পিতাকে লেখা শেষ চিঠি

৭৫ থেকে ২১ বছর ধরে আপনি কায়েমি ঘৃণা ও ক্ষমতার পর্বতের তলায় চাপা পড়ে ছিলেন। বিগত ২০ বছর ধরে ঘৃণার পাহাড় ঠেলে আপনি আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন, এর জন্য কোন সংরক্ষণ আইনের প্রয়োজন হয়নি। আপনার সন্মান রক্ষার আইন করে সেই ব্যর্থ ঘৃণার চাষাবাদ কাজে ভর্তুকি দেওয়ার নির্বুদ্ধিতা দেখতে পাচ্ছি।

পিতা, যে রাষ্ট্র একটি সুষম সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র দমন পীড়নে দক্ষ হলেও সমাজের সকল অংশে আইনের সৎ ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা। আইনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সমাজের একটা বিশেষ অংশের মাঝে আপনার প্রতি বিদ্বেষের চাষাবাদ করনেওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে। আর আরেকটা অংশ মশগুল থাকে আপনার প্রতি কুমীরের কান্না দেখিয়ে নাযায়েয ফায়দা হাসিলে।

প্রিয় বঙ্গবন্ধু,
আমার জন্মদাতা হোস্টেলে থাকা আমাকে ২০০২ সন পর্যন্ত প্রায় একশত চিঠি লিখেছিলেন। মোবাইল ফোন এসে যাবার পর প্রবাহ বন্ধ হওয়া চিঠির বান্ডিল সংরক্ষণ করে রেখেছি। আমার পিতা মিলিশিয়া নম্বর ১১৪২,সেক্টর নম্বর ৮,জাতীয় মুক্তি বাহিনী। আমার পিতা দেরাদুন মিলিটারি একাডেমীর কমান্ডো ট্রেনিং প্রাপ্ত গেরিলা। আমার পিতা বাংলাদেশের একজন তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক যিনি নানা রকম টানা পড়েনের গ্লানিকর জীবনের শেষপ্রান্তে ২০১৩ সনের ৬ ই মে সকালবেলার টাটকা সবজি কিনতে কিনতে তৃতীয় বারের মত হার্ট এ্যাটাক হয়ে রাস্তায় কাটা কলাগাছের মত পড়ে মারা গেছেন। আমার জন্মদাতার মৃত দেহের নাক দিয়ে বের হওয়া রক্তের ধারা,রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার বিহীন দাফনের শেষ মুঠোর মাটি চাপা দেবার সময়ও বন্ধ হয়নি।

আমার পিতা তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যর্থ চিকিৎসা নেবার সময় ২০১২ সনে শেষ তিনমাস রাজধানীর পান্থপথে ছিলেন। প্রায়দিন বিকেল বেলা হেঁটে হেঁটে ৩২ নম্বর বাড়িতে যেতেন। টিকেট কেটে বাড়িতে প্রবেশ করতেন। বাংলাদেশের জন্মদাতার ইতিহাস দেখতেন। কখনো লেকের পাড়ে বসে থাকতেন।

প্রিয় বঙ্গবন্ধু, অনেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বিবেচনায় আপনাকে তাদের মত করে মূল্যায়ন, অবমূল্যায়ন করতে চান। আর কেউ কেউ অন্ধ মতাদর্শিক অবস্থান থেকে আপনার প্রতি পুষে রাখা অগ্রিম বিদ্বেষ প্রতিনিয়ত পুনরায় নবায়ন করে যাচ্ছে। ইতিহাস আমাদের মতামত দিয়ে নয়,সময় ও কাজ দিয়ে যার যার অবস্থান চিহ্নিত করবে। আপনাকে পরিপূর্ণ মূল্যায়নের সে সময় ইতিহাসের নিরিখে এখনো আসেনি।

বঙ্গবন্ধু, আপনাকে বঙ্গবন্ধুর মত করে ভালোবাসার অনুভব মানে এই নয় দলীয় রাজনীতির তল্পিবাহক হতে হবে। আমি অনুভব করি ক্ষমতাহীন, সুবিধাহীন, অধিকারহীন হতদরিদ্র মোট ৯০ ভাগ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য তেমন পুর্নাঙ্গ কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নাই। তাই আপনার প্রতি আমার মায়ার অবস্থান একটি বিশেষ কাল পর্বের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অবস্থান। যে দায়বদ্ধতা আমাদের ভিত্তি থেকে সামনে এগিয়ে যাবার সেতুবন্ধন। আপনাকে ন্যায্য সন্মানের সাথে স্বীকার করে নিয়েই সামনে এগোতে হয়। আপনার ব্যর্থতা সমূহ আপনার খুনীরা ও পরবর্তী বাংলাদেশের শাসকেরা আপনার প্রতি অবিচারের দ্বারা মুছে দিয়েছেন। এসব সমীকরণের বাইরে আপনি বাংলাদেশের পিতা। পিতা দানব বা দেবতা নন। পিতার ওপর অভিমান করা যায়, রাগ করা যায়, আবদার করা যায়।

যখন আপনার প্রতি বিদ্বেষ ও আক্রোশ পোষণ করতে দেখি বাংলাদেশেরই কিছু মানুষকে, তখন বুকে রক্তক্ষরণ হয়। আপনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজের ব্যর্থতা নিয়ে কেউ সমালোচনা বা পর্যালোচনা করলে বরং ভুল থেকে শেখার আগ্রহ জাগে। কিন্তু কেউ যখন আপনার সফলতা কে গাদ্দারি বলে কুৎসা করে,তখন সত্যিই মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে। আবার পাকিস্থানি জেনারেল ও ঐতিহাসিকদের বই-এ আপনার প্রতি ক্রোধের আগুন দেখলে, আপনার সফলতায় সুখ অনভব হয়।

৭৫ থেকে ২১ বছর ধরে আপনি কায়েমি ঘৃণা ও ক্ষমতার পর্বতের তলায় চাপা পড়ে ছিলেন। বিগত ২০ বছর ধরে ঘৃণার পাহাড় ঠেলে আপনি আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন, এর জন্য কোন সংরক্ষণ আইনের প্রয়োজন হয়নি। আপনার সন্মান রক্ষার আইন করে সেই ব্যর্থ ঘৃণার চাষাবাদ কাজে ভর্তুকি দেওয়ার নির্বুদ্ধিতা দেখতে পাচ্ছি।

পিতা,যে রাষ্ট্র একটি সুষম সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র দমন পীড়নে দক্ষ হলেও সমাজের সকল অংশে আইনের সৎ ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা। আইনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সমাজের একটা বিশেষ অংশের মাঝে আপনার প্রতি বিদ্বেষের চাষাবাদ করনেওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে। আর আরেকটা অংশ মশগুল থাকে আপনার প্রতি কুমীরের কান্না দেখিয়ে নাযায়েয ফায়দা হাসিলে।

তাই পিতা আমি ক্ষমা চাইছি, আমার ব্যর্থতার জন্য, আপনার প্রতি নির্ভেজাল সন্মান রক্ষা করতে আপনার জাতি ব্যর্থ। পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ যে আইন করতে যাচ্ছে, এরপর আমি আর আপনাকে কিছু লিখবোনা, আপনাকে নিয়ে কিছু লিখবোনা। পিতার কাছে পত্র লিখলে সেখানে ভালবাসার সাথে সাথে রাগ থাকে, ক্ষোভ থাকে, অভিমান থাকে, আবদার থাকে , বিরক্তি থাকে। সেসব প্রকাশ করার সুযোগ না থাকলে পিতার কাছে চিঠি লেখা যায়? তাই আপনার কাছে এই শেষ চিঠি । যখন এই ভঙ্গুর বিভক্ত সমাজে বেঁচে থাকা চলার পথে কোনো কোনো অন্ধ কুঠুরিতে আপনার প্রতি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা,অশ্রাব্য কুৎসা,কায়েমি স্বার্থের আস্ফালন শুনতে পাব, তখন পিতা আপনার জন্য আমার জন্মদাতা পিতার হৃদরোগে দীর্ণ হৃদয়ের মত আমার হৃদয় দীর্ণ হতে থাকবে। তবুও পিতা আজকের পর থেকে আপনাকে আমি আর কোনো চিঠি লিখবোনা। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন পিতা। আপনাকে যারা ঘৃণা করে ও আপনাকে যারা পুজা করে, তারা যতই আপনাকে নিয়ে টানা হেঁচড়া করুক,আপনি ইতিহাসে আপনার অবস্থানেই থাকবেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + = 13