নাচের শাড়ি

আজকের সকালটা আসলেই চমৎকার।বাসার সামনে এক্টুকরো জমিতে দিনের প্রথম সূর্্যাীলোক এসে পড়েছে।এই শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়ে বৃস্টি জিনিসটা বেশ জাকিয়েই বসেছে। কদিনের একটানা বর্ষণে ঘাটফরহাদবেগ এলাকা পুরো পানিতে ডুবে গেছে। রীতিমতো নৌকা চলতে পারবে অনায়াসে। কতদিন আর ঘরে বন্দী হয়ে থাকা যায়? তাও আবার একেবারে একেলা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিল সবাই। শফিকও গিয়েছিল। কিন্তু মে মাসের দিকে সবাই যখন ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো, তখন বেঁকে বসলো সে। পরিবারের সবার কথা উপেক্ষা করেই শহরে ফিরে এসেছে। যোগ দিয়েছে খাতুনগঞ্জের সওদাগরের আড়তের চাকরিতে। এবছরই ডিগ্রী পরীক্ষাটা দেয়ার কথা ছিলো। তা আর হয়ে উঠলো কই? তবে চাকরিটা আড়াল মাত্র। মে মাস থেকেই সে যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছে ক্যাপটেন করিম গ্রুপের সাথে। হালকা পাতলা গড়ন আর চোখে হাই পাওয়ারের চশমা থাকায় তাঁকে গেরিলা গ্রুপে নেয়া হয়নি। কিন্তু দেয়া হয়েছে অন্য কাজের ভার। সে সহ কয়েকজনের উপরে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে শহরের ভেতরে তথ্য আদান প্রদান, গেরিলাদের সাহায্য, অস্ত্রশশ্ত্র লুকিয়ে পরিবহন ইত্যাদি কাজের। রোগা হাড়জিড়জিড়ে চেহেরা আর মোটা ফ্রেমের চশমাটার কারণে আর্মি বা রাজাকারদের সুদৃষ্টি থেকে ভালোই আড়াল পেয়েছে সে।

কদিন আগে অবশ্য একটা সমস্যা হয়েছিল। গদি বন্ধ করতে করতে রাত প্রায় ১০ টা বেজে গিয়েছিল। ফিরছিলো রিকশায়। আন্দরকিল্লার মোড়ে আসতেই, চেক পয়েন্ট থেকে “হল্ট” বলে ডাক এলো। আর চেকপোস্ট থেকে রাইফেল উচিয়ে এগিয়ে এলো দুই খানসেনা। মূর্তিমান জল্লাদ যেন। এসেই বললো ,

…… ডান্টি কার্ড কিধার হে?

পকেট থেকে কার্ডটা বের করে দেয়ার পরে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে দেখলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো?

… নাম ক্যা হ্যায়?

…… শফিকুল ইসলাম।

…… হিন্দু আউর মুসলমান?

……… মুসলমান।

…… প্যান্ট উতারো।

রীতিমতো স্থম্ভিত হয়ে যায় শফিক। বলে কি বেটারা? নাম বলার পরেও চেক করে দেখতে চাচ্ছে ওটা কাটা আছে কিনা !!!! ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রেগে গেলেও বাইরে প্রকাশ করার সাহস ছিলোনা তার। কি আর করা , বাধ্য হয়ে প্যান্ট খুলে দেখাতেই হলো। প্রচণ্ড অশ্লীল একটা হাসি দিলো বেজন্মা দুটো। যেন লাইভ সার্কাস দেখছে। এরপর ইশারায় প্যান্টের বোতাম লাগাতে বলে রাস্তা ছেড়ে দিলো। রিকশায় গুম হয়ে বসে ছিলো সে। ফাঁকা রাস্তা, লোকজন নেই বললেই চলে। কেউ দেখেছে বলেও মনে হয়না। তারপরও লজ্জায় ঘৃণায় সারা শরীর রিরি করে উঠছিলো তার। নীরবতা ভাঙলো রিকশাওয়ালাই। ৬০ এর কাছাকাছি বয়েস। তারপরও বেশ শক্তসামর্থ।

…… সাহেব নাম কইলেন। মুসলমানের নাম। তারপরও ল্যাংটা কইরা চেক করলো। ব্যাপারটা বুঝছেন নি কিছু?

………… হয়তো সন্দেহ করেছে। বা বিশ্বাস করেনি।

………… আরেনা। হেরা ভালামতোই জানে যে, কোন হিন্দুর বুকের পাটা নাই এতো রাইতে রাস্তায় বাইর অয়।

……… এটাতো ভেবে দেখিনি। তাইলে চেক করলো কেন?

………… বুঝলেননা, হিন্দু মুসলমান ব্যাপার না। বাঙালী মানেই হেতেগো কাছে কাফের আর গাদ্দার , তাই বেইজ্জতী কইরা মজা লইল। নিজের গায়ে নিজে থুথু দিবার ইচ্ছা করে , যখন মনে পড়ে বয়সকালে এই পাকিস্তানের লাইগা “লড়কে লেহেঙ্গে পাকিস্তান” শ্লোগান দিচিলাম।

কিছু না বলে চুপচাপ রিকশাওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো শফিক। এরকম ছোটোখাটো সামান্য সমস্যা ছাড়া মোটের উপরে সে বেশ নিরাপদেই আছে। বাসার মালিক ওয়ালী সাহেব মুসলিম লীগার। পিস কমিটিতে বড় পদে আছেন। আর্মি আর যেখানেই হউক এখানে অন্তত ঘাটাবেনা সহজে। ঘুম ভেঙেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কিছু মুখে দিতে আর ইচ্ছে করছেনা। গতকাল ফেরার পথে কোতোয়ালীর মোড়ে ডাস্টবিনের উপরে একটা নাড়িভুড়ি বের করা বীভৎস লাশ দেখে এসেছে। বাসায় ফিরেই বমি। কিছু খাওয়াও হয়নি। এখনো সে রেশ কেটে যায়নি। যদিও গত কমাসে এরকম কয়েকশত লাশ দেখেছে সে। কিন্তু অনেকের মতো অভ্যস্ত হতে পারেনি এখনো। প্রতিবারই নিত্যনতুন বিভিষিকার মুখোমুখি হতে হয়। মানুষ মারার এমন কোন কায়দা নেই যেটা পাইক্কা শালারা জানেনা। চেঙ্গিস খানের সৈন্যরাও হয়তো এতো বর্বর ছিলোনা।

হঠাত টোকা পড়লো দরজায়। পরপর তিনটে। এ অসময়ে আবার কে এলো?

…… কে?

……… দরজাটা একটু খুলুন বাবা। আমরা অন্ধ ফকির। একপয়সা দিলে বাবা সত্তর পয়সা পায় , ইহকালে দিলে বাবা পরকালে পায়।

শালা মিঠুন। অভিনয় পাক্কা জানলেও গলার স্বর বদলাতে পারেনি।মিথুনের সাথে অপরিচিত একটা ছেলেও আছে। দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে বসলো ওরা। দুজনের পরনেই শতচ্ছিন্ন পাঞ্জাবী। কাঁধে ভিক্ষার ঝোলা। সারা শরীরে ধুলোবালুর পাহাড়।মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। উসখোখুশকো চুল। একেবারে পাক্কা ভিখারী।

…… তাড়াতাড়ি পানি দে এক গ্লাস। তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। ফকির হওয়া কি চাট্টিখানি কাজ?
পাউরুটি আর বাসি তরকারী ছিলো গতকালের। সেগুলো আর এক মগ পানি এনে দিলো শফিক। গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলো দুজনে। বোঝাই যাচ্ছে অনেকক্ষণ না খেয়ে আছে ওরা। মিঠউনের দিকে তাকাতেই মায়া লাগলো শফিকের। নামকরা আইনজীবী অরিন্দম সেনের একমাত্র আদরের দুলাল এই বন্ধুটি ছিলো অতিমাত্রায় ডানপিটে আর শৌখিন। এক কাপড় দুদিন পড়তে দেখেনি কেউ কলেজে। আর সেই ছেলের আজ এই অবস্থা। যুদ্ধ আসলেই অনেক বদলে দেয় মানুষকে।

……… কিরে শালা , ফ্যামিলির খোজখবর রাখস কিছু ?

………… নারে, মে মাসে ভারতে যাওয়ার পর থেকে আর যোগাযোগ নেই।

…………… তা থাকবে কেন?শালা আকাইম্মার ধাড়ি। খবর যে রাখবিনা সেটা আগেই জানতাম। তাই খবর নিয়েই এসেছি। উনারা সবাই কোলকাতায়। আমার বাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম গত মাসে। সেখানেই দেখা। একই পাড়ায় থাকেন পাশাপাশি।

……… তাই? কেমন আছেরে সবাই?

……… আছে মোটামুটি।রিফিউজিদের আবার থাকা। তবে শরণার্থী ক্যাম্পের মানুষগুলোর চেয়ে অনেক ভালো আছেন।সেখানে তো প্রতিদিন রোগে আর অনাহারে হাজারে হাজারে মরছে। যাকগে, আচ্ছা ভালো কথা, তোর কাছে কি নীল রঙের একটা বাচ্চাদের নাচের শাড়ী আছে নাকি?

………… তুই জানলি কি করে?

………… মুমু বলেছে শাড়ীটা নিয়ে যেতে।

মুমু শফিকের বড় ভাইয়ের মেয়ে। ক্লাশ ফোর এ পড়ে। শফিকের খুব ন্যাওটা। ওকে নাচের স্কুলে ভর্তি করানোর পরে বায়না ধরেছিলো একটা শাড়ি কিনে দিতে। গত জন্মদিনে তাই শাড়িটা কিনে দিয়েছিল শফিক। খুব পছন্দ হয়েছিলো মুমুর। রাতে ঘুমাতে গেলেও সাথে রাখতো। যুদ্ধ শুরুর পরে তাড়াহুড়োয় আর সাথে নেয়া হয়নি। ভিনদেশে গিয়েও শাড়িটার কথা ভুলেনি পিচ্চি মেয়েটা।

………… দাড়া আসছি।

ভেতরের রুমে গেলো শফিক। আলমারী খুলে শাড়ীটা নিয়ে এসে মিথুনের হাতে দিলো।

……… দেখিস শালা , ঠিকঠাকমতো পৌঁছে দিস।শাড়ীটার কিছু হলে মুমু আমাকে আস্ত রাখবেনা।
শাড়ীটা ঝোলাতে পুরল মিথুন। তারপর তার স্বভাবসুলভ প্রাণখোলা হাসিটা হেসে বললো,

………… চিন্তা করিসনারে। শাড়িটা আমি জীবন দিয়ে হলেও আকড়ে রাখবো। এখন যাই, অনেক দেরী হয়ে গেছে। জরুরী নিউজ পাঠাতে হবে ক্যাম্পে।

বলেই বেরিয়ে পড়লো ওরা। একবার মাথা ফিরিয়ে ইশারায় বিদায় জানালো। তারপর দুজনে ভিক্ষার গান গাইতে গাইতে সামনের মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। শফিকও দরজা আটকে শুয়ে পড়লো আবার আজ আর বাসার বাইরে বেরোবেনা সে।

দুই/

পরদিন বেশ ভোরেই উঠলো ঘুম থেকে। গতকাল গদিতে যায়নি। আজ যেতেই হবে। এই যুদ্ধের বাজারেও মালিকের সকাল সকাল আড়ত খোলার অভ্যাসটা যায়নি। যুদ্ধ হউক বা শান্তি ,কিছু মানুষের ধান্ধা আসলে কখনোই বন্ধ থাকেনা। মালিকের ছেলে আবার ছাত্রসংঘের নেতা। তাই মিলিটারীর ভয়ও নেই। বাসা থেকে বেরিয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করলো কতক্ষণ। তারপর না পেয়ে হাঁটতে শুরু করলো আন্দরকিল্লার দিকে। ভোরের আলো বেশ ফুটেছে চারদিকে। লোকজনও বেরিয়েছে মোটামুটি। যুদ্ধের দোহাই পেটতো আর শুনবেনা। লালদিঘির মোড়ে আসতেই একটা ছোটখাট জটলা চোখে পড়লো। ডাস্টবিনের পাশে কয়েকজন ঘিরে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে। পাশে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করলো ও ব্যাপারটা কি?

………… কাল রাতে আলবদররা একটা ফকিরকে এখানে জবাই করে মেরে লাশ ফেলে চলে গেছে। মারার আগে প্রচণ্ড মারধোর করেছে। হাত,পা সব ভেঙে শেষে জবাই করেছে। এতো কস্ট দিতে পারে জালিমগুলো !!!!!!!!

একবার ভাবলো এড়িয়ে যাবে। কি দরকার এসব লাশ দেখে? সহ্য যখন হয়না। কয়েককদম এগিয়ে গিয়ে কি মনে করে জানি থমকে দাড়ালো। ফিরে এগিয়ে গেল জটলার দিকে। ভেতরে উকি দিতেই স্থম্ভিত হয়ে গেল পুরোপুরি। ডাস্টবিনের সামনে গলা কাটা অবস্থায় পড়ে আছে মিথুনের লাশ। চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে, হাত পা ভাঙা। সারা শরীরে তীব্র অত্যাচারের চিহ্ন।হাতদুটো পিছমোড়া বাঁধ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাতের বাধনটার দিকে চোখ যেতেই চমকে ঊঠলো শফিক। ওর সারা শরীর কাঁপতে শুরু করলো ভীশণভাবে।

হাতদুটো বাঁধা হয়েছে মুমুর সেই নাচের শাড়ীটা দিয়েই!মিথুন ওর কথা রেখেছে।

শাড়ীটা সে জীবন দিয়েই আঁকড়ে রেখেছিলো…………………………………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 5