রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (দুই)

রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (দুই)
বাস্তবতা কি ? জাদু কি ?

একটি ভিন্ন অর্থে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এক ধরনের টাইম মেশিন হিসাবে কাজ করতে পারে। আমরা যখন কোনো কিছুর দিকে তাকাই আমরা আসলে যা দেখি সেটি হচ্ছে আলো, আর আলোর সময় লাগে কোনো দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য। এমনকি যখন আপনি আপনার বন্ধুর মুখের দিকে তাকান, আপনি সেই মুখটি অতীতের কোনো একটি সময়ে দেখছেন, কারণ তাদের মুখ থেকে ফিরে আসা আলো আপনার চোখে এসে পৌছাতে এক সেকেণ্ডের খুব ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ পরিমান সময় নেয়। শব্দ দূরত্ব অতিক্রম করে আরো অনেক ধীরে, সে কারণে আপনি লক্ষ্য করার মত আগেই আকাশে আতশ বাজির বিস্ফোরণ দেখতে পান, এর শব্দ শোনার আগে। যখন দূর থেকে কাউকে গাছ কাটতে দেখেন, গাছের উপরে কুঠারের আঘাত এবং তার কারণে সৃষ্ট শব্দের মধ্যে বেমানান একটি বিলম্ব থাকে।

আলো এত দ্রুত দূরত্ব অতিক্রম করে যে আমরা সাধারণত মনে করি আমরা যা কিছু দেখি সেটি ঘটছে ঠিক যে মুহূর্তে আমরা তা দেখছি। কিন্তু নক্ষত্রদের ব্যপার আলাদা। এমনকি সূর্যও আট লাইট-মিনিট দূরে। যদি সূর্য কখনো বিস্ফোরিত হয়, সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি আমাদের বাস্তবতার অংশ হবে না, আট মিনিট অতিক্রান্ত হবার আগে। এবং সেটি আমাদের জন্যও চুড়ান্ত সময়! আর যদি সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটির কথা ভাবি, প্রক্সিমা সেন্টরি, আপনি যদি এটির দিকে ২০১২ সালের কোনো সময় তাকান, আপনি যা দেখবেন সেটি ঘটেছিল ২০০৮ এ। ছায়াপথগুলো হচ্ছে অসংখ্য নক্ষত্রের সম্ভার। মিল্কি ওয়ে নামের একটি ছায়াপথে আমাদের অবস্থান। যখন আপনি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের নিকট প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের দিকে তাকাবেন, আপনার দূরবীক্ষণ যন্ত্র তখন টাইম মেশিন যা আপনাকে আড়াই মিলিয়ন বছর আগে নিয়ে যাবে। পাঁচটি ছায়াপথের একটি গুচ্ছ আছে, যার নাম স্টেফানস কুইন্টেট, যাদের আমরা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে পারি, বিস্ময়করভাবে তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু আমরা তাদের পরস্পরের সাথে ধাক্কা খেতে দেখছি ২৮০ মিলিয়ন বছর আগের কোনো একটি সময়ে। পরস্পরের সাথে ধাক্কা খাওয়া ছায়াপথে বাস করা যদি কোনো ভীনগ্রহী আমাদেরকে দেখার মত শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতো, পৃথিবীতে তারা কি দেখতো ঠিক এই মুহূর্তে, এখানে এবং এখন, ডায়নোসরদেরও আদি পূর্বসূরিদের।

আসলেই কি মহাশূন্যে ভীনগ্রহীরা বাস করে? আমরা তাদের দেখিনি এবং তাদের কোনো কিছু শুনিনি। তারা কি বাস্তবতার অংশ? কেউ জানেনা, কিন্তু আমরা জানি কোন জিনিসগুলো আমাদের তা বলতে পারবে, যদি তাদের অস্তিত্ব থাকে। যদি আমরা কোনো অ্যালিয়েনের কাছে যাই, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো সেটি সম্বন্ধে আমাদের বলতে পারবে। হয়তো কেউ একদিন এমন একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করবে যা যথেষ্ট শক্তিশালী হবে এখান থেকেই অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব শনাক্ত করার জন্য। অথবা হয়তো আমাদের রেডিও টেলিস্কোপ সেই বার্তা পাবে, যা কেবলমাত্র ভীনগ্রহী কোনো বুদ্ধিমান সত্তারই হতে পারে। কারণ বাস্তবতা শুধুমাত্র আমরা ইতিমধ্যে যা কিছু জানি সেই সবকিছুই দিয়ে তৈরী নয়, এখানে সেই সব কিছুই আছে যাদের সম্বন্ধে আমরা এখনও কিছু জানি না বা ভবিষ্যতে কোনো সময় ছাড়া তাদের আমরা জানতেও পারবোনা, হয়তো যখন আমরা আরো বেশী শক্তিশালী যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবো যা আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করবে।

পরমাণুদের অস্তিত্ব ছিল সবসময়ই, কিন্তু আমরা বরং খুব সাম্প্রতিক সময়ে নিশ্চিৎ হয়েছি তাদের অস্তিত্বের ব্যপারে। এবং সম্ভাবনা বেশী যে আমাদের উত্তরসূরীরা আমাদের চেয়ে আরো অনেক কিছু সম্বন্ধে জানবে, বর্তমানে যা আমাদের জানা নেই। আর এটাই বিজ্ঞানের বিস্ময় আর আনন্দ: এটি চলমান একটি পক্রিয়া যা একে পর এক নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলে। এর মানে এই না যে, আমাদের যে কোনো কিছুই বিশ্বাস করা উচিৎ যা হয়তো কেউই কল্পনা করতে পারেন। বহু মিলিয়ন জিনিস আছে যা আমরা কল্পনা করতে পারি, কিন্তু যাদের বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম – যেমন পরী বা হবগবলিন, লেপরেকন আর হিপপোগ্রিফ। আমাদের সবসময়ই খোলা মনের হওয়া উচিৎ, কিন্তু কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে এমন কিছু বিশ্বাস করার একমাত্র ভালো কারণ হচ্ছে, যদি সত্যিকারের প্রমাণ থাকে যে, এর আসলেই অস্তিত্ব আছে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 66 = 70