ত্রয়ী

সকাল সবসময় স্নিগ্ধ। বেলকনি দিয়ে সোজা আলো এসে পড়ছে সিনথিয়ার বিছানায়। সিনথিয়া এই সময়টা খুব প্রিয়। প্রিয় না হওয়ারই বা কোনো কারণ আছে কি? সে ভেবে কূল পায় না। আলো এসে সোজা তার মুখের উপর পড়ে। আর এই মিষ্টি আলোর জন্যেই হয়তো লোকে সকালের ঘুম ভাঙানোর অপরাধ মার্জনা করে দেয় সূর্যকে। সিনথিয়া আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো।অয়ন এখনো ঘুমাচ্ছে। কুম্ভকর্ণ একটা! এই ঘুমের জন্যেই তার সুপ্ত প্রতিভাও সুপ্ত হয়ে আছে। এটা সিনথিয়ার বিশ্বাস। নাহয় এতো ভালো ছবি আঁকে, বিদেশে না হোক দৃকেও তো একটা আর্ট এক্সিবিশান করা যেতো। থাক ওকে এখন জাগিয়ে তোলা যাবে না। পাশে বাসি হয়ে যাওয়া সাদা চাদরটা পড়ে আছে। তার চোখ গিয়ে পড়ে চাদরের লালচে লালচে ছোপ ছোপ দাগ। সিনথিয়া মুচকি হাসে আর ভাবে অয়ন পারে বটে, গতরাত সে অন্য জগতে ছিলো!
সিনথিয়া সকাল সকাল স্নান করে নিল। রৌদ্রস্নানের পর জলে অবগাহন না করলে তার শরীরের অবস্থা কি হতো! সিনথিয়া দুচোখ বন্ধ করে জল ঢালছে, বাথটাবে সাবানের ফেনা। সিনথিয়া গুণগুণ করে গান করছে। যেনো নিমগ্ন চিন্তায়।
অয়ন, তুমি উঠে পড়েছ?
অয়ন পর্দাটা সরিয়ে বাথটাবের পাশে বসে, হাতে সাবানের ফ্যানা দিয়ে বুদবুদ তৈরি করছে তো করছে!
সিনথিয়া বললো, তোমার বাচ্চামি আর গেলো না!
অয়ন বললো, সিনথিয়া দেখো, দেখো, এই বুদবুদে তুমি-ব্যালে নাচছ,আর ওঠাতে আমি-ক্যানভাসে তুলির আঁচড় দিচ্ছি, আর দেখো দেখো দুটো বুদবুদ এক হয়ে যাচ্ছে।
সিনথিয়া উচ্ছাস নিয়ে, ওয়াও! ওয়াও!দেখো ওরা আমাদের মিলনরথের সারথি।
সত্যিই তো ওই বুদবুদ দুটো একসাথে লেগে যেন ঘোষণা দিচ্ছে- অয়ন, সিনথিয়ার দুটো মন পাশাপাশি, দুটো মন মিলে কি একটি মন হওয়া যায়? কখনোই না…
দশটা বাজার আগেই অয়ন চলে গেলো, অয়নের অফিস কাওরানবাজারের এক খুপড়িতে। অথচ সে চেয়েছিলো, পাহাড়, সে চেয়েছিলো আকাশ, সে চেয়ছিলো উন্মুক্ত সাগর। কিন্তু কাজ না করলে চলবে?

সিনথিয়া নাচের স্কুল চালায়। রোজ পাঁচটা পর্যন্ত। আজকেও যেতে হবে। সিনথিয়ার ফোন বেজে উঠলো। নিশ্চয় শুভ -এর ফোন। সিনথিয়ার সাথে শুভ এর পরিচয় হয় গতবছর ডিসেম্বরে। ধানমণ্ডী লেকের পাড়ে। শুভ সবসময় মাথা ন্যাড়া করে রাখে। শুভ ছেলেটা গান গায় না, কবিতাও আবৃত্তিও করে ন, তবুও ছেলেটাকে সিনথিয়ার ভালো লেগে যায়। শুভ যেনো ছিলো সঙ্গীহীন এক পাখি। সিনথিয়ার একটু স্পর্শে সে খুঁজে পেয়েছিলো ঠিকানা। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করা ছেলেটা রোজ অফিস কামাই করে সিনথিয়ার অফিসে বসে থাকতে শুরু করল। সিনথিয়ার নাচের স্কুলে ভর্তি হওয়াটা বাড়াবাড়ি রকম ছেলেমানুষি ছিলো তার। তবুও হয়ে গেলো। সিনথিয়া প্রথম থেকে ব্যাপারটা উপভোগ করছে। সিনথিয়া তাকে তো সেদিন বলেই ফেললো, নাচ তো তোমাকে দিয়ে হবে না। তুমি বরং মার্কেটিং নিয়েই থাকো! এটা বলে তার হাতে হাত রাখল, দুজন মুখোমুখি, “দ্যাখো, নাচের সময়, তোমার চোখ কথা বলে, হাত কথা বলে, মুখ কথা বলে, বিমূর্ত কিছুই না! আমার চোখের ভাষা পড়!”
শুভ বলল, ম্যাম সিনথিয়া, তুমি কি আমার চোখের ভাষা পড়তে পারো?
সিনথিয়া বলল, পারি বলেই তো ভয় হয়।
এবার তার দুজনে নাচের দ্বিতীয় পর্যায়ে, শুভ বলল, তুমি কি তোমার এই অবাধ্য ছাত্রকে বের করে দেবে?
সিনথিয়া বলল, সেই সাধ্য যদি আমার থাকত?
শুভ বলল, তবে আরোও কাছে টেনে নাও না কেন?
সিনথিয়া বলল, কি চাও তুমি?
শুভ বললো, “তোমার চরণে দেব হৃদয় খুলিয়া!”
সিনথিয়া আর শুভ এবার নাচের তৃতীয় পর্যায়ে, এবার চতুর্থ, এবং সর্বশেষ ধাপে। এতক্ষণে নিশ্চুপ আধাঘণ্ঠা মনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে শরীরে শরীরে।
সিনথিয়া বললো, “তবে তুমি আমার একমাত্র প্রেমিক না, বলো পারবে হতে? ”
শুভ বললো, “আমি রাজি! শুধু তুমি আমার ভালোবাসা হও। ভালোবাসা যেখানে উদার সেখানে দুটো দেহ, এক মন কি সংকীর্ণতা নয়? আমার ভালোবাসা ঠুনকো নয়, আমার ভালোবাসা কারাগার নয়! ”
সিনথিয়া দু’চোখে অশ্রু। অশ্রুর দু’ধারার একটি অয়নের জন্যে, একটি শুভ-এর জন্যে।

শুভ্রের ফোন ধরে বলল, হ্যাঁ, আমরা পরের সপ্তাহেই মানালি যাবো। আমি, তুমি আর শুভ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =