“বাগদাদ জ্বলছে” – নামহীন নারীর ব্লগ থেকে ! – কিস্তি ৬

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ

পূর্ব প্রকাশিতর পর থেকে

 

পঞ্চম পুতুলঃ আব্দুল আজিজ আল হাকিম

ইনি সুপ্রিম কাউন্সিল অফ ইসলামিক রেভলিউশন এর ডেপুটি প্রধান। তিনি বহু বছর ইরানে ছিলেন এবং বদির বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধপরবর্তী বেশ কিছু হট্টগোল এর জন্যে তাকেই দায়ী মনে করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ খবর হচ্ছে, ইদানিং রটনা শোনা যাচ্ছে যে, এই বাহিনী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এক ধরনের নেগোশিয়েসন হচ্ছে যে, ইরাকের কিছু কিছু অঞ্চলের “নিরাপত্তা” রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হতে পারে হাকিমের বাহিনী কে।

 

ষষ্ঠ পুতুলঃ আদনান আল পাসিসি

একজন কট্টর সুন্নী আরব, বয়স ৮১ বছর (মতান্তরে ৮৪ বছর), লাঠিতে ভর করে হাঁটেন। ষাটের দশকে তিনি দুইবার ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন। আমার দাদা তাঁকে চিনতেন। হয়তো এভাবে বলা ঠিক নয়, তার সব কিছু মিলিয়ে, তাঁকে খানিকটা আজব কিসিমের মনে হয়, তাঁকে ঠিক ইরাক শাসনের জন্যে যোগ্য মনে হয়না। এটা সত্যিই একটা মজার ব্যাপার হবে যদি এই লোক নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসেন। কেননা – তিনি দেশ ছড়েছিলেন ষাটের দশকের এবং তারপর থেকে আধুনিক ইরাকের কিছুই জানেন না। ইরাকীরাও তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না।

 

সপ্তম পুতুলঃ মোহসেন আব্দুল হামিদ

ইনি একটি সুন্নী ইসলামী মৌলবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক। ইসলামিক ব্রাদারহুড এর একটি ইরাকী শাখা বলা যেতে পারে। এই দলটি সুন্নী মৌলবাদী দল এবং এদের সাধারণ সম্পাদক কে সরকারে নেয়া হয়েছে, মূলত সুন্নী চরমপন্থীদের কে বাগে ধরে রাখার জন্যে।

 

অষ্টম পুতুলঃ মোহাম্মদ বহর উল ইলুম

ইরাকের খুব কম মানুষই তাঁকে চেনেন। যদি কাউকে তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে পালটা প্রশ্ন শুনতে হবে – কে? ইনি একজন শিয়া ধর্মীয় মোল্লা, ১৯৯১ সাল থেকে পলাতক ছিলেন। তিনি লন্ডনে পলাতক বা নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক যোগ্যতা হচ্ছে তিনি লন্ডনে পলাতক অথবা যাকে তিনি বলতেন নির্বাসিত জীবনে ছিলেন। খুব দ্রুত জনপ্রিয় হবার কোনও সুযোগই তিনি ছাড়তে রাজী নন। তাইতো ইরাকের নতুন জাতীয় দিবস ৯ ই এপ্রিল ঘোষণার সুযোগটি তিনি ছাড়তে পারলেন না।

 

নবম বা শেষ পুতুলঃ মাসুদ বেরাজানি

ইনি হচ্ছেন কুর্দি গণতান্ত্রিক দলের প্রধান এবং ইরাকে বুশ প্রশাসনের আরেক পুতুল অস্থায়ী প্রধান জালাল তালেবানির প্রধান প্রতিপক্ষ। মাসুদ বেরাজানি হচ্ছেন আমেরিকার সমর্থনে উত্তর ইরাকের নিয়ন্ত্রন কর্তা। জালাল তালেবানির সাথে বিরোধের জের হিসাবে কয়েক হাজার কুর্দি নিহত হয়েছেন এবং আরো একটি বিরাট অংশ প্রবাসে বা আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। আমেরিকান পিতা পল ব্রেইমারের সামনে এই দুই চির শত্রু যখন দন্ত বিকশিত হাসি দিয়ে দিয়ে কথা বলেন, বাত-চিত করেন তখন মনে হবে এরা কতইনা ঘনিষ্ঠ একে অপরের, মনে হবে এরা বোধ হয় জুগ যুগান্তরের প্রানের সখা। রাজনীতির এটা একটা দারুন পাঠ – কিভাবে চিরকালের শত্রুরা এক সাথে গলাগলি করে। এদের দেখলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন আসে, তাহলো – যারা ইরাকের ছোট একটা অংশের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে হাজার হাজার খুনোখুনি করে, তারা কিভাবে সারা ইরাকের নেতৃত্ব দেবে?


(মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে ইরাকের পুতুল প্রশাসক মাসুদ বেরাজানি)

এই দুই কুর্দি নেতার অধীনে একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে। এই বাহিনীর বহুবিধ প্রতিভার কথা বেশ জোরে শোরে রটনা আছে। এরা নাকি একই সাথে দেহরক্ষী ও চোরাচালানী হিসাবে কাজ করে থাকে। এ বিষয়ে এদের নাকি বিশেষ প্রশিক্ষন আছে। এরা গাড়ী, মুদ্রা ও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন পাচার কালে ধরা পড়েছে। গত দুদিন ধরে এই দুইজনের বাহিনী আর তুর্কমেন দের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ হচ্ছে।

সবচাইতে গা জ্বালা করা বিষয় হচ্ছে – যখন ব্রেইমার আমাদের কে ব্যাখ্যা করেন কিভাবে এই নয়জন পুতুল অস্থায়ী রাষ্ট্র প্রধান ইরাকী জনগন কে প্রতিনিধিত্ত করেন। বাস্তবতায় এরা আসলে অন্তর্বর্তী সরকার আরে ব্রেইমার কে প্রতিনিধিত্ব করেন। এরা আমেরিকার পুতুল, অবশ্য কয়েকজন আছেন ইরানের পুতুল। এরা বড়জোড় খুব উচ্চ বেতনের অনুবাদক বা ইন্টারপ্রেটার ছাড়া আর কিছুই নন। ব্রেইমার আদেশ দেন আর এরা তাঁর ইরাকী অনুবাদ করে জনগনের মাঝে প্রচার করেন। এদের বেশীর ভাগকেই আমেরিকা তাঁর জনগনের ট্যাক্সের টাকায় তৈরী করেছে আর এখন এরা আমেরিকাকে সেবা করছে ইরাকের তরল টাকা ‘তেল’ দিয়ে।

গনতন্ত্রের পথে এর চাইতে বাজে শুরু আর কোনোভাবেই হতে পারেনা। প্রথমত অন্য দেশের দারা দখল হয়ে যাওয়া আর তারপরে সেই দখলদার বাহিনীই ঠিক করে দিচ্ছে কে আমার নেতা হবে … এর চাইতে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছুই হতে পারেনা। এর বেশি আমরা আর কিইবা আশা করতে পারি? যে দেশের রাস্ট্রপতিকে ক্ষমতায় বসায় সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট, তাদের কাছ থেকে কি গনতন্ত্র শেখার আছে কিছু?

(পাঠকের জন্যে নোটঃ শেষ অংশে, প্রেসিডেন্ট বুশ এর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রতিপক্ষ আল-গোর এর কাছে হেরে গিয়ে, সুপ্রিম কোর্ট এর সাহায্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট হবার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে।)

 

ইরাকের ‘নতুন’ জাতীয় দিবস …

আমার জন্যে ৯ ই এপ্রিল হচ্ছে ভয়, আতংক আর কান্নার দিন। উৎকণ্ঠিত ইরাকীদের মুখশ্রী ঘুরছিলো চারিদিক। সারা বাগদাদে শুধু বোমা, গুলি, ধোঁয়া আর ধোঁয়ায় ধুসরিত পরিবেশ। রাস্তায় চোরাগোপ্তা হামলা, সশস্ত্র সেনা, ট্যাংক বহর, আকাশে জুদ্ধবিমান আর ডাকাতের মতো এপ্যাসে হেলিকপ্টার গুলো আতংকগ্রস্থ মানুষগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সাদ্দমের পক্ষ বা বিপক্ষ, সাদ্দমের ভালোবাসার লোক বা ঘৃণার পাত্র, কারো রক্ষা নেই আজ, সবাই কে ছিন্ন ভিন্ন করতেই যেনো আজকের আয়োজন। মুহূর্তের মধ্যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান শহর টি একটি ভুতুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হলো। হ্যাঁ, এপ্রিল মাসের ৯ তারিখ হচ্ছে আমেরিকার কাছে ইরাক দখল হয়ে যাওয়ার দিন। বাগদাদের পতন হবার দিন। আমি জানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ সেদিন নিশ্চয়ই সেলিব্রেট করেছেন এই “আনন্দ”। আমি সত্যিই অবাক হই, যার গনতন্ত্রে ন্যূনতম বিশ্বাস আছে, সেরকমের একজন মানুষ কিভাবে আরেকটি দেশের পরাধীনতায় উল্লাসে মেতে উঠতে পারেন … !

নয়ই এপ্রিল আমি প্রচন্ড গোলাগুলি আর বোমার শব্দে আমি ঘুম থেকে উঠি ভোর ছয়টায়। মাত্র দুই ঘন্টার ঘুমের পরই আমাকে উঠে যেতে হলো। আমি বিছানাতেই বসে ছিলাম, চোখ বন্ধ করে। ঘরটা বেশ গরম ছিলো এবং আমি আমার আগের রাতে পরা জিন্স পরেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ভয়ে আমার দাতগুলো ঠক ঠক করছিলো, আমি প্রানপনে চেস্টা করছিলাম একটু সুস্থ বোধ করার। গত কয়েকদিন ধরে আমরা একই পোশাক পরে আছি, আমাদের প্যান্ট আর শার্টের পকেট গুলোতে নানান ধরনের পরিচয়পত্র এবং প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র আর টাকায় ভরা। কারণ আমরা জানতাম, যেকোনো সময় আমাদের ঘরে ঢুকে পড়তে পারে মার্কিন বাহিনী, তাই আমাদের পরিচয়জ্ঞাপক প্রায় সকল কিছুই আমরা পকেটে করে নিয়ে বসে আছি। আমরা অপেক্ষা করে আছি – যেকোনো সময় আমাদেরকে হয়তো বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে হতে পারে।

আমি গোলাগুলি আর বোমার শব্দ এতো ঘন ঘন শুনেছি যেনো ঠিক গ্রীষ্মকালে ছেলেদের ক্রিকেট খেলার মতো, একের পর এক, সারাদিন ব্যাপী হয় ট্যাংক নয়তো বোমা নয়তো যুদ্ধ বিমান নয়তো হেলিকপ্টার … !

বাগদাদ পতনের দিন, আমরা শুধু নিসচুপ হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম সারাদিন। আমাদের বড়ীতে একমাত্র মানব কন্ঠটি ছিলো রেডিও থেকে ধারা ভাষ্যকারের কন্ঠ। সে কন্ঠও বার বার ভেঙ্গে যাচ্ছিলো, কখনও খুন আস্তে কখনও বা শোনাই যাচ্ছিলোনা। রেডিও যা বলছিলো আমাদেরকে, তা আমরা কয়েকদিন আগে থেকেই জানি, আমরা জানতাম আমেরিকা একদিন বাগদাদ দখল করে নেবে। রেডিও তে বললো, খানিকটা প্রতিরোধ নাকি ছিলো, কিন্তু এখন পুরো বাগদাদ জুড়ে কেবল আমেরিকান ট্যাংক আর ট্যাংক … !

এখন সেটাই হচ্ছে ইরাকের জাতীয় দিবস !

এপ্রিলের নয় তারিখে – আমাদের প্রতিবেশীরা বার বার দরোজায় এসে ধাক্কা দিয়েছে, জানতে চেয়েছে আমাদের কি শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিৎ কিনা… গেলে কখন যেতে হবে ! কেননা আমেরিকান বাহিনীর আসার শব্দও আমরা তখন শুনতে পাচ্ছিলাম … তারা যেনো একদম দরোজার কাছে চলে এসেছিলো।

দিনটি ছিলো আমাদের জন্যে লজ্জার, ভয়ের, আতংকের … আমাদের সকলের চোখ গুলো প্রায় মৃত মানুষের চোখের মতো হয়ে গিয়েছিলো। বাড়ীর মহিলারা ভয়গ্রস্থ শিশুদের সাম্লানোর চেষ্টা করছিলেন, আমাদের সকলেরই তখন খানিক্টা স্বস্তি দরকার ছিলো, খানিক্টা ভরসা দরকার ছিলো, কিন্তু কেউ নেই আমাদের চারপাশে সেইটুকু দেবার মতো।

নয়ই এপ্রিল আমরা বাড়ীতে বসে ছিলাম, আমাদের সবার ব্যাগ গোছানো ছিলো। আমরা মিসাইল এর শব্দ শুনছিলাম আর অপেক্ষায় ছিলাম যেকোনো মুহূর্তে আমাদের বাড়ীটাকেই হয়তো উড়িয়ে নেবে কোনও একটি বোমার আঘাত। আমরা হিসাব করছিলাম, আমরা কি বাগদাদের অপর প্রান্তে চলে যাবো? যদি যাই তাহলে কতটুকু সময় লাগবে? নাকি বাড়ীতে বসে বসে পরিনতির জন্যে অপেক্ষা করবো?

এই দিনটি ছিলো যেদিন মা আমাকে তাঁর সামনে বসিয়ে কিছু ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলেন, যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে কি কি করতে হবে সেই উপদেশ। আমি জিজ্ঞাসা করছিলাম – যদি কিছু মানে কি মা? মানে কি হতে পারে? মা বার বার বলছিলেন,

 মানে যদি কিছু হয়ে যায় আমাদের … মানে ধর যদি আমাদের কে আলাদা হয়ে যেতে হয় … ধর যদি আমাকে বা আমাদের কে আলাদা হয়ে চলে যেতে হয়… তাহলে তো তুই জানিস কোথায় টাকা আছে …

আমি তবুও বলেছিলাম … আমি জানি কোথায় কি আছে, কিন্তু সেসব কোনও ব্যাপার না যদি তোমাদের কিছু হয়ে যায়…

সেই দিনটি ছিলো মহল্লার কুকুর গুলো সারা দিন রাত অসহায়ের মতো চিৎকার করেছে রাস্তায় … আকাশের পাখি গুলোও তাদের অভ্যাসবশত উড়তে পারছিলোনা। মনে হয় ওরাও চেষ্টা করছিলো পালানোর জন্যে।

দিনটা যেনো হলদেটে ধূসর দিন ছিলো… কখনও যদি আমার জীবনের ভয়াবহতম কোনও দিনের স্মৃতিচারণ করি, তাহলে নিঃসন্দেহে এই দিনটির কথাই বলবো আমি বারবার। আমার জীবনের সবচাইতে আতংকের দিন।

আর এই দিনটাই আমার জতীয় দিবস এবং আরো লক্ষ ইরাকীর জন্যে।

হয়তো আগামী বছর, ২০০৪ সালের নয়ই এপ্রিল ব্রেইমার এবং তাঁর পোষা প্রানীরা হোয়াইট হাউসে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে বাগদাদ পতন দিবস উদযাপন করবে … ওদেরকে হয়তো আমেরিকাতেই ইরাকের জাতীয় দিবস পালন করতে হবে কেননা ইরাকে আমরা কখনই এই কালো দিনটিকে আমাদের জাতীয় দিবস হিসাবে পালন করতে পারবোনা।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

43 − = 42