ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৬)

?1440086852″ width=”500″ />

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৬)

বিশ্বাসের শক্তি (১)

হ্যারিস: মাজিদ, কিছুক্ষণের জন্য তোমার ব্যক্তিগত কাহিনীতে ফিরে আসি – আমার মনে হচ্ছে তোমার ইসলামবাদ ছিল মূলত রাজনৈতিক, যার জন্ম হয়েছিল বৈধ কোনো অভিযোগ থেকে – মূলত বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক অবিচার – যা তুমি দেখতে শুরু করেছিলে ইসলামের লেন্স দিয়ে। কিন্তু তুমি বলোনি, যেমন করে আল-কায়েদার সদস্যরা বলে থাকে, তুমি ক্ষুদ্ধ হয়েছো আরব উপদ্বীপে মসুলমানদের প্রবিত্র ভূমির নিকটে অবিশ্বাসীদের অপবিত্র পা পড়ার কারণে। তাহলে আসলেই কি পরিমান মাত্রায় ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো – শহীদ হবার আকাঙ্খা, যেমন – তোমাকে ও তোমার সহযোগী ইসলামবাদীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল? আর যদি এমন কোনো চিন্তা কাজ না করে থাকে, তুমি কি বিপ্লবী ইসলামবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একটি জিহাদবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্যগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারবে?

নাওয়াজ: হ্যা, নিশ্চয়ই, আসলেই কিছু মিল আর অমিল আছে ইসলামবাদ আর জিহাদবাদের মধ্যে। আমাদের সেটি নিয়ে অবাক হওয়াও উচিৎ না – একইভাবে বিষয়টি প্রযোজ্য, যেমন, আমরা যখন কমিউনিজম নিয়ে কথা বলি। সমাজতন্ত্রী বা সোস্যালিস্টরা এক প্রান্তে আর কমিউনিষ্টরা অন্য প্রান্তে, তাদের কেউ জঙ্গী, আর কেউ জঙ্গী নন। ইসলামবাদের ক্ষেত্রেও ব্যপারটা একই রকম।

তবে, আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে ইসলামবাদী ও জিহাদবাদীদের উদ্বুদ্ধ করে একটি আদর্শগত মতবাদ, যা তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়, প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক আকর্ষনীয় চরিত্রের নেতা, যে সদস্য সংগ্রহ করে, যে কল্পিত কোনো অভিযোগ সংক্রান্ত সংক্ষুদ্ধ অনুভূতি আর একটি আত্মপরিচয়ের সংকটকে ব্যবহার করে তার উদ্দেশ্য সফল করার জন্য। বাস্তবিকভাবে, আমি বিশ্বাস করি যে কোনো ধরনের আদর্শগত যুদ্ধে সদস্য সংগ্রহের চারটি মূল উপাদান আছে : কোনো প্রকৃত বা কল্পিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ক্ষোভের কাহিনী, আত্মপরিচয়ের সংকট, প্রভাবিত করতে পারে এমন কেউ, যিনি সদস্য সংগ্রহ করেন, এবং একটি আদর্শগত মতবাদ। মতবাদের ‘কাহিনী’ হচ্ছে এর প্রচারণা।

হিজব উত-তাহরির এবং আল কায়েদার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে অনেকটা কমিউনিজমের মধ্যে বিদ্যমান বিতর্কের মত, সেটি হচ্ছে পরিবর্তন কি সরাসরি আক্রমন আর সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে আসবে কিনা। আপনি যদি কমিউনিজমের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদিতার তত্ত্বটি দেখেন – এবং আমাদের কি উচিৎ হবে অপেক্ষা করা এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে তার পথ খুজে নিতে সুযোগ দেয়া, নাকি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এর গতিপথকে প্রভাবিত করা। – সেই তত্ত্বে বিশুদ্ধবাদীরা দাবী করবেন আপনার কিছুই করার দরকার নেই, উৎপাদনের উপায়গুলো স্বাভাবিকভাবেই বুর্জোয়াদের হাত থেকে শ্রমিকদের হাতে হস্তান্তরিত হবে, কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হবে অর্থহীন, কারণ ঠিক এভাবেই ইতিহাস কাজ করে। অন্যরা হয়তো বলবেন আমাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিৎ।

তাত্ত্বিক স্তরে এ ধরনের পার্থক্যও বিদ্যমান রাজনৈতিক ইসলামবাদী ( অথবা entryist – এনট্রিইজম হচ্ছে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল যখন কোনো গ্রুপ কোনো রাষ্ট্রের সদস্যদের উৎসাহিত ও সহায়তা করেঅন্য, সাধারণত আরো বড় কোনো সংস্থার সাথে যুক্ত হয়ে তাদের প্রভাব সম্প্রসারণ অথবা তাদের মতবাদ প্রচার করার প্রচেষ্টা হিসাবে), বৈপ্লবিক ইসলামবাদী এবং জিহাদবাদীদের মধ্যে। অবশ্যই জিহাদবাদীরা বিশ্বাস করেন সরাসরি আক্রমনে: এই বিষয়ে তাদের পুরো একটি তত্ত্বও আছে। আমি যুক্তি দেবো, আসলে, আবু বাকর আল-বাগদাদীর নেতৃত্বে তথাকথিত ইসলামি স্টেট এর উত্থান কিছুটা হলেও ওসামা বিন লাদেন এর অপকৌশল যে সঠিক ছিল তা প্রমাণ করে, বিশেষ করে তার বিশ্বাস যে, যুদ্ধের মাধ্যমে যদি পশ্চিমা শক্তিকে হস্তক্ষেপে ক্লান্ত করা যেতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হবে, এবং পশ্চিমা শক্তি বাধ্য হবে আরব স্বৈরাচারী শাসকদের প্রতি সমর্থন সরিয়ে নিতে, যা তাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলবে। এবং ধ্বংসস্তুপে ছাইয়ে গড়ে উঠবে একটি ইসলামী রাষ্ট্র। বিন লাদেন এটি বলেছিল প্রায় ১১ বছর আগে এবং আরব অভ্যুত্থানের ফলাফল কি ঘটেছে সেটি খুবই রহস্যময়।

হ্যারিস : আমি আসলে যা জানার চেষ্টা করছি সেটি হচ্ছে ধর্মীয় পার্থক্যটি, আমি মনে করছি যা আমি শনাক্ত করেছি; তুমি যে ধরনের ইসলামবাদী ছিলে – যুক্তরাজ্যে সহিংস বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হবার কারণে রাজনৈতিক ইসলামের একজন উগ্র সমর্থকে রুপান্তরিত হয়েছিল – এবং এমন কেউ, যার সেই ধরনের কোনো অভিযোগ বা রাগ নেই কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামিক স্টেট এর মত কোনো গ্রুপের জন্য সে যুদ্ধ করবে, কারণ সে সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে সে ইসলামের শত্রুদের বা শয়তানের বিরুদ্ধে কোনো মহাজাগতিক যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, হয় সে একটি সত্যিকারের ধর্মবিশ্বাস প্রচার করবে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত অবধি অথবা তা করতে গিয়ে সে শহীদ হবে। তুমি কি তোমার নিজের শহীদ হবার সম্ভাবনা নিয়ে ভেবেছিলে? অথবা তোমার ইসলামবাদ সাধারণ ক্ষোভ প্রকাশের চেয়ে বরং বেশী সংশ্লিষ্ট রাজনীতি নিয়ে?

নাওয়াজ: আমি মনে করি, আমি যা বলার চেষ্টা করছি তা হলো যদিও পদ্ধতিগত একটি পার্থক্য আছে, সব ইসলামবাদীরা বিশ্বাস করেন যে, তারা একটি মহাজাগতিক সংগ্রামে লিপ্ত। কিন্তু এই সংগ্রামই শুধুমাত্র একমাত্র কারণ নয় তাদের সেই কাজটি করার জন্য।

হ্যারিস: হয়তো আমি আমার সমালোচকদের বেশী স্বীকৃতি দিচ্ছি এই বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, কিন্তু আরো একবার তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বাড়তি চেষ্টা করি, আমি কল্পনা করছি ( যেমন বহু মানুষই এক্ষেত্রে এমন কিছুই দাবী করে থাকেন) অতিমাত্রায় নিবেদিত ইসলামবাদীদের বেশ উল্লেখযোগ্য শতাংশ বিশুদ্ধভাবে রাজনৈতিক, এর মানে যেখানে তারা পার্থিব কোনো কিছু নিয়ে প্ররোচিত নয় এবং তারা শুধুমাত্র ইসলামকে ব্যবহার করছেন একটি ব্যানার বা পতাকা হিসাবে তাদের সেই উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে। এমন কি ইসলামবাদীরা আছেন, যারা শহীদ হবার আধ্যাত্মিক তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না?

নাওয়াজ: আমরা তাদের শুধুমাত্র বলবো তারা আসলেই আন্তরিক নয়। আন্তরিক নয় এমন মানুষ বহু আন্দোলনে ও যে কোনো আদর্শের পতাকাতলে থাকতে পারে। কিন্তু যদি আমরা লক্ষ্য করি ইসলামবাদীরা আসলে কি সমর্থন করছে, আমাদের অবশ্যই সেই সংখ্যালঘুদের বাদ দিতে হবে, যারা মাকিয়াভেলীয় কপটতাপূর্ণ এবং তারা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে কারণ তারা সেখান থেকে অন্য কিছু চান।

কিন্তু তুমি যদি যারা আন্তরিক, তাদের লক্ষ্য করো, এবং আমিও সৎ ছিলাম যা আমি একসময় বিশ্বাস করতাম – তাহলে তুমি দেখবে যে, তারা শহীদ হবার জন্য প্রস্তুত। মিসরে আমাকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং আমি ভেবেছি আমি আমার আদর্শের জন্য মারা যাবো। সেই অর্থে সব আন্তরিক ইসলামবাদীরা বিশ্বাস করে তারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির মহাজাগতিক সংগ্রামে লিপ্ত। তারা শুভ শক্তিকে চিহ্নিত করে পবিত্র সংগ্রাম হিসাবে। কিন্তু আবারও এটাই একমাত্র জিনিস নয় যা তারা বিশ্বাস করে।

তারা অবশ্যই শহীদ হবার তত্ত্বে বিশ্বাস করে, এছাড়াও তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে অশুভ শক্তি সেটিও বিশ্বাস করে। একইভাবে তারা বিশ্বাস করে তারা আরেক স্বৈরাচারীদের অধীনে বসবাস করছে। এখানে ক্ষোভ আর অভিযোগের কাহিনী তার প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যেমনটি আমি বলেছিলাম, সংগঠনে যোগদান বা যোগদানের জন্য কর্মী হিসাবে সংগৃহীত হবার আগের মুহূর্ত অবধি। যখন তাদের কর্মী হিসাবে সংগ্রহ করা হয় তাদের সেই ক্ষোভের কাহিনী জীবাশ্মীভুত হয় আদর্শগত মতবাদের মাধ্যমে, সেটি এরপর সেই বাহক হিসাবে কাজ করে যার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রকাশ করে। সুতরাং একটি একটিমাত্র বিষয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। তবে অবশ্যই মহাজাগতিক যুদ্ধ সব ইসলামবাদীদের জন্য জন্য একটি চিরন্তন উপাদান।

আরেকটি পার্থক্য জিহাদবাদী আর ইসলামবাদীদের মধ্যে যে, ইসলামবাদীরা তাদের নিজের তত্ত্ব অনুযায়ী শহীদ হবার কারণ অনুসন্ধান করে। সুতরাং হিজব উত-তাহরিরে থাকার সময় আমাদের শেখানো হয়েছিল শহীদ হবার সৌভাগ্য অর্জন করার সম্ভব কোনো স্বৈরাচারী নিপীড়ক শাসককে জবাবদিহি করানোর মাধ্যমে অথবা আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে। আমাদের শেখানো হয়েছিল যে, যদি শাসক আপনাকে হত্যা করে, যখন আপনি সেনা অফিসারদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করছেন, আপনি তাহলে শহীদ হবেন, এবং আপনার সেই নিয়তি হাসিমূখে গ্রহন করা উচিৎ। কিন্তু আমাদের এটাও শেখানো হয়েছে আপনি অবশ্যই শহীদ হবেন না, যদি আমি কোনো বাজারের মধ্যে নিজেকে বোমা দিয়ে বিস্ফোরিত করেন, কারণ আপনি বেসামরিক ব্যক্তি ও অন্য মুসলিমদের হত্যা করছেন।

এখন, হিজব উত-তাহরির যখন বিদ্যমান কোনো সেনাবাহিনী দিয়ে ক্যু করার জন্য প্ররোচিত করছে, জিহাদীরা তখন সোজাসাপটা বলছে, কেন আমরা নিজেদেরই একটি সেনাবাহিনী তৈরী করছি না? এই সব লোকদের নিয়ে সময় নষ্ট করে কি লাভ, তারা তো এমনিতেই কাফের? জিহাদবাদীদের জন্য, তাদের নিজেদের সেনাদলের জন্য যুদ্ধ করার সময় মারা যাওয়া হচ্ছে শহীদ হওয়া। এটাই পার্থক্য, যতক্ষণ কিনা তুমি মারা যাচ্ছো, তোমার নিজের বিশ্বাস মতবাদ অনুযায়ী, আপনি সেই মতবাদে বিশ্বাসী গ্রুপের কাছে শহীদ।

( চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 36 =