রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (তিন)

?oh=603d2f806decfb90c49d6d68d235c629&oe=5840A275″ width=”500″ />
রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (তিন)
বাস্তবতা কি? জাদু কি?

মডেলস: আমাদের কল্পনাগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা

একটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত উপায় আছে যা সাধারণত বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন কোনটি সত্য সেটি নির্ধারণে, যখন আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় সেটি সরাসরি শনাক্ত করতে পারেনা। এটি হচ্ছে যা ঘটছে বা ঘটতে পারে, তার একটি মডেল ব্যবহার করে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। এরপর আমরা খুঁজে বের করি ( প্রায়শই গানিতিক হিসাব নিকাশ করে) সত্যিকারভাবে কোনটি আমাদের দেখা অথবা শোনা উচিৎ ইত্যাদি (প্রায়শই কোনো পরিমাপক ব্যবহার করে) ও আমাদের প্রস্তাবিত মডেলটি সত্য কিনা। এরপর আমরা পরীক্ষা করে দেখি, এটাই কি আমরা আসলে দেখছি কিনা বাস্তবে। আক্ষরিকভাবে কোনো মডেল হতে পারে কোনো রেপ্লিকা বা অনুলিপি, যা বানানো হয়েছে কাঠ কিংবা প্লাস্টিক দিয়ে। অথবা এটি হতে পারে কাগজের উপর কিছু গণিত অথবা কোনো কম্পিউটারে একটি সিমুলেশন বা কাল্পনিক সেই একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আমরা খুব সতর্কতার সাথে মডেলটি লক্ষ্য করি এবং ভবিষ্যদ্বাণী করি আমাদের কি দেখা বা শোনা উচিৎ ইত্যাদি, যদি মডেলটি সঠিক হয়। এরপর আমরা দেখবো আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক নাকি মিথ্যা। যদি সেগুলো সঠিক হয়, এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দেবে যে মডেলটি আসলেই বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করছে। এরপর আমরা আরো কিছু বাড়তি পরীক্ষা পরিকল্পনা করি, হয়তো মডেলটিকে আরো সূক্ষ্মতর করে তুলি, আমাদের ফলাফলগুলোকে আবারো পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিৎ করার জন্য। যদি আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হয়, আমরা মডেলটি প্রত্যাখান করি অথবা পরিবর্তন করি এবং তারপর আবার চেষ্টা করি।

একটি উদাহরণ আলোচনা করা যাক, এখন যেমন আমরা জানি যে, জিন – বংশগতির একক – ডিএনএ নামক একটি জিনিস দিয়ে যারা তৈরী। আমরা ডিএনএ সম্বন্ধে এখন অনেক কিছু জানি, যেমন কিভাবে এটি কাজ করে। কিন্তু আপনি বিস্তারিতভাবে দেখতে পারবেনা ডিএনএ আসলে কেমন দেখতে, এমনকি শক্তিশালী কোনো অণুবীক্ষন যন্ত্র দিয়েও। ডিএনএ সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি তা সব এসেছে পরোক্ষভাবে মডেল তৈরী ও পরে সেটি পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে।

আসলেই, ডিএনএ সম্বন্ধে কেউ কিছু জানার বহুদিন আগেই, বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই জিন সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতেন শুধুমাত্র মডেলে তাদের ভবিষ্যদ্বাণীকে পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে। উনবিংশ শতাব্দীর সেই সময়ে, একজন অস্ট্রীয় যাজক, যার নাম গ্রেগর মেণ্ডেল তার সন্ন্যাসশ্রমের বাগানে কিছু পরীক্ষা করেছিলেন, তিনি প্রচুর পরিমানে মটরশুটি আর ফুলের চাষ করেছিলেন। তিনি একের পর এক প্রজন্মের গাছদের সংখ্যা গণনা করেন যাদের ফুলের রঙগুলো ভিন্ন অথবা যাদের মটরশুটি বীজর চামড়া মসৃন অথবা কুচকানো। মেণ্ডেল কখনোই কোনো জিন স্পর্শ করেননি, তিনি শুধু মটরশুটি আর ফুলদের দেখেছেন, এবং তিনি তার চোখ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন ভিন্ন এই প্রকারগুলো গণনা করার জন্য। তিনি একটি মডেল আবিষ্কার করেছিলেন। যার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ছিল সেটি, যাকে আমরা এখন জিন বলছি (যদিও মেণ্ডেল তাদের সে নামে ডাকেননি কখনো) এবং তিনি হিসাব করেছিলেন যে, যদি তার মডেল সঠিক থাকে, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজনন পরীক্ষায়, সেখানে কুচকানো মটরশুটি বীজের চেয়ে তিনগুণ বেশী মসৃণ মটরশুটি বীজ পাওয়া যাবে। এবং সেটাই তিনি পেয়েছিলেন গণনা করার পর।

বিস্তারিত বিষয়গুলো উহ্য রেখে, এখানে মূল বক্তব্যটি হচ্ছে মেণ্ডেলের জিন তার কল্পনার একটি সৃষ্টি: তিনি তার নিজের চোখে সেটি দেখেননি, এমনকি অনুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেও না। কিন্তু তিনি মসৃণ আর কুচকানো মটরশুটি দেখেছিলেন এবং সেগুলো গণনা করার মাধ্যমে তিনি পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছিলেন তার বংশগতির মডেল বাস্তব পৃথিবীর কোনো কিছুর বেশ ভালোই প্রতিনিধিত্ব করছে। পরে বিজ্ঞানীরা মেণ্ডেলের পদ্ধতির সামান্য কিছু পরিবর্তন করে, এবং অন্যান্য প্রাণীদের উপর গবেষণা করেন, যেমন মটরশুটির বদলে ফ্রুট ফ্লাই, দেখাতে যে জিনরা একটি নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত থাকে ক্রোমোজোমের সুতায় (আমরা মানুষদের ৪৬ টি ক্রোমোজোনম আছে, ফ্রুট ফ্লাইয়ের যেমন আছে আটটি)। এমনকি এই মডেলটি পরীক্ষা করে বলা সম্ভব, কোন সজ্জায় জিনগুলো ক্রোমোজোমে সজ্জিত থাকে। এই সবই সম্ভব হয়েছিল জিনরা যে ডিএনএ দিয়ে তৈরী সেটা জানার বহু আগেই।

এখন আমরা সেটি জানি এবং আমরা সঠিকভাবেই জানি কিভাবে ডিএনএ কাজ করে, জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক এবং আরো বহু বিজ্ঞানীদের কল্যাণে যারা তাদের পরে এসেছেন। ওয়াটসন আর ক্রিক তাদের নিজেদের চোখে ডিএনএ কে দেখেননি, আবারো তারা তাদের আবিষ্কার করেছেন একটি মডেল কল্পনা করে এবং সেগুলো পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে। তাদের ক্ষেত্রে তারা আক্ষরিকার্থে লোহা আর কার্ডবোর্ডের মডেল তৈরী করেছিলেন ডিএনএ কেমন দেখতে হতে পারে তা ধারণা করে, এবং তারা কিছু সুনির্দিষ্ট পরিমাপ হিসাব করেছিলেন, যদি সেই মডেলটি সঠিক হয়ে থাকে। একটি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী, ডাবল হেলিক্স মডেল সঠিকভাবে মিলে গিয়েছিল রোজালিণ্ড ফ্র্যাঙ্কলিন আর মরিস উইলকিন্স এর পরিমাপ করা মডেলে, যারা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন বিশুদ্ধ ডিএনএ স্ফটিকের উপর এক্সরে রশ্মি ফেলে ছবি তোলার জন্য। ওয়াটসন এবং ক্রিক সাথে সাথেই বুঝতে পেরেছিলেন তাদের ডিএনএ মডেল ঠিক সেই একই ধরণের ফলাফল দেবে, তার সন্ন্যাসশ্রমের বাগানে গ্রেগর মেণ্ডেল যা দেখেছিলেন।
কোনটি বাস্তব সত্য, আমরা এখন জেনেছি যে সেটি, মোট তিনটি উপায়ের যে কোনো একটি ব্যবহার করে আমরা জানতে পারি। আমরা এটি শনাক্ত করতে পারি, সরাসরি আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে, অথবা পরোক্ষভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়দের বিশেষ যন্ত্র যেমন দূরবীক্ষণ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র, দ্বারা সহায়তা করে। অথবা এমনকি আরো পরোক্ষভাবে, মডেল তৈরী করে যা বাস্তব সত্য হতে পারে এবং তারপর সেই মডেলগুলো পরীক্ষা করে দেখে যে, তারা কি সফলভাবে কোনো কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে কিনা সেই জিনিসগুলো যা আমরা দেখতে ( অথবা শুনতে ইত্যাদি) পাই কেনো যন্ত্র ব্যবহার করে অথবা না করে। পরিশেষে এটি সবসময় আমাদের ইন্দ্রিয়েই ফিরে আসে, কোনো না কোনো উপায়ে।

এর মানে কি তাহলে বাস্তবতা শুধুমাত্র সেই সব জিনিসগুলো ধারণ করে যা শনাক্ত করা যেতে পারে, সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে, আমাদের ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অথবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে? কিন্তু ঈর্ষা বা আনন্দ, সুখ বা ভালোবাসা, এগুলো তাহলে কি? এরা কি বাস্তব নয়?

হ্যা, এরাও বাস্তব সত্য, কিন্তু এদের অস্তিত্বের জন্য এরা নির্ভরশীল মস্তিষ্কের উপর: মানব মস্তিষ্ক, অবশ্যই এবং সম্ভবত অন্যান্য অগ্রসর প্রাণী প্রজাতিরও মস্তিষ্ক, যেমন শিম্পাঞ্জি, কুকুর এবং তিমি। পাথররা কোনো আনন্দ অনুভব করেনা এবং পর্বতমালা কাউকে ভালোবাসে না। এই আবেগগুলো তীব্রভাবে বাস্তব যারা তা অনুভব করেন, এর অভিজ্ঞতা অনুভব করেন, কিন্তু মস্তিষ্কের অস্তিত্বের আগে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। এটা সম্ভব যে এই ধরনের আবেগগুলো – এবং হয়তো অন্য আবেগগুলো যা আমরা এমনকি কল্পনা করতেও শুরু করিনি- তাদের অস্তিত্ব হয়তো থাকতে পারে অন্য কোনো গ্রহে, কিন্তু শুধুমাত্র যদি সেই সব গ্রহে মস্তিষ্কও থাকে- অথবা মস্তিষ্কের সমতুল্য কোনো কিছু : কারণ কে জানে কি অদ্ভুত চিন্তা করা অঙ্গ অথবা অনুভব করা যন্ত্র হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও?

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1