মেজর জিয়া কখনও গণতন্ত্রকামী ছিলেন না

১৯৮০ সালের শুরুতেই জাতীয় সংসদের বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যগণ সংসদের সার্বভৌমত্ব এবং সংসদ সদস্যদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে কতিপয় অভিযোগসহ ২৪ দফা দাবী উত্থাপন করেন। তাদের মতে, বর্তমান অবস্থায় সংবিধানের মাধ্যমে জাতীয় সংসদকে এক ব্যক্তি অর্থাৎ তথাকথিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ইচ্ছাধীন রাখা হয়েছে।

সংসদকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন আদেশ, অধ্যাদেশ, বিজ্ঞপ্তি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জনগনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংসদ অধিবেশনে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের কথার বলার পর্যাপ্ত সুযোগ না দেয়া শুধুমাত্র নিজ দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গনবিরোধী আইন পাশ করা হচ্ছিলো। এ অবস্থায় সংসদের বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যগণ (৭৭+১৭=৯৪ জন) এক অধিবেশনে মিলিত হয়ে কতিপয় দাবি উপস্থাপন করে এবং তাদের দাবির সমর্থনে ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস হতে সংসদের অধিবেশন বর্জনের কর্মসূচি গ্রহণ করে।

১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে জিয়া সরকার জাতীয় সংসদে উপদ্রুত এলাকা বিল উপস্থাপন করেন। এ বিলে সরকারকে দেশের কোন অংশকে উপদ্রুত এলাকা ঘোষণা করে সেখানে কার্যরত বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য প্রদানের জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোকদের নিয়োগ করার ক্ষমতা চাওয়া হয়।

এ ধরনের উপদ্রুত এলাকায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোন অফিসার বা পুলিশের কমপক্ষে সাব-ইন্সপেক্টর পদ মর্যাদার অফিসার অথবা বাংলাদেশ রাইফেলসের অন্যূন হাবিলদার অন্যান্য ক্ষমতার মধ্যে গণ শৃঙ্খলা রক্ষার্থে বেআইনি কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে বিচার বহির্ভূত গুলি করার ক্ষমতা অর্জন করেন। বেআইনি কাজ বলতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা কিংবা গণশৃঙ্খলার প্রতি ক্ষতিকারক কার্যকলাপকে বুঝানো হয়েছে।

অধিকিন্তু বেআইনি কাজের জন্য উপদ্রুত এলাকায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয় এবং অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করা হয়। এ বিলটির পক্ষে সংসদে বলা হয় যে, অস্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ প্রচলিত আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে, সে সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্যই এ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এই উপদ্রুত এলাকা বিলটি সংসদের বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তারা বিলটিকে মৌলিক মানবাধিকার বিরোধী বলে অভিহিত করেন এবং এটি পেশ করার প্রতিবাদে সংসদ অধিবেশন হতে ওয়াক আউট করেন। সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বিলটিকে সামরিক আইনের চেয়েও জগন্য বলে অভিহিত করেন এবং তা বাতিলের জন্য তৎকালীন জিয়া সরকারের নিকট জোর দাবি জানান। পরবর্তীতে সংসদে যাতে এ বিলটি পাশ না হয় সেজন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের নিকট জোর আবেদন জানান।

এভাবে উপদ্রুত এলাকা বিলটির বিরোধিতায় সমগ্র দেশব্যাপী প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকলে সরকার বিলটিকে সংসদের একটি স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনার জন্য প্রেরণ করেন। তবে এ সম্পর্কে পরবর্তীকালে সরকারের তরফ থেকে আর কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয় নি বলে বিলটি আর পাশ হতে পারে নি।

সুতরাং সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিরোধী দলীয় রাজনীতি তেমন সাড়া জাগানো ভূমিকা পালন করতে পারে নি। উপদ্রুত এলাকা বিল তথা বিচার বহির্ভূত গুলি করার ক্ষমতা অর্জনের বিল পাশের চিন্তা-ভাবনা ছিল তারই একটি বহিঃপ্রকাশ যাতে করে বিরোধী দলগুলো কখনোই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। উল্লেখ্য জিয়াউর রহমানের ৫ বছরের শাসনামলে ৩ বছর ১০ মাস ২১ দিনই (১৫ আগস্ট ১৯৭৫-৬ এপ্রিল ১৯৭৯) সামরিক আইন জারি ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে তার মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তথাকথিত সাংবধানিক বৈধতা এবং নিরাপত্তা লাভ করেন।

কিন্তু বাস্তবতার কি নির্মম পরিহাস! জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় তার শাসনামল বেসামরিকরনের আপ্রাণ চেষ্টা বলবৎ থাকা সত্ত্বেও স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার শাসনামলকে বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলেই, ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে অবৈধ আখ্যায়িত করে প্রমান করেছে, তিনি কেমন সফল ছিলেন ও গনতন্ত্রকামী ছিলেন! উল্লেখ্য ৫ম সংশোধনী বাতিল করতে গিয়ে তিনি খন্দকার মোস্তাকের শাসনামল, জাস্টিস সায়েমের শাসনামল এবং জেনারেল জিয়ার শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। কারণ ঐ ৩ জনের শাসনামল ৫ম সংশোধনীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 + = 85