রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (চার)

?oh=de59fc8af65373bf36c49704a926fe8b&oe=5851DD96″ width=”500″ />
রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (চার)
বাস্তবতা কি? জাদু কি?

বিজ্ঞান এবং অতিপ্রাকৃত: ব্যাখ্যা এবং তার শত্রু (১)

সুতরাং এটাই হচ্ছে বাস্তবতা, আর এভাবেই আমরা জানতে পারি কোনো কিছু বাস্তব কিনা। এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় হবে বাস্তবতার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় – যেমন সূর্য, অথবা ভূমিকম্প অথবা রঙধণু অথবা বিভিন্ন ধরনের প্রাণী। এবার শিরোনামে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অন্য শব্দটি নিয়ে আলোচনা করবো আমি, শব্দটি হচ্ছে: ম্যাজিক বা জাদু। জাদু খুব পিচ্ছিল শব্দ: এটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় তিনটি ভিন্ন উপায়ে, এবং প্রথমে আমি অবশ্যই যা করবো তাহচ্ছে এগুলোর মধ্যকার পার্থক্যগুলোকে ব্যাখ্যা করবো। আমি প্রথমটিকে ডাকবো, ‘অতিপ্রাকৃত জাদু’, দ্বিতীয়টি ‘মঞ্চের জাদু’ এবং তৃতীয়টি ( যেটার অর্থ আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমার শিরোনামে ব্যবহৃত জাদু শব্দটি যে উদ্দেশ্যে আমি ব্যবহার করেছি), ‘কাব্যিক জাদু’।

‘অতিপ্রাকৃত জাদু’ হচ্ছে এক ধরনের জাদু যা আমরা খুঁজে পাই পুরাণ কাহিনী ও রুপকথায়। ( মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা, যদিও আমি সেই জাদুগুলোর কথা আপাতত আলোচনা করবো না, এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে সেই বিষয়গুলো আবার আলোচনায় ফিরে আসবে); এটি আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগের জাদু, জাদুকরদের জাদু, গ্রিম ভাতৃদ্বয়, হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাাণ্ডারসন, জে. কে. রলিঙস এর জাদু। এটি কাল্পনিক গল্পের সেই ডাইনীর জাদু, যারা মন্ত্র পড়ে কোনো রাজকুমারকে ব্যাঙে রুপান্তরিত করতে পারে, অথবা সেই পরী গড মাদার যে কুমড়োকে রুপান্তরিত করে ঝকমকে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে। আমাদের শৈশবের এইসব গল্পগুলো হচ্ছে সেইসব কাহিনী, যাদের আমরা এখনও ভালোবাসার সাথে সবাই মনে করতে পারি, এখনও অনেকেই তা উপভোগ করেন যখন ঐতিহ্যবাহী ক্রিসমাসের অনুষ্ঠানে কাহিনী হিসাবে তারা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমরা সবাই জানি এই ধরনের জাদু হচ্ছে শুধুমাত্র কাহিনী, বাস্তবে যা ঘটে না।

মঞ্চের জাদু, এর ব্যতিক্রম, আসলেই বাস্তবে ঘটে এবং এটি দারুণ উপভোগ্যও হতে পারে। অথবা অন্ততপক্ষে, কোনোকিছু সেখানে আসলেই ঘটে, যদিও দর্শকরা যা মনে করেন সেটি তা নয়। মঞ্চে কোনো মানুষ (সাধারণত একজন পুরুষ, কোনো না কোনো কারণে) আমাদের ছলনা করে বিশ্বাস করাতে, আসলে আমরা যা দেখছি তা ঘটছে সেখানে – বিস্ময়কর কোনো কিছু ( ‘মনে’ হতে পারে এমনকি অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটছে), যখন সেখানে আসলেই যা ঘটে সেটি খুবই ভিন্ন। রেশমী রুমাল কিন্তু কখনো খরগোশে রুপান্তরিত হতে পারেনা, যেমন ব্যঙ রুপান্তরিত হতে পারেনা রাজপুত্রে। আমরা মঞ্চে যা দেখি সেটি শুধুমাত্র একটি কৌশল। আমাদের চোখ আমাদের সাথে ছলনা করে – অথবা, বরং জাদুকর অত্যন্ত পরিশ্রম করেন আমাদের চোখকে ফাকি দিতে, হয়তো বুদ্ধিমত্ত্বাপূর্ণ কোনো শব্দ ব্যবহার করে, যা আমাদের অন্যমনস্ক করে, আর আমরাও ঠিক মত খেয়াল করতে পারি না তার হাত দিয়ে সে আসলেই কি করছে।

কিছু জাদুকর খুবই সৎ এবং তারা আসলেই আপ্রাণ চেষ্টা করেন নিশ্চিৎ করতে যে, তাদের দর্শকরা যেন আগে থেকেই জানেন, তারা শুধুমাত্র একটি হাতসাফাই বা কৌশল দেখাচ্ছেন। আমি সেই সব জাদুকরদেও কথা ভাবছি, যেমন জেমস ‘অ্যামেজিং’ র‌্যাণ্ডি অথবা পেন অ্যাণ্ড টেলার অথবা ড্যারেন ব্রাউন। এমনকি যদি এইসব অসাধারণ জাদুকররা সাধারণত দর্শকদের বলেন না যে ঠিক কিভাবে তারা তাদের কৌশলটি দেখাচ্ছেন – কারণ সেটি করলে তাদেরকে ম্যাজিক সার্কেল ( জাদুকরদের ক্লাব) থেকে বের করে দেয়া হবে, কিন্তু তারা তাদের দর্শকদের নিশ্চিৎ করেন, সেখানে অতিপ্রাকৃত জাদুর কোনো উপস্থিতি নেই। অন্যরাও সক্রিয়ভাবে যদিও বলেন না, তারা যা করছেন তা একধরনের কৌশল মাত্র, কিন্তু তারা এমন কিছু বাড়তি দাবীও করেন না, তারা কি করেছেন সেই বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কোনো মিথ্যা কথা বলে, তারা শুধুমাত্র দর্শকদের মনে একটি আনন্দময় অনুভূতি রেখে যান, এইমাত্র তারা খুব রহস্যময় কিছু একটা দেখলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বেশ কিছু জাদুকর আছেন তারা খুব পরিকল্পিতভাবেই অসৎ এবং তারা ভান করেন তাদের সত্যিকারভাবে ‘অতিপ্রাকৃতিক অথবা অস্বাভাবিক কোনো ক্ষমতা আছে: হয়তো তারা দাবী করেন তারা আসলেই লোহা বাঁকাতে পারেন বা ঘড়ি বন্ধ করে দিতে পারেন শুধুমাত্র তাদের চিন্তার শক্তি ব্যবহার করে। এদের মধ্যে কিছু অসৎ ভানকারী ( প্রতারক, একটা উপযুক্ত শব্দ তাদের বর্ণনা করার জন্য) প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারেন খনি বা তেল কোম্পানীর কাছ থেকে দাবী করে যে তারা তাদের ‘সাইকিক শক্তি’ ব্যবহার করে বলতে পারবেন কোথায় খনন বা ড্রিল করা সবচেয়ে ভালো হবে। অন্য প্রতারকরা সেই সব মানুষদের ব্যবহার করে যারা শোকাহত, দাবী করে যে তারা মৃতদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। যখন এটি ঘটে, এটি আর শুধুমাত্র কৌতুক বা আমোদপ্রমোদময় অনুষ্ঠান থাকেনা, বরং মানুষের বিশ্বাসপ্রবণতা আর হতাশার সুযোগ নেয়া হয় স্বার্থপর উদ্দেশ্যে। নিরপেক্ষভাবে বললে, হতে পারে যে এই সব মানুষগুলো সবাই অসৎ প্রতারক নয়, তাদের কেউ কেউ হয়তো আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন তারা মৃতদের সাথে কথা বলছেন।

জাদুর তৃতীয় অর্থ হচ্ছে সেটি যা আমি শিরোনামে ব্যবহার করেছি, ‘কাব্যিক জাদু’। কোনো সুন্দর সঙ্গীত শুনলে আমাদের আবেগের অশ্রু চলে আসে চোখে। আমরা নক্ষত্রদের দিকে তাকাই অন্ধকার রাতে যখন কোনো চাঁদ থাকেনা, শহরের আলো থাকেনা এবং তীব্র আনন্দ আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করে প্রায়, আমরা এই দৃশ্যকে বর্ণনা করি বিশুদ্ধ জাদু হিসাবে। আমরা হয়তো একই শব্দ ব্যবহার করি অসাধারণ কোনো সূর্যাস্ত অথবা কোনো পাহাড়ী ভূদৃশ্য বা আকাশে কোনো রঙধনু বর্ণনা করার জন্য। এই অর্থে জাদু, শুধুমাত্র মর্মস্পর্শী, গভীর আনন্দের উদ্রেককারী: এমন কিছু যা আমাদের শিহরিত করে, আমাদের আরো পূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অনুভূতি দেয়। আমি যা দেখাতে আশা করছি এই বইয়ে, সেটি এই বাস্তবতা – সেই বাস্তব জগত সম্বন্ধে সেই সত্যগুলো যা আমরা অনুধাবণ করেছি বিজ্ঞানের নানা পদ্ধতির মাধ্যমে – যা জাদুময় এই তৃতীয় অর্থে, কাব্যিক অর্থে, বেঁচে থাকার আনন্দের অর্থে।

এখন আমি সেই অতিপ্রাকৃত ধারণায় ফিরতে চাই এবং ব্যাখ্যা করতে চাই কেন এটি কখনোই আমাদের সত্যিকারের কোনো ব্যাখ্যা প্রদাণ করেনা সেই সব জিনিসগুলো সম্বন্ধে যাদের আমার এই পৃথিবীতে ও আমাদের চারপাশের মহাবিশ্বে দেখি। বাস্তবিকভাবেই কোনো কিছুর অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা দাবী করার মানে আসলেই সেটি ব্যাখ্যা না করা, এমনকি আরো খারাপ, এটিকে কখনো ব্যাখ্যা করা যেতে পারে সেই সম্ভাবনাও বাতিল করে দেয়া। কেন আমি এ কথাটি বললাম? কারণ যে কোনো কিছু অতিপ্রাকৃত, সংজ্ঞানুযায়ী অবশ্যই প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার ক্ষমতার বাইরে। অবশ্যই এটিকে বিজ্ঞানের এবং সুপ্রতিষ্ঠিত, বহুপরীক্ষিত এবং প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নাগালের বাইরে হতে হবে, যে পদ্ধতি গত চারশত বছরে বা তারও বেশী সময় ধরে আমাদের উপভোগ করা অর্জিত জ্ঞানের অবিশ্বাস্য বিশাল অগ্রগতির জন্য দায়ী। কোনো কিছু অতিপ্রাকৃত কোনো উপায়ে ঘটেছে এটি বলা শুধুমাত্র এই না যে, ‘আমরা এটি বুঝি না’, বরং বলা. ‘আমরা কখনোই এটি বুঝতে পারবো না, সুতরাং এমনকি কোনো চেষ্টা করার দরকার নেই’।

বিজ্ঞান ঠিক এর বীপরিত দৃষ্টিভঙ্গিটি ধারণ করে। এখনও অবধি বিজ্ঞান আরো সমৃদ্ধ হয় কোনো কিছু ব্যাখ্যা না করতে পারার আপাত অক্ষমতায়, এবং এই অক্ষমতাকেই সে প্রেরণা আর উদ্দীপনা হিসাবে ব্যবহার করে আরো প্রশ্ন করা অব্যহত রাখার জন্য, সম্ভাব্য মডেল তৈরী করে তাদের পরীক্ষা করে দেখার জন্য। যেন আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌছাতে আমাদের পথ খুজে পাই ধীরে এবং ধাপে ধাপে।

সেই গোয়েন্দা পুলিশ সম্বন্ধে আপনি কি ভাববেন, যিনি কিনা একটি হত্যাকাণ্ড দেখে হতভম্ব হয়ে যান, যিনি এতই অলস যে সমস্যাটির সমাধান করা চেষ্টায় কোনো কাজই করেননা, বরং রহস্যটি সমাধান করে এটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করে? বিজ্ঞানের সামগ্রিক ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যা একসময় কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির পরিণতি ভাবা হতো – যার কারণ দেবতারা (সন্তুষ্ট এবং অসন্তুষ্ট উভয়েই), দানবরা, ডাইনীরা, আত্মা, অভিশাপ এবং জাদুমন্ত্র, আসলে তাদের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা আছে: যে ব্যাখ্যাগুলো আমরা বুঝতে পারি, পরীক্ষা করে দেখতে পারি, যার উপর বিশ্বাস রাখতে পারি। কোনো কারণই নেই বিশ্বাস করা যে বিজ্ঞান এখনো যে সব কিছুর কোনো প্রাকৃতিক কারণ খুজে পায়নি সেগুলো ঘটছে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণে, যেমন করে মনে করা হয় ক্ষুদ্ধ দেবতাদের কারণে ঘটে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং নানা অসুখ কিংবা মহামারী, যেমন মানুষ একসময় বিশ্বাস করতো।
অবশ্যই, কেউ আসলেই বিশ্বাস করেন না, কোনো ব্যঙকে রাজকুমারে রুপান্তরিত করা সম্ভব হতে পারে ( অথবা কোনো রাজকুমারকে ব্যঙে, আমি কখনোই মনে করতে পারিনা) অথবা একটি কুমড়াকে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, কিন্তু আপনি কি কখনো বিষয়টি ভেবে দেখেছেন যে, কেন এই ধরনের বিষয়গুলো অসম্ভব? বেশ কিছু উপায় আছে সেটি ব্যাখ্যা করা। আমার পছন্দের উপায়টি হচ্ছে এটি।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (চার)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 10 = 13