দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( প্রথম পর্ব)

?1477078261602″ width=”500″ />

অবশ্যপাঠ্য ভূমিকা: দর্শনের সহজ পাঠ একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক, ফেসবুক পেজ জীবনের দর্শন এর প্রাণ। এই লেখাগুলো আমি লিখতে শুরু করেছি, ১৯৮৭ সালে ঢাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য আসা স্বপ্নে বিভোর প্রতিশ্রুতিময় এক তরুণের জন্য। তরুণটি তখনও দর্শন কিছু নিয়ে ভাবেনি, যদি তার প্রিয় কিছু বিষয়ের মধ্যে ইতিহাস ছিল, ধ্রুপদী সাহিত্যের একটি বড় অংশের সাথে তার পরিচয়ও ছিল। বিস্ময়করভাবেই দর্শনের সাথে তার পরিচয় ঘটেছিল গানের মাধ্যমে। দর্শনের বেশ কিছু বই সে খুব খুঁজেছিল একসময় যা তাকে সহজ কিছু ধারণা দিতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান তার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল অজান্তেই। দর্শনকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার পশ্চিমাদের ইন্টারনেট ব্যবহার আমাকে বিস্মিত করছে বেশ কয়েক বছর হলো, বেশ কিছু লেখকদের অনুমতি নিয়ে আমি শুরু করেছিলাম ধারাবাহিক অুনবাদ সিরিজটি ( জানি না কখনো প্রকাশিত হবে কিনা), তবে লেখাগুলো সব মিশ্র, পশ্চিমা দর্শন নিয়ে শুরু করলেও প্রাচ্য কিংবা আরবের স্বর্ণযুগের দর্শনের সহজ পরিচিতিও খুঁজছি এর সাথে যুক্ত করার জন্য, যা পাচ্ছি সেগুলো যুক্ত করেছি, আরো করবো যখন সুযোগ পাবো ( বলা উচিৎ সময় পাবো)। মূলত ইতিহাসের আদলে লেখা এই ধারাবাহিকটি যার জন্য লেখা, সে এখন তার জীবনের পঞ্চম দশকের শেষ প্রান্তে, স্পষ্টতই এখনও সে নিজেকে পায়নি খুঁজে। তবে আমার সন্দেহ সেই মানুষটি এখন যখন লেখাগুলো পড়েন, হয়তো তার হঠাৎ দীর্ঘশ্বাসে খানিকটা তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে। তিনি তার প্রয়োজনে পান নি ঠিক আছে, তবে তার মত অন্য কেউ, কৌতুহলী তরুণ এখন এই লেখাগুলো পড়তে পারবে, হয়তো জীবনের নতুন কোনো পথ খুঁজতে এই লেখাগুলো তাকে সহায়তা করবে। – কাজী মাহবুব হাসান)

দর্শনের সহজ পাঠ – ১ :
সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( প্রথম পর্ব)

প্রায় ২৪০০ বছর আগে এথেন্সে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল অতিরিক্ত বেশী প্রশ্ন করার জন্য। তার আগেও বহু দার্শনিক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সক্রেটিস এর হাত ধরেই এই দর্শন বিষয়টি সত্যিকারভাবে তার যাত্রা শুরু করেছিল। দর্শনের যদি কোনো পৃষ্ঠপোষক সেইন্ট থেকে থাকেন, তিনি হলেন সক্রেটিস।

চ্যাপটা নাক, মোটা, বেঁটে, অগোছালো, নোংরা এবং বেশ অদ্ভুত প্রকৃতির সক্রেটিস সেই সমাজে ঠিক মানানসই ছিলেন না। যদিও শারীরিকভাবে তিনি কুৎসিত ছিলেন, প্রায়ই তিনি গোছল করতেন না, তবে তার ব্যক্তিত্বে অবশ্যই অদ্ভুত একধরনের আকর্ষনীয়তা ছিল, আর তিনি প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর মেধারওঅধিকারী ছিলেন তিনি। এথেন্স এর সবাই একমত ছিলেন অন্তত একটা বিষয়ে, তার মত এমন কাউকে আর কখনোই দেখা যায়নি এর আগে এবং সম্ভবত আর কখনোই দেখা পাওয়া যাবেনা। তিনি খুবই অনন্য একজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন খুবই বিরক্তিকরও। তিনি নিজেকে দেখতেন ঘোড়া বা গবাদীপশুর গায়ে কামড়ানো বিরক্তিকর মাছির মত, গ্যাডফ্লাই বা গোমাছি যাকে বলে। তারা বিরক্তিকর তবে বড় কোনো ধরনের ক্ষতি করেনা। তবে এথেন্সের সবাই অবশ্য তা মনে করতেন না। কিছু মানুষ তাকে ভালোবাসতেন ঠিকই তবে বেশীরভাগ মানুষরাই তাকে ভাবতেন বিপজ্জনক একজন ব্যক্তি হিসাবে, যিনি অনেককেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন।

?oh=74a6f98030c93371858a2331a3ac5db1&oe=584AAA0C” width=”400″ />

তারুণ্যে তিনি ছিলেন সাহসী একজন সৈন্য, স্পার্টা এবং তাদের জোটের বিরুদ্ধে পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধে এথেন্সের হয়ে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন। মধ্যবয়সে তাকে এথেন্সের বাজারে এলোমেলোভাবে হাটতে দেখা যেত, মাঝে মাঝে তিনি অন্যদের থামিয়ে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতেন। কম বেশী মোটামুটিভাবে তিনি শুধু এই কাজটিই করতেন। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো তিনি করতেন সেগুলো ছিল ছুরির মত ধারালো। প্রশ্নগুলো খুব সহজ মনে হতো, কিন্তু সেগুলো আদৌ সহজ কোন প্রশ্ন ছিলনা। এর একটি উদহারণ যেমন হতে পারে, ইউথাইডেমুস এর সাথে তার একটি কথোপকথনে বা সংলাপে। সক্রেটিস তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ছলনাপূর্ণ হয়ে কোনো কাজ করা কি অনৈতিক মনে করা যেতে পারে? ‘অবশ্যই অনৈতিক’, ইউথাইডেমুস জবাব দেন, তিনি ভেবেছিলেন এর উত্তরতো স্পষ্ট। সক্রেটিস তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, বেশ তাহলে ধরুন, যদি আপনার এক বন্ধু যে খুবই হতাশাগ্রস্ত এবং আত্মহত্যা করতে পারে, আপনি তার ছুরিটা চুরি করলেন? সেটা কি একটি ছলনাপূর্ণ কাজ হবে না? অবশ্যই হবে, কিন্তু এমন কোন কাজ কি অনৈতিক না হয়ে বরং নৈতিক হবার কি কথা নয়? যদিও এটি ছলনাপূর্ণ একটি কাজ, কিন্তু তারপরও তো এটি ভালো একটি কাজ যার উদ্দেশ্য বন্ধুর জীবন বাঁচানো – খারাপ কোন কাজ নয়। হ্যা, ইউথাইডেমুস উত্তর দেন, ততক্ষণে তিনি সক্রেটিসের প্রশ্নে জালে জড়িয়ে গেছেন। সক্রেটিস ঠিক এভাবে বুদ্ধিমানের মত বীপরিত একটি উদহারণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, ইউথাইডেমুস এর সাধারণ মন্তব্য যে, ছলনাপূর্ণ কোনো কিছু মানেই অনৈতিক, এই প্রস্তাবটি আসলে সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য না। ইউথাইডেমুস বিষয়টি এর আগে কোনদিনও বুঝতে পারেননি। বারবার সক্রেটিস প্রমান করেন যে, বাজারে ( আগোরা) যে সব মানুষগুলোর সাথে তার দেখা হচ্ছে প্রতিদিন, তারা যা কিছু জানেন বলে ভাবেন, আসলেই তারা সেটি জানেন না। কোনো এক সামরিক সেনানায়ক হয়তো আত্মবিশ্বাসের সাথে কথোপকথন শরু করলেন যে তিনি জানের ‘সাহস;’ বলতে কি বোঝায়, কিন্তু সক্রেটিসের সাথে তার বিশ মিনিট বাদানুবাদের পরে তিনি পুরোপুরিভাবে সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়তেন। আর এই অভিজ্ঞতাটি নিশ্চয়ই খুব অস্বস্তিকর ছিল বহু মানুষের জন্য।

?oh=95ff7df7f6bab0fa51cae5b702472d45&oe=583C345D” width=”400″ />

মানুষ আসলে সত্যিকারভাবে কতটুকু বুঝতে পারে তার সীমাটি দেখিয়ে দিতে সক্রেটিস ভালোবাসতেন এবং তিনি সেই সব ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতেন, যার উপর ভিত্তি করে তারা তাদের জীবন গড়ে তুলেছে। কোনো একটি কথোপকথন যদি শেষ হয় এমন কোনোভাবে, যেখানে সবাই অনুধাবন করতে পারেন যে, আসলেই তারা কত অল্প জানেন, সক্রেটিসের জন্য সেটাই একটি সফলতা। সক্রেটিসের মতে অবশ্যই যা অনেক বেশী ভালো, সেটি হচ্ছে, কোন কিছুকে বুঝতে পারছেন বলে এমন ভ্রান্ত একটি বিশ্বাস বহন করে যাওয়ার বদলে যদি আপনি স্বীকার করে নেন আসলে ব্যাপারটি আপনি ঠিকমত বোঝেননি।

(চলবে)

ব্যবহৃত চিত্রকর্ম:

(১) Jacques-Louis David, The Death of Socrates -1787
(২) Antonio Zucchi, Socrates Drinking the Hemlock -1777
(৩) Jean-Leon Gerome, Socrates seeking Alcibiades in the house of Aspasia, 1861

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 − 60 =