কাশ্মীরের সমস্যার সমাধান

.png” width=”400″ />

যতোবার কাশ্মীর প্রসঙ্গ সামনে আসে, ততোবার ভারত কাশ্মীরকে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করে, ততোবার পাকিস্তান কাশ্মীরকে আজাদি (স্বাধীনতা) দিতে চায়। আসল বিষয়টা হলো, ১৯৪৭ যিশুসনের আগস্টে এই দুই দেশের স্বাধীন হয়ে যাওয়াটাই কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই দুই দেশ একসাথে কাশ্মীরকে চাপ দিয়ে ধরে রেখেছে, যেনো সে নিজের পায়ে কখনো না দাঁড়াতে পারে।

১৯৪৭ এর আগস্টে কি হয়েছিলো? ১৯৪৭ যিশুসনের আগস্টে বৃটিশ ভারতের জমি ভাগ হয়ে দুইটি স্বাধীন দেশ হয়েছিলো। আর বৃটিশ ভারতের বাইরের ৫৮৫ টি দেশীয় স্বাধীন রাজ্য (প্রিন্সলি স্টেট) পরাধীন হয়েছিলো। ভারত আর পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশীয় স্বাধীন রাজ্যগুলো বৃটিশ-রাজের সাথে একধরণের চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো। চুক্তি অনুযায়ী রাজ্যগুলোর প্রতিরক্ষা আর পররাষ্ট্রনীতি দেখতো বৃটিশ-রাজ। ১৯৪৭ যিশুসনে ভারত আর পাকিস্তানের স্বাধীনতার আগে আগে, বৃটিশ সরকার দেশীয় রাজ্যগুলোকে আহবান করে, হয় ভারতে যোগ দিতে, নয় পাকিস্তানে যোগ দিতে, অথবা স্বাধীন থাকতে। স্বাধীন থাকার কথা বলা হলেও আদতে তা সম্ভব ছিলো না। একপাশে জাতীয়তাবাদী ঢেউ, অপরপাশে বৃটিশ-রাজের দায়িত্ব ত্যাগ। দেশীয় রাজ্যগুলো কেউ চুক্তি করে ইউনিয়ন ভুক্ত হলো, কেউ চাপে পরে ইউনিয়ন ভুক্ত হলো। সমস্যা হলো তিনটি রাজ্য নিয়ে। কাশ্মীর, জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদ।

কাশ্মীরের সমস্যা হলো, কাশ্মীরের বেশিরভাগ জনগণ ধর্মীয়ভাবে মুসলিম। তারা পাকিস্তানে যোগ দিতে চায়। কিন্তু রাজা হিন্দু, তিনি ভারতে যোগ দিতে চান। ঠিক উল্টা সমস্যা জুনাগড়ের। জুনাগড়ের জনগণ বেশিরভাগ হিন্দু, তারা ভারতে যোগ দিতে চায়। নবাব মুসলমান, তিনি পাকিস্তানে যোগ দিতে চান। [যদিও জুনাগড়ের সাথে পাকিস্তানের কোনো ভূমিসংযোগ নাই। জুনাগড় বর্তমানে আরবসাগর তীরবর্তী গুজরাটের একটি জেলা।] হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রে সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। হায়দ্রাবাদের জনগণ স্বাধীন থাকতে চায়, সম্রাট নিজাম উল মুলক ও স্বাধীন থাকতে চান। হায়দ্রাবাদ আয়তন আর জনসংখ্যায়ও বিশাল, তখনকার দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। কিন্তু হায়দ্রাবাদের চারদিকে ভারত। সমুদ্রে যাওয়ার কোনো রাস্তা নাই। শেষ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদের নিজাম পর্তুগালের সম্রাটকে প্রস্তাব দেন তার কাছে গোয়া বিক্রি করে দেয়ার জন্য, যেনো হায়দ্রাবাদের ভাগে সমুদ্রে পরে। যাই হোক সেটা ভিন্ন গল্প।

কাশ্মীরের মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের পাকিস্তান যোগদানের চাপ একদিকে, অপরদিকে ভারতের চাপ ভারতে যোগদানের জন্য। দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। এমন অবস্থায় কাশ্মীরের রাজা হরি সিং স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৭ যিশুসনের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। স্বাধীন হওয়ার পরও তারা উভয়ে চাপ অব্যাহত রাখে। ভারত মনে করে কাশ্মীর পাকিস্তানে যোগ দিলো এই, পাকিস্তান মনে করে কাশ্মীর এই ভারতে যোগ দিলো প্রায়। দুজনেই কাশ্মীরকে অবিশ্বাস করে, দুজনেই চায় কাশ্মীর তার অংশ হোক। ভারত এমন অবস্থায় কাশ্মীরের রাজা হরি সিং কে অন্তত একটা প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করতে চাপ দেয়, যেনো বহিঃশত্রু(!)’র আক্রমণে ভারত তাকে বাঁচাতে পারে। এদিকে কাশ্মীর-পাকিস্তান সীমান্তে পশতু উপজাতীয় সৈন্যদল প্রস্তুত। ভারত যোগদানের ন্যুনতম আভাষ পেলেই তারা শ্রীনগর আক্রমণ করে দখল করে নেবে।

প্রসঙ্গক্রমে, ১৯৪৭ যিশুসনের আগে ভারত নামে কোনো একক রাজনৈতিক ইউনিটের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। ১৮৫৭ পর্যন্ত একটু পাওয়া যায়, তা ভারতবর্ষ নামে। তার আগে ভারতের ইতিহাসে কোনো একক ভারত ছিলো না। একইসাথে অনেক রাজ্য আর অনেক রাজা ছিলো। প্রত্যেকের আলাদা ইতিহাস আর পরিচয় ছিলো। সুতরাং ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ কথাটা সম্পূর্ণ ভুল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর পাকিস্তান নিজেই একটা আগাগোড়া রাজনৈতিক ভুল।

১৯৪৭ যিশুসনে কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। তিনি ১৯২৫ যিশুসনে ক্ষমতায় আসেন। তার পিতার দাদা গুলাব সিং ১৮৪৬ যিশুসনে মাত্র ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে কাশ্মীর কিনে নেন। তার আগে কাশ্মীর পাঞ্জাবের স্বাধীন শিখ রাজা ‘রণজিৎ সিং’ এর অধীনে ছিলো। রণজিৎ সিং ১৮১৯ যিশুসনে আফগানদের যুদ্ধে পরাজিত করে কাশ্মীর দখলে নেন। ১৭৫৩ যিশুসনে আফগানরা কাশ্মীরের দখল নেয়। তার আগে ১৫৪০ থেকে ১৭৫৩ পর্যন্ত কাশ্মীর মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে।

.png” width=”400″ />

তো, অবিশ্বাসের সে সময়ে, ১৯৪৭ যিশুসনের অক্টোবরের ২৪ তারিখ রাজা হরি সিং দিল্লী আসেন, চুক্তির বিষয়ে কথা বলার জন্য। এই সময়ে পশতু সৈন্যদল পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পরে, দখল করে নেয় গিলগিট-বালতিস্তান সহ কাশ্মীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। লাদাখের পশ্চিম পাশে প্রবেশ করে চীনা সেনাবাহিনী। তারাও কাশ্মীরের একটা অংশ দখল করে, নাম দেয়- ‘আকসাই চীন’। আকসাই চীন এখনো চীনের তিব্বত প্রদেশের অংশ। পশতু সৈন্যরা কাশ্মীরে প্রবেশের পর, ভারতের সেনাবাহিনীও কাশ্মীরে প্রবেশ করে। অল্পের জন্য রাজধানী শ্রীনগরের পতন ঠেকায় ভারতীয় সেনারা। রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নে ‘স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য’ হিসেবে যোগদান করে। ভারতীয় ইউনিয়নে তার নাম হয় ‘জম্মু ও কাশ্মীর’। অপরদিকে পাকিস্তান তার অধিকৃত কাশ্মীরে প্রতিষ্ঠা করে ‘আজাদ কাশ্মীর’। দুই কাশ্মীরের মাঝখানে ভারত এবং পাকিস্তান একটা ‘যুদ্ধবিরতি সীমানারেখা’ আকে, এর নাম দেয়া হয়- ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ (এলওসি)। কাশ্মীরের আজাদীর বিনিময়ে পাকিস্তান গিলগিট-বালতিস্তান এর বিস্তীর্ণ এলাকায় আলাদা প্রশাসন কায়েম করে, নিজের অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করে। ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরও স্বায়ত্তশাসন পায়নি।

.png” width=”400″ />

কাশ্মীর ভারত চায় না, পাকিস্তান ও চায় না। কাশ্মীর চায় আজাদি (স্বাধীনতা)। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায় না। উপরন্তু, কাশ্মীরের দখল নিয়ে পরস্পর যুদ্ধে জড়িয়েছে চার বার। ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ যিশুসনে ভারত এবং পাকিস্তান নিজেরা কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ করলেও, তারা কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায় না। কাশ্মীরের স্বাধীনতার প্রশ্নে গনভোট চায় না, কাশ্মীরের ব্যাপারে কাশ্মীরের জনগণের মতামত জানতে চায় না। এমনকি ন্যুনতম জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপও চায় না।

কাশ্মীরের সমস্যার সহজতম সমাধান হতে পারে, গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনতার রায় জানতে চাওয়া এবং রায় মোতাবেক কাশ্মীরকে তার আজাদির পথে হাটতে দেয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “কাশ্মীরের সমস্যার সমাধান

    1. ভারত আর পাকিস্তান আরো
      ভারত আর পাকিস্তান আরো দীর্ঘদিন কাশ্মীর ইস্যু জীবিত রাখবে, নিজেরা রাজনীতি করার জন্য। ভারত-পাকিস্তানের চক্কর থেকে বের হতে না পারলে, কাশ্মীরের মুক্তি নাই।

  1. কাশ্মীরের মানুষ পাকিস্থানের
    কাশ্মীরের মানুষ পাকিস্থানের সাথে যোগ দিতে চেয়েছিল এই তথ্য সঠিক নয়। শের-ই-কাশ্মীর শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে কাশ্মীরের মানুষ ভারতে যোগ দিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। বর্তমানে ভারতীয় শাসকদের আচরনে ফলে কাশ্মীরি জনগনের যে মনোভাব তৈরী হয়েছে তার সাথে তৎকালীন তৎকালীন মনোভাবের কোনই সম্পর্ক নেই। হায়দ্রাবদের ক্ষেত্রেও আপনার তথ্য ভূল। ওই রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ ছিলে হিন্দু। অন্ধ্রপ্রদেশ তেলেঙ্গানায় ঢুকলেই বুঝতে পারবেন। প্রবন্ধের বাকী অংশের সাথে আমি একমত

    1. ১৯৪৭ এ শেখ আবদুল্লাহ তরুন
      ১৯৪৭ এ শেখ আবদুল্লাহ তরুন রাজনীতিবিদ। তিনি ছাড়াও কাশ্মীরে আরো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদগণ ছিলেন যারা পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইছিলেন। এমনকি পাকিস্তানে যোগদানের বিষয়ে রাজা হরি সিং এর সাথে লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমুদ্দিনদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছিলো। কাশ্মীরের জনতা ছিলো তিন ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ ভারতে যোগ দিতে চায়। এক ভাগ পাকিস্তানে যোগ দিতে চায়। এক ভাগ স্বাধীন থাকতে চায়। এমন অবস্থায় রাজা হরি সিং তার দেওয়ানের সাথে পরামর্শ করে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কাশ্মীরের জনগণের একাংশ তখন পাকিস্তানে যোগ দিতে চায় নি, এমন তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?

      হায়দ্রাবাদের জনগণের বিষয়ে, তারা বেশিরভাগ হিন্দু ছিলো না মুসলিম ছিলো, এই কথা আমি এই খানে কোথাও বলি নাই। আমি বলেছি তারা বেশিরভাগ স্বাধীনতার পক্ষে ছিলো। অবশ্য তেলেঙ্গানা অংশের কিছু হায়দ্রাবাদী জনগণ ভারত যোগদানেরও পক্ষে ছিলো। হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রে আমার কোন তথ্যটা ভুল, স্পেসিফাই করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =