দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( দ্বিতীয় পর্ব)

?oh=4d03fedcd2b7ad910475d8f7acb7e0c4&oe=583DF103″ width=”400″ />

দর্শনের সহজ পাঠ – ১ :
সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( দ্বিতীয় পর্ব) ও তাঁর বিখ্যাত ছাত্র প্লেটো

সেই সময় এথেন্সের ধনী ব্যক্তিদের ছেলেদের সোফিস্টদের কাছে পড়তে পাঠানো হতে। সোফিস্টরা আসলে ছিলেন বুদ্ধিমান শিক্ষক গোষ্ঠী, যারা তাদের ছাত্রদের শেখাতেন কিভাবে বক্তৃতা দিতে হয়, যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে হয়। আর এই কাজটি করার জন্য তারা মোটা অংকের পারিশ্রমিক নিতেন। কিন্তু তাদের ব্যতিক্রম, সক্রেটিস কোন কিছু শেখানোর জন্য পয়সা নিতেন না। বাস্তবিকভাবে তিনি দাবী করতেন, তিনি আসলে কিছুই জানেনা না, সুতরাং কিভাবে আদৌ তিনি কাউকে কোনো কিছু শেখাতে পারবেন? তবে এই দাবী অবশ্য তার কাছে ছাত্রদের শিখতে আসা বন্ধ করতে পারেনি, তার কথোকথন শোনার জন্যই তারা জড়ো হতেন দল বেধে। বিষয়টি তাকে সোফিস্টদের কাছে মোটেও জনপ্রিয় করেনি।

একদিন তার বন্ধু শেরেফোন ডেলফিতে অ্যাপোলোর ওরাকল এর কাছে গিয়েছিলেন। ওরাকল হচ্ছেন একজন জ্ঞানী বৃদ্ধ মহিলা, একজন সিবিল, মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি । তার উত্তরগুলো সাধারণত হতো ধাঁধাঁর মত। শেরোফোন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কি কোনো ব্যক্তি আছেন? ‘না’ উত্তর এলো, ‘ সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ নেই’। যখন শেরোফোন সক্রেটিসকে বিষয়টি জানান, তিনি প্রথমে এটি বিশ্বাস করেননি। আসলেই তাকে অবাক করেছিল, তিনি ভাবলেন ‘ আমি কিভাবে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ হই যখন আমি এত কম জানি?’ । তার জীবনের বহু বছর তিনি ব্যয় করেছিলেন, তার চেয়ে কেউ বেশী জ্ঞানী আছেন কিনা সেটি জানার জন্য, সেটি খুঁজতে। অবশেষে তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ওরাকল আসলে কি বলতে চাইছে এবং তার কথাও ঠিক। বহু মানুষ সেই বিষয়টি ভালো জানেন তারা সাধারণত যেটি করেন – কাঠমিস্ত্রী কাঠের কাজে ভালো, সৈন্যরা জানে যুদ্ধ করতে – কিন্তু তাদের কেউই আসলে সত্যিকারভাবে জ্ঞানী নন। তারা আসলেই জানেন না কি বিষয় নিয়ে তারা কথা বলছেন।

দার্শনিক এর ইংরেজী শব্দ ‘ফিলোসফার’ শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ থেকে যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। পশ্চিমা দর্শনের প্রচলিত ধারাটি বিস্তার লাভ করেছিল প্রাচীন গ্রীস থেকে বিশ্বের বহু জায়গায়, কখনো এটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে প্রাচ্য দর্শনের সংমিশ্রনে ও মিথস্ক্রিয়ায়। যে ধরণের জ্ঞানকে দর্শন মূল্য দেয়, তার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি, তর্ক এবং প্রশ্ন করা। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি আপানাকে বলেছে সেটি সত্য দাবী করে, শুধুমাত্র সেই কারণে সেটি বিশ্বাস করা নয়। সক্রেটিসের কাছে জ্ঞান মানে অনেক বাস্তব তথ্য জানা নয় বা কোনো কিছু কিভাবে করতে হয় সেটি জানা নয়। এর মানে হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের সত্যিকার প্রকৃতিটিকে অনুধাবন করা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আমরা কতটুকু জানতে পারি তার সীমানাও।

আজকের যুগে দার্শনিকরা কম বেশী সেই কাজটি করছেন যা সক্রেটিস করেছিলেন: কঠিন সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা, যুক্তি এবং প্রমান পর্যালোচনা করা, গুরুত্বপূর্ণ কিছুু প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য চেষ্টা করা, বাস্তবতার প্রকৃতি সম্বন্ধে এবং কেমন ভাবে আমাদের বাঁচা উচিৎ ইত্যাদি বিষয়ে যে প্রশ্নগুলো আমরা আমাদের নিজেদের করতে পারি তার উত্তর অনুসন্ধান করা। সক্রেটিসের চেয়ে বর্তমান দার্শনিকরা ব্যতিক্রম শুধুমাত্র তাদের চিন্তার ভিত্তি তৈরী করে দেবার জন্য গত আড়াই হাজার বছরের দার্শনিক ধ্যান-ধারণা বিদ্যমান। আর সেই ধারাটির সূচনা করেছিলেন সক্রেটিস।
সক্রেটিসকে এত জ্ঞানী বানিয়েছিল যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে, তিনি তার প্রশ্ন করা কখনোই থামাননি এবং তার নিজের যে কোনো ধারণা নিয়ে তিনি সবসময় প্রস্তুত থাকতেন বিতর্ক করার জন্য। তিনি বলতেন, এই জীবন ধারণ করার তখনই মুল্য আছে, যদি আপনি কি করছেন সেই বিষয়ে চিন্তা করেন; অপরীক্ষিত কোনো অস্তিত্ব গবাদী পশুদের জন্য হয়তো ঠিক আছে, মানুষের জন্য ঠিক নয়।

?oh=47235a53c985452ac451ee55df7c7112&oe=584B80F3″ width=”400″ />

দার্শনিকদের ক্ষেত্রে যে কাজটা খুবই বেমানান, সক্রেটিস কোনো কিছু লিখে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাঁর কাছে লেখার চেয়ে বরং কথা বলা অনেক বেশী উত্তম মনে হতো। লিখিত কোনো শব্দ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা; তারা আপনাকে কোনো কিছু বোঝাতে পারেনা, যখন আপনি পড়ে সেটি বুঝতে পারবেন না। মুখোমুখি কথোপকথন অনেক বেশী উত্তম, তিনি মনে করতেন, কারণ কথা বলার সময় কোন ধরনের মানুষের সাথে আমরা কথা বলছি সেটা বিবেচনায় আনা যায়, এবং আমরা ঠিক সেইভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারি আমরা যা বলছি সেটি যেন অপর পক্ষের কাছে বোধগম্য হয়।

যেহেতু তিনি কোনো কিছু লিখে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন, সক্রেটিসের বিখ্যাত তারকা ছাত্র প্লেটোর মাধ্যমে প্রধাণত আমরা তার সম্বন্ধে বেশীর ভাগ ধারণা পেয়েছি – এই মহান মানুষটি কি বিশ্বাস করতেন, কি নিয়ে তর্ক করতেন। প্লেটো সক্রেটিস এবং যে সব মানুষদের তিনি প্রশ্ন করতেন তাদের কথোপকথনগুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু বই হিসাবে লিখে গিয়েছিলেন। যা পরিচিত প্লেটোনিক ডায়ালগস হিসাবে। দর্শনতো বটেই তারা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও অনন্য সৃষ্টি – কোনো না কোনো ভাবে ভাবা যেতে পারে প্লেটো ছিলেন সেই যুগের শেক্সপিয়ার। তার এই সব ডায়ালগস বা সংলাপগুলো পড়ে আমরা একটা ধারণা পাই সক্রেটিস কেমন ছিলেন, তিনি কত বুদ্ধিমান ছিলেন, কিভাবে তিনি বেশ কিছু মানুষের ক্রোধের কারণ হয়েছিলেন।

কিন্তু আসলেই ব্যপারটা এত সরল ছিল না, যেমন আমরা কিন্তু সবসময় নিশ্চিৎ হয়ে বলতে পারিনা, প্লেটো কি সত্যি সক্রেটিস যা বলে গেছেন সেটি লিখেছেন নাকি তার নিজের সৃষ্ট সক্রেটিস নামের একটি চরিত্রের মুখে তার নিজের ধারণাগুলো তুলে দিয়েছিলেন। তবে তাদের মধ্যে একটি ধারনা বেশীরভাগ মানুষই সক্রেটিস নয় বরং প্লেটোর নিজের ধারণা বলেই মনে করেন, সেটি হচ্ছে, পৃথিবীকে আমরা যেমন মনে করি, সেটি আসলে সে রকম নয়। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের সামনে আমরা যা দেখি তা আসলে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভিন্ন বাস্তবতা থেকে। আমরা বেশীর ভাগ মানুষই এই বাহ্যত রুপগুলো বাস্তবতা হিসাবে মনে করি। আমরা মনে করে আমরা বুঝতে পারছি কিন্তু আমরা আসলে পারছি না।

প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে শুধুমাত্র দার্শনিকরাই বুঝতে পারেন এই পৃথিবীটা সত্যিকার ভাবে কেমন। তারা বাস্তবতার প্রকৃতি আবিষ্কার করেন তাদের কোনো ইন্দ্রিয়ের উপর ভরসা না করে বরং চিন্তা করে। তার এই ভাবনাটি বোঝাতে তিনি একটি গুহার বর্ণনা দেন। আর সেই কাল্পনিক গুহায় মানুষরা একটি দেয়ালের দিকে মুখ করে শৃঙ্খলিত হয়ে আছে। তাদের সামনে তারা শুধু দেখতে পারছে কম্পমান ছায়াগুলো, যা তারা বিশ্বাস করছে সত্যি কোনো কিছু হিসাবে, কিন্তু তারা বাস্তব নয়। তারা যা দেখতে পারছে সেটি হলো তাদের পিছনের আগুনের সামনে ধরে রাখা কোনো কিছুর ছায়া যা তাদের সামনের দেয়ালে পড়ছে। এই মানুষগুলো তাদের সারাটা জীবন অতিবাহিত করে দেয়ালের উপর প্রক্ষেপিত ছায়াগুলোকে বাস্তব পৃথিবী হিসাবে ভেবে। তারপর তাদের মধ্যে কোনো একজন তার শৃঙ্খল ভেঙ্গে পেছনে যখন আগুনের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে সবকিছু প্রথমে ঝাপসা মনে হয়, তারপর সে দেখতে পারে আসলে সে কোথায় অবস্থান করছে। সে হোচট খেতে খেতে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সুর্যের দিকে তাকাতে সক্ষম হয়। এরপর যখন সে গুহায় আবার ফিরে আসে, বাইরের পৃথিবী সম্বন্ধে সে যা কিছু অন্যদের বলে কেউই পারেনা বিশ্বাস করতে। যে মানুষটি তার শৃঙ্খলিত জীবন থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে দার্শনিকের মত। সাধারণ মানুষের খুব সামান্যই ধারণা আছে বাস্তবতা সম্বন্ধে, কারণ গভীরভাবে ভাবার বদলে তাদের সামনে যা আছে তা দেখেই তারা সন্তুষ্ট।

কিন্তু এই চোখে যা দেখি সেটি ছলনাময়, তারা যা দেখে সেটি হচ্ছে ছায়া, বাস্তবতা না। এই গুহার গল্প সংশ্লিষ্ট প্লেটোর সেই প্রস্তাবের সাথে, যা আমাদের কাছে পরিচিত, থিওরী অব ফর্মস নামে। তার এই দার্শনিক প্রস্তাবনাটি বোঝার সবচেয়ে সহজতম উপায় হতে পারে একটি উদহারণের মাধ্যমে : আপনি আপনার সারা জীবনে যতগুলো বৃত্ত দেখেছেন সেগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কোনোটা কি একেবারে নিখুঁত বৃত্ত? না, তাদের কোনোটাই একেবারে ক্রটিহীন নিখুঁততম বৃত্ত নয়। কোন একটি নিখুঁত বৃত্তে এর পরিধির উপর যে কোন বিন্দু এর কেন্দ্র থেকে সমান দুরত্বে অবস্থান করবে। বাস্তব বৃত্তগুলো কখনোই্ এটি পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে পারেনা। কিন্তু আপনি বুঝতে পেরেছেন, আমি যখন নিখুঁত বৃত্তের কথা বলছি আমি আসলে কি বোঝাতে চাইছি।

(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি

(১) This bronze piece depicts ancient Greek philosopher Socrates (469-399 B.C.) in a seated position, gesturing as if engaged in dialogue. Designed by artist Anthony Frudakis,1993,
(২) And So Socrates Dies by Robert Fowler

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( দ্বিতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 4 = 13