মহান মে দিবস

অনেকদিন আগের কথা। ১৮ শতকের পৃথিবীতে তখন জোরে সোরে ঘুরছিল যান্ত্রিক উন্নয়নের চাকা। আর এই উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরোক্ষ কিন্তু মূল ভূমিকা রেখেছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের আমরা শ্রমিক বলেই জানি। তবে শ্রমজীবী মানুষদের খাটানো হতো অমানবিকভাবে। এমনকি দিনে ২০ ঘণ্টা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে তাদের কাজ করতে হতো। কিন্তু সে তুলনায় পারিশ্রমিক দিত নামমাত্র। অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষগুলো প্রতিবাদ করল। দাবি ছিল একটাই। দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ। এতে ক্ষেপে উঠল পুঁজিবাদী মালিকেরা। উপেক্ষা করে উল্টো নির্যাতন করল শ্রমিকদের। রাগে ক্ষোভে শ্রমিকরা শিকাগো শহরে ডাক দেয় ধর্মঘটের।

কেন হয়েছিল এমনটি? চলুন জেনে আসি…
১৮৮০-৯০ এর দশকে শিল্প উন্নয়ন ভালোভাবে চললেও মাঝামাঝি সময়ে একটু মন্দা দেখা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় অনেক কল-কারখানা। বহু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। তাই শ্রমিকরা কাজ পেতে চেয়েছিল এবং জনে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম –এই দাবিতে সোচ্চার হয়। মালিকপক্ষ এ দাবি না মানায় ১৮৮৬ সালের ১ মে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক শিকাগো শহরকে কেন্দ্র করে মিশিগান এভিনিউ-এর মিছিলে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভয় পেয়ে মালিকপক্ষ পুলিশ বাহিনী জড়ো করে। কিন্তু শ্রমিকরা সফলভাবে ধর্মঘট পালন করে। ৩ মে ধর্মঘট আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। এদিন ম্যাক করমিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ফসল কাটার শ্রমিকরা পুলিশের মোকাবিলা করে সভা করে। পুলিশ সভা চলাকালে নির্বিচারে গুলি করে। ৬ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত এবং বহু শ্রমিক আহত হয়। এর প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর ‘হে’ মার্কেট চত্বরে বিশাল এক শ্রমিক সমাবেশ হয়। এ সময় কে বা কারা একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তাতে মালিকপক্ষের অনুগত পুলিশ বাহিনী বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও গুলি করে। সভায় উপস্থিত এক কিশোর শ্রমিক তখন তার জামাটি রক্তে ভিজিয়ে উড়িয়েছিল পতাকা হিসেবে। সেই রক্তে রাঙ্গানো লাল জামাটি শ্রমিক শ্রেণীর লাল পতাকায় বদলে গিয়েছিল। ‘হে’ মার্কেট চত্বরে সেদিন ৪ শ্রমিক নিহত হন এবং ১৬ জন গ্রেপ্তার হন।

তারপর আরেক অধ্যায়ের শুরু। ১৮৮৭ সালের ২১ জুন বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়। ঐ বছরই ৯ অক্টোবর ৬ জনকে ফাঁসি ও ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর ফলে বিশ্বের শ্রমিকরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। “দুনিয়ার মজদুর এক হও”- এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিশ্বের সকল শ্রেণীর শ্রমিকই এ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। দুর্বার এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের কিছু মৌলিক দাবি ও অধিকার স্বীকৃত হয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন(ILO)-এর সম্মেলনে শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় ও সপ্তাহে ১ দিন ছুটি নির্ধারণ করে প্রথম শ্রম আইন তৈরি হয়। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে শিকাগোর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক সংহতি অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সিধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “মহান মে দিবস

  1. শ্রমিকের আন্দোলন শ্রমিককেই
    শ্রমিকের আন্দোলন শ্রমিককেই করতে হবে। আমাদের দেশে সব সর্ষের মাঝেই ভুত ঢুকে বসে থাকে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোও এর বাইরে নয়। ইউনিয়ন নেতারা আরও বড় মালিক বনে যান, এটাই দুঃখের বিষয়।
    মে দিবসে সকল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

  2. শুধু মালিক নয়, শ্রমিকদের
    শুধু মালিক নয়, শ্রমিকদের অধিকার ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের থেকেও মুক্তি পাক। সারা বিশ্বের শ্রমিকদের মে দিবসের শুভেচ্ছা।

  3. আমার স্বচক্ষে দেখা, কোন একজন
    আমার স্বচক্ষে দেখা, কোন একজন শ্রমিক নেতা হওয়ার সাথে সাথেই তিনি আর কোন কাজ করেন না! সে হোটেল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, মটর শ্রমিক বা যেকোন প্রকারের শ্রমিকই হোক না কেন ! তাহলে তার সংসার বা জীবণ যাত্রা চলে কি করে ? এই যদি হয় ট্রেড ইউনিয়নের বাস্তব চিত্র, তাহলে সাধারণ শ্রমিকদের কি উপকার হবে এটাই আমার কাছে একটা বিরাট প্রশ্ন…..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 79 = 80