দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( শেষ পর্ব)

?oh=dc9e30bc484179b8736dc2a0fbe25250&oe=5848A738″ width=”400″ />

দর্শনের সহজ পাঠ – ১ :
সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন এবং তাঁর ছাত্র প্লেটো ( শেষ পর্ব)

বেশ, তাহলে এই নিখুঁত বৃত্তটা আসলে কি? প্লেটো বলবেন কোনো একটি নিখুঁত বৃত্তের ধারণাটাই কোনো একটি বৃত্তের ফর্ম। আপনি যদি বুঝতে চান একটি বৃত্ত আসলে কি, আপনাকে বৃত্তের ফর্মের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে, সত্যিকারের বৃত্তের উপর না যা কিনা আপনি আঁকতে পারেন এবং আপনার দর্শনেন্দ্রিয় দিয়ে সেটি অভিজ্ঞতায় অনুভব করতে পারবেন, যাদের প্রতিটি কোনো না কোনভাবে ক্রটিপূর্ণ। এভাবে প্লেটো ভাবতেন, আপনি যদি ভালোত্ব কি বুঝতে চান, তাহলে আপনাকে মনোযোগ দিতে হবে ভালোত্বর ফর্মের উপর, বিশেষ কোনো ভালোত্ব পরিচায়ক ঘটনার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয় যার স্বাক্ষী আপনি ছিলেন। দার্শনিকরা হচ্ছে সেই মানুষগুলো যারা সবচেয়ে বেশী প্রস্তুত আর যোগ্য এভাবে নৈর্ব্যক্তিক উপায়ে ফর্মগুলো নিয়ে ভাবার জন্য। সাধারণ মানুষ মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে দিকভ্রান্ত হয় তাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভূত আর অভিজ্ঞ পৃথিবীর দ্বারা। কারণ প্লেটো মনে করতেন দার্শনিকরাই খুব দক্ষ বাস্তবতা নিয়ে ভাবার জন্য।

এছাড়া প্লেটো বিশ্বাস করতেন দার্শনিকদের হাতেই থাকা উচিৎ সব রাজনৈতিক শক্তি। দ্য রিপাবলিক, তাঁর বিখ্যাত এই বইটিতে তিনি একটি কাল্পনিক নিখুঁত সমাজের কথা বর্ণনা করেছিলেন। যেখানে দার্শনিকরা থাকবে সমাজের উচ্চতম স্তরে এবং বিশেষ শিক্ষায় তারা শিক্ষিত হবেন, কিন্তু তারা নিজেদের সুখ-সাচ্ছন্দ বিসর্জন দেবেন যে নাগরিকদের তারা শাসন করছেন তাদের কল্যানে। তাদের নীচের স্তরে থাকবে সৈন্যরা, যারা দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবে এবং তাদের নীচে আছেন যারা তারা হচ্ছেন শ্রমিক। এই তিন গ্রুপের মানুষ নিঁখুত একটি ভারসাম্যে অবস্থান করবেন। প্লেটো ভাবতেন, এমন একটি ভারসাম্যময়তা যা কিনা সু-ভারসাম্যময় মনের মত, যেখানে যৌক্তিক অংশটি আবেগ আর কামনার উপর তার নিয়ন্ত্রন রাখবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার সমাজের মডেল গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক এবং যা জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে মিথ্যাচার এবং বলপ্রয়োগের মিশ্রণ দ্বারা। তিনি হয়তো সব ধরণের শিল্পকলাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেন, শিল্পকলা বাস্তবতার মিথ্যা প্রতিনিধিত্ব করছে এমন অভিযোগে। চিত্রকর নানা দৃশ্য ও রুপ আঁকেন, যা তারা ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেন, কিন্তু প্রকৃত সম্বন্ধে সঠিক তথ্য দেয়না এনসব ইন্দ্রিয়গোচর রুপগুলো। প্লেটোর আদর্শে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র প্রজাতন্ত্র দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে উপর থেকে। এমন রাষ্ট্রকে আমরা বলি কর্তৃত্ববাদী কোনোএকনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্লেটো ভাবতেন সব মানুষকে ভোট দেবার অধিকার দেয়া মানে দক্ষ কোনো ক্যাপটেইনের পরিবর্তে যাত্রীদেরকে জাহাজ চালানোর করার সুযোগ দেয়া – সেজন্য তার মতে, আরো অনেক উত্তম, যারা ভালোভাবে জানেন কি করতে হবে কেবল তাদেরই দ্বায়িত্বে থাকা উচিৎ।

প্লেটো তার দ্য রিপাবলিক বইটিতে যে ধরনের রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করেছিলেন, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর এথেন্স তার থেকে খুবই ভিন্ন ছিল। সেখানে এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল, যদিও জনসংখ্যার শুধুমাত্র দশ শতাংশ ভোট দেবার অধিকার রাখতেন। নারী এবং ক্রীতদাসরা যেমন, এই অধিকার থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু সব নাগরিকরাই রাষ্ট্রের আইনের চোখে ছিলেন সমান। এবং সেখানে জটিল সুপরিকল্পিত লটারী পদ্ধতি ছিল যা নিশ্চিৎ করতো যে প্রত্যেকেই যেন একটি নায্য সুযোগ পায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রভাবিত করার জন্য।

প্লেটো তার শিক্ষক সক্রেটিসকে যেভাবে উচ্চ মুল্যায়ন করতেন এথেন্স সেভাবে করেনি। মূল্যায়ন তো দুরের কথা, বহু এথেন্সবাদী অনুভব করেছিলেন সক্রেটিস হচ্ছেন বিপজ্জনক এবং তিনি পরিকল্পিতভাবে তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করছেন। ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন সক্রেটিসের বয়স সত্তর, তাদের একজন, মেলেতুস, তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাড় করান। তিনি দাবী করেন সক্রেটিস এথেন্সবাসীদের উপাস্য দেবতাদের অবহেলা করছেন, এবং নিজের দেবতাদের দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি আরো অভিযোগ আনেন যে সক্রেটিস এথেন্স এর তরুণদের খারাপ আচরণ করার জন্য উৎসাহিত করছেন, তাদেরকে উস্কে দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আচরণ করতে। দুটোই খব ভয়ঙ্কর অভিযোগ ছিল সেই সময়ের এথেন্সে। খুবই কঠিন আমাদের পক্ষে জানা তাদের এই অভিযোগে আদৌ কোনো সত্যতা ছিল, হয়তো সক্রেটিস সত্যিই তার ছাত্রদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, এবং কিছু প্রমান আছে যেখানে এথেন্সের গণতন্ত্রকে উপহাস করেছেন। এই দুটোই তার চরিত্রের সাথে মানানসই হতে পারে। তবে যে বিষয়টা নিশ্চিৎ ছিল সেটি হচ্ছে বহু এথেন্সবাসী সত্যিকারভাবে তার প্রতি আনীত এই অভিযোগগুলো বিশ্বাস করেছিলেন।

যুক্তি তর্ক পরিশেষে তারা ভোট গ্রহন করেন সক্রেটিস দোষী না নির্দোষ এমন প্রস্তাবনায়, ৫০১ জন নাগরিক, যারা এই বিচারে সুবিশাল আকারের জুরির দ্বায়িত্বে ছিলেন, তাদের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য কিছু বেশী এথেন্সবাসী ভোট দেন, হ্যা, সক্রেটিস দোষী। সক্রেটিস যদি চাইতেন তিনি সম্ভবত তার মৃত্যুদণ্ডটি এড়াতে পারতেন তার কথার মাধ্যমে। কিন্তু এর পরিবর্তে, গোমাছির মত তার পরিচিতির সত্যতা প্রমান করেন, তিনি এথেন্সবাসীদের আরো ক্ষেপিয়ে তোলেন যুক্তি দিয়ে যে, তিনি ভূল কোনো কিছু করেননি এবং তাদের উচিৎ হবে, বাস্তবিকভাবে, শাস্তির বদলে তাকে সারাজীবন ধরে বিনামুল্যে খাদ্য সরবরাহ করা। তার এই প্রস্তাব অবশ্যই জুরীদের সহানুভূতি অর্জন করেনি।

তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় বিষপানে বাধ্য করে, হেমলক নামের একটি উদ্ভিদ থেকে বানানো এই বিষটি ধীরে ধীরে সারা শরীরকে অবশ করে দেয়। সক্রেটিস তার স্ত্রী ও তিন ছেলেকে বিদায় জানান এবং তারপর চারপাশে তার ছাত্রদের জড়ো করেন এবং বলেন, যদি তাকে সুযোগ দেয়া হত নীরবে, আর কোনো কঠিন প্রশ্ন করে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেবার জন্য, তিনি সেটি গ্রহন করতেন না, এরচেয়ে তার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়তর। তিনি তার নিজের ভিতর একটি কন্ঠস্বর শুনতে পেতেন যা তাকে প্রতিটি বিষয় সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে বলতো, এবং তিনি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারতেন না। এরপর তিনি একটি পাত্র থেকে বিষপান করেন এবং খুব শীঘ্রই মারা যান।

প্লেটোর সংলাপ বা ডায়ালগে, যদিও, সক্রেটিস এখনও জীবিত। এই কঠিন মানুষটি, যিনি সারাক্ষনই প্রশ্ন করতেন, এবং মৃত্যুকে শ্রেয়তর মনে করতেন কোন কিছু আসলেই কি সেই বিষয়ে চিন্তা করা থামানোর বদলে, সেই সময় থেকেই সব দার্শনিকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। সক্রেটিসের তাৎক্ষনিক প্রভাব আমরা দেখতে পাই সেই সব ছাত্রদের মধ্যে যারা তার কাছে ছিলেন। শিক্ষকের মৃত্যু হলে প্লেটোই সক্রেটিসের চিন্তা,চেতনা আর প্রাণশক্তিটিকে বহন করে নিয়ে যান বহুদুর। তবে প্লেটোর সবচেয়ে সমীহ জাগানো ছাত্রটি ছিল অ্যারিস্টোটল, যিনি সক্রেটিস এবং প্লেটো দুজন থেকে খুব ভিন্ন ছিলেন।

(সক্রেটিস পর্বটি সমাপ্ত)

(চলবে)

ব্যবহৃত চিত্রকর্ম:

(১) Louis J.Lebrun. Socrates speaks. 1867
(২) Statue of Socrates by Leonidas Drosis, Athens

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “দর্শনের সহজ পাঠ – ১ : সক্রেটিস – যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন ( শেষ পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 7 =