মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে কোনো সংবাদ সম্মেলন করেন নাই।

উনি মুলত একতরফা মিডিয়া ট্রায়াল অনুষ্ঠিত করেছেন। যেখানে উনিই বাদী উনিই বিচারক আর সাংবাদিকেরা ছিল উনার পক্ষে রায় আসার জন্য বাদী পক্ষের উকিল। বিবাদী পক্ষের অনুপস্থিতিতে শুনানি হল, রায় হল। উনার মত রাষ্ট্রীয় ব্যাপক সুবিধা নিয়ে একই অনুষ্ঠানে অন্য পক্ষ যুক্তি উপস্থানের সুযোগ পায়নি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন উনার দায়িত্ব ছিল যথাযথ দেশী ও বিদেশী এক্সপার্ট প্যানেল এর উপস্থিতিতে পক্ষ বিপক্ষের বক্তব্য শোনা। উচিত ছিল পক্ষে বা বিপক্ষে এক্সপার্ট প্যানেলের সিদ্ধান্ত জানা। এই পুরো অনুষ্ঠান গনমাধ্যমে সরাসরি প্রচারে উনি অভিভাবক হয়ে উপস্থিত থেকে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত যুক্তিগুলি নিজে ও দেশবাসীকে সমানভাবে শোনার সুযোগ করে দিতে পারতেন। সিদ্ধান্ত কি নিতেন?


এটা সংবাদ সম্মেলন নয়। বিগত কয়েক বছর ধরে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে ও বিপক্ষে চলে আসা যুক্তি তর্কের এক পক্ষের উপস্থাপন। উনি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে যেসব যুক্তি তর্ক তুলে ধরলেন, উনার পক্ষের লোকেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গনমাধ্যমে আগেই অনেকবার এসব উপস্থাপন করেছেন। অন্য পক্ষ হতে এসব যুক্তি তর্কের যথাযথ জবাব দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। উনার মত রাষ্ট্রীয় ব্যাপক সুবিধা নিয়ে একই অনুষ্ঠানে অন্য পক্ষ যুক্তি উপস্থানের সুযোগ পায়নি। উনি মুলত একতরফা মিডিয়া ট্রায়াল অনুষ্ঠিত করেছেন। যেখানে উনিই বাদী উনিই বিচারক আর সাংবাদিকেরা ছিল উনার পক্ষে রায় আসার জন্য বাদী পক্ষের উকিল। বিবাদী পক্ষের অনুপস্থিতিতে শুনানি হল, রায় হল। বিবাদীরা দোষী সাব্যস্ত হল। যিনি বাদী তিনিই বিচারক হলেন এবং উনার চেলাদের এতদিন বলে আসা খণ্ডিত এবং যুক্তি আড়াল করে তথ্য গোপন করা একপেশে বক্তব্য সমূহের সমর্থনে উনি চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন উনার দায়িত্ব ছিল যথাযথ দেশী ও বিদেশী এক্সপার্ট প্যানেল এর উপস্থিতিতে পক্ষ বিপক্ষের বক্তব্য শোনা। উচিত ছিল পক্ষে বা বিপক্ষে এক্সপার্ট প্যানেলের সিদ্ধান্ত জানা। এই পুরো অনুষ্ঠান গনমাধ্যমে সরাসরি প্রচারে উনি অভিভাবক হয়ে উপস্থিত থেকে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত যুক্তিগুলি নিজে ও দেশবাসীকে সমানভাবে শোনার সুযোগ করে দিতে পারতেন। সিদ্ধান্ত কি নিতেন?

খাদ্য ক্ষুধা মেটায় , জীবাণুতে রোগ হয়, ঔষধে রোগ নিরাময় হয় এগুলো প্রত্যক্ষ প্রাকৃতিক সত্য। আবার বাতাসে অক্সিজেন, পরিমিত কার্বনের ভারসাম্য অপ্রত্যক্ষ প্রাকৃতিক সত্য। এরকম বহু প্রাকৃতিক সত্য ভু-পরিমন্ডলে বিদ্যমান। অধিকাংশ জনমত যদি এই সত্য অস্বীকার করে, তবুও গনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে প্রাকৃতিক সত্যকে মিথ্যায় রুপান্তর করা যায়না। ক্ষমতা শক্তি ও দাম্ভিকতা দিয়ে ভারত রাষ্ট্রের শাসকেরা ফারাক্কা বাঁধ আর আটকে রাখতে পারছেনা। বিজ্ঞান আর প্রকৃতি এখন তাদের দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে ফারাক্কা বাধ ভেঙ্গে দাও। তাহলে সকল সিদ্ধান্ত অধিক জনমতের দ্বারা তথাকথিত গনতান্ত্রিক কিংবা দাম্ভিক ক্ষমতার অভিপ্রায় আর শক্তির জোরে স্বৈরতান্ত্রিক হলেই সঠিক হবে এমন নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহনে মূল বিবেচ্য হতে হবে বিজ্ঞান যা বলে তাই মানা। বিজ্ঞান উনি এবং উনারা মানছেন না। বিজ্ঞান কে উনাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী খণ্ডিত উপস্থাপন করছেন। অধিকন্তু উনি বললেন আমাদের দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে তাই ঋণের দায় সহ ৮৫ ভাগ খরচ আমাদের করতে হবে। কিন্তু উনি বললেন না কেন ৫০ ভাগ লাভ ওরা নেবে? কেন অন্যান্য দেশী কোম্পানির চেয়ে দ্বিগুণ দাম দিয়ে ওখান থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে?

উনাদের মত অঢেল সম্পদ নেই এমন সাধারন অধ্যাপক কে উনার চেলারা বিদেশী ফান্ড পাওয়া দালাল বলে কুৎসা করলেন। রাজাকাররা উঠতে বসতে যাদের রাম বাম নাস্তিক বলে গালি দেয় সেই নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্ষুদ্র সাংগঠনিক আকারের প্রতিবাদকারীদের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের দোসর বলে মিথ্যা অপবাদ দিলেন। খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় লুটপাট মিশ্রিত যে উন্নয়ন হয়, উনারা সেই দায়িত্ব পালন করাকে উনাদের দয়া আর কৃতিত্ব বলে চালান। সেই খেটে খাওয়া মানুষের ন্যায়ভিত্তিক জনমত, বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের চেষ্টাকে উনারা উন্নয়ন বিরোধীতা বলেন। উনার এবং বিএনপি নেত্রীর দ্বিপাক্ষিক ক্ষমতার লোভকে হাতিয়ার করে উনি সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করলেন। রাজনৈতিক বিকাশের অভিপ্রায় নিয়ে প্রকাশ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা নৈতিক অধিকার। উনি নিজেও অতীতে এরকম আন্দোলন করেছেন। এত ক্ষমতাবান হয়েও উনি বেকায়দায় থাকা বিএনপি নেত্রীকে প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিন্দায় বিদ্ধ করলেন। নৈতিকভাবে দুর্বল খালেদা জিয়াকে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের প্রধান মুখ রুপে তুলে ধরে উনি রাজনৈতিক কৌশলে ফায়দা নিলেন। উনি ধমক দিয়ে বর্তমানে চালু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বন্ধ করে কষ্ট দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিতে চান। উনি যা বললেন তার মানে বুঝতে হবে অন্য আরো দশটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে আরো দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও আমাদের হারিকেন জ্বালিয়ে থাকতে হবে, শুধু রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতেই হবে নাহলে অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে আমাদের অন্ধকারে থাকতে হবে। উনাদের আচরণে মনে হয় উনারা দেশের অভিভাবক নয় জমিদার, আমরা দেশের অধিবাসী নই ক্রীতদাস। অতীতে নানান ক্ষেত্রে উনার সৎ সাহসের প্রশংসা করেছি। মিডিয়া ট্রায়ালে উনাকে দেখে অনুভব করলাম সৎ সাহস আর দাম্ভিকতার পার্থক্য আছে।

মনীষী আহমেদ ছফা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যখন জেতে একলা জেতে , আওয়ামী লীগ যখন হারে পুরো বাংলাদেশ হারে। কিন্তু আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ জেতার সাথে পুরো বাংলাদেশ মাত্র ২ বার জিতেছে। একবার ৭০ এর নির্বাচনে, আরেকবার যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে। আর উনার আওয়ামী লীগের সাথে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের পার্থক্য হল, উনার আওয়ামী লীগ জিতলে ১৯৭০ এর আওয়ামী লীগও হারে। উনার আওয়ামী লীগ হারলে হয়তো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত হবে। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের লড়ায় করা আর খুন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকা জীবনের বাংলাদেশ উনার আওয়ামী লিগ হারলেও হারবেনা।

উনি শুধু আজ একটি উপকার করলেন। এই স্বল্প শক্তির যৌক্তিক আন্দোলন উনাকে মিডিয়া ট্রায়াল করাতে বাধ্য করলো। এই প্রহসনের মিডিয়া ট্রায়াল ভিডিও আকারে সংরক্ষিত হয়ে থাকলো । ৪১ বছর পর বিহারের নিতিশ কুমার বলছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দাও। আমরা রইবোনা, কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালের ভিডিও রইবে। আমি অন্তর থেকে বলছি, উনি আজ নিজ দায়িত্বে ও ক্ষমতায় যে সিদ্ধান্ত নিলেন তা মঙ্গলময় হোক, প্রত্যাশা করি এই কাজের দ্বারা সবার ভালো হোক, আমি আনন্দিত হব উনার সফলতায়। আর বিপরীত পরিণতি হলে, ইতিহাস পৃথিবীর পরবর্তী প্রজন্মকে এই শিক্ষা দেবে যে বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া বঞ্চনাময় পৃথিবীতে প্রহসনের রাজত্ব বহাল থাকে,গণতন্ত্র সাম্য ও মুক্তি আসেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 2 =