দর্শনের সহজ পাঠ – ২ : প্লেটো আর ইউডাইমোনিয়া ( প্রথম পর্ব)

দর্শনের সহজ পাঠ – ২ :
প্লেটো আর ইউডাইমোনিয়া ( প্রথম পর্ব)

প্রায় অাড়াই হাজার বছর আগের এথেন্স, জমজমাট এই শহরে বাস করতো প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ। নাগরিকদের জন্য সেখানে ছিল চমৎকার উন্মুক্ত গোছলখানা, নাট্যমঞ্চ, উপাসনালয়, বিশাল আগোরা বা বাজার, ব্যয়াম করার জিমনেশিয়াম; হ্যা, কোনো কিছুরই অভাব ছিলনা। সেখানে শিল্পকলার নানা শাখাও তখন উৎকর্ষতার অভিমূখে, এমনকি বিজ্ঞানও। পিরাইউসের বন্দর ছিল ভূমধ্যসাগরের অন্যতম সমূদ্রবন্দর, আর বছরের অর্ধেকের চেয়েও বেশী সময় আবহাওয়া যেখানে থাকতো ঈর্ষনীয়ভাবে সহনীয়।এই শহরে বাস করতেন পৃথিবীর প্রথম সত্যিকারের – এবং অনেকের মতেই সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক, যাকে আমরা চিনি প্লেটো নামে।

পশ্চিমা দর্শনের উপর প্লেটোর প্রভাবকে খাটো করতে দেখা কারো পক্ষে আসলেই সম্ভব না। এই শহরেরই এক বিখ্যাত এবং বিত্তশালী পরিবারে জন্ম হয়েছিল প্লেটোর। প্লেটো অবশ্য তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একটি মাত্র লক্ষ্য অর্জনে, সেটি হচ্ছে একটি বিশেষ অবস্থা অর্জন করার জন্য মানুষকে সাহায্য করা, সেই অবস্থাটির নাম তিনি দিয়েছিলেন: εὐδαιμονία বা Eudaimonia (ইউডাইমোনিয়া) : এই অদ্ভুত গ্রীক শব্দটি অনুবাদ করা বেশ কঠিন। খুব সাধারণ অর্থে শব্দটি প্রায় happiness বা সূখের কাছাকাছি কোনো কিছুকে বোঝায়, কিন্তু ভাবার্থে আসলে বরং শব্দটির অর্থ ইংরেজী fulfilment এর বেশী নিকটবর্তী, যার বাংলা আমরা করতে পারি, ‘পূর্ণতা বা পরিপূর্ণতা’, এ ধরনের কোনো শব্দ ব্যবহার করে । কারণ সুখ, সুখানুভবতা বা হ্যাপিনেস ইঙ্গিত দেয় একটি নিরন্তর আনন্দ অনুভবের একটি পরিস্থিতি, কিন্তু পূর্ণতায় এমন কিছু পর্ব থাকে, যেখানে তীব্র কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্যে দিয়েও আমাদের অতিক্রম করতে হয় – প্লেটোর মতে একটি সার্থক সুন্দর জীবনে সেই অংশটিও অপরিহার্য । বেশ, তাহলে মানুষকে সেই পূর্ণতা পাবার ক্ষেত্রে সফল হবার জন্য প্লেটো কোন পথগুলো অনুসেরণ করতে প্রস্তাব করেছিলেন? তার কাজে আমরা চারটি মূল ধারণাকে প্রাধাণ্য পেতে দেখি।

আরো অনেক গভীরভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে:

প্লেটোর প্রস্তাব করেছিলেন যে আমাদের জীবনের ভুলগুলোর মূল কারণ, আমরা প্রায় কখনোই আমাদের জীবনের পরিকল্পনাগুলো নিয়ে যথেষ্ট পরিমান সতর্কতা আর যুক্তি ব্যবহার করে ভাবি না। এবং সেকারণেই আমাদের ভাগ্যে জোটে ভুল মূল্যবোধ, ভুল পেশা এবং ভুল সম্পর্ক। প্লেটো চেয়েছিলেন আমাদের মনে শৃঙ্খলা আর সুস্পষ্টতা ফিরিয়ে আনতে। প্লেটো লক্ষ্য করেছিলেন আমাদের বহু ধারণার উৎস আসলে, ‘জনতা’, বা বলা যেতে পারে ‘অন্যরা’; গ্রিকরা যা চিহ্নিত করেছিল ‘doxa’ শব্দ দিয়ে, এবং ইংরেজীতে এর অর্থ common-sense, তবে ভাবগত ভাবে এর মানে হচ্ছে ‘সাধারণত অন্যরা যা ভাবে’ সেটাই। এবং তারপরও তার লেখা ৩৬ টি বইয়ে প্লেটো বহুবারই দেখিয়েছিলেন এই তথাকথিত সাধারণ ধারণা বা common-sense ভ্রান্তি, পূর্বসংস্কার আর কুসংস্কারে পূর্ণ। ভালোবাসা,খ্যাতি, অর্থ কিংবা সদগুণবলী সংক্রান্ত লোকপ্রিয় ধারণাগুলো আসলেই যুক্তির চ্যালেঞ্জের মুখে দাড়াতে পারেনা। প্লেটো আরো লক্ষ্য করেছিলেন – সহজাত প্রবৃত্তি অথবা ভাবাবেগে ( কোন সিদ্ধান্তে ঝাপিয়ে পড়া শুধুমাত্র ‘তারা যা অনুভব করেছিল’ তার ভিত্তিতে) পরিচালিত হওয়া নিয়ে মানুষরা কত বেশী নিজেদের গর্বিত ভাবে, এবং তিনি সেটি তুলনা করেছিলেন চোখ বাঁধা বুনো একদল ঘোড়াদের দ্বারা ভয়ঙ্করভাবে অনির্দিষ্ট কোনো দিকে টেনে হেচড়ে নিয়ে যাওয়ার সাথে। ফ্রয়েড খুব আনন্দের সাথে স্বীকার করে নিয়েছিলেন – ‘প্লেটোই হচ্ছেন মনোবিশ্লেষণের জনক, যিনি আমাদের বারবার বলেছেন, আমাদের সব চিন্তা আর অনুভূতিকে যুক্তির নীরিক্ষায় সমর্পন করার জন্য’। যেমন প্লেটো বারবার লিখেছিলেন, দর্শনের মূলসারটি মূলত সেই নির্দেশটি : γνῶθι σεαυτόν বা ‘Know yourself বা নিজেকে জানুন।

আরো বিচক্ষণতার সাথে ভালোবাসতে হবে:

মানব সম্পর্কের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে প্লেটো অন্যতম সেরা দার্শনিক। তার The Symposium বইটিতে তিনি চেষ্টা করেছিলেন ভালোবাসা আসলে কি সেটি বোঝাতে। বিষয়টি বোঝাতে তিনি একটি গল্পের আশ্রয় নিয়েছিলেন, যেখানে আমরা সুদর্শন কবি আগাথন এর আয়োজিত একটি নৈশভোজের দৃশ্য দেখি, এই নৈশভোজনে আগাথন তার কিছু বন্ধুকে নিমন্ত্রন করেছিলেন, খাওয়া, পান করা এবং ভালোবাসা সম্বন্ধে আলোচনা করার জন্য। ভালোবাসা কি সে বিষয়ে অতিথির দৃষ্টিভঙ্গী ছিল পরস্পর থেকে ভিন্ন। প্লেটো সেখানে তার পুরোনো বন্ধু ও শিক্ষক সক্রেটিসের বক্তব্যে (যিনি প্লেটোর সব বইয়েরই প্রধান চরিত্র ছিলেন) সবচেয়ে উপযোগি আর কৌতুহলোদ্দীপক তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছিলেন।

তত্ত্বটি মোটামুটি এরকম: যখন আপনি কাউকে ভালোবাসবেন, তখন আসলেই যা ঘটে সেটি হচ্ছে ,আপনি সেই মানুষটির মধ্যে ভালো কিছু গুণ লক্ষ্য করেছেন, যা আপনার নেই। হতে পারে তারা শান্ত, যখন আপনার মেজাজ সহজেই ক্ষিপ্ত হতে পারে, অথবা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ হয়তো বেশী, যখন আপনার নিজের জীবনে কোনো শৃঙ্খলা নেই, অথবা তারা খুব সহজেই মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে, আপনি হয়তো ভাবনার জড়তায় আক্রান্ত। ভালোবাসার অন্তর্নিহিত কল্পনাটি হচ্ছে, সেই মানুষটির কাছে যাবার মাধ্যমে আপনিও কিছুটা তার মতই হয়ে উঠবেন। তারা আপনার পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাস্তব করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। প্লেটোর দৃষ্টিতে, ভালোবাসা মূলত এক ধরণের শিক্ষা: আপনি আসলেই কাউকে ভালোবাসতে পারবেন না যদি আপনি তাদের দ্বারা নিজের কোনো উন্নতি সাধণ করতে না চান। ভালোবাসা হওয়া উচিৎ দুটি মানুষের একসাথে বেড়ে ওঠা, আর এই বেড়ে ওঠার পক্রিয়ায় পরস্পর করার প্রচেষ্টা।

তার মানে আপনার এমন কোন মানুষ খুজে বের করা উচিৎ যে কিনা আপনার বিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অনুপস্থিত অংশটি ধারণ করে: আপনার যে গুণটি নেই সেটি তারা ধারণ করে। আধুনিক সময়ের প্র্রেক্ষাপটে এই কথাগুলো শুনতে অদ্ভুত মনে হবে, যখন আমরা ভালোবাসাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি এমন কাউকে খুজে বের করা, যে কিনা ঠিক বর্তমানে যে অবস্থায় আছে সেটাই নিখুঁত। তর্কের সময় যেমন আমরা প্রায়শই প্রেমিক যুগলকে বলতে শুনি, যদি তুমি আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে আমাকে বদলাবার চেষ্টা করতে না। প্লেটো ঠিক এর একেবারে বীপরিতটাই ভাবতেন। তিনি আমাদের অনেক কম মাত্রায় লড়াকু মনোভাব এবং অহংকার নিয়ে সম্পর্কে জড়াতে পরামর্শ দেন। আমাদের উচিৎ হবে মেনে নেয়া যে আমরা আসলে সম্পূর্ণ না, এবং আমাদের ভালোবাসার মানুষদের সুযোগ দিতে হবে আমাদের কিছু শেখানোর জন্য। একটি ভালো সম্পর্কের অর্থ হতে হবে, আমরা সেই অন্য মানুষটিকে তারা ঠিক যেরকম, সেভাবেই ভালোবাসবো না। এর অর্থ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া আমরা তাদের তাদেরই সেরা সংস্করণে রুপান্তরিত হবার জন্য চেষ্টা করবো। এছাড়া ঝোড়ো আর বিপদসঙ্কুল যাত্রাপথ যা এর অনিবার্য অংশ সেটিও সহ্য করার প্রতিজ্ঞা নিতে হবে – একই আমাদের নিজেদের উন্নয়নের পথে তাদের কোন প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

?oh=aa5b7a645349c5d3ece9b849b1dd2268&oe=583F09AB” width=”400″ />

সৌন্দর্যের গুরুত্ব

কমবেশী মোটামুটি আমরা সবাই সুন্দর যে কোনো কিছু্ই করি। কিন্তু আমাদের এমন ভাবে ভাবার প্রবণতা আছে যে – আমাদের ‍উপর প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে সৌন্দর্য খানিকটা রহস্যময় তার ক্ষমতায়, এবং যদি সবকিছুর সাথে তুলনামূলক বিচার করি, তাহলে সৌন্দর্য জীবনধারণের জন্য খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। কিন্তু প্লেটো প্রস্তাব করেছিলেন, আপনার চারপাশে কি ধরণের ঘরবাড়ী, বা মন্দির, কিংবা পাত্র অথবা ভাস্কর্য আছে সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

আর প্লেটোর আগে কেউই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করেননি: কেন আমরা সুন্দর জিনিস পছন্দ করি?

তিনি এই প্রশ্নটির একটি মনোমুগ্ধকর কারণও খুজে বের করেছিলেন বলে দাবী করেন : আমরা তাদের চিহ্নিত করি ভালো বা শুভ কোনো কিছুর অংশ হিসাবে। আমরা অনেক ভালো কিছু হবার ইচ্ছা পোষন করি: দয়ালু, নম্র,ভদ্র, ভারসাম্যময়, বৈরিতামূক্ত, শান্তিপূর্ণ, শক্তিশালী, মর্যাদাপূর্ণ, আর এগুলো হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান গুন। তবে এই গুণগুলো কোনো দ্রব্যেরও হতে পারে। আমরা আবেগাক্রান্ত এবং উদ্বেলিত হই যখন এই সব গুণাবলী কোনো জিনিসের মধ্যে খুজে যাই যা আমাদের জীবনে অনুপস্থিত। একারণেই প্রতিটি সুন্দর জিনিসেরিই সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে আমাদের জীবনে। তারা আমাদের আমন্ত্রন জানায় তাদের অভিমূখে বিবর্তিত হবার জন্য, তাদের মত রুপান্তরিত হয়ে ওঠার জন্য। সৌন্দর্য আমাদের অন্তর্গত সত্তাকে শিক্ষিত করে। এই বিষয়টি আরো একটি দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে, কুৎসিৎ বা কদর্যতাও গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যপার। কারণ এটি আমাদের সামনে ক্ষতিকর আর নষ্ট হয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্যগুলো প্রদর্শন করে। এটি আমাদের তাদের মত হবার জন্য প্ররোচিত করে: কঠোর, বিশৃঙ্খল, শিষ্টাচারহীন। এটি দয়ালু, নম্র্র আর শান্তিপ্রিয় হবার পথ যথেষ্ঠ অমসৃণ করে।

প্লেটো শিল্পকলাকে দেখেছিলেন থেরাপিউটিক বা নিরাময় করতে সক্ষম এমন কোনো উপায় হিসাবে: কবি ও শিল্পীদের ( বলতে পারি – বর্তমানে ঔপন্যাসিক,টেলিভিশন প্রযোজক, ডিজাইনাররা) কর্তব্য হচ্ছে আমাদের সাহায্য করা সুন্দর জীবন কাটানোর জন্য।

কিন্তু শিল্পকলায় সেন্সরশীপ বা বিধিনিষেধ আরোপে বিশ্বাস করতেন প্লেটো। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু অপেক্ষা করুন, তিনি আসলে কি বলতে চেয়েছিলেন? বেশ, তার মতে, যদি শিল্পীরা আমাদের সুন্দরভাবে বাঁচতে সাহায্য করতে পারে, দূর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা কিন্তু একইভাবে, সহায়ক নয় এমন দৃষ্টিভঙ্গী আর ক্ষতিকর ধারণাগুলোকেও মর্যাদাপূর্ণ করে উপস্থাপনও করতে পারে। শুধুমাত্র শিল্পী হওয়াটাই নিশ্চিৎ করেনা যে তারা শিল্পকলার ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিজ্ঞতা পরিচয় দেবে। সে কারণে প্লেটো বিশ্বাস করতেন, শিল্পীদের কাজ করা উচিৎ দার্শনিকদের নির্দেশাধীন হয়ে, যাদের তাদের সঠিক ধারণা দিয়ে বলবেন, তারা যেন সেই ধারণাগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য এবং জনপ্রিয় করে তোলে। শিল্পকলা সেই অর্থে হবে ভালো কিছুর জন্য একধরণের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা – অথবা বিজ্ঞাপন।

(চলবে)

দর্শনের সহজ পাঠ – ২ : প্লেটো আর ইউডাইমোনিয়া ( শেষ পর্ব)

ব্যবহৃত ছবি:

(১) Plato and Athena, Academia of Athens by Leonidas Drosis
(২) “The School of Athens” (detail showing Aristotle with the elder Plato) by Raffaello Sanzio da Urbino (painted between 1509 and 1511)
(৩) Anselm Feuerbach – The Symposium (After Plato) (Second Version) [1871-74]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7