আত্মকথা

অন্যান্য অনেকের মত আমারও জন্ম হয়েছিল ধর্মান্ধ মুসলিম পরিবারেই। সেই ছোট বেলা থেকেই ইহুদী খৃষ্টানদের প্রতি বিদ্বেষ, মূর্তি পূজারীদের নির্বুদ্ধিতা, মূর্তি গুলোর অক্ষমতা আর মুহাম্মদ ও তার সাহাবীদের গুণগান শুনে শুনেই বড় হয়েছিলাম। সম্ভবত সে কারণে শিশুকালে সরল মস্তিষ্কে গভীর ভাবেই ঢুকে গিয়েছিল ধর্ম। এ দেশে যদি আরজ আলী মাতুব্বর, হুমায়ূন আজাদ, ডঃ আহমদ শরীফ না জন্মিতেন তা হলে আমিও কোন দিন জানতে পারতাম না মুসলমানের নামাজ রোজা, প্রার্থনা উপাসনা হিন্দুর মুর্তি পুজার মতোই অসার, নিরর্থক। আমার মনেও হয়ত কোন দিন কোন প্রশ্নের উদয় হতনা। কোটি কোটি ধার্মিকের মত তাদের ধর্মগ্রন্থ গুলো না পড়েই শুধু বিশ্বাস করেই জীবন কাটিয়ে দিতাম, কোন দিন জানতে পারতাম না মুহম্মদ ও তার সাহাবীদের সম্পর্কে যা প্রচার করা হয় তার অধিকাংশই সত্যি নয়। বাজারে ধর্মের ঢাক ঢোল পেটানো বইয়ের অভাব নেই, কিন্তু ধর্মের মূল গ্রন্থ গুলো পড়লেই আসল সত্য জানা যায়। বনু কুরাইজা গোত্রের কয়েক শত মানুষকে নির্মম ভাবে হত্যা, অজস্র ছোট ছোট গোত্রের মানুষদের নিরপরাধে হত্যা সহ তাদের ধণ সম্পদ লুন্ঠন, স্ত্রী সন্তানদের দাস দাসী বানাবার কাহিনী যেমন মর্মাহত করে তেমনি লজ্জায় মুষড়ে যেতে হয় পালিত পুত্রবধুকে বিয়ে করার ইতিহাস জেনে। কোন ভাবেই ঐশ্বরিক বা আল্লার ইচ্ছা হতে পারেনা নয় বছরের শিশুকে বিয়ে করা, কিংবা একই দিনে কোন নারীর স্বামী, পিতা, মাতা, আত্মীয় স্বজন সবায়কে হত্যা করে সেই দিনই বিয়ে করে বাসরের আয়োজন করা। -এসব যদি বর্বরতা, অসভ্যতা, নির্মমতা না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে পৃথিবিতে কখনো কোথাও ন্যায়, অন্যায় ভালো, মন্দ বলতে কিছু ছিলনা বা নেই, শুধু যান্ত্রিক ভাবে নির্মম পাষন্ড এক বন্দনা প্রিয় ঈশ্বর/আল্লার যপ তপ উপাসনা, প্রার্থনা করাই মানুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
আমার মত অনেকের মনেই নানান প্রশ্নের উদয় হয় –যে ঈশ্বর বা আল্লা নিজের সৃষ্টিকে এমন দাস দাসীর মত হুকুমের গোলাম করে রাখেন, তার আদেশ নিষেধের এতোটুকু ব্যতিক্রম হলে নরক/জাহান্নামের এমন নির্মম ভয়াবহ শাস্তির পরিকল্পনা করে রাখেন তাকে কি দয়াময়, পরম করুণাময় স্রষ্টা বলা যায়!! মানুষের মত তুচ্ছ প্রাণীই কি তার নিজের সৃষ্ট সন্তানের জন্য তা সে যতই অন্যায়ই করুক এমন নিষ্ঠুর, ভয়াবহ শাস্তির কথা কল্পনা করতে পারে!!
অনেকেরই মনে এমন শত শত প্রশ্নের জন্ম ও মৃত্যু হয় কিন্তু তা সবই চেপে যেতে হয় কখনো পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের বা ধর্মের অলৌকিক ভয়ে। নিরন্তর নিরুদ্বিগ্ন মনে ও মেনে নিয়েই জীবন পার করতে হয়।
আমিও এক সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম, সুরা কলেমা যে টুকু শিখেছি তা আরবিতেই শিখেছি, ধর্মের দাওয়াত দিয়ে বেড়িয়েছি, মাঝে মাঝে মসজিদে ওয়াক্তি জামাতে ইমামতিও করেছি। দেশ ছেড়েছি প্রায় কুড়ি বছর হল। সে সময় আমাদের গ্রামে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন তারা নিশ্চয় কোন না কোন এক সময় আমার পিছনে নামাজ পড়েছেন।
যখন আরজ আলী মাতুব্বরের “সত্যের সন্ধান” বইটা হাতে পেলাম তখনও আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম, তারও কিছু দিন আগে নতুন চিন্তার খোরাক যুগিয়েছিল মুহাম্মদ আব্দুল হাই রচিত “ওমর খৈয়াম” নামক একটা প্রবন্ধ।
যাইহোক সেদিন আমার ভিতরে একটা ওলট পালট হয়ে গেল, মুহাম্মদের নবুয়্যাত প্রাপ্তির মতই একটা আলোড়ন বোধ করে ছিলাম নিজের ভিতরে। আজন্ম লালিত সংস্কার, অজস্র ধর্মীয় বই পড়া, মৌলানা, মৌলভিদের ওয়াজ নসিহত সমস্তই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে গেল আমার মন থেকে। আমি হয়ে উঠলাম এক নতুন মানুষ, যেন একটা পর্দার ঘোর সরে গিয়ে পৃথিবীর এক নতুন কঠিন সত্য রুপ ধরা পড়ল আমার চোখে।
তবুও সম্পূর্ণ খোলস ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে আরও অনেকদিন সময় লেগেছে। নতুন পথ, তথ্য, সত্য নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগেছি, আরজ আলী মাতুব্বর, হুমায়ুন আজাদ, ডঃ আহমদ শরীফ সহ আরও কিছু মুক্ত চেতনার মানুষ সব সময় পথের সন্ধান দিয়েছেন।
এখন নিজের মত, পথ বিশ্বাসে অটল, হাজারো বিরুদ্ধতা সত্বেও আমার বিশ্বাসের একটা বিশ্বব্যাপি সত্যরুপ ধরা পড়েছে। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানীগণ বাঁধা পথের যাত্রী নয়, তাদের কারই ধর্মের বই নিয়ে অপচয় করার মত সময় নেই, অবিশ্বাসী মন নিয়ে তারা সর্বদা সত্য খুঁজে ফেরেন। আর সাঈদি, জাকির নায়েকের মত ধর্ম ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাঁচাতে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের মিল খুঁজতে হয়। আদিম নির্বোধ মানুষ সরল ভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন যে রাতের বেলা সূর্য্য আল্লার আরশের নীচে বসে জিকির করে আর ভোরবেলা পুনরায় উদয়ের জন্য আল্লার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে। এখানে শব্দ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নানান রকম যুগোপযোগী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করান ভণ্ডরা।
(ব্যক্তিগত কিছু কথা লিখব বলেই আজ বসেছিলাম কিন্তু কলমের টানে চলে গেছি আর একদিকে। আমার বিশ্বাস অবিশ্বাস সবই ব্যক্তিগত, আমি বিশ্বাস করি মানুষের স্বাধীনতায়, ধর্ম করা কিংবা ধর্ম অবিশ্বাস করার অধিকার একান্তয় ব্যক্তিগত, তেমনি মানুষের বলবার অধিকারও জন্মগত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3