দর্শনের সহজ পাঠ – ২ : প্লেটো আর ইউডাইমোনিয়া ( শেষ পর্ব)

?oh=4c294909550ca4b0bc832beff0f36ede&oe=585AAF17″ width=”400″ />

দর্শনের সহজ পাঠ – ২ :
প্লেটো আর ইউডাইমোনিয়া ( শেষ পর্ব)

সমাজ পরিবর্তন:

একটি সরকার বা সমাজের আদর্শ রুপ কি হতে পারে সে বিষয়টি নিয়ে প্লেটো অনেক ভেবেছিলেন। তিনিই পৃথিবীর প্রথম ‘ইউটোপিয়া’ ভাবনার চিন্তাবিদ। এই ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এথেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দী আরেকটি গ্রীক রাষ্ট্র স্পার্টাকে দেখে। স্পার্টা ছিল শহরাকৃতির একটি যন্ত্র, যার উৎপাদিত পণ্য ছিল সাহসী সৈনিক ।স্পার্টাবাসীরা যা কিছু করতো – যেভাবে তারা তাদের সন্তানদের প্রতিপালন করতো, যেভাবে তাদের অর্থনীতি সংগঠিত ছিল, যাদের তারা শ্রদ্ধা করতো, যেভাবে তারা যৌন সঙ্গম করতো, তারা যা কিছু খাদ্য হিসাবে গ্রহন করতো – সবকিছুই পরিকল্পিত ছিল শুধুমাত্র এই একটি উদ্দেশ্য পূরণে। এবং সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে স্পার্টা বিস্ময়করভাবে সফল ছিল। কিন্তু প্লেটো সেটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না, তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কিভাবে একটি সমাজ উন্নত হতে পারে, তবে সামরিক শক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে না বরং এর নাগরিকদের জন্য ইউডাইমোনিয়া বা পরিপূর্ণতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ? কিভাবে একটি রাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য উপায়ে এর নাগরিককে সাহায্য করতে পারে পরিপূর্ণ একটি জীবন অর্জনের জন্য।

তার বিখ্যাত দ্য রিপাবলিক বইটিতে প্লেটো কিছু বিষয় শনাক্ত করেছিলেন, তার মতে এমন কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই বিষয়গুলো পরিবর্তন করা উচিৎ ।

নতুন অনুকরণযোগ্য বীরের প্রয়োজন

এথেন্সের সমাজের মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদ অর্জন করে বিত্তশালী হবার প্রচেষ্টা করা, যেমন কুখ্যাত বিত্তবান অভিজাত আলসিবিয়াডেস, কিংবা ক্রিয়া ক্ষেত্রের সুপরিচিত খেলোয়াড, যেমন মাইলে অব ক্রোটোন। প্লেটো অবশ্যই এসব পছন্দ করতেন না। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন আমরা কাকে শ্রদ্ধা করবো বিস্ময় বিমুগ্ধতার সাথে সেটি নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। কারণ বিখ্যাত এই সব ‘সেলিব্রিটিরা’ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, ধারণা এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। খারাপ অনুকরণীয় চরিত্র বা হিরোরা চরিত্রের দূর্বলতাকে মোহনীয় কোনো বৈশিষ্ট্য হিসাবে উপস্থাপন করে। সেকারণে প্লেটো চেয়েছিলেন এথেন্সকে নতুন ধরনের সেলিব্রিটি দেবার জন্য, যারা বিদ্যমান তথাকথিত সেলিব্রিটিদের প্রতিস্থাপিত করবে আদর্শগতভাবে বিজ্ঞ এবং ভালো মানুষদের দ্বারা, যাদের তিনি নাম দিয়েছিলেন গার্ডিয়ান বা অভিভাবক: যারা চরিত্রগতভাবে কিভাবে সুবিকশিত হতে হয়, সেই বিষয়ে সবার জন্য অনুকরণীয় মডেল হবেন। জনগণের প্রতি তাদের সেবার দ্বারা এই মানুষগুলোকে, তাদের নম্রতা, সুআচরণ, সব ধরণের খ্যাতির প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা এবং তাদের বিস্তৃত এবং গভীর অভিজ্ঞতার নীরিখে বিশেষভাবে শনাক্ত করা হবেন। সমাজে তারাই হবে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় আর সন্মানিত ব্যক্তি।

বিধি নিষেধের প্রয়োজন আছে

বর্তমানে সেন্সরশীপের কথা শুনলে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। কিন্তু প্লেটো চিন্তিত ছিলেন ভুল ধরণের স্বাধীনতা নিয়ে। এথেন্স ছিল এমনকি সবচেয়ে খারাপতম ধারণা প্রচারণার ক্ষেত্রেও সবার জন্য উন্মুক্ত একটি জায়গা। উন্মত্ত ধর্মীয় বিশ্বাস, শুনতে ভালো লাগে অথচ ভয়ঙ্কর সব ধারণা শুষে নিয়েছিল জনগনের উৎসাহ। যার পরিনতিতে এথেন্সবাসীদের সহ্য করতে হয়েছে সর্বনাশা সরকার ব্যবস্থা এবং কুপ্ররোচনায় বিপথগামী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে (যেমন স্পার্টার উপর সর্বনাশী আক্রমন)। প্লেটো বিশ্বাস করতেন – নিরন্তরভাবে সংশয়াচ্ছন্ন কন্ঠস্বরের উচ্চ আওয়াজের বিশৃঙ্খলা আসলেই এথেন্সবাসীদের জন্য মঙ্গলজনক নয়, সুতরাং তিনি এই সব রাজনৈতিক বক্তাদের এবং বিপদজ্জনক ধর্মপ্রচারকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত করার পক্ষপাতি ছিলেন। আজকের যুগের গণমাধ্যমের শক্তি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই প্লেটো খুব বেশী সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়তেন।

সুশিক্ষার ব্যবস্থা করা

প্লেটো শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার ব্যপারে তীব্র উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য ছিল পাঠ্যসূচীর উপর বিশেষভাবে নজর দেয়া। শুধুমাত্র গণিত বা বানান শিক্ষা না, আমাদের কিভাবে আরো ভালো মানুষ হওয়া যায় সেটা শেখানো প্রয়োজন। আমাদের সাহস, আত্মনিয়ন্ত্রন, যৌক্তিকতা,স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা ও সুস্থির মেজাজ কিভাবে অর্জন করা যায় সেটাও শেখা প্রয়োজন। তার এই ধারণাটিকে বাস্তবে রুপ দেবার জন্য প্লেটো একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এথেন্স, দি একাডেমী, প্রায় ৪০০ বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি টিকে ছিল। কিভাবে বাঁচতে হয় আর ভালোভাবে মরতে হয় সেটা শেখা ছাড়া আরো বহু কিছু শেখার জন্য সেখানে জড়ো হতো শিক্ষার্থীরা। বিস্ময়কর এবং খানিকটা দুঃখজনক যে কিভাবে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই উচ্চাকাঙ্খাগুলো নিষিদ্ধ হিসাবে ঘোষণা করেছে এখন। এখন যদি কোওন ছাত্র অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হাজির হয় কিভাবে বাঁচতে হবে সেটা শেখার আকাঙ্খা নিয়ে, অধ্যাপকরা পুলিশ ডাকবেন অথবা তার জায়গা হয়ে মানসিক রোগীদের আশ্রমে।

সুন্দর শৈশব

যদিও অনেক পরিবার চেষ্টা করে এবং কখনো কখনো শিশুরা ভাগ্যবানও হয় ভালো পরিবার পাবার ক্ষেত্রে। তাদের পিতামাতা হয়তো সুস্থির ভারসাম্যময় ভালো শিক্ষক, যারা সত্যিকারভাবে বিজ্ঞ এবং নির্ভরযোগ্যভাবেই প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পিতামাতা তাদের সব সংশয় আর ব্যর্থতা সংক্রমিত করেন তাদের সন্তানদের মধ্যে। প্লেটো মনে করতেন শিশুদের সঠিকভাবে প্রতিপালন সবচেয়ে কঠিন (এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) দক্ষতা। প্লেটো তীব্রভাবে সমব্যথী ছিলেন সেই সব শিশুদের প্রতি যাদের পারিবারিক পরিবেশ তাদের পূর্ণবিকাশের প্রতি বৈরী। সুতরাং তিনি প্রস্তাব করেছিলেন বহু শিশুর জন্য বাস্তবিকভাবে অনেক উত্তম হবে যদি তারা তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী তাদের পিতামাতা থেকে গ্রহন না করে বরং কোনো বিজ্ঞ অভিভাবকের কাছ থেকে গ্রহন করে, যে অভিভাবকদের রাষ্ট্র আর্থিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করবে।তিনি প্রস্তাব করেছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রতিপালন করবে এমন অভিভাবকরা যারা তাদের নিজেদের পিতামাতা থেকে অনেক বেশী যোগ্য।

?oh=52a2bd29a35e35297bbd8a47e3392fde&oe=585AE256″ width=”400″ />
****

প্লেটো আর সক্রেটিস, দুজনকে নিয়েই প্রায়শই সংশয়াচ্ছন্ন হতে দেখা যায়। সক্রেটিস ছিলেন প্লেটের বন্ধু শিক্ষক, যার কাছ থেকে প্লেটো অনেক কিছুই শিখেছিলেন। সক্রেটিস কোন কিছু লিখে যাননি, তবে প্লেটো প্রচুর বই লিখে গেছেন, যাদের প্রায় প্রত্যেকটিতে অন্যতম প্রধাণ একটি চরিত্র সক্রেটিস।প্লেটোর ধারণাগুলো এখনও গভীরভাবে উদ্দীপক এবং আকর্ষণীয়। ধারাণাগুলোকে একীভূত করে তাদের আদর্শবাদীতা আর উচ্চাকাঙ্খা। তিনি চেয়েছিলেন দর্শন আমাদের সাহায্য করবে পৃথিবীকে পরিবর্তন করার জন্য। তার এই উদহারণের দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া আমাদেরও উচিৎ হবে।

(প্লেটো পর্ব সমাপ্ত)
(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি:

(১) The Birthday of Plato Celebrated in the Villa di Careggi by Lorenzo the Magnificent by Luigi Mussini (painted: 1867)
(২) Portrait of Plato. Luni marble. Roman copy after a Greek original created by Silanion
(৩)French School/ Portrait of Plato (429-347 BC) c.1475

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 4