হায়রে সিনেমা!

রনি রেজা : সিনেমাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। মধ্যযুগীয় একঘুয়েমি জীবনের পর ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়ে বিনোদনের যে মাধ্যমগুলো স্থান করে নেয়; তার মধ্যে সিনেমা বেশি আলোচিত। সিনেমা শুধু বিনোদনই দেয় না; অনেক কিছু শেখায়ও। তবে তা যদি হয় কু-শিক্ষা তাহলে বুঝতে হবে অধঃপতনের মাত্রা কত নিচে নেমে গেছে। সিনেমা মাঝেমধ্যে বিতর্কেরও জন্ম দেয়। কখনো নগ্নতা-যৌনতার কারণে, কখনও রাজনৈতিক কারণে। কখনো মানবিক মূল্যবোধের কারণে কিংবা ধর্মানুভূতির কারণে। আবার কখনো অতি হিং¯্র দৃশ্যের কারণে আলোচিত সিনেমাগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
এরপরেও সর্বস্তরের মানুষের কাছে শক্ত অবস্থান এই সিনেমার। কোমলমতি শিশুদের মনোবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এ বিনোদন মাধ্যমটি।

আমাদের সময়ে ছোটবেলায় মান্না বা ইলিয়াস কাঞ্চন হবার স্বপ্ন দেখেনি এমন সহযোগী সহপাঠী মেলা ভার। মনে পড়ে, এক সময়ের সাড়া জাগানো চিত্রনায়িকা শাবানা অভিনীত ‘ভাত দে’ ছবি দেখে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিলাম। কষ্টে সেদিন রাতে ঘুমুতে পারিনি। আবার মান্নার কোনো এক ছবি দেখে বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম সত্যিকারের পিস্তল কিনে দিতে। ঘরে থাকা খেলনা পিস্তলেও আমার চলবে না! হতে হবে সত্যিকারের পিস্তল! মানুষ মারা যায় এমন! আমার অনড় অবস্থান ও বাবার ভালোবাসার ফসল হিসেবে সেদিন আরো একটি নতুন খেলনা পিস্তল আমার হস্তগত হয়েছিল। হয় তো পিস্তল পেয়েই ভুলে গেছি সিনেমার দৃশ্য। ততক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি নতুন কোনো চিন্তায়।

বিনোদন মাধ্যম যে শুধু শিশুদের প্রভাবিত করে সেটা নয়। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ সিরিয়াল দেখে আন্দলনে নেমেছিল প্রাপ্তবয়স্করাও।
আমি মোটেও সিনেমা বিশেষজ্ঞ নই। আজকের এত প্যাঁচালের নির্দিষ্ট কারণ আছে।

কিছুক্ষণ আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে চোখ আটকে যায়। যা ভাবিয়ে তুলবে এটাই স্বাভাবিক। আর ভাবনার দায় এড়াতে এই কলম ধরা।
খবরে বিষয় ছিল, কলকাতার জিৎ অভিনীত ‘বস’ সিনেমায় প্রভাবিত হয়ে অপরাধ জগতে পা বাড়ায় ৬ ছাত্র। ‘বস’ ছবির আদলে গড়ে তুলে ‘সুরিয়া এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট’ নামক দল। ‘বস’ সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, মাফিয়া ডন হবার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেয় ছেলে। সেই মতো শহরের কুখ্যাত সব দুষ্কৃতীকারীদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তৈরি করে গ্যাং। ক্রমে ‘সুরিয়া’ হয়ে ওঠে মুম্বাইয়ের কুখ্যাত ‘গ্যাংস্টার’। ছবিটিতে ‘সুরিয়া’র চরিত্রে অভিনয় করেন জিৎ।

আনন্দবাজার জানায়, সিনেমা দেখে সদ্য মাধ্যমিক পাশ করা ছয় কিশোর গঠন করে গ্যাং; সিনেমার আদলেই নাম রাখে ‘সুরিয়া এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট’। নিজেদের আসল নাম বললে যদি ধরা পড়ে যায়? তাই ঠিক হয় সাংকেতিক নাম। লিডারের নাম হল সূর্য। বাকিরা ব্ল্যাক, ড্যানি, কেকে, হিরা, দ্বীপ।

ফিল্মে মুম্বাইয়ের বড় বড় ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করত সুরিয়া। এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটল না। এলাকার পয়সাওয়ালা লোকেদের বেছে নিল ৬ কিশোর। তারপর ফোন করে, কখনও বা এসএমএস করে টাকা আদায়ের চেষ্টা। কারও কাছে ৫ লাখ তো কারও কাছে ৮ লাখ টাকার দাবি। ফিল্মি কায়দায় দিব্যি চলছিল গ্যাং। অবশেষে গত শনিবার পুলিশের হাতে ধরা পরে ওই দলের ছয় সদস্য।
যে ছাত্রদের স্বপ্ন হতে পারতো অনেক বড় কিছু। যাদের ভরসায় রাষ্ট্র এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতো। আজ একটি সিনেমার কাহিনীতে প্রভাবিত হয়ে বাঁক নিয়েছে অপরাধের দিকে।

বলাবাহুল্য সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ভারত সব সময়ই এগিয়ে। তামিলরা মালয়েশিয়াতে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সন্ত্রাসীপনা ঘটায়। সেই তামিল সন্ত্রাসীদের ভালোভাবে উপস্থাপন করে ভারত সম্প্রতি ‘কাবালি’ নামক একটি সিনেমা বানিয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে- ঐ সিনেমাটি ভারতে এবং বিশে^র নানা প্রান্তে বসবাস করা ভারতবাসীর কাছে এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এমনকি ভারতের অনেক স্থানে সিনেমাটি দেখতে ছুটি পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডাকাত গোষ্ঠী হিসেবে নামডাক আছে মারাঠেদের। ওই মারাঠে নেতা শিবাজী ভারতীয়দের বড় হিরো। এই ডাকাত শিবাজীর মূর্তি দিয়ে ভারতের মহারাষ্ট্র ভরে ফেলা হয়েছে। মারাঠে ডাকাতের নীতিমালায় গঠিত হয়েছে ‘শিবসেনা’ নামক রাজনৈতিক সংগঠন। এই ডাকাত সর্দারের প্রশংসা করে বানানো হয়েছে অসংখ্য নাটক-সিনেমা।
এ ধরনের চর্চার অবশ্যই একটি ঋণাত্বক প্রভাব আছে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের প্রচার-প্রসার ঘটে। মানুষ সন্ত্রাস সৃষ্টিতে উৎসাহ পায়। যার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ওই ছয় কিশোরের মধ্যে।

লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + = 10