রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (শেষ পর্ব)

?oh=f275dbbf787bab634d8bb98b5d875653&oe=584D280C” width=”400″ />

রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (শেষ পর্ব)
বাস্তবতা কি? জাদু কি? –

বিবর্তনের মন্হর জাদু।

একটি জটিল কোনো জীবকে এক ধাপে আরেকটি জটিল কোনো জীবে রুপান্তর করার বিষয়টি – যেমন রুপকথায় ঘটে – আসলেই বাস্তবতা নির্ভর সকল সম্ভাবনার নাগালের বাইরে। এবং তারপরও জটিল প্রাণীদের অস্তিত্ব আছে। কিভাবে তাদের উদ্ভব হয়েছিল? কিভাবে, বাস্তবেই, জটিল জিনিস, যেমন ব্যঙ, সিংহ, বেবুন আর বটগাছ, রাজকুমার আর কুমড়ো, আপনি এবং আমি অস্তিত্বশীল হয়েছি?

ইতিহাসের বেশীরভাগ সময় ধরে এটি ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়ার মত একটি প্রশ্ন ছিল, সঠিকভাবে যার উত্তর কেউই দিতে পারেননি। মানুষ সেকারণে নানা ধরনের গল্প উদ্ভাবন করেছে সেটি ব্যাখা করার চেষ্টায়। কিন্তু তারপর এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন- এবং দারুণ বুদ্ধিমত্তার সাথে – উনবিংশ শতাব্দীতে, এযাবৎ কালের শ্রেষ্ঠতম একজন বিজ্ঞানী, চার্লস ডারউইন। আমি এই অধ্যায়ের বাকী অংশটি ব্যবহার করবো তার সেই উত্তরটি ব্যাখ্যা করার জন্য, তবে ডারউইনের ব্যবহৃত শব্দগুলোর চেয়ে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে।

?oh=c9f9426939e454b11ebdfe45ed109673&oe=583D37D8″ width=”400″ />

উত্তর হচ্ছে – জটিল জীবন – যেমন মানুষ, কুমির, বাধাকপি, হঠাৎ করেই উদ্ভব হয়নি এক ধাক্কায়, বরং ধীরে ধীরে, ছোট ছোট ধাপ পার হয়ে এমনভাবে, যেন প্রতিটি ধাপের পরের পরিস্থিতি এর আগেই থেকে যা বিদ্যমান তার থেকে সামান্য একটু ভিন্ন হয়। কল্পনা করুন আপনি লম্বা পা সহ একটি ব্যাঙ সৃষ্টি করতে চান । কাজটির শুরুতেই সবচেয়ে ভালো যে পদক্ষেপটি আপনি নিতে পারেন, সেটি হচ্ছে এমন কিছু দিয়ে কাজটি শুরু করা, ইতিমধ্যেই যাদের সেরকম খানিকটা বৈশিষ্ট্য আছে, যা কিনা আপনি অর্জন করতে চাইছেন: যেমন ধরুন ছোট পা সহ ব্যাঙ। আপনি আপনার ছোট পা সহ ব্যাঙগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখবেন এবং তাদের পায়ের মাপ নেবেন। আপনি সেখান থেকে কিছু পুরুষ আর স্ত্রী ব্যাঙ বাছাই করে নেবেন যাদের পায়ের দৈর্ঘ্য গড়পড়তা অন্য সব ব্যাঙগুলোর চেয়ে লম্বা, এরপর আপনি শুধু তাদের মধ্যে প্রজননের ব্যবস্থা করে দেবেন, এবং খেয়াল রাখবেন যেন তাদের ছোট পা সহ বন্ধুরা প্রজননের কোনো সুযোগ না পায়।

অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পায়ের পুরুষ এবং স্ত্রী ব্যঙরা একসাথে ব্যাঙাচি তৈরী করবে, এবং তাদের একসময় পা গজাবে এবং ব্যাঙে পরিণত হবে। এরপর আপনি নতুন প্রজন্মের ব্যাঙদের পা মেপে দেখবেনে, আবারো পুরুষ আর স্ত্রী ব্যাঙ্গদের বাছাই করবেন যাদের পা বাকীদের চেয়ে খানিকটা বড় এবং তাদের প্রজনন করতে সুযোগ করে দেয়া হয়।
প্রায় ১০ টি প্রজন্ম এমন করার পর, আপনি হয়তো কিছু কৌতুহলোদ্দীপক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করবেন। গড় পায়ের দৈর্ঘ আপনার সেই বাছাই করা ব্যাঙ জনগোষ্ঠিতে এখন লক্ষ্য করার মতই দীর্ঘ হবে শুরুর সেই জনগোষ্ঠীর গড় পায়ের দৈর্ঘ অপেক্ষা। আপনি হয়তো দেখতে পারেন, দশম প্রজন্মের সব ব্যাঙের পা, প্রথম প্রজন্মের পায়ের দৈর্ঘের তুলনায় বেশ লম্বা। অথবা ১০ টি প্রজন্ম হয়তো যথেষ্ট না এমন কিছু অর্জন করার জন্য: আপনাকে হয়তো ২০ তম প্রজন্ম অথবা আরো বেশী প্রজন্ম অবধি পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অবশেষে আপনি গর্বের সাথে বলতে পারবেন, ‘আমি একটি নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরী করেছি যাদের পা পুরোনো ব্যাঙের চেয়ে দীর্ঘতর’।

কোনো জাদুর কাঠির প্রয়োজন নেই, কোনো ধরনের জাদুর দরকার নেই। এখানে যে প্রক্রিয়াটি আমরা দেখতে পাই সেটি হচ্ছে সিলেকটিভ ব্রিডিং, বা বাছাইকৃত প্রজনন। আমি সেই বাস্তব তথ্যটি ব্যবহার করেছি শুরুতেই, ব্যাঙদের নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা (পায়ের দৈর্ঘ) আছে এবং এই সব ভিন্নতা বংশগত হবার প্রবণতা আছে – তার মানে এটি পিতামাতা থেকে সন্তানে বিস্তার করে জিনের মাধ্যমে। শুধুমাত্র কোন ব্যাঙগুলো প্রজনন করতে পারবে আর কোনগুলো পারবেনা, সেটি নিয়ন্ত্রণ করেই আমরা নতুন ধরনের ব্যাঙ তৈরী করতে পারবো।

খুব সহজ, তাই না?

কিন্তু শুধুমাত্র পা দীর্ঘতর করা খুব বেশী চিত্তাকর্ষক কোনো বিষয় নয়। সর্বোপরি আমরা তো ব্যাঙ নিয়ে শুরু করে করেছিলাম, তারা শুধুমাত্র ছিল ছোট পায়ের ব্যাঙ এর রুপ। ধরুন আপনি শুরু করলেন, ছোট পায়ের এক প্রকার ব্যাঙ থেকে না বরং এমন কিছু দিয়ে সেগুলো আদৌ ব্যাঙ নয়। ধরুন তারা খানিকটা দেখতে নিউটদের মত ( নিউটরা একধরনের উভচরী প্রাণি)। যদি তুলনা করা হয় ব্যাঙের পায়ের তুলনায় নিউটদের খুব ছোট পা থাকে ( অন্তত ব্যঙের পেছনের পায়ের তুলনা করলে অবশ্যই ) আর তারা সেটি ব্যবহার করে লাফানোর জন্য নয়, বরং হাটার জন্য। নিউটদের এছাড়া লম্বা লেজ থাকে, যেখানে ব্যাঙদের কোনো লেজ থাকেনা, এবং নিউটরা আকারে বেশীর ভাগ ব্যাঙদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সরু আর লম্বা। কিন্তু আপনি দেখতে পারবেন যে, যদি যথেষ্ঠ হাজার পরিমান প্রজন্ম দেয়া হয়, আপনি নিউটদের একটি জনগোষ্ঠীকে ব্যাঙের একটি জনগোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করতে পারবেন, শুধুমাত্র ধৈর্য ধরে বাছাই করতে হবে, ঐসব বহু মিলিয়ন প্রজাতির প্রত্যেকটিতে, পুরুষ আর স্ত্রী নিউটরা, যারা খানিকটা বেশী ব্যঙের মত, তাদের শুধুমাত্র প্রজনন করতে সুযোগ দিয়ে, এবং যাদের সাথে ব্যঙের সদৃশ্যতা কম তাদের প্রজননে বাধা দেবার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো পর্যায়ে আপনি কোনো নাটকীয় পরিবর্তন দেখবেন পাবেন না। প্রতিটি প্রজন্ম তাদের আগের প্রজন্মের মতই মোটামুটি দেখতে হবে, কিন্তু তাসত্তেও, যখন যথেষ্ঠ পরিমান প্রজন্ম অতিক্রান্ত হবে, আপনি লক্ষ্য করতে শুরু করবেন গড় লেজের দৈর্ঘ্য খানিক কম, এবং গড় পেছনের পায়ের দৈর্ঘ খানিকটা লম্বা। অনেক বড় সংখ্যার প্রজন্ম অতিক্রান্ত হতে লম্বা পায়ের, ছোট লেজের সদস্যদের জন্য হয়তো সহজ হবে তাদের লম্বা পা হামাগুড়ি দেবার বদলে লাফ দেবার জন্য ব্যবহার করতে। এবং এভাবে আরো কিছু পরিবর্তনও আমরা দেখবো।

অবশ্যই, আমি যে দৃশ্যকল্পটি এই মাত্র বর্ণনা করলাম, সেখানে আমি আমাদেরকে প্রজনন নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে কল্পনা করেছি, সেই সব স্ত্রী ও পুরুষ সদস্যদের বাছাই করেছি যাদের আমরা চেয়েছি নিজেদের মধ্যে প্রজনন করুক সেই ফলাফলটি পাওয়ার জন্য, যা আমরা নির্বাচন করেছিলাম। কৃষকরা এই কৌশল ব্যবহার করছেন বেশ কয়েক হাজার বছর ধরে গবাদী পশু আর খাদ্যশস্য উৎপাদনে, যাদের ফলন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী, এবং ইত্যাদি। ডারউইন হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রক্রিয়াটি কাজ করে, এমনকি যখন কোনো কৃত্রিম প্রজননকারী ( যেমন মানুষ) সেখানে থাকেন না নির্বাচন করার জন্য। ডারউইন দেখেছিলেন যে, পুরো বিষয়টি ঘটবে প্রাকৃতিকভাবে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, শুধুমাত্র সরল কারণ যে কিছু সদস্য যথেষ্ঠ দীর্ঘসময় অবধি বেঁচে থাকে প্রজনন করার জন্য এবং অন্যরা বাঁচে না। এবং যারা টিকে থাকে সেটি করার জন্য কারণ তারা বাকীদের চেয়ে সেই কাজটি করার আরো দক্ষভাবে নানা বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত। সুতরাং যে টিকে থাকে তার সন্তান সেই জিনগুলো পায় যা তাদের পিতা অথবা মাতাকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। সেটি নিউট হোক কিংবা ব্যাঙ হোক, সজারু অথবা কোনো আগাছা হোক, সবসময়ই কিছু সদস্য থাকবে যারা অন্যদের চেয়ে বেশী দক্ষ বেঁচে থাকার জন্য।

?oh=dea2c07ce36cc6bf4a1dbaded885c5db&oe=58381FD7″ width=”400″ />

যদি লম্বা পা সেটি করার জন্য ঘটনাচক্রে সহযোগিতা করে ( ব্যাঙ অথবা ঘাসফড়িং, যারা লাফ দিয়ে বিপদ থেকে সরে যেতে পারে, যেমন ধরুন, গ্যাজেল শিকার করা চিতা বা চিতার আক্রমন থেকে পালানোর জন্য), লম্বা পা সহ সদস্যদের মারা যাবার সম্ভাবনা কম। প্রজনন করার জন্য তাদের বেশী দিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশী । এছাড়াও, বেশীর ভাগ একক সদস্যদের লম্বা পা থাকবে যাদের প্রজননের জন্য পাওয়া যাবে। সুতরাং প্রতিটি প্রজন্মে অপেক্ষাকৃত একটি বড় সম্ভাবনা আছে লম্বা পায়ের জিনদের জন্য পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবার ক্ষেত্রে। এবং সময়ের সাথে আমরা দেখবো কোনো একটি জনগোষ্ঠীতে ক্রমশ আরো বেশী সদস্যরা লম্বা পায়ের জিন বহন করবে। সুতরাং প্রভাবটি পড়ে ঠিক যেন মনে হয় বুদ্ধিমান কোনো ডিজাইনার, যেমন মানব কৃত্রিম প্রজননকারী, লম্বা পায়ের সদস্যদের বাছাই করেছেন প্রজনন করার জন্য – কিন্তু শুধুমাত্র এ ধরনের কোনো ডিজাইনারের আসলেই কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই : এটি ঘটছে, প্রাকৃতিক ভাবেই, একা একাই,একটি স্বয়ংক্রিয় পরিণতি হিসাবে সেই পরিস্থিতির – যেখানে কোনো কোনো সদস্যরা যথেষ্ঠ পরিমান দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে প্রজনন করার জন্য, এবং কোনো কোনো সদস্যরা সেটি করতে পারেনা। এ কারণে এই প্রক্রিয়াটির নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন। যথেষ্ট পরিমান প্রজন্ম যদি পার করতে পারি, নিউটদের মত দেখতে কোনো পূর্বসূরি পরিবর্তিত হতে পারে এমন উত্তরসূরিদের যাদের দেখলে ব্যঙের মত মন হবে। আরো যদি প্রজন্ম পার হওয়া যায়, মাছদের মত দেখতে কোনো পূর্বসূরি সেই উত্তরসূরিতে পরিবর্তিত হতে পারে, যারা বানরে মত দেখতে হয়। এবং আরো যদি প্রজন্ম অতিক্রম করার সুযোগ দেয়া হয়, ব্যকটেরিয়াদের মত দেখতে পূর্বসূরিরা সেই উত্তরসূরিতে পরিবর্তিত হতে পারে যারা দেখতে মানুষদের মত। এবং ঠিক এটাই ঘটেছিল। এটা হচ্ছে সেই ধরনের বিষয় যা প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদের ইতিহাসে ঘটেছিল, যারা বেঁচে ছিল কোনোদিনও। এবং যে পরিমান প্রজন্ম সংখ্যার দরকার হয় এমন পরিবর্তনের জন্য সেটি আমার ও আপনার সম্ভাব্য কল্পনার চেয়ে বেশী, কিন্তু পৃথিবী হাজার কোটি বছর প্রাচীন এবং আমরা জীবাশ্ম থেকে জানি জীবনের সূচনা হয়েছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর ( সাড়ে তিন হাজার কোটি) আগে, সুতরাং বিবর্তন হবার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল।

এটাই ডারউইনের অসাধারণ ধারণাটি, এবং এটিকে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। মানব মনে আবির্ভূত হওয়া শ্রেষ্ঠতম ধারণাগুলোর গুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে জীবন সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি এটি সবকিছুই ব্যাখ্যা করে। যেহেতু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমি পরের অধ্যায়গুলোয় আমি আবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসবো।

আপাতত, এটুকু যথেষ্ঠ বোঝার জন্য যে, বিবর্তন খুব ধীর আর ক্রমশ ঘটা একটি প্রক্রিয়া। বাস্তবিকভাবেই, এই বিবর্তনের ক্রমে ক্রমে ঘটার বিষয়টি বিবর্তনকে সহায়তা করে ব্যাঙ কিংবা রাজকুমারদের মত জটিল কিছু তৈরী করা। জাদুর বলে কোনো ব্যাঙের রাজকুমারে রুপান্তরিত হবার ঘটনা কখনোই ক্রমে ক্রমে ঘটবে না, এটি ঘটবে হঠাৎ করেই। আর এটাই এই সব জিনিসকে বাস্তবতা জগতে অসম্ভব বলেই চিহ্নিত করেছে। বিবর্তন হচ্ছে একটি সত্যিকারের ব্যাখ্যা, যা আসলেই কাজ করে এবং এর সত্যিকারের প্রমাণ আছে এর সত্যতা প্রদর্শন করার জন্য। যা কিছু, যারা দাবী করে, জটিল জীবনের নানা রুপের আবির্ভাব হয়েছে হঠাৎ করেই, একসাথে ( ধীরে ধীরে ক্রমশ বিবর্তিত হবার বদলে), সেগুলো আসলেই অসল কাহিনী মাত্র, রুপকথার সেই পরী মায়ের জাদুর কাঠির কল্পনার চেয়ে আদৌ ভালো কিছু না।

আর কুমড়োদের ঘোড়া টানা গাড়ির কোচে রুপান্তর হবার ব্যাপারে, জাদুর মন্ত্র অবশ্যই কিছু করে না যেমন তারা ব্যাঙকে রাজকুমারে রুপান্তর করতে পারেনা। ঘোড়ায় টানা গাড়ি বা কোচ বিবর্তিত হয় না – অন্তত প্রাকৃতিকভাবে, যেভাবে ব্যাঙ আর রাজকুমাররা বিবর্তিত হয়। কিন্ত কোচ, উড়োজাহাজ আর কুড়াল, কম্পিউটার আর ফ্লিন্ট পাথরের তীরের মাথা – তৈরী করে মানুষ, যারা বিবর্তিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক আর হাত বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, ঠিক যেভাবে হয়েছে নিউটদের লেজ আর ব্যাঙদের পেছনের দুটি পা। এবং মানব মস্তিষ্ক, একবার যখন তা বিবর্তিত হয়েছে, তারা গাড়ি কিংবা কোচ, কাচি কিংবা সঙ্গীত, ওয়াশিং মেশিন এবং ঘড়ি, সবকিছু পরিকল্পনা করতে ও বানাতে সক্ষম হয়। আরো একবার, কোনো জাদু না। আরো একবার কোনো চালাকির কৌশল না। আরো একবার, সবকিছু সুন্দরভাবে এবং সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এই বইটির বাকী অংশে আমি আপনাদের দেখাবো যে সত্যিকারের পৃথিবী, বৈজ্ঞানিকভাবে যা বোঝা হয়েছে, তার নিজস্ব একটি জাদু আছে – সেই জাদুকে আমি বলে কাব্যিক জাদু: যার অনুপ্রেরণা দেবার মত সৌন্দর্য, যা আরো বেশী জাদুময় কারণ এটি বাস্তব এবং কারণ আমরা বুঝতে সক্ষম কিভাবে এটি কাজ করছে। বাস্তব পৃথিবীর সত্যিকারের সৌন্দর্য এবং জাদুর সাথে অতিপ্রাকৃত মন্ত্র আর জাদুর মঞ্চের খেলা তুলনা করলে মনে হতে পারে অনেক শস্তা আর রুচিহীনভাবেই চটকদার। বাস্তবতার জাদু অতিপ্রাকৃত না আবার হাতসাফাইও না, কিন্তু – খুব স্পষ্টভাবেই – বিস্ময়কর। বিস্ময়কর এবং বাস্তব। বিস্ময়কর কারণ এটি বাস্তব।

(প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত)

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – প্রথম অধ্যায় (শেষ পর্ব)

  1. এরপর আপনি নতুন প্রজন্মের

    এরপর আপনি নতুন প্রজন্মের ব্যাঙদের পা মেপে দেখবেনে, আবারো পুরুষ আর স্ত্রী ব্যাঙ্গদের বাছাই করবেন যাদের পা বাকীদের চেয়ে খানিকটা বড় এবং তাদের প্রজনন করতে সুযোগ করে দেয়া হয়। প্রায় ১০ টি প্রজন্ম এমন করার পর, আপনি হয়তো কিছু কৌতুহলোদ্দীপক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করবেন।

    অনেক চেষ্টা করেও এক স্পেসিসকে অন্য স্পেসিসে রুপান্তর করা যাচ্ছে না ভাই। আপনি হয়ত বিজ্ঞানী Richard Lenski নাম শুনে থাকবেন। তিনি Escherichia coli নামক ব্যাকটেরিয়া্র ৫৮০০০ হাজার জেনারেশনে রুপান্তর করেছেন। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরিয়াই রয়ে গেছে, স্পেসিস পরিবর্তন হবার নূন্যতম সম্ভাবনা দেখা দেয় নি। শেষ মেষ বলা হচ্ছে আগামী ২.৫ বিলিয়ন বছর ধরে এই এক্সপেরিমেন্ট চললেও ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন হবার কোন সম্ভাবনা নেই।
    লিংক
    http://www.the-scientist.com/?articles.view/articleNo/38325/title/Ever-Evolving-E–coli/

    রিচার্ড ডকিন্সের বক্তব্যের অসারতা আশা করি বুঝতে পারছেন।

    1. আপনাকে হতাশ করেই বলতে হচ্ছে
      আপনাকে হতাশ করেই বলতে হচ্ছে আপনার খুজে পাওয়া তথাকথিত অসারতা আমি বুঝতে পারছি না। কারণ এই বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে। স্পষ্টতই প্রজাতির সংজ্ঞাটি আপনি বোঝেননি। বিবর্তন নিয়ে অসার তর্ক করার অপ্রয়োজনীয়তা আমি বহু বছর আগেই অনুভব করেছি। যেহেতু এই ব্লগে আমি নতুন করে লিখছি সেকারণে একটি মন্তব্য করাই সমিচীন মনে করছি। আমরা যারা অনুজীবদের নিয়ে গবেষণা করছি, তাদের কাছে বিষয়টি আরো হাস্যকর।কোনো বিজ্ঞানী একটি প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিকে রুপান্তর করা চেষ্টা করছেন না।কারণ বিবর্তন সেভাবে কাজ করে না।একটি কমন পূর্বসূরি প্রজাতি যে সিলেকশন প্রেসারের মুখোমুখি হয়ে দ্বিবিভাজিত হয়েছে পরস্পর থেকে পৃথক জিন পুল হিসাবে, সেটি পুনসৃষ্টি করার চেষ্টা কেউই করবে না আর করা সম্ভব না, আর এছাড়া বিবর্তনের প্রমাণ এখন জিন পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব। মানুষ কয়েক হাজার বছরেই বহু পরিবর্তন ঘটিয়েছে সেই প্রক্রিয়াগুলোর মাত্র কয়েকটিকে বেছে নিয়ে। যেমন আজ যে ফুলকপি, বাধাকপি, ওলকপি. ব্রকলি আমরা খাচ্ছি এটা একটি মাত্র প্রজাতির উপর কয়েকশ প্রজন্মের কৃষকদের কাজ।কোনো একটা সময় ধারণা করা হয়েছে আমাদের মানব জীবদ্দশায় আমরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়া চোখে দেখতে পারবো না।কিন্তু সেটি দেখাও সম্ভব হয়েছে, এগুলো নিয়ে বহু লেখা হয়ছে। রিচার্ড লেনস্কির গবেষণা নিয়ে এর আগেও আমি লিখেছি আমার নিজের ব্লগে। আর আপনি যে লিঙ্কটি দিয়েছেন সেখানে সম্পর্ণ ভিন্ন কথাই বলা হয়েছে। একটি প্রজাতি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি সৃষ্টি হবার কথা বিবর্তন বলে না কখনোই।যে প্রজাতিটি তার প্যারেন্ট প্রজাতি থেকে পরিবর্তিত হয়েছে তাকে পাশাপাশি রাখলে প্যারেন্ট প্রজাতি থেকে আলাদা করা কঠিন। বহু মিলিয়ন বছরের ক্রম বিবর্তনে ঘটা সব প্রজাতিকে এক লাইনে দাড় করালে, পাশাপাশি দুটি প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করা কঠিন হবে। কিন্তু যদি বহু মিলিয়ন বছরের আগের একটি আর বর্তমান প্রজাতিকে দেখা হয় মনে হতে পারে পার্থক্যটা খুবই বিশাল, অথচ প্রক্রিয়াটি ঘটেছে ধীরে খুব সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট নির্বাচনী চাপের প্রতিক্রিয়ায়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা সহজ যারা যৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে। আবার বহু উদ্ভিদের প্রজাতিকরণ ঘটেছে ভিন্ন উপায়ে যেমন পলিপ্লয়ডি, ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে যা সহজে ঘটে ল্যাটেরাল জিন ট্রান্সফারের মত প্রক্রিয়ায়। লেনস্কিও দেখিয়েছেন একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে থেকে কিভাবে বারোটি ফ্লাস্কে রাখা বা ‘গোত্র’ বিবর্তিত হতে পারে। তারা কি একইভাবে বিবর্তিত হয় নাকি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। লেনস্কি গবেষনা প্রদর্শন করছে, মাইক্রোকসম এ এবং ল্যাবে, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে, ফলে আমাদের চোখের সামনেই আমরা ঘটতে দেখি প্রাকৃতিক নির্বাচনের অনেকগুলো গুরুত্বপুর্ণ অংশ: র‌্যানডোম মিউটেশনের পর ঘটে নন র‌্যানডোম প্রাকৃতিক নির্বাচন; স্বতন্ত্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে একই পরিবেশে অভিযোজিত হওয়া; যে প্রক্রিয়ায় পরবর্তী মিউটেশন এর আগের মিউটেশনগুলোর সাথে সংযোগে সৃষ্টি করে বিবর্তনীয় পরিবর্তন। যেভাবে কিছু জিন নির্ভর করে, তাদের প্রভাবের জন্য, অন্য জিনের উপস্থিতির উপর, কিন্ত এ সব কিছুই হয় বিবর্তন সাধারনত যে সময় নেয় তার খুব সামান্যতম অংশতেই।লেনস্কির গবেষণা নিয়ে রিচার্ড ডকিন্স আর জেরী কয়েন তাদের বইতে লিখেছেন, আমি রিচার্ড ডকিন্সের বইটির সেই অনূদিত অংশের লিঙ্ক দিচ্ছি।এছাড়া অাগে ও পরে আরো কিছু লেখা আছে। আপনার কাছে যা অসার তা পৃথিবীর বহু বিজ্ঞানীদের কাছেই অসার না। সুতরাং এধরনের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য অন্য কোনো পোষ্টের জন্য সংরক্ষিত রাখবেন আশা করি ভবিষ্যতে।

      দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ (রিচার্ড ডকিন্স থেকে)

      http://wp.me/p1KdC9-1hE

      জেরি কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু খেকে:

      http://wp.me/p1KdC9-1gh

  2. আসলে মিঊটেশন আর ন্যাচারাল
    আসলে মিঊটেশন আর ন্যাচারাল সিলেকশনের মাধ্যমে দীর্ঘদীন পরে এক স্পেসিস সত্যিই আরেক স্পেসিসে পরিণত হতে পারে কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন আর প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এই বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রমান করা সম্ভব হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত লম্বা লম্বা মন্তব্য আর বিরাট বিরাট বাত-চিত করে মনে হয় না কোন লাভ হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − = 15