আমি অতিথি তোমারি দ্বারে

?oh=193e3e7fea8abea1644e58b82c3f913b&oe=5847A727″ width=”400″ />
মা অসুস্থ। মাকে এম্বুলেন্সে করে ঢাকা নিয়ে এসে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এ ভর্তি করিয়েছি। ডাক্তার জানালেন মার হার্ট ফেইলর ও ডায়াবেটিস প্রচন্ড বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে আমার চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই। চোখে অন্ধকার দেখছি।

আমার নাম মারুফ হাছান। জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার পোনা গ্রামে। মা আমাকে অনেক কষ্ট করে ডিগ্রি পাশ করিয়েছেন। যখন আমার তিন বছর তখন আমার বাবা নিখোঁজ হোন। হয়তো তাকে কেউ মেরে মধুমতি নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। আমার মা অন্যের বাসায় কাজ করে আমাকে বড় করেন, লেখা পড়া শেখান। আমার মনে আছে, ছোট বেলায় আমি সারাক্ষন মার শাড়ির আঁচল ধরে থাকতাম। মা যখন অন্যের বাসায় থালা-বাসন ধুয়ে দিতেন, তখনও আমি মার শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

পত্রিকাতে সরকারি হাসপাতালের নানান রকম খবর পড়তাম। এখন, এখানে এসে দেখি অবস্থা তার চেয়ে বেশি খারাপ। আমার কাছে মনে হলো যেন, হাসপাতালের চেয়ার টেবিল, বেড, দেয়াল এবং ঝুলে থাকা দুর্বল ফ্যানও যেন টাকার জন্য হা করে আছে। আমার টিউশনি করে জমানো সব টাকা আর প্রতিবেশির কাছ যে যা দিয়েছে হাত পেতে সব নিয়ে এসেছি। মাকে বাঁচাতে হবে। এই পৃথিবীতে মা ছাড়া তো আমার আর কেউ নেই। আমার খুব শখ মা আর আমি একসাথে হজে যাব।

আমি গ্রামের ছেলে হলেও অসাধ্য সাধন করেছি। সরকারি হাসপাতালে মার জন্য কেবিন এর ব্যবস্থা করেছি। প্রথম দুই দিন মাকে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে থাকতে হয়েছে। আমি দেখলাম মহিলা ওয়ার্ডে তিনটা সিট ফাঁকা পড়ে আছে। হাসপাতালের লোকদের বললাম, সিট খালি আছে তাহলে আমার মা’কে ফ্লোরে থাকতে হবে কেন? হাসপাতালের লোক গুলো বিচ্ছিরি হলুদ দাঁত গুলো বের করে বলল, টাকা দেন পাঁচ শ। আমি বললাম, এটা তো সরকারি হাসপাতাল। হলুদ দাঁত ওয়ালা চোখ মুখ খিঁচিয়ে বলল, চান্দু আর একটা কথা বললে কানটা ধরে ধাক্কা দিয়ে ফেল দিব তিন তলা থেকে।

রাত আট টার পর মহিলা ওয়ার্ডে কোনো পুরুষ লোককে থাকতে দেয়া হয় না। মা বুকের ব্যথায় ছটফট করলেও আমি জানালা দিয়ে দেখব কিন্তু কিছু করতে পারব না। আমি হাসপাতালের বারান্দায় সারা রাত বসে থাকি। চারপাশ নোংরা, পচা গন্ধ। প্রচুর মশা মৌ মাছির মতো আমাকে ঘিরে ধরে। সাহসী ইঁদুর গুলো সারারাত সারা হাসপাতাল ছুটে বেড়ায়। বিড়াল গুলো একে অন্যের সাথে উচ্ছ স্বরে ঝগড়া করে। সহবাস করে। সবচেয়ে আশ্চয্য হয়েছি কুকুর দেখে। আমি ভেবে পাই না হাসপাতালের তিন তলায় কুকুর আসে কি করে? আমার খাওয়া নেই, ঘুম নেই, গোছল নেই। খুব ক্ষুধা পেলে রাস্তার পাশের দোকান থেকে চা বিস্কুট খেয়ে নেয়। মাকে একা হাসপাতালে রেখে হোটেলে ভাত খেতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। হিস্টিরিয়া রোগির মতো আমি ছটফট করি।

চতুর্থ দিন আমি হাসপাতালে মার জন্য কেবিন নিতে সক্ষম হই। গত কয়েকদিনে হাসপাতালের লাশ ঘরের দাড়োয়ান সোলেমান এর সাথে আমার বেশ সখ্যতা হয়। এই লোক আমাকে হাসপাতালে কিভাবে নানান সুবিধা পাওয়া যাবে, তা জানান। সোলেমানের কথার সারমর্ম হলো পানির মতো টাকা খরচ করতে হবে। যেখানে দুইটাকা লাগবে সেখানে পাঁচ টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু আমার অল্প টাকা। এই টাকা দিয়ে মার চিকিৎসা করে আবার গ্রামে ফিরে যেতে হবে। বিদেশে থাকা বন্ধুর কাছে হাত পাতলাম। সে আমাকে এক ঘন্টার মধ্যে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিল।

রাত বারোটায় একদিন দেখি, লাশ ঘরের সামনে খুব চিৎকার-চেচামেচি হচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি- লাশ ঘরের দায়িত্বে থাকা লোকজন বলছে, দুই হাজার টাকা না দিলে লাশ নিতে দেব না। লোকটি কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমি সারা দিন রিকশা চালাই এত টাকা কোথায় পাবো? তিন শ টাকা রাখেন। আমার বোনের লাশ টা দিয়ে দেন। আমারে দয়া করেন। কিন্তু তারা দয়া করলো না। এই ঘটনা দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না।

হাসপাতাল ভর্তি দালাল। রোগীর চেয়ে দালালের সংখ্যা কম নয়। দালালদের টাকায় অনেক ডাক্তারও ভাগ পায়। প্রতিটা কাইকে কাইকে (পায়ে পায়ে) টাকা লাগে। কোনো টেস্ট করাতে গেলেই বলে মেশিন নষ্ট। আর টাকা দিলে সাথে সাথে মেশিন ভালো হয়ে যায়। টেস্ট করার পর বলে টেস্টের রিপোর্ট দুই দিন পর পাবেন। আর টাকা দিলে দুই ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়। ওয়ার্ড বয় এবং নার্সদের ব্যবহার ভয়ঙ্কর খারাপ। নামেই শুধু সরকারি হাসপাতাল। সরকার কি কোনো খোঁজ খবর রাখে না? টিভিতে দেখি স্বাস্থ্যমন্ত্রী কত বড়-বড় কথা বলেন। নিজের চোখে দেখলাম বাস্তব তো সম্পূর্ণ অন্যরকম। আসলে টিভিতে মন্ত্রীরা মিথ্যা কথা বলেন।

এখন, আমি আমার ‘আমি অতিথি তোমারি দ্বারে’ মুল গল্পে প্রবেশ করবো। এবং গল্পটি খুব দ্রুত শেষ করবো। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা আপনারা প্রস্তুত তো? আসলে, সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই গল্পটির জন্ম। আমার সককর্মীর বিশেষ অনুরোধে আমি গল্পটি লিখতে বসেছি।

রাত তখন তিনটা। মারুফ হাছান হাসপাতালের কেবিনে মার পাশে বসে আছে। একটু পরপর মার মুখে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। মারুফ চোখ মুছতে মুছতে ব্যলকনিতে এসে দাঁড়ায়, তখন হঠাৎ তার মনে হয়- এই ঘরে মা ছাড়া অন্য কেউ আছে। কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না। মারুফ তার অনুভূতি টের পাচ্ছে। হঠাত এক আকাশ ভয় মারুফকে ঘিরে ধরল। তার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। সে এখন কি করবে?

দিনের বেলা মারুফের রাতের ঘটনা কিছুই মনে থাকল না। কারন দিনের বেলা তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই ওষুধ আনতে যাচ্ছে। এই নার্সকে ডেকে আনতে যাচ্ছে। মায়ের হাত পা মুছে দিচ্ছে। মাকে খাইয়ে দিচ্ছে। ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে। কেবিনে দ্বিতীয় দিন রাতেও মারুফের মনে হলো- এই ঘরে অন্য কেউ আছে। মারুফ খুব টের পায়, এমনকি অনুভব পর্যন্ত করতে পারছে। তখন মারুফ ভয় পেতে শুরু করে এক আকাশ অজানা ভয়। তার হাত পা শক্ত হয়ে আসে তার। সে তখন তার মায়ের পায়ের কাছে কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে থাকে। এবং মুহূর্তেই ঘুমিয়ে পড়ে। একজন ঘুমন্ত মানুষকে ভয় স্পর্শ করতে পারে না।

এখন, আমি গল্পের শেষ প্রান্তে।
তৃতীয় দিন রাত তিনটা। মারুফ তার মায়ের মাথার কাছে অনেকক্ষন বসে থেকে ব্যলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। মেঘ মুক্ত স্বচ্ছ আকাশের দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবল। তার বাবার কথা ভাবল, বাবা যদি হঠাৎ করে এসে এখন উপস্থিত হয়- তাহলে কেমন হবে? রুপা’র কথা ভাবল। রুপা মারুফ এর সাথে একই কলেজে লেখা পড়া করত। মারুফ রুপাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু তার পায়ের নিচের মাটিটা নরম থাকায় কোনো সে তার ভালোবাসার কথা রুপাকে বলতে পারেনি। রুপার বিয়ে হয়ে গেল তার চোখের সামনে। রুপার কথা মনে পড়লেই তার নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়।

ব্যলকনি থেকে ফিরে ঘরে ঢুকে মারুফ একটা অদ্ভুত দৃশ দেখল। এই দৃশ দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে করতে সে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। ভয়ে তার সারা শরীর ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেল। সে থরথর করে কাঁপতে লাগল। মারুফ দেখলে- তার মার মাথার কাছে একটি তরুনী মেয়ে বসে আছে। মেয়েটি খুব সুন্দর! সুন্দর একটি শাড়ি পরা। মাথা ভর্তি চুল ফ্যানের বাতাসে উড়ছে। দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটির চোখ। চোখে আবার মোটা করে কাজল দেয়া।

মেয়েটি মারুফের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। পৃথিবীর কোনো মেয়ে এত সুন্দর করে হাসতে পারবে না। যেন হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দিল- আমাকে ভয় পেও না। আমি তোমার বন্ধু। মারুফ কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েটি ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলল। আর বুঝিয়ে দিল ব্যলকনিতে যাও, আমি আসছি। এখানে কথা বললে মার ঘুমের অসুবিধা হবে। তারা দুই ভুবনের দুইজন চুপচাপ ব্যলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো।

ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটি স্পস্ট করে বলল, তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তুমি কি জানতে চাও, তা আমি জানি। একটু হেসে মেয়েটি বলল- আমার নাম রুপা। কাকতালিয়ভাবে তোমার বান্ধবীর নামের সাথে মিলে গেল। আমি এই হাসপাতালেই, এই কেবিনেই মারা যাই। জন্মের সময় আমি হার্ট এ তিনটা ছিদ্র নিয়ে পৃথিবীতে আসি। আর এই ছিদ্র হার্ট নিয়ে উনিশ বছর বেঁচে ছিলাম। আমার মৃত্যু শোক বাবা মা সহ্য করতে না পেরে দুইজনই একই সাথে মারা গেলেন। কাকতালিয়ভাবে তারা দুইজনও এ ঘরেই মারা যান। এখন আমরা তিনজন এই ঘরেই থাকি। বাবা-মা কখনও কারো সামনে আসেন না। আমিও আসি না, কিন্তু তোমাকে দেখে সামনে না এসে পারলাম না। তুমি এত সহজ সরল একজন ভালো মানুষ।

মারুফ কাঁদতে কাঁদতে রুপার হাত ধরল। রুপার হাত কি ঠান্ডা! কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি থাকো আমার কাছে। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসবো। কোনোদিনও দুঃখ দিব না। মেয়েটি বলল, তা কি সম্ভব? আমি অন্য ভূবনের একজন। তুমি যদি আমার কথা কাউকে বলো, কেউ বিশ্বাস করবে? করবে না। সবাই তোমাকে পাগল ভাববে। তবে আমি যদি বেঁচে থাকতাম তাহলে অবশ্যই তোমাকে বিয়ে করতাম। এবং আমাদের সংসার জীবন হতো আনন্দময়।

ঘটনা বা গল্পটি এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু তা হলো না। মারুফের মা আজ সুস্থ। তারা আজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। বাসে মারুফ মার কাঁধে মাথা রেখে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। মা ছেলের মাথায় এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক এই সময় মারুফদের বাসের ড্রাইভার নিয়ন্তন হারিয়ে বাস ভর্তি যাত্রী নিয়ে ব্রিজের উপর থেকে নিচে পড়ে যায়। মারুফ এবং তার মা সাথে সাথে নিহত হোন।

লেখকরা খুব কল্পনাবিলাসী হোন। তাদের ভাবতে ভালো লাগে- মৃত্যুর পর মারুফ এবং তার মা, রুপা এবং তার বাবা-মা একসাথে অদৃশ্য হয়ে হাসপাতালের কেবিনে থাকেন। রুপা এবং মারুফ অন্য ভূবনে সংসার পাতেন। সেই সংসারে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই। গভীর রাতে মারুফ আর রুপা ব্যলকনিতে বসে গল্প করে। চা খায়। বাতাসে রুপার চুল আর শাড়ির আঁচল উড়ে এসে পড়ে মারুফের চোখে মুখে। রুপার গল্প শুনতে শুনতে মারুফ ব্যলকনিতেই রুপার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে। এই সময় অজানা এক আকাশ আনন্দে রুপার চোখে আনন্দ অশ্রু পড়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 6