জরথ্রুস্টঃ ইরানের প্রাচীন ধর্ম

পৃথিবীতে হাজারো ধর্মের মতই জরথ্রুস্ট একটি ধর্ম। তবে, এটি ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বেশ পুরাতন একটি ধর্ম। বর্তমানে ইরানের জরথ্রুস্ট এবং ভারতের পার্সিদের মধ্যে এ ধর্মের চর্চার সন্ধান পাওয়া যায়। জোরোয়াষ্টার বা জরথ্রুস্ট্রা (এভেস্টান), অথবা জরথ্রুস্ট নামক একজন প্রাচীন পারস্যীয় ধর্ম প্রচারক এর হাত ধরে এ ধর্ম মতের প্রবর্তন ঘটে পৃথিবীতে। ভারতীয় উপমহাদেশে এটি পারসিক বা পার্সি ধর্ম নামেও পরিচিত।

ধর্ম প্রচারক জরথ্রুস্ট সাধারনভাবে স্বীকৃত একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তার সমসাময়িক কাল সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে তেমন কিছুই জানা যায়না। অনেক পন্ডিতের মতানুসারে তিনি আনুমানিক ১২০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ সময়ের একজন মানুষ, যিনি প্রাচীন ধর্মমত প্রবর্তকদের অন্যতম, যদিও অন্য অনেকের মতে তিনি ১৮০০ খ্রীস্ট পুর্বাব্দ হতে ৬ষ্ঠ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ মধ্যবর্তী সময়ের একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন।

জরথ্রুস্ট ধর্মের নামকরণ নিয়ে বেশ কিছু মত প্রচলিত আছে। তবে “জোরোয়াস্টার” নামটি মূলত দুটি এভেস্টিয়ান ভাষা’র শব্দ সমষ্টি, যা এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়ঃ জোরো- (“পুরাতন”) + আস্ট্রা (“উট),” অর্থ “বুড়ো উটওয়ালা”। অন্যদিকে আধুনিক পার্সীতে জারেড যার অর্থ হলো “হলুদ” বা “সোনালী”। এ অর্থে জোরয়াস্টার এর অর্থ দাঁড়ায় “হলুদ উটওয়ালা” বা “সোনালী উটওয়ালা। আবার জারা অর্থ উজ্জ্বল, স্বর্ণ বা আলো, তুস্ট এর অর্থ দাঁড়ায় বন্ধু বা প্রেমিক। অর্থাৎ জরথ্রুস্ট মানে যে আলো ভালবাসে। হলুদ আর লাল যাই হোক না কেন, প্রবর্তক যে হলুদ উটের মালিক হয়েছিল বা হবার চেষ্টা করেছিল তার কিছু ইঙ্গিত এই নামের মধ্যেই পাওয়া যায়।

যদিও ৩য় শতাব্দীর মধ্যে জরথুস্ত্রবাদ এবং তার মতবাদ সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তথাপি জোয়ারাস্টার অর্থাৎ প্রবর্তকের জীবনকাল নিয়েও অনেক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য মত হলো জোয়ারাস্টার খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০ থেকে ১০০০ খ্রীস্টপূর্ব এর কোন এক সময়ে বর্তমান ছিলেন। এর পক্ষে জোরালো মত দেন মেরি বয়েস তার “ এ হিস্ট্রি অব জোয়ারস্ট্রিজম” গ্রন্থে। এইচ, এস, নাইবার্গ তার “প্রাচীন ইরানের ধর্ম” গ্রন্থে প্রমান করার প্রয়াস পান যে ৪৫৮ খ্রীস্ট পূর্ব সময় থেকে জোয়ারাস্টারের ধর্ম প্রচারিত হতে থাকে। অন্যদিকে, বুন্দাহিসন বা সৃষ্টি নামক জোয়ারাস্ট্রান ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ন লিখনিতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে আলেকজান্ডার’এর পারস্য আক্রমণ এর ২৫৮ বছর পূর্বে জোরোয়াস্টার বর্তমান ছিলেন, অর্থাৎ তদানুসারে ৫৮৮ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ জোয়ারাস্টারের সময়কাল। ঊনবিংশ শতাব্দীর অনেক পন্ডিত এই “জোরোয়াস্টার এর ঐতিহাসিক সময়কাল” সাথে একমত পোষন যাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন তাগিজাদেহ এবং ডব্লিউ. বি. হেনিং। যদিও ডার্মেসটিটার এর মত কিছু কিছু পন্ডিত এর সাথে দ্বিমত পোষন করেন এবং যুক্তি দেখান যে, জোরোয়াস্টার মূলত ১০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ এর সমসাময়িক, যদিও এই মতবাদ এখন ব্যাপক আকারেই আগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত।

আদিকাল হতে বার্থহোলোমিয়া এবং ক্রিস্টেনসেন এর মতো পন্ডিতেরা “ঐতিহ্যগত সময়” নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন মূলত ভাষাগত সমস্যা হতে যা উৎসরিত। ঐতিহ্য হতে দেখা যায় জোরোয়াস্টার ১৮ টি কবিতা লিখেন, যার সমন্বয়ে এভেস্টা’র পুরাতন খন্ড, গ্রাথাস গ্রথিত হয়েছে। “গ্রাথাস” এর ভাষা এবং রচনা সাধারণত “ইয়াসনা হাপ্তানগাইতি” কে বলা হয় পুরাতন “এভেস্টান” বা গাথিক এভেস্টান, এবং যা এভেস্টার পরবর্তী খন্ডগুলোর ভাষা হতে অনেকটাই সেকেলে। শব্দের ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে গাথিক এভেস্টান এর সাথে বৈদিক সংস্কৃত’র ঋগবেদ প্রচুর মিল রয়েছে।

যদিও ঋগবেদের এর সংস্কৃতের সাথে গাথিক এভেস্টানের এর ভাষা কিছুটা বেশি মাত্রায় রক্ষণশীল, ধারণা করা হয় যে এভেস্টা ঋগবেদের এর কয়েক শতক পরে গ্রথিত হয়েছে। ধারণা করা হয় ঋগবেদ গ্রথিত হয়েছে ১৫০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ হতে ১২০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ এর মধ্যবর্তী সময়ে। সে অনুসারে গাথিক এভেস্টান গ্রথিত হয়েছে ১০০০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ হতে ২০০ বছর সময়কালের এর মধ্যে।

জরথ্রুস্ট ধর্ম মতে প্রধান পূজ্য বা স্রষ্টার নাম হলো আহুরা মাজ্‌দা (হোরমজ্‌দ)। জরাথ্রুস্টীয়বাদীগণকে প্রধানত অগ্নি উপাসক নামে সংজ্ঞায়িত করা হলেও জরথ্রুস্ত্রিয়বাদীদের অগ্নি উপাসনার ধারণাটি মূলত জরাথ্রুস্ট্রবাদ-বিরোধী বিতর্ক থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, অগ্নিকে জরাথ্রুস্ট্র ধর্মে শুদ্ধতার প্রতিনিধি এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এমনকি তাদের ফায়ার টেম্পল বা অগ্নি মন্দিরেও (জরাথ্রুস্ত্রীয় পরিভাষাটি আরও বিস্তৃত যার সরল অর্থ হল হাউজ অব ফায়ার বা আগুনের ঘর) এই একই ধারণা পোষণ করা হয়। । বর্তমানকালে এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে যে অগ্নি প্রজ্বলনের কারণ হল তা সর্বদা যে কোন ঊর্ধ্বমুখী বস্তুবিশেষকে পুড়িয়ে ফেলে এবং তা কখনোয় দূষিত হয় না। তা সত্ত্বেও, সাদেহ এবং চাহারশানবে সুরি হল বৃহত্তর ইরানের সর্বত্র উদযাপিত দুটি অগ্নি-সম্পর্কিত উৎসব এবং এই দুটি উৎসবে সেই সময়ের রীতিতে ফিরে যাওয়া হয় যে সময়টিতে জরাথ্রুস্ট্রীয় ধর্ম অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ধর্ম ছিল।

জরাথ্রুস্টবাদে, পানি (আপো, আবান) এবং আগুন (আতার, আযার) হল ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতিনিধি এবং এ-সম্পর্কিত শুদ্ধিকরণ আচার-অনুষ্ঠানসমূহকে ধর্মীয় জীবনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জরাথ্রুস্টীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে, পানি এবং আগুন হল যথাক্রমে দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ সৃষ্ট প্রভাবশালী পদার্থ, এবং তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে পানিকে সৃষ্টিগতভাবে আগুনের মূল উৎস মনে করা হয়েছে। আগুন এবং পানিকে জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়, এবং আগুন ও পানি উভয়কেই ফায়ার টেম্পলের চারপাশে প্রতীকীরুপে তুলে ধরা হয়। জরাথ্রুস্টবাদীগণ বিভিন্নভাবে প্রজ্বলিত আগুনের (যাকে যে কোন ধরনের আলোতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়) উপস্থিতিতে উপাসনা করে থাকেন, এবং উপাসনার মৌলিক কর্মের চূড়ান্ত আচারটি “জলরাশির শক্তি”রূপে সংযুক্ত হয়। আগুনকে একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি অর্জিত হয়, এবং পানিকে সেই জ্ঞানের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খ্রিস্টীয় ২০০০ সন এর প্রাক্কলন অনুযায়ী পৃথিবীতে এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪৫,০০০ যা সাম্প্রতিক হিসাব অনুসারে প্রায় ২৬ লক্ষ। ধারণা করা হয়, গত একদশকে জরাথ্রুস্টবাদ বা পার্সি ধর্মের অনুসারির সংখ্যায় এই ব্যাপক পরিবর্তন প্রকৃত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে হয়নি, বরং এ সময়কালে উদ্ভূত অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুবিধার ফলে পার্সি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সম্পর্কিত তথ্যউপাত্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেকেই নিজেদের জরাথ্রুস্টবাদ বা পার্সি ধর্মের অনুসারি হিসেবে সনাক্ত করেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে অঞ্চলে পার্সিগণ ঐতিহাসিকভাবেই নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে বলে প্রকৃত পার্সি জনসংখ্যা কত তা এখনো সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিনসাধ্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “জরথ্রুস্টঃ ইরানের প্রাচীন ধর্ম

  1. ভাইয়া অনেক ভাল লাগলো লেখাটি
    ভাইয়া অনেক ভাল লাগলো লেখাটি পরে। আরও জানতে চাই এই ধর্ম সম্পর্কে কিন্ত গুগল সার্চ করে পাইলাম না কিছু। যদি দয়া করে এই ধরমের ইংলিশ বানান টা অথবা গুগল এর লিঙ্ক দেন অনেক উপকৃত হবো। ধন্যবাদ

  2. হ্যা এইসব জরথ্রুস্ট নামক
    হ্যা এইসব জরথ্রুস্ট নামক উদ্ভট ধর্মগুলোর ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। তাতে মানুষ মূল ধারার ধর্ম থেকে দূরে সরবে। পৃথিবীতে আসবে শান্তি।

  3. শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।
    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ। প্রাচীন ধর্মগুলো সম্পর্কে জানা প্রয়োজন আমাদের। অন্য প্রাচীন ধর্মগুলো নিয়ে এই ধরনের পোস্ট চাই।

    1. চীনের তাওবাদ ও জাপানের
      চীনের তাওবাদ ও জাপানের গ্লুটান ধর্ম নিয়ে কিছু লিখার ইচ্ছা আছে। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করেন, তিনি যেন সে তৌফিক দান করেন। আমীন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 71