ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৮)


ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৮)
উদারনীতিবাদের বিশ্বাসঘাতকতা (১)

নাওয়াজ: হ্যা, যুক্তরাজ্যেও আমরা এমন বিতর্ক দেখেছি। এখানে থেকে আমি যা বলবো, তা একজন লিবারেল বা উদারপন্হী হিসাবেই বলবো- বাস্তবিকভাবে আমি সেটা বলবো লণ্ডনের একজন লিবারেল ডেমোক্র্যাট সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসাবে। একটি ভয়ঙ্কর লিবারেল বিশ্বাসঘাতকতা চলমান এখন। দূঃখজনকভাবে ইসলামবাদের বহু ‘সহযাত্রী’ এখন এই বিতর্কে লিবারেলদের পক্ষে। যাদের আমি বলবো রিগ্রেসিভ লেফটিস্ট বা পশ্চাদগামী বামপন্হী; তারা আসলে বাস্তবিকভাবে বীপরিতমূখী বর্ণবাদী। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তারা নিজেদের প্রত্যাশার একধরনের দৈন্যতায় ভোগেন। মূলত তারা বিশ্বাস করেন এরা আসলেই সব একই ধরনের ( হোমোজেনাস) এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত সব মূল্যবোধগুলোর প্রতি সহজাতভাবেই বৈরী। ‘প্রাচ্য’ সংস্কৃতিকে তারা এমনভাবে দেখেন যে তাদের খুব একটা অসুবিধা হয়না সাংস্কৃতিকভাবে একটি অতিমাত্রায় লঘুকৃত উপসংহারে উপনীত হতে –আর আমার এই ক্ষেত্রে, সেটি ‘ইসলামী সংস্কৃতি – তারা সাংস্কৃতিকভাবে পরিনামবাদী একটি অবস্থান নেন, যখন তারা এই সব বিষয়ে তাদের আদর্শগুলোকে স্থগিত করে রাখেন শুধুমাত্র নিজেদের ওরিয়েন্টাল ফেটিশ বা প্রাচ্য প্রীতিকে পরিতুষ্ট করার জন্য।

কিন্তু যখন তারা ঠিকই তাদের ‘নিজেদের’ পশ্চিমা সংস্কৃতির সব কিছুকেই প্রগতির নামে প্রশ্ন করতে পারেন, তারাই আবার উদারপন্হী মসুলমানদের সমালোচনা করেন যারা ঠিক সেই একই কাজটি ইসলামের ভিতরে করতে চান; এবং হাত মেলানোর জন্য তারা প্রতিটি পশ্চাদগামী প্রতিক্রিয়াশীলদেরই বেছে নেন ‘সাংস্কৃতিক অকৃত্রিমতা’ ও ‘উপনিবেশবাদ’ বিরোধীতার নামে। তারা দাবী করেন, তারা যেটাকে নিজেদের সরকার বলে বিবেচনা করেন, তাদের ছাড়া অন্য কোনো সরকারের আন্তর্জাতিক কিংবা আভ্যন্তরীণ কোনো নীতির সমালোচনা করতে অস্বীকার করার কারণ হচ্ছে, তারা অন্য কোনো সরকারের কাজের জন্য দায়ী নয়। তবে তারা লাফ দিয়ে ওঠেন, যখনই ‘কোনো’ (এবং শুধমাত্র তাদের ‘নিজেদেরই’ নয়) উদারনীতিবাদী গণতান্ত্রিক সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে কোনো ভুল করে বসেন, অথবা সাধারণত পুরোপুরিভাবেই তারা উপেক্ষা করেন পৃথিবীর প্রায় সব ফ্যাসিবাদী, ধর্মতান্ত্রিক, অথবা মুসলিম নেতৃত্বাধীন একনায়কতান্ত্রিক সরকার ও গোষ্ঠীগুলোকে। মনে হয় যেন তারা তাদের মস্তিষ্ক একই সাথে দুটি চিন্তা ধারণ করতে পারেনা। এছাড়া, কবে থেকেই বা এমন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ উদারপন্হী আন্তর্জাতিকতাবাদীদের বৈশিষ্ট্যে রুপান্তরিত হয়েঠে? এটি তো ডানপন্হীদের একটি বৈশিষ্ট্য।

তাদের দৃষ্টিতে তারা যাদের ‘নেটিভ’ বা আদিম সমাজ হিসাবে গণ্য করেন – আমি শব্দটি ইচ্ছা করেই ব্যবহার করছি -অপেক্ষাকৃতভাবে নিম্নতর মাণদণ্ডে তারা সেই সমাজগুলোকে বিচার করেন, অথচ তারা ‘তাদের’ নিজেদের জনগোষ্ঠীর উপরে আরোপ করের আরো উচ্চমাণে একটি মাণদণ্ড, আর ঘটনাচক্রে তারা সবাই মূলত শ্বেতাঙ্গ- আর সেকারণেই আমি এটাকে বলেছি বীপরিতমূখী বর্ণবাদীতা। নেটিভ বা আদিম সমাজগুলোর কাছে তুলনামূলক নিচু মাণদণ্ড – অথবা আরো বেশী সাংস্কৃতিকভাবে অকৃত্রিমতা – প্রত্যাশা করে তারা এই সব সমাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ক্ষমতাহীন করে ফেলেন। তারা তাদের উচ্চাকাঙ্খাগুলোও শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। তাদের সমাজগুলো থেকে পুরোপুরিভাবে তারা এগুলোকে কেটে ফেলে দেয়, কারণ কোনো আশাই আর অবশিষ্ট থাকে না। এই সমাজগুলো গড়ে ওঠে আত্ম-পৃথকীকৃত মসুলমান এলাকা হিসাবে, যেখানে শুধুমাত্র একটি জিনিস তাদের সদস্যরা প্রত্যাশা করে, তাহলো কিছু নিম্নমানের সামাজিক নেতা হবার জন্য, অনেকটা বস্তি সর্দারের মত। সেই ‘সহযাত্রীরা’ এই মুসলিম মহল্লা আর বস্তিগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দেয় সাংস্কৃতিক অকৃত্রিমতা আর আত্মপরিচয়ের রাজনীতির নামে। আর মহল্লা সর্দারগুলোকে প্রায়শই দেখা যায় তাদের ফাই ফরমাস খাটতে। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি আর সাংস্কৃতিক অকৃত্রিমতার এই ছদ্ম- উদারনীতিবাদী অনুসন্ধান পরিণতিতে কিছু দেয় না, মধ্যযুগীয় প্রতিদ্বন্দীতা মূলক ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক দাবীর নিম্নগামী ক্রমাবনতি ছাড়া, যেখানে তারা যুদ্ধ করে কারা সত্যিকারের মুসলিম সেই দাবীতে, ক্রমবর্ধিষ্ণু নারী বিদ্বেষ, সমকামী বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা আর উগ্রবাদের ভয়ঙ্কর একটি প্রেক্ষাপটে।

এসব আদৌ উদারনীতিবাদ নয়। বামে, এখনও সমাজতন্ত্রী দৃষ্টিভঙ্গির অবশিষ্টাংশ আছে, যা গোত্র পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেয় ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর। আর ডানপন্হীদের মধ্যে, এটি বৃটিশ ঔপনিবেশিক ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ দৃষ্টিভঙ্গির অপ্রতাশিত প্রত্যাবর্তন। ধ্রুপদী উদারনীতিবাদী শক্তি একক ব্যক্তির স্বাধীনতার উপর গুরুত্বারোপ করে। এখানে আমি যে উদারনীতিবাদের প্রতি তথ্য নির্দেশ করছি, সেটি দার্শনিক অর্থে যেভাবে সটি বোঝা হয়ে থাকে; যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে এটি বোঝা হয়ে থাকে সেই অর্থে না, যেখানে ডেমোক্রাটিক পার্টিকে নির্দেশ করে শব্দটি – আর সেটি দলীয় রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত। এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় লিবারেল বিশ্বাসঘাতকতা হচ্ছে উদারনীতিবাদের নামে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সাম্প্রদায়িক অধিকারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ব্যাক্তি স্বাধীনতার বিনিময়ে। আর এইসব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে যারা সংখ্যালঘু, তারা আসলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। যে মানুষগুলোকে নিয়ে আমি আসলেই চিন্তিত যখন আমরা এই কথোপকথন করছি, তারা হলো নারীবাদী মুসলিম, সমকামী মুসলিম ও প্রাক্তন মুসলিমরা। তারা সবাই অরিক্ষত, সহজেই আক্রম্য এবং নিপীড়নের স্বীকার। তাদেরকে শুধু কলঙ্কিত করাই হয়না বরং বহু ক্ষেত্রে তারা হিংস্র আক্রমনের শিকার হন অথবা তাদের হত্যা করা হয় শুধুমাত্র সামাজিক নিয়মের ব্যতিক্রম একটি অবস্থান নেবার জন্য।

এ কারণে আমি ‘সহযাত্রীদের’ পছন্দ করিনা, যা জঙ্গী ইসলামবাদীদের সাথে হাতে হাত মেলাবেন এবং এমন পথ ধরে হাটবেন তাদের সাথে, যা তাদের নিয়ে যাবে পুরোপুরিভাবে উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে, তারা বিশ্বাস করেন, যে তারা মসুলমানদের উপকার করছেন, যখন বাস্তবিকভাবে তারা সেই সব মসুলমানদের বাধ্য করছেন মৃত্যুর মুখে আত্মসমর্পন করার জন্য – যারা সংস্কার করার চেষ্টা করছেন – , এবং অনেক ক্ষেত্রেই – নীরবে সেই নিপীড়ক শাসক গোষ্ঠীর মূলনীতিকে সমর্থন জানিয়ে – যে সরকারগুলো চেষ্টা করছে তাদের সব হত্যা করার জন্য।

কিন্তু এইসব কিছুর আরেকটি দিক আছে, যে ব্যপারে আমাদের সতর্ক হতে হবে। আমেরিকার চেয়ে আরো বেশী ইউরোপে আমাদের এখানে উগ্র ডানপন্হীদের উত্থান একটি গুরুতর সমস্যা। গ্রীসে, যেমন, নব্য নাৎসি দিল গোল্ডেন ডন এর রাজনৈতিক প্রভাব আছে। ব্রিটেনে আমাদের সমস্যা আছে বেশ কিছু জনপথ ভিত্তিক আন্দোলনের সাথে। আমি যুক্ত ছিলাম টমি রবিনসনকে সাহায্য করার প্রচেষ্টার সাথে, যেন তিনি ইংলিশ ডিফেন্স লীগ পরিত্যাগ করতে পারেন, কারণ সেখানে নিও নাৎসীদের অনুপ্রেবেশ সেখানে ক্রমশ বাড়ছিল বলে তিনি পর্যক্ষেণ করেছিলেন। তিনি আর এর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাননি। তার ইডিএল ত্যাগ করার পর পরই একটি নতুন, অপেক্ষাকৃত ছোট সংস্থার আবির্ভাব ঘটে, যার সদস্যরা সামরিক পোষাক সজ্জিত হয়ে মসজিদে মসজিদে হাজির হয়ে বাইবেল বিতরণ শুরু করেছিলে দিন দুপুরে । যা তুমি কল্পনা করতে পারছো, কি পরিমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য এমন কিছু উস্কানিমূলক হতে পারে, কিভাবে বিষয়গুলো সমাজে উদ্বেগ বাড়ায়। পূর্ব জার্মানীতে নব্য নাৎসিবাদের তীব্র উত্থান ঘটেছে।

সুতরাং এই সব ‘সহযাত্রীদের’ সাথে, আমি ব্যাখ্যা করেছি কেন আমি একমত পোষণ করিনা – কিছু ধর্মান্ধ আছে, এখন এই ধর্মান্ধগুলো, তারা ইসলাম প্রকারের হোক কিংবা মুসলিম বিরোধী প্রকারের হোক- তারা মূলত কিছু বিষয়ে নিজেদের মধ্যে একমত পোষণ করে। একটি হচ্ছে তাদের বিশ্বাস যে, ইসলাম নিজেই – ‘ইসলামবাদ’ নয় – একটি আধিপাত্যবাদী, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করার আদর্শ, যার উদ্দেশ্য সারা পৃথিবী দখল করা। আরেকটি হচ্ছে, সেকারণেই মুসলিম আর অমুসলিমরা কখনোই সমানভাবে ও একসাথে শান্তিতে বাস করতে পারবে না, বরং তাদের অবশ্যই আলাদা বসবাস করতে হবে ধর্ম দ্বারা সংজ্ঞায়িত পরিচয়ে।

অব্যশই, তুমি এখন দেখতে পারছেন বিষয়টি কিভাবে ইসলামবাদীদের সহায়তা করছে, কিন্তু এটি গোল্ডেন ডন ও অন্যান্য গ্রুপগুলোকে সহায়তা করছে যারা খুবই খুশি হবে সব মুসলিমদের ইউরোপ থেকে বহিষ্কার করতে পারলে- এমনকি যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবই ইউরোপে। এই দুটি গ্রুপই একই ধরনের স্বপ্ন দেখে, শুধুমাত্র পার্থক্য প্রকাশিত হয়- এর সবচেয়ে জঙ্গী রুপে – একটি গ্রুপে, অ্যান্ডারস ব্রেইভিক এর মত সন্ত্রাসীর মধ্যে এবং অন্য গ্রুপটির ক্ষেত্রে, লণ্ডন ৭/৭ বোমা হামলার জিহাদীদের মধ্যে। আমি অবাক হইনি জেনে যে ব্রেইভিক তার সন্ত্রাসী ম্যানিফেস্টোতে ব্যপকভাবে আল-কায়েদার উদ্ধৃতি দিয়েছে। এই সব উগ্রবাদীদের একজন মুসলিম অধিগ্রহনের বিরোধী আর অন্যরা এর সমর্থক। কিন্তা তার উভয়েই সেই বিভাজনমূলক সাম্প্রদায়িক মহাপ্রলয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। এই সব উগ্রবাদ মোকাবেলা করার জন্য, আমাদের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এইসব ‘সহযাত্রীদের’ গুরুত্ব হ্রাস করা ও তাদের অভিসন্ধি উন্মোচন করা, যা আমি নিয়মিতভাবে করার চেষ্টা করি, এবং একই সাথে ধর্মান্ধ সংকীর্ণমনার মানুষদেরও বিরোধীতা করি।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =