সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি -আহমদ রফিক

এক
রেসকোর্স ময়দান ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ঐতিহ্যবাহী নাম যেমন পুরনো ঢাকার আন্টামোরার ময়দান (পরের নাম ভিক্টোরিয়া পার্ক, তারও পরে বাহাদুর শাহ পার্ক) বা বুড়িগঙ্গা পারের করোনেশন পার্ক। করোনেশন পার্ক নেই, আমাদের বাণিজ্যিক লোভের তাড়নায় অদৃশ্য। বাহাদুর শাহ পার্ক অবশ্য ঠিকই আছে। আর রেসকোর্স ময়দান এখন গাছপালা-সমাকীর্ণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ময়দান থেতে উদ্যান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঠিক পরপরই রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত হতো জনসভা।

সময় ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ। রমনায় কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা। পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেদিন এ ময়দানের বিশাল জনসভায় অদ্ভূত এক বক্তৃতা দিলেন। তার দীর্ঘ ভাষণে তিনি তার বহু উদ্ধৃত পূর্বেকার গণতান্ত্রিক কথাবার্তা বুড়িগঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়ে যা বললেন তা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। আসলে এগুলোই জিন্নাহ-রাজনীতির, তার পাকিস্তান রাজনীতির সঙ্গে ঠিক মিলে যায়। তিনি জানালেন তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা, পাকিস্তানি আদর্শের কথা। মূল কথা তার ভাষায় সত্যিকার নেশন গড়ে তুলতে হলে ভুলে যেতে হবে আমরা বাঙালি, সিন্ধি, বালুচি বা পাঠান। মনে রাখতে হবে আমরা পাকিস্তানি, আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে আপনি আর যাই হোন না কেন আপনি মুসলমান। কাজেই নেশন গড়তে হলে প্রাদেশিকতা বর্জন করতে হবে। পাকিস্তান হাতে পেয়েও ধর্মের ধারালো হাতিয়ারটি অন্য হাতে ধরে রাখেন পাক গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আল জিন্নাহ। একেবারে খাটি দ্বিজাতি তত্ত্বের নয়া প্রচার।

এর পরের কথাগুলো একজন উদ্ধত একনায়কের দলীয় রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বয়ান। তিনি বলেন আমাদের মধ্যে বিদেশি এজেন্ট, পঞ্চম বাহিনী ও কমিউনিস্টরা রয়েছে যারা মুসলমানদের বিভক্ত করতে চায়, সস্তা আকর্ষণীয় শ্লোগান তুলে। তাদের সম্বন্ধে সতর্ক হতে হবে। তিনি কথিত রাষ্ট্র বিরোধীদের কঠোর হাতে দমনের (তার ভাষায় রুথ্লেসলি) অঙ্গীকার করে ভাষা-বিতর্ক সম্বন্ধে শেষবানী উচ্চারণ করেন এই বলে যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে, অন্য কোনো ভাষা নয়। যারা এর বিরোধীতা করে তারা পাকিস্তানের দুশমন। এ ভাবেই পাকিস্তান নামক নয়া রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকতার রুপরেখা তুলে ধরেন জিন্নাহ। উদ্দেশ্য বাংলা ও বাঙালি দমন, পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র রূপে গঠন। ১৯৫৬ সালে রচিত প্রথম সংবিধানে তাই পাকিস্তান হয়ে ওঠে ইসলামি রিপাবলিক।

কিন্তু এমন পাকিস্তান বাঙালি মুসলমান চায় নি। তাদের প্রত্যাশা ছিল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য অসম প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশের স্বতন্ত্র ভুবনের স্বাধীনতা। কিন্তু পাকিস্তানে তা মেলেনি। বরং সেখানে যথারীতি চলেছে বাঙালি শোষণ, পাকিস্তানের পূর্ব-পশ্চিমে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য। উঠতি বাঙালি মধ্য বিত্তের মনে স্বভাবতই গভীর ক্ষোভ। তাই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা থেকে কাগমারি সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতায় বাংলার স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি উত্থাপিত তারই পরিণত রূপ ষাটের দশকের ছয় দফা দাবি। বিভিন্ন ঘাতের দাবি ঘিরে আন্দোলন, ঊনসত্তরে স্বৈরাচার-বিরোধী গণঅভ্যূত্থান এবং সত্তরে ছয়দফার এককাট্টা নির্বাচনী বিজয়। আবারও সেখানে বাধা। আর সে বাধার মুখে পূর্বোক্ত রেসকোর্স ময়দানেই আট চল্লিশের বিপরীত চরিত্রের জনসভা একাত্তরের (১৯৭১) ৭ই মার্চ তারিখে।

এ জনসভার আয়তন পূর্বোক্ত সভার চেয়ে অনেক অনেক বড়। এবারের বক্তা জনবন্দিত নেতা, বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তার উদাত্ত আহ্বান সাম্প্রদায়িক বাংলার জন্য নয়, তার আহ্বান অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী বাংলা গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতা-সংগ্রামের জন্য। এ দুই ঐতিহাসিক বক্তৃতার রাজনৈতিক চরিত্রে আকাশ-পাতাল ফারাক। এ বক্তৃতা ও বাঙালি জাতীয়বাদী চেতনার ভিত্তিতে এবং পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ২৫ মার্চ মধ্যরাতের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সূচিত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের জের ধরে ১৬ ডিসেম্বর (১৯৭১) স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

এবার ১৯৪৭ আগস্টের মতো ক্ষমতার হস্তান্তর নয়, রীতিমত যুদ্ধ করে অনেক মৃত্যু, অনেক নির্যাতনের মুখে স্বাধীনতা অর্জন। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর রাজনীতি পরিচালিত যুদ্ধ হলেও কৃষক-শ্রমিক-কারিগর শ্রেণীর অংশগ্রহণে একাত্তরের যুদ্ধ চরিত্র বিচারে জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধ নব্য উপনিবেশবাদী, পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। তাই এ যুদ্ধে প্রত্যাশা তৃণমূল স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রত্যাশা সর্বশ্রেণীর বাঙালির। কারণ এ যুদ্ধ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাধাণ্যে পরিচালিত হলেও রনাঙ্গণে ছিল নানান শ্রেণী চরিত্রের সমাবেশ ছিল। সাধারণ স্তরের যোদ্ধা যেমন পুলিশ, বাঙালি ইপিআর জওয়ান ও কিছুসংখ্যক অফিসার, তেমনি শ্রেণী সচেতন বাম রাজনীতির তরুণ সদস্য এবং বিপর্যস্ত কৃষক-শ্রমিক-কারিগর শ্রেণীর মানুষ তাদের একাংশ রাজনীতি সচেতন, অন্য অংশ বলতে হয় বড়সড় অংশ দলীয় রাজনীতি-বহির্ভূত সাধারণ মানুষ। এক্ষেত্রে অপ্রিয় সত্যটা হলো বর্বর ও ব্যাপক পাকিস্তানী আক্রমণের মুখে অস্তিত্ব রক্ষার টানে এদের লড়াইয়ের সচেতন প্রয়াস। এদের মধ্যে তরুণের সংখ্যা সর্বাধিক। কারণ এরাই ছিল পাক-আক্রমণের প্রধান টার্গেট। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বলে প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে অপেক্ষারত তরুণের সংখ্যা লক্ষাধিক। এভাবেই ১৯৭১ সালের ছাব্বিশে মার্চে সূচিত বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম রণক্ষেত্রের বাস্তবতায় জনযুদ্ধে চিহ্নিত হয়ে ওঠে। তবু এ যুদ্ধ সুনির্দিষ্ট বিপ্লবী মতাদর্শভিত্তিক ও বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালিত মুক্তি সংগ্রাম হয়ে ওঠেনি যদিও স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর সে অর্জনে ছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিদেশি সহায়তা।

দুই
এ স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যাশা ব্যাপক ও সর্বজনীন চরিত্রের হলেও প্রাপ্তি শ্রেণীনির্ভর সীমাবদ্ধ চরিত্রের। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মিলাতে চাইলে মোটা দাগের অর্জন বাংলা ভূখন্ডের ভৌগলিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা সে সূত্রে স্বাধীন মানচিত্র ও পতাকা ও সেক্যুলার জাতীয় সঙ্গীত। এগুলোর ভিত্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সেই ভিত্তিতে বাহাত্তরে একটি গণতান্ত্রিক সেক্যুলার সংবিধান যেখানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা রক্ষিত। বাঙালি জাতিসত্তার সর্বজনীন বিচারে এ পর্যন্ত প্রাপ্তি সদর্থক।

কিন্তু কাগজ-কলমের বাইরে চুলচেরা হিসাব, শ্রেণী ভিত্তিক বিচার-ব্যাখ্যা করতে গেলেই প্রাপ্তির চেহারা ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এক এক করে প্রশ্ন ভিন্ন সত্য জানিয়ে দেয়। প্রথম প্রশ্ন ভাষিক জাতিসত্তার ভিত্তিতে সংঘটিত লড়াইয়ে অর্জিত স্বদেশে কেন এবং কেমন করে সর্বজনীন জাতীয়তাবোধ পেছনে ঠেলে ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রদায়বাদী চেতনার প্রকাশ ঘটে। কেমন করে পাকিস্তানি চেতনার প্রকাশ ঘটে কোথাও প্রচ্ছন্ন, কোথাও প্রকাশ্যে। সে সুবাদে সেক্যুলার সংবিধানের মাথায় শোভা পায় ধর্মীয় চেতনার তাজ। মূল সংবিধানের চরিত্র পাল্টে যায়, যা হয়ে ওঠে ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য-নির্ভর তাও আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের একক ধর্মের। এমনকি জাতিসত্তার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বলা হতে থাকে পরিচিতি সংকটের (আইডেনটিটি ক্রাইসিস-এর) কথা, এর দ্বন্দ্ব ও নিরসনের কথা। ধর্ম ও জাতীয়তার মধ্যে দ্বন্দ্ব।

তাহলে কি মনে করতে হবে, ঊনসত্তরÑএকাত্তরের বাঙালি জাতীয়তাবোধের আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল বহিরঙ্গের, চৈতন্যের গভীর বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত নয়! পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতনের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পাকিস্তানি সমর তৎপরতা যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার মতো বাঙালিয়ানাও কি চাপিয়ে দিয়ে ছিল। এতোটা ভাবতে ইচ্ছা করে না। তবু অন্তত এটুকু মানতে হয় যে পাকিস্তানি রাজনীতির পূর্ব প্রভাব সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি, বাঙালি চেতনার শুদ্ধ প্রভাবে সামাজিক পরিবর্তন সীমাবদ্ধ বৃত্ত ঘটেছে, ব্যাপক স্তরে ঘটেনি। সে চেষ্টা করা হয়নি। বরং বাঙালিয়ানার আবেগ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছে শিক্ষিত, সংস্কৃতি মনস্ক বাঙালি। এ চেতনা-তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেবার কোনো চেষ্টা আমাদের ছিল না। এর কারণও ছিল। কারণ কিছুটা শ্রেণী বিষয়ক এ যুদ্ধের চালিকা শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি ছিল শিক্ষিত শ্রেণীর, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আজকালকার বিশেষ গোষ্ঠীর বিচার ব্যাখ্যায় যাদের বলা হয় ‘ভদ্রলোক শ্রেণী’ যাদের উদ্ভব ঊনিশ শতক থেকে বিশ শতকে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে। দীর্ঘ সময় পর মুসলমান সম্প্রদায়ে। এদের শ্রেণী স্বার্থের প্রয়োজনে পাকিস্তানে বাঙালি-অবাঙালি স্বার্থের দ্বন্দ্বÑযে দ্বন্দ্ব বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করতে বাধ্য এবং করেছেও। এক কথায় ঐ ‘ভদ্রলোক শ্রেণী’ আমার ধারণা পূর্বতন ধর্ম বনাম জাতিসত্তা তথা জাতি চেতনার দ্বন্দ্ব চাপা রেখে অর্থাৎ দ্বন্দ্বের নিরসন না ঘটিয়েই বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্ব- মূলত অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছে।

বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্বটা যে প্রধানত আর্থ-সামাজিক, অংশত সাংস্কৃতিক এটা পাকিস্তান আমলে বহু-আলোচিত বিষয়। প্রাথমিকভাবে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী উল্লিখিত দ্বন্দ্বটাকে রাজনৈতিক সচেতনায় তুলে ধরে। এর প্রথম প্রকাশ ভাষা-আন্দোলনে এবং সংস্কৃতি চর্চায়, পরবর্তী পর্যায়ে রাজনীতিতে ১৯৫৪ থেকে ষাটের দশকে জাতীয়তা বোধের শাসন কর্তৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ পরিচালনায়। তাই জাতিসত্তার আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে শ্লোগান তোলার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে পূর্ব ঐতিহ্য মাফিক ইংরেজি-শিক্ষিত এলিট শ্রেণী। বাংলা ভাষা ও বাঙালি চেতনা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে এমন ব্যাখ্যাই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। এখানেই প্রধান হয়ে উঠেছে কথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীস্বার্থ। আর সেজন্যই বৃহত্তর জনগোষ্ঠির শ্রেণী স্বার্থপূরণ তাদের পক্ষে বিবেচনায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। সেটা আসতে গেলে এত দ্রুত হাজার-কোটিপতি ধনিক-বণিক শিল্পপতি শ্রেণীর অবিশ্বাস্য বিকাশ কখনো সম্ভব হতো না। ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, পেশাজীবী সামরিক-বেসামরিক অবাঙালিদের স্থান দখল করেছে অনুরূপ বাঙালি শ্রেণী।

স্বাধীন বাংলাদেশ ব্যতিরেকে এ নীতি সম্ভব হতো না। এ শ্রেণীর স্বার্থই পূরণ করেছে এবং করছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ‘গণ’ এখানে অবহেলিত। সেজন্যই গ্রাম থেকে উঠে আসা মুক্তিযোদ্ধা আজ চালগুদামের কুলি যাকে ষাটোর্ধ বয়সে আড়াই মনি চালের বোঝা পিঠে নিয়ে জীবিকা অর্জন করতে হয়। এ শ্রেণীতেই রয়েছে রিকশা চালক, ভ্যানগাড়ি চালক, দিন মজুর বা নিতান্ত মুক্তিযোদ্ধা। বেকার এরা একাত্তরে প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র কাধে তুলে যুদ্ধে শামিল হয়েছিল। নামেই মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ এদের বিরাট অংশকে প্রতারিত করেছে এবং করেছে বলেই স্বাধীন বাংলাদেশ গত চল্লিশ বছরের কাল পরিসরে সামরিক-বেসামরিক বুরেক্রেট-টেনোক্রেট এবং ধনিক-বণিক ও রাজনীতিকদের স্বর্গরাষ্ট্রে পরিণত।

অন্যদিকে আর্থ-সামাজিক কারণে ও পূর্বোক্ত চেতনাগত প্রভাবে সমাজে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রকাশ ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উদ্ভব ঘটেছে। এ সমস্যা অবশ্য বিশ্ব সমস্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সঠিক শিক্ষার অভাবও এ অবস্থার একটি কারণ। বাংলাদেশের এমন এক আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজি এবং ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রভাব যে গভীর হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবাঙালি কর্তৃত্বাধীন বাংলাদেশী সমাজে বিরাজমান মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধীতা এখন স্বাধীন, শাসিত বাংলাদেশে প্রায় অনুপস্থিত বলা চলে। সংস্কৃতি অঙ্গনে মার্কিন পরাশক্তি-বিরোধীতা যতটা দেখা যায় তা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারেনি। তাই প্রশ্ন, রাজনীতি সচেতন বাঙালি সমাজ কি পিছু হটছে, অন্তত গত শতকের পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের তুলনায়?

দু-দুটো স্বাধীনতা-দিবস নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা কতোটা আনন্দের আর কতোটা দুঃখবেদনার তার হিসাব-নিকাশ আজ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ সেই সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক। পেন্ডুলামের দোলন একই নিয়মে চলছে। ডাইনে বায়ে। তবে যথারীতি স্পর্শ করে চলেছে মধ্য বিন্দু, বারবার, নিয়মিত। শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির স্বার্থ বলে কথা। সর্বশেষ স্বাধীনতা-দিবস তাই সুদর্শন মুখ নিয়ে প্রতি বছরই আসে যায়, নয়া ভাবনা বা প্রত্যাশা উসকে দিয়ে যায়। ভাবতে থাকি পথুল, চর্বিপুষ্ট বিত্তবানদের সুসজ্জিত কক্ষ থেকে কীভাবে স্বাধীনতার অমৃতভাবের কিছুটা জনস্বার্থে অশ্বথ-বটের ছায়ায় ছিমছাম মাটির ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়। দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি স্থানান্তরের পক্ষে হলেও রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো অনুকূল নয়। নয় সাংগঠনিক বিচারে। তাই চলছে মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান, আমলা ও পেশাজীবীর প্রতিনিধিত্বকারী রাজনীতির শাসন। যে শাসন শুধু জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে সুবিধা, সহযোগিতা ও সমর্থন আদায় করে কিন্তু পরিবর্তে খুঁদকুড়োর বেশি কিছু ফিরিয়ে দেয় না। তারা অর্ধাহারে দিন কাটায় বা অতিকষ্টে দিন গুজরান করে।

তাই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার একদিকে সুস্থ জাতীয়তাবোধ অন্যদিকে শ্রেণী চেতনার বিকাশ। যাতে সমাজ থেকে শ্রেণী শোষণ ও শ্রেণী বৈষম্য দূর করা যায়। সেজন্য প্রয়োজন বলিষ্ঠ শ্রেণী সংগঠন। এর বিকল্প নেই। সংসদীয় পদ্ধতিতে যে সমস্যার সমাধান নেই তার প্রমাণ ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য। তবে এক্ষেত্রে একক ছোট রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের একটা সুবিধা ছিল কিন্তু বাঙালি সমাজ সে সুবিধা কাজে লাগাতে পারে নি। বরং ঐ সমাজ এখন উল্টো পথে হাঁটছে। আমাদের তাই লক্ষ্য অর্জনে অনেকখানি পথ হাঁটতে হবে। সে হাঁটা শুরু করুক না ছাত্র সমাজ ও জনসংস্কৃৃতির সংগঠনগুলো।
(ছাত্র ইউনিয়নের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’র স্মরণীকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে, ২০১২ সালে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি -আহমদ রফিক

  1. দুই বছর আগে আমি দেশভাগ,
    দুই বছর আগে আমি দেশভাগ, স্বাধীনতা যুদ্ধ, রাজনীতি নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। ১০০০ শব্দ লেখার পর, নানান ঝামেলায় আর লেখা হয়ে উঠেনি। ভাবছি- আবার লেখা শুরু করবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − = 25