বড় জীবনের ছোটগল্প

আজ শুক্রবার,স্কুল নেই; সারাদিনই দুরন্তপনার। সকালবেলা
মায়ের দেয়া একবাটি পান্তা খেয়েই রিজু বেরিয়ে পড়লো।
পাশের বাড়ির নুরুল আর রাস্তার ওপারের বাড়ি থেকে
বলাইকে হাকডাক দিয়ে নিয়ে এলো।
-চল আজকে বদর মোল্লার পুকুরে বড়শি ফালাই গিয়া।
-হ, ম্যালাদিন তো হইলো ব্যাটায় পোনা ছাড়ছে; বড় হইছে
মনে অয়।
অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অকাজ মাথায় না আসায় বলাইও
রাজি হলো।
-বড়শি আর সুতা পামুনি কই?
রিজু বললো, আমি ব্যবস্থা করতাছি; তোরা আমার লগে আয়
খালি।
গ্রামের বাজারে রিজুর আব্বার হরেক মালের দোকান।
দোকানে আব্বা না থাকার ফাঁকে মুহূর্তের মধ্যে রিজু
দোকানে ঢুকে সৎ চোরের মতো এককাঠি সুতো আর বাক্স
থেকে গুনে গুনে তিনটে বড়শি বের করে নিয়ে এলো।
বলাইদের বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড় থেকে তিনটে কঞ্চি
কেটে ছিপ বানিয়ে নিলো ওরা।
বেকারি থেকে দুটো বাসি রুটি চেয়ে নিয়ে সোজা চলে
গেলো পুকুরপাড়ে। কিছুটা রুটি ছিঁড়ে পাড়ের কাছে ছিটিয়ে
দিলো রিজু। অল্প পানি আজলায় ভরে তাতে রুটি দুটোকে
চটকে নিয়ে টোপ তৈরি করা হলো। টোপ লাগিয়ে তিনজনে
একসাথে বড়শি ফেলার খানিকবাদেই বলাইয়ের বড়শির
সুতোয় আটকানো পাটখড়ির টুকরো নড়ে উঠলো। তারপর
হঠাৎই ডুবে গেলো টুকরোটি, হকচকিয়ে উঠে ছিপ ধরে টান
দিতেই বড়শিতে গেঁথে উঠে আসলো মাঝারি আকারের
নওলা। মাছের দিকে তাকিয়ে তিনজনের খুশি যখন চরম
মাত্রায় পৌঁছেছে তখনই পেছন থেকে ধমকের সুরে ভেসে
এলো
-হারামজাদার দল।
সাতপাঁচ না ভেবে পানিতে ঝাঁপ দিলো ওরা, সাঁতরিয়ে
পুকুরের অপর পাড়ে গিয়ে উঠলো। বদর মোল্লা ওদের
বড়শিগুলো দখলে নিলো, অশ্রাব্য গালি ছুড়ে দিলো
তিনজনের উদ্দেশ্যে। রাগে দুঃখে রিজু, নুরুল আর বলাই
বাড়ির দিকে হাটা দিলো। যাওয়ার পথে রিজু বললো
-কুনো একদিন বাগে পাইলে বদর ব্যাটার চান্দি ফাটাই দিমু।
ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবার খেয়েই
আবার পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলতে গেলো রিজু।
লাটিম আর ডাংগুলির পর সন্ধ্যা পর্যন্ত দাড়িয়াবান্ধা।
আযান পেরিয়ে যায়, রিজু ঘরে ফেরে না, রিজুর মা খেলার
ময়দান হতে কান ধরে বাড়িতে নিয়ে এল ওকে। একমাত্র
ছেলেকে নিয়ে খুব চিন্তা মায়ের, সারাদিন দস্যিপনা করে
বেড়ায় যে।
বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে নিলো রিজু। তারপর খানিক সময়
ধরে পড়তেই
-খাওন দেও মা।
-বাইরে আইহা বয়, দিতাছি।
ফলি মাছের ঝোল, মসুর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উদরপূর্তির
পর রাজ্যের ঘুম নেমে এলো রিজুর চোখে। অতঃপর বিছানাই
ওর দিনের শেষ আশ্রয়, বদর মোল্লার চান্দি ফাটিয়ে
প্রতিশোধ নেয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো।
তারপর প্রায় আড়াইশো শুক্রবার পার হয়ে গেছে। রিজু এখন
স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। ফুটবলের নেশায় পেয়েছে ওকে,
স্কুল ছুটির পর সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটবল খেলে স্কুলের বন্ধুদের
সাথে। সামনে আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় নাম
লেখাতে চায় রিজু, দলে জায়গাও পেয়ে যায় মিডফিল্ডার
হিসেবে, কিন্তু বাঁধ সাজলো ওর আব্বা।
-কয়দিন পরে টেস্ট পরীক্ষা, হের পরে ফাইনাল। এহন বল
খেইলা হাত-পাও ভাইঙ্গা বাড়ি বইয়া থাক, পরীক্ষা আর
দেওন লাগবো না।
-পরীক্ষা দেরি আছে আব্বা, আমি খেলুম।
-জিদ করবি না রিজু, পড়ালেহা আগে খেলন পরে। পরীক্ষার
পরে ম্যালা সময় পাবি খেলবার।
-আমি খেলুম।
অতঃপর আব্বার ব্যপক আওয়াজের ধমকে রিজু বিছানায় শুয়ে
কাঁদতে কাঁদতে রাত পার করে দিলো। না, রিজুর আর ফুটবল
খেলা হয়নি।
যথারীতি টেস্ট আর ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলো রিজুদের।
আব্বার বকুনিতে খানিকটা পড়াশোনাও করা হয়েছে।
ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল যেদিন ঘোষিত হলো, নোটিশ
বোর্ডে রেজোয়ান শরীফ নামের পাশে ভাল রেজাল্টই
চকচক করছিলো। মা, আব্বা, স্কুলের শিক্ষকরা সবাই খুশি ওর
সাফল্যে। ওদের বাংলা শিক্ষকের কথায় রিজুর আব্বা
পাড়া-গাঁ ছেড়ে ওকে শহরের নামী কলেজে ভর্তি করিয়ে
দিলেন। থাকার জন্য পরিচিত এক মেসও ঠিক করে দিলেন,
রিজু শহরে এলো।
মেস থেকে কলেজ, কলেজ থেকে মেস; এভাবেই কাটতে
লাগলো রিজুর দিন। কলেজে যাওয়া আসার রাস্তায় অসংখ্য
লোকজনকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো ও; দিনমজুর,
রিক্সাওয়ালা, গার্মেন্টস শ্রমিক, ভিখারি, পথশিশুদের
পানে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। এখন কিছুটা বড়
হয়েছে রিজু, বুঝতে শিখেছে মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ-
দুঃখ। সারাদিন ভাবতো দুঃখী মানুষগুলোর জন্য কিছু করবে
ও। দেখতে দেখতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা কাছে চলে
এলো। পরীক্ষা শুরুর দিন পাঁচেক আগে হঠাৎ দুপুরবেলা রিজুর
আব্বার ফোন।
-বাবা তুই বাড়ি আয় জলদি।
-কেন আব্বা?
-আয় জলদি।
ব্যাগ না গুছিয়েই বাড়ির পথে রওনা দিলো রিজু, ঘন্টা
তিনেকের পথ পেরিয়ে বাড়ির ধারে পৌঁছাতেই বাড়িতে
ছোটখাটো জটলা দেখতে পেলো। প্রতিবেশীরা রাস্তা
ছেড়ে দিলো ওর জন্য। উঠোনের মাঝখানে মায়ের নিথর
দেহখানা পড়ে থাকতে দেখে রিজুর চোখ দিয়ে অঝোরে
অশ্রু ঝরছিলো। মায়ের মুখখানি নীলাভ রঙে মলিন ছিলো;
আজ সকালে ঘাটের কোণ থেকে কলমি শাক তুলতে গিয়ে
সাপে কামড়েছে। ওকে দুরে রেখেই মরে গেছে মা, ওঝা
অবশ্য এসেছিলো মৃত্যুর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে।
দুদিনের বেশি কাঁদার সময় পায়নি রিজু, আব্বা ওকে দিয়ে
এলো মেসে; পরীক্ষা যে দিতে হবে। এবারও কৃতিত্বের
সাথে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো রিজু, দেশের নামকরা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিরও সুযোগ পেলো।
রিজু এখন আরও বড়, আরও পরিণত চিন্তা-চেতনা ওর। দেশ-
বিদেশের তাবৎ ঘটনা, রাজনীতি, খেলাধুলা সম্পর্কে
বিস্তর জ্ঞান রাখে রিজু।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, অরাজকতা, দুর্নীতি, অবিচার,
শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে মন; এসবের প্রতিকার
নিয়ে ভাবে ও। সুখী-সমৃদ্ধ, শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ ও দেশ
গঠনের চিন্তা রিজুর মাথায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় অন্য বিভাগের
সুন্দরি এক মেয়ের প্রেমে পড়ে রিজু। সরল মনে মেয়েটিকে
ভালবাসার কথা জানায়। শিরিন রাজী হয়ে যায়, নাকটা একটু
বেশি চোখা হলেও ‘দেখতে’ বেশ স্মার্ট রিজু। রিজুর
প্রেমময় জীবন শুরু হয়।
তারপর একটু একটু প্রেম আর একটু একটু পড়াশোনার চাপে
দুবছর কেটে যায়। রিজু সব ভুলে গিয়ে একপেশে জীবনে
অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। রেজাল্ট ও এক দুঃসম্পর্কের মামার
জোরে চাকরি নেয় একটি বেসরকারি ব্যাংকে।
ভালোই বেতন, আব্বার অনুমতি নিয়ে শিরিনকে বিয়েও করা
হয়ে গেলো। শহরের অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে
দাম্পত্যজীবন শুরু হলো, আব্বাকেও ডেকে নিলো শহরে।
বাসা থেকে অফিসে যেতে আর অফিস করে বাসায় ফিরতে
অনেকগুলো বছর কেটে গেলো। এর মাঝে আব্বাকে
হারিয়েছে আর শিরিনের গর্ভ হতে দুইজন আব্বা ও একজন
মা পেয়েছে রিজু।
রিটায়ারমেন্টের সময়ও ঘনিয়ে এলো। পাকা চুল-দাড়ি
বয়সটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে জনাব রেজোয়ান শরীফের।
ছেলেেময়েগুলো বড় হয়েছে; বড় ছেলে চাকরি করে, মেয়ের
বিয়ে দেয়া হয়েছে ভাল পাত্র দেখে আর ছোট ছেলেটি
এখনো পড়ে। তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন চাকরি জীবনে
জমানো টাকা আর কিছু ব্যাংক-লোন নিয়ে শহরের
এককোণে একটি বাড়ি করার। টাকার ব্যবস্থা হচ্ছিলো, প্লট
রেডি।
একদিন ভোরে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায় তার। বুকের বা-দিকটায়
অসহ্য ব্যথা, হাত দিয়ে ঠেলে স্ত্রী শিরিন শারমীনকে
জাগিয়ে তুললেন তিনি। স্ত্রী কিছু না বুঝে উঠেই
-স্বপন, কবির বাবারা তারাতারি এ ঘরে আয়, তোদের
বাবার কী হলো দেখ!
-কবির তুই এ্যাম্বুলেন্স ডাক, হাসপাতালে নিতে হবে। হার্ট
এ্যাটাক!
এ্যাম্বুলেন্স আনা হলো, হাসপাতালে নেয়া হলো জনাব
রেজোয়ান শরীফকে।
খানিকবাদে কর্মরত ডাক্তার জানালেন,
-দুঃখিত, ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক ছিলো; আমরা অনেক
চেষ্টা করেছি। উনি আর নেই।
বদর মোল্লার চান্দি ফাটিয়ে প্রতিশোধ নেবার জন্য, ফুটবল
খেলার জন্য, গরীব-দুঃখীদের কষ্ট দুর করার জন্য, সুখী-সমৃদ্ধ
ও শোষণ-বঞ্চনাহীন দেশ গড়ার জন্য আর একটি বাড়ি করার
জন্য ঢের সময় আছে এখন। শুধু জনাব রেজোয়ান শরীফ(রিজু)
আর নেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − 83 =