দর্শনের সহজ পাঠ – ৩ : অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান (প্রথম পর্ব)


দর্শনের সহজ পাঠ – ৩
অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান (প্রথম পর্ব)

‘একটি কোকিল মানেই বসন্ত নয়’ – আপনি ভাবতেই পারেন এমন কোনো বাক্য হয়তো এসেছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার অথবা অন্য কোনো মহান কবির কবিতা থেকে। শুনলে মনে হতে পারে সেটাই তো হওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবিকভাবে বাক্যটিকে আমরা খুজে পাবো ‘দ্য নিকোম্যাকিয়ান এথিকস’ নামে অ্যারিস্টোটল এর একটি বইতে। বইটির নাম এরকম হবার কারণ এটি অ্যারিস্টোটল উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর ছেলে নিকোম্যাকাসকে ( নিকোম্যাকাস এটি সম্পাদনাও করেছিলেন)। এই বাক্যটি দিয়ে তিনি যা বোঝাতে চাইছিলেন সেটি হচ্ছে, বসন্ত কিংবা গ্রীষ্ম এসেছে সেটি প্রমান করার জন্য একটি মাত্র কোকিলের আগমনের চেয়েও আরো বেশী কিছুর প্রয়োজন আছে এবং একটি উষ্ণ দিন, বা অল্প কিছু মহুর্তের আনন্দ আর সত্যিকারের সুখ কিন্তু এক নয়। অ্যারিস্টোটলের কাছে সুখ মানে ক্ষণিকের জন্য অনুভূত আনন্দের কোন বিষয় ছিল না। বিস্ময়করভাবে, তিনি ভাবতেন যে, শিশুরা কখনোই সুখী হতে পারেনা। তার এই কথাটি শুনলে অামাদের খুব অদ্ভুত মনে হতে পারে, কারণ যদি শিশুরাই সুখী হতে না পারে, তাহলে কে পারে? কিন্তু তার এই প্রস্তাবটি স্পষ্ট করে ‘সুখ’ সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গিটি আসলে আমাদের থেকে কতটা ভিন্ন। শিশুরা কেবলই তাদের জীবন শুরু করেছে, সুতরাং কোনো অর্থেই বলা যাবেনা তারা পুরোপুরি জীবনের আস্বাদ পেয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, সত্যিকার সুখের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ জীবন।

অ্যারিস্টোটল ছিলেন প্লেটো ছাত্র, আর প্লেটো ছিলেন সক্রেটিসের ছাত্র। সুতরাং মহান এই তিন দার্শনিক একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খল তৈরী করেছিল, সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টোটল। এবং প্রায়শই সেটাই ঘটে থাকে, প্রতিভাবানরা সাধারণত শূন্য থেকে আবির্ভূত হননা। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাদের জীবনে দেখা মেলে কোন না কোন এক অনুপ্রেরণা দেবার মত শিক্ষক। কিন্তু এই তিনজনের প্রত্যেকের ভাবনাই ছিল পরস্পর থেকে ভিন্ন। তারা কেউই তোতা পাখির মত তাদের শিক্ষকের কাছে যা শিখেছিলেন শুধু তারই পুনরাবৃত্তি করে যাননি। প্রত্যেকের চিন্তারই একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। খুব সহজভাবে যদি বলি, সক্রেটিস অসাধারণ ছিলেন তার কথোপকথনে, প্লেটো ছিলেন অসাধারণ একজন লেখক, আর অ্যারিস্টোটলের অসাধারণ কৌতুহলী মন অনুসন্ধান করেছে সবকিছু। সক্রেটিস এবং প্লেটো পৃথিবীকে ভাবতেন সত্যিকার বাস্তবতার একটি ফ্যাকাশে প্রতিফলন হিসাবে, যে বাস্তবতাটির স্বরুপ অনুসন্ধান শুধুমাত্র সম্ভব হতে পারে নৈর্ব্যক্তিক দার্শনিক ভাবনা দ্বারা। এর ব্যতিক্রম, অ্যারিস্টোটল, তার চারপাশে বিদ্যমান সবকিছুর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান নিয়েই আবিষ্ট ছিলেন তাঁর পুরোটা জীবন।

দূর্ভাগ্যজনকভাবে, অ্যারিস্টোটলের বেশীর ভাগ লেখাই টিকে আছে লেকচার নোট এর আকারে। কিন্তু তারপরও তার চিন্তার এই লিপিবদ্ধ বিবরণ পশ্চিমা দর্শনের উপর এখনও তার প্রভাব বজায় রেখেছে, যদিও তার লেখার শৈলী প্রায়শই শুষ্ক। কিন্তু তিনি শুধু একজন দার্শনিকই ছিলেন না, প্রাণিবিজ্ঞান,জ্যোতির্বিজ্ঞান,ইতিহাস,রাজনীতি এবং নাটক ইত্যাদি বহু বিষয়েও তিনি আগ্রহী ছিলেন। ৩৮৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মেসিডোনিয়ায় তিনি জন্ম গ্রহন করেছিলেন ( তখন মেডিসোডনিয়া ছিল গ্রীকদের দখলে), প্লেটোর শিক্ষার্থী হিসাবে কিছুদিন পড়াশুনা করার পর, বিভিন্ন দেশ ঘুরে অবশেষে তিনি কিছুদিন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট এর শিক্ষকের দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে এথেন্সে ফিরে এসে তার নিজের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, লাইসিয়াম। সেই সময়ে লাইসিয়াম ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত জ্ঞানপীঠ, কিছুটা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতই। সেখান থেকেই তিনি গবেষকদের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিতেন, তাদের কাজ ছিল রাজনীতি থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান যে কোন বিষয়ে কিছু না কিছু নতুন তথ্য সংগ্রহ করে আনা। একই সময় সেখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরীও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রেনেসাঁ পর্বের শিল্পী রাফায়েল এর একটি বিখ্যাত দেয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো আছে, দ্য স্কুল অব এথেন্স, যেখানে আমরা প্লেটোকে উপরের দিকে নির্দেশ করতে দেখি তার বিশুদ্ধ ফর্মের দিকে, এর ঠিক বীপরিত, অ্যারিস্টোটল দৃষ্টি আমরা দেখি তার সামনেই বাস্তব পৃথিবীর দিকে।

প্লেটো হয়তো সন্তুষ্ট ছিলেন এক জায়গায় বসে সব বিষয় নিয়ে দার্শনিক প্রস্তাবনা ও আলোচনা করার জন্য, কিন্তু অ্যারিস্টোটল বাস্তব এই পৃথিবীকে যা আমরা আমাদের সব ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করি, সেটি পর্যবেক্ষন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তার শিক্ষকের থিওরী অব ফর্ম বা সবকিছুর একটি আদর্শ নিখুঁত রুপ আছে এমন প্রস্তাবনা সমর্থন করেননি কখনো। এর পরিবর্তে তিনি বিশ্বাস করতে কোনো একটি সাধারণ শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত কোনো কিছুকে বুঝতে হলে, সেই শ্রেনীর কোনো একটি সুনির্দিষ্ট উদহারণকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আমাদের দেখতে হবে। সুতরাং একটা বিড়াল আসলে কি সেটা বোঝার জন্য অ্যারিস্টোটল ভাবতেন সত্যিকারের কোনো বিড়ালের দিকেই আমাদের তাকানো উচিৎ, নৈর্ব্যক্তিকভাবে কোন বিড়ালের ফর্মের কথা না ভেবে।

একটি প্রশ্ন যা অ্যারিস্টোটলকে বেশ ভাবিয়েছিল, সেটি হচ্ছে, আমাদের কেমন করে বাঁচা উচিৎ? তার আগে এই প্রশ্ন সক্রেটিস এবং প্লেটোও করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজনীয়তা মূলত মানুষকে দর্শনের দিকে আকৃষ্ট করে। এই প্রশ্নের উত্তরে অ্যারিস্টোটলের একটি নিজস্ব উত্তর আছে, সেই উত্তরের খুব সরলতম সংস্করণটি হচ্ছে: সুখের অনুসন্ধান করা।

কিন্তু সুখের অনুসন্ধান করা – এই বাক্যটি কি আসলে বোঝাচ্ছে? আজ বেশীর ভাগ মানুষকে উপদেশ দেয়া হয় সুখ খোজার জন্য তাদের এমন কিছু উপায় অনুসন্ধান করতে হবে, যা করলে তারা নিজেদেরকে তৃপ্ত করতে পারবে। হয়তো সুখ আপনার জন্য কোনো সুন্দর জায়গায় ছুটি কাটানোর সাথে সংশ্লিষ্ট, অথবা কোনো সঙ্গীতের অনুষ্ঠান বা পার্টিতে যাওয়া অথবা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো ইত্যাদি। এমনকি এর মানে হতে পারে আপনার প্রিয় বইটা নিয়ে আরাম করে কোথাও বসে পড়া, অথবা কোনো শিল্পকলার প্রদর্শনী দেখতে যাওয়া। কিন্তু যদিও এই সবকিছুই একটি উপভোগ্য জীবনের অংশ হতে পারে ঠিকই, তবে তিনি অবশ্যই বিশ্বাস করতেন না যে এভাবে বাইরে বের হয়ে আনন্দ খোঁজা, বেঁচে থাকার সবচেয়ে ভালো কোন উপায় হতে পারে। কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব কিছু শুধুমাত্র এর নিজ গুণে একটি ভালো জীবনের নিশ্চয়তা দেয়না। যে গ্রীক শব্দটি প্লেটো ও অ্যারিস্টোটল ব্যবহার করেছিলেন তার ‘সুখ’ বোঝাতে, সেটি হচ্ছে ইউডাইমোনিয়া (Eudaimonia); তবে প্রায়ই অ্যারিস্টোটলের লেখায় শব্দটি অনূদিত হয়, ‘সুখ’ এর বদলে বরং ‘সফলতা’ বা ‘সমৃদ্ধি লাভ করা’ হিসাবে। কিন্তু আসলেই এটি – ধরুন আপনার পছন্দের ফ্লেভার দেয়া আইসক্রিম বা আপনার প্রিয় দলের খেলা জিততে দেখলে যে ধরণের আনন্দময় অনুভূতি হয় – তার থেকেও কিছুটা বেশী। ইউডাইমোনিয়া মানে ক্ষনিকের আনন্দ বা কিভাবে আপনি অনুভব করছেন সেই বিষয়টি নয়, এটি এর চেয়ে আরো বেশী চিন্তা নিরপেক্ষ বাস্তব কোনো কিছু। এটি বেশ কঠিন বোঝা কারণ, আমরা কি অনুভব করছি শুধুমাত্র তার সাথেই সুখকে সংশ্লিষ্ট করতে আমরা খুব বেশী অভ্যস্ত এবং তার বাইরে আমরা বেশী কিছু ভাবতে পারিনা।

একটি ফুল গাছের কথা ভাবুন, আপনি যদি যত্ন করে তাকে পানিতে রাখেন, যথেষ্ট পরিমান আলো দেন, সামান্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, এটি ঠিক মত বেড়ে উঠবে এবং ফুল ফুটবে। আপনি যদি এটিকে অবহেলা করেন, অন্ধকারে রেখে দেন, এর পাতাগুলো পোকামাকড়কে খেতে সুযোগ করে দেন, এটিকে শুকিয়ে যেতে দেন, এটিও ক্রমেই দূর্বল হয়ে মারা যাবে, অথবা নিদেনপক্ষে এটি রুপান্তরিত হবে অনাকর্ষণীয় একটি উদ্ভিদে। মানুষও গাছের মতই ভালো বা খারাপ ভাবে বিকশিত হতে পারে, যদিও গাছের ব্যতিক্রম আমরা আমাদের নিজেদের জন্যই সিদ্ধান্ত নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরা কি করতে চাই এবং হতে চাই। অ্যারিস্টোটল দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলেন যে, মানব প্রকৃতি বলে নিশ্চয়ই কিছু আছে এবং তিনি যেমন করে লিখেছিলেন, এবং মানুষের কিছু নির্দিষ্ট ধরণের কাজ আছে, এবং মানুষ হিসাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে মানানসই হয়, এমন কোন বাঁচারও উপায় আছে। অন্য যে কোনো জীব বা আর অন্য সব কিছু থেকে যা আমাদের আলাদা করে, সেটি হচ্ছে আমরা চিন্তা করতে পারি এবং আমাদের কি করা উচিৎ এই বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এখান থেকেই তিনি উপসংহারে আসেন কোন একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে সেরা জীবন হবে সেটি, যেখানে আমরা আমাদের যুক্তির শক্তি ব্যবহার করতে পারি।

(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি

(১) Roman copy in marble of a Greek bronze bust of Aristotle by Lysippus, c. 330 BC.
(২) The School of Athens (Italian: Scuola di Atene) is one of the most famous frescoes by the Italian Renaissance artist Raphael. It was painted between 1509 and 1511 as a part of Raphael’s commission to decorate the rooms now known as the Stanze di Raffaello, in the Apostolic Palace in the Vatican.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 + = 40