দর্শনের সহজ পাঠ – ৩ অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান ( দ্বিতীয় পর্ব)

?oh=1722aa5b7176fe4edb54cdaf39aa7ed6&oe=583BE466″ width=”400″ />
দর্শনের সহজ পাঠ – ৩
অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান (দ্বিতীয় পর্ব)

বিস্ময়করভাবে, অ্যারিস্টোটল বিশ্বাস করতেন, যে বিষয়গুলো সম্বন্ধে আপনার কোনো কিছু জানা নেই বা জানা সম্ভবও না – যেমন এমনকি আপনার মৃত্যুর পরে ঘটা কোনো ঘটনাও -আপনার ইউডাইমোনিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষয়টি শুনতে বেশ অদ্ভুত মনে হচ্ছে তাই না। যদি ধরে নেই মুত্যুর পরে কোনো জীবন নেই, তাহলে আপনি যখন বেঁচে থাকবেন না, তখন ঘটা এমন কোনো কিছু কিভাবে আপনার ‘সুখের’ উপর প্রভাব ফেলতে পারে? বেশ, ধরুন, আপনি কোনো সন্তানের পিতা কিংবা মা, আংশিকভাবে আপনার সুখ নির্ভর করছে সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আপনার আশা-আকাঙ্খার উপর। যদি, দুঃখজনকভাবে, আপনার নিজের মৃত্যুর পর যদি সেই সন্তান গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়, তাহলে আপনার ইউডাইমোনিয়া এটি দ্বারা প্রভাবিত হবে। অ্যারিস্টোটলের দৃষ্টিভঙ্গিতে, আাপনার জীবন আরো দুঃসহ হয়ে উঠবে, এমনকি যদিও, আপনি আসলেই জানতে পারবেন না আপনার সন্তানের অসুস্থতার কথা এবং আপনিও আর জীবিত নন। এটি বেশ সুন্দরভাবে সুখ সংক্রান্ত তার ধারণাটিকে ব্যাখা করে, সুখ সেই অর্থে আপনার জীবনের সম্পুর্ণ অর্জন, এমন কিছু যাকে প্রভাবিত করতে পারে আপনি যাদের ভালোবাসেন তাদের সাথে কি ঘটছে তার উপরেও। নানা কিছু যা কিনা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, আপনার জানা নেই এমন কোনো জ্ঞানও তা প্রভাবিত করে। আপনি সুখি কিংবা অসুখি, সেটি অাংশিকভাবে নির্ভর করে সৌভাগ্যের উপর।

মূল প্রশ্নটি হচ্ছে: আমরা কি করতে পারি আমাদের ইউডাইমোনিয়া’র সম্ভাবনা বাড়াতে? অ্যারিস্টোটলের উত্তর ছিল: ‘সঠিক ধরনের চরিত্র গড়ে তোলা।’ সঠিক সময়ে আপনাকে সঠিক ধরনের আবেগ অনুভব করতে হবে এবং এটাই আপনার সঠিক আচরণ নিশ্চিৎ করবে। আংশিকভাবে আপনি কিভাবে প্রতিপালিত হয়েছেন সেটার উপরও বিষয়টি নির্ভর করবে, কারণ ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার সেরা উপায়টি হচ্ছে খুব অল্প বয়স থেকেই সেটি অনুশীলন করা। সুতরাং এখানেও ভাগ্যের হাত আছে। ভালো ধরনের আচরণগুলো সদগুণ আর খারাপগুলোই হচ্ছে অনাচার।
যুদ্ধের সময় সাহসিকতার সদগুনটির কথা ভাবুন। হয়তো কোনো একজন সৈন্যর জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে কিছু বেসামরিক জনতাকে আক্রমনরত সেনাবাহিনী থেকে রক্ষা করার জন্য তার নিজের জীবনকে ঝুকিপূর্ণ কোনো এক পরিস্থিতিতে ফেলা। কোনো বেপরোয়া সাহসী ব্যক্তি, যার নিজের জীবনের নিরাপত্তার ব্যপারে কোনো খেয়াল নেই, সে হয়তো যে কোনো বিপদজ্জনক পরিস্থিতিতে ঝাপিয়ে পড়ে, এমনকি এমন কোনো সময়েও যখন সেটা করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু সেটা সত্যিকারের সাহসিকতা নয়, শুধুমাত্র বেপরোয়া ঝুকি নেয়া। এর অন্যপ্রান্তে আছে, কোন ভীরু সৈন্য, যে তার ভয়কে যথেষ্ট পরিমানে জয় করতে পারেনা এমন কোন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে আচরণ করার জন্য। এবং যখন তাকে সবচেয়ে প্রয়োজন সেই বিশেষ মুহুর্তেই হয়তো সে ভয়ে অবশ হয়ে যাবে। একজন সাহসী মানুষ এই পরিস্থিতিতে ঠিকই ভয় অনুভব করবে, কিন্তু সেই ভয়কে সে জয় করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। অ্যারিস্টোটল ভাবতেন যে কোন সদগুনই অবস্থান করে এধরনের দুটি চরম প্রান্তের মাঝামাঝি কোন স্থানে। এখানে সাহসিকতা, ভীরুতা ও বেপরোয়া সাহসিকতার মাঝামাঝি অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে এটিকে বলা হয় অ্যারিস্টোটল এর ডকট্রিন অব দি গোল্ডেন মিন (Doctrine of the golden mean) বা আদর্শ গড় এর মতবাদ।

নৈতিকতার প্রতি অ্যারিস্টোটলে দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র ঐতিহাসিকভাবে কৌতুহলের ব্যাপার না। বহু আধুনিক দার্শনিকও বিশ্বাস করেন, সদগুন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত তার দৃষ্টিভঙ্গিটি সঠিক, এবং সুখ সংক্রান্ত বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিটিও ছিল সঠিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী। জীবনের আনন্দ বাড়াবার উপায়গুলো খোজার পরিবর্তে, তারা মনে করেন, আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিৎ ভালো মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করা এবং সঠিক কাজটি করা। এবং এটাই জীবনকে সুন্দর ও সুখী করে তোলে।

এই সবকিছুই শুনলে মনে হয় যেন অ্যারিস্টোটল একক ব্যাক্তির ব্যক্তিগত জীবনের বিকাশ বা উন্নতিতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তিনি বিষয়টি বলেছিলেন আরো বড় পরিসরের কথা ভেবে। তিনি যুক্তি দেন, মানুষ হচ্ছে রাজনৈতিক জীব, আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি কাজ হচ্ছে অন্য মানুষের সাথেও ভালোভাবে বাস করার মত উপযুক্ত হওয়া এবং আমাদের একটি ন্যায়বিচার নিশ্চিৎ করার পদ্ধতিরও প্রয়োজন, যা আমাদের প্রকৃতির খারাপ দিকগুলোর সাথে বোঝাপড়া করতে আমাদের সাহায্য করবে। ইউডাইমোনিয়া শুধুমাত্র অর্জন করা সম্ভব কোন একটি সমাজের অভ্যন্তরে কাটানো সংশ্লিষ্ট সমগ্র জীবনে। আমরা একসাথে বাস করি এবং আমাদের সুখ খোজা প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে আমাদের চারপাশে সবার সাথে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।

অ্যারিস্টোটলের দুর্দান্ত মেধার একটি দুর্ভাগ্যজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে যদিও। তিনি খুবই বুদ্ধিমান ছিলেন, এবং তার গবেষনা এত বেশী গভীর এবং বিস্তারিত ছিল, যে অনেকেই যারা তার লেখা পড়েছেন বিশ্বাস করতেন তিনি সব বিষয়ে ঠিক কথা বলেছেন। আর এটি প্রগতির জন্য সহায়ক ছিলনা, সক্রেটিসের সূচনা করা দর্শনের ঐতিহ্যবাহিকতার ধারাতেও সেটি মঙ্গলজনক নয়। তার মুত্যুর পর বহু শতাব্দী বেশীর ভাগ গবেষকই পৃথিবী সম্বন্ধে তার সব দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নাতীতভাবে সত্য হিসাবে গ্রহন করে নিয়েছিলেন। যদি তারা কোনভাবে প্রমাণ করতে পারতেন, অ্যারিস্টোটল এই কথা বলেছেন, তাদের জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল, এবং এটাকে মাঝে মাঝে বলা হয়, ‘ট্রুথ বাই অথরিটি’ বা কোন কিছুকে সত্য বলে বিশ্বাস করা কারণ কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা কেউ এটিকে সত্য বলেছে ।

কি ঘটতে পারে যদি আপনি একই আকারের একটুকরো কাঠ আর একটুকরো ভারী কোন ধাতু কোন একটি উচু জায়গা থেকে নীচে ফেলেন? কোনটি আগে মাটিতে পড়বে? অ্যারিস্টোটল ভেবেছিলেন, যেটা ভারী, যেটা বানানো হয়েছে ভারী ধাতু দিয়ে সেটি আগে মাটিতে পড়বে। কিন্তু আমরা জানি সেরকম ঘটে না, তারা একই গতিতে মাটিতে পড়ে যখন তাদের উপর কাজ করা অন্য বলগুলোকে নিরপেক্ষ করা যায় ।কিন্তু যেহেতু অ্যারিস্টোটল বলেছেন এটাই সত্যি, পুরো মধ্যযুগ ধরে প্রায় সবাই ভেবেছেন এটাই অবশ্যই সত্যি। আর কোনো প্রমানের দরকার পড়েনি। যদিও মনে করা হয় ষোড়শ শতাব্দীতে গ্যালিলিও গ্যালিলেই পিসার হেলানো টাওয়ারের উপর থেকে একটি কাঠের বল আর একটি কামানের বল একই সাথে নীচে ফেলেছিলেন এই বিষয়টিকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য। দুটোই একই সাথে মাটিতে পড়েছিল। সুতরাং অ্যারিস্টোটল তাহলে ঠিক বলেননি। কিন্তু বহু আগেই এই পরীক্ষাটি খুব সহজে যে কেউই করতে পারতেন। তবে যুগান্তকারী সেই পরীক্ষাটি পিসার হেলানো টাওয়ারে আসলে ঘটেনি, এই কাহিনীটির সূচনা করেছিলে গ্যালেলিওর ছাত্র সহকারী ভিনসেনজিও ভিভিয়ানি (১৬২২-১৭০৩),

অ্যারিস্টোটলের প্রস্তাবনা ছিল ভারী কোনো বস্তু দ্রুত নীচে পড়বে কোনো হালকা বস্তু অপেক্ষা, কিন্তু গ্যালিলিওর প্রস্তাবনা ছিল একই পদার্থ দিয়ে তৈরী দুটি বস্তু একই মাধ্যমে একই গতিতে নীচে পড়বে। বেশীর ভাগ বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা মনে করেন গ্যালিলিও এই ধারণায় পৌছেছিলেন একটি চিন্তার পরীক্ষার মাধ্যমে, তার বই On Motion তিনি কল্পনা করেছেন দুটি ভিন্ন ওজনের বস্তু, একই হালকা ও অন্যটি ভারী, তবে দুটোই পরস্পরের সাথে সুতো দিয়ে বাধা, কোনো একটি টাওয়ারের উপর থেকে যদি এটাকে নীচে ফেলে দেয়া হয়, যদি আমরা ধরে নেই যে ভারী বস্তুটি আগে মাটিতে পড়বে ( এবং হালকাটি পরে ধীরে), তাহলে দুটির মধ্যকার সুতোটি টান টান হয়ে ভারী বস্তুর পতনের গতিকে হ্রাস করবে, কিন্তু পুরো সিস্টেমটাই ভারী বস্তুটির একার চেয়ে ভারী, তাহলে তো তার আরো জোরে নীচে পড়ার কথা। এই স্ববিরোধীতাই প্রমান করে এই ধারণাটি ভুল। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ James Robert Brown এটি বলেছেন the most beautiful thought experiment ever devise.. ( এটি চমৎকার ভাবে পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন বৃটিশ পদার্থবিদ ব্রায়ন কক্স, ভিডিওটি এখানে)

অন্য কারো মতামত আর কর্তৃত্বের উপর নির্ভর করে কোন কিছু মেনে নেয়া ছিল এমনকি অ্যারিস্টোটলের গবেষনারও মূল প্রাণশক্তির বিরুদ্ধে, এটি দর্শনের মুল চালিকা শক্তিরও বিরুদ্ধে। কোনো কর্তৃত্ব নিজেই কোনো কিছু প্রমান করতে পারেননা। অ্যারিস্টোটলের নিজের পদ্ধতি ছিল, পরীক্ষা, গবেষণা এবং সুস্পষ্ট যুক্তি। দর্শন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বিতর্কের জন্য, ভূল প্রমানিত হবার সম্ভাবনায়, প্রতিদ্বন্দী দৃষ্টিভঙ্গীকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে। সৌভাগ্যক্রমেই, প্রতিটি যুগেই দার্শনিকরা ছিলেন তারা গভীরভাবে নিরীক্ষাধর্মী পর্যালোচনা করেছেন, যা কিনা অন্য মানুষরা তাদের বলেছেন অবশ্যই বিশ্বাস করার জন্য।

(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি:

(১) Statue of Aristotle in Aristotle’s Park (Located high in the mountains of Halkidiki called Holomontas (Cholomontas) Sithonia in Halkidiki, Macedonia, Northern Greece;

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 16