দর্শনের সহজ পাঠ – ৩ অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান ( শেষ পর্ব)


অ্যারিস্টোটল – সত্যিকারের সুখের অনুসন্ধান ( শেষ পর্ব)

অ্যারিস্টোটল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক, তাকে যেমন বলা হয় ‘master’ এবং শুধু দ্য ‘philosopher’; তার একটি বড় দ্বায়িত্ব ছিল আলেক্সাণ্ডার দ্য গ্রেট শিক্ষক হিসাবে কাজ করা, যিনি পরে সেই সময়ে পরিচিত বিশ্বের পুরোটা জয় করতে অভিযানে বের হয়েছিলেন। অ্যারিস্টোটল পড়াশুনা করেছিলেনে এথেন্সে, প্লেটোর সাথে কয়েক বছর থাকার পর তিনি নিজেই তার নিজের পথ খুজে নিয়েছিলেন। নিজের গবেষণা আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Lyceum ( ফ্রান্সের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোকে বলা হয় lycée, এই নামটি তার এই প্রচেষ্টাকে সন্মান জানিয়েছে) এ তিনি যখন পড়াতেন বা কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা করতেন তাকে দেখা যেত শিক্ষার্থীর দিয়ে বিভিন্ন দিকে হাটতে, তার অনুসারীদের বলা হতো Peripatetics, নামটি এসেছে Peripatos থেকে, এথেন্সে যেখানে তার লাইসিয়ামে যেখানে অনুসারী জড়ো হতেন সেটাই peripatoi বা colonnades ( দীর্ঘ লম্বা স্তম্ভের সারি যা উপরে ছাদ দিয়ে ঢাকা থাকতো), কিন্তু গ্রীক আরেকটি শব্দ আছে peripatetikos, যা অর্থ হাটা, অ্যারিস্টোটলের মৃত্যুর পর প্রচলিত হয়েছিল তিনি হেটে হেটে লেকচার দিতেন, আর অনুসারীরা তাই পরিচিত হয়েছিলেন Peripatetics নামে। পরে এটাই তার স্কুলের নামের মূল কারণকে প্রতিস্থাপিত করেছে।

তার বেশীর ভাগ বইই মূলত লেকচার নোটস। তিনি খুবই কৌতুহলী ছিলেন কিভাবে সব কিছু কাজ করে সেটি জানার জন্য। যেমন, কিভাবে একটি মুরগীর ছানা ডিমের মধ্যে গড়ে ওঠে? কিভাবে স্কুইডরা বংশ বিস্তার করে? কেন কোনো একটি উদ্ভিদ কোনো জায়গায় খুব ভালোভাবে বাড়ে, আর কোন জায়গায় আদৌ পারে না বাড়তে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কোন বিষয়গুলো মানুষের জীবন ও সমাজকে পরিপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দে রাখে? অ্যারিস্টোটলের জন্য দর্শন হচ্ছে ব্যবহারিক জ্ঞ্যান। তিনি চারটি প্রধান দার্শনিক প্রশ্নের ‍উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিলেন –

১ মানুষকে সুখী করে কি?

তার Nicomachean Ethics বইটিতে, অ্যারিস্টোটল চেষ্টা করেছিলেন সেই নিয়ামকগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য, যা কোনো মানুষের পরিপূর্ণ সুখী জীবনের কারণ হতে পারে অথবা পারেনা। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন ভালো ও সফল মানুষদের সবারই সুনির্দিষ্ট কিছু ভার্চু বা সদগুণ আছে এবং প্রস্তাব করেন যে আমাদের উচিৎ সেই সদগুণগুলোকে শনাক্ত করতে ক্রমশ দক্ষ হয়ে ওঠা, যেন আমরা সেগুলো লালন করতে পারি আমাদের মধ্যে ও অন্যদের মধ্যে যখন সেগুলো দেখবো যেন আমরা সেগুলো সন্মাণ করতে পারি। অ্যারিস্টোটল আরো লক্ষ্য করেছিলেন, প্রতিটি সদগুণ মনে হয় যেন দুটি খারাপ গুণের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করে। এটি সেই জায়গাটা দখল করে যার নাম তিনি দিয়েছিলেন, চরিত্রের দুটি চুড়ান্ত অবস্থার সোনালী গড় বা the golden mean, যেমন তার Ethics এর চতুর্থ খণ্ডে কথোপকথনের সদগুণ আর খারাপগুণ – wit, buffoonery and boorishness (বা বুদ্ধিমত্তা, ভাঁড়ামী আর বর্বরতা) এর শিরোনামের অধীনে অ্যারিস্টোটল আলোচনা করেছিলেন পরস্পরের সাথে কথা বলার সময় আমার কিভাবে আরো ভালো বা আরো খারাপ আচরণ প্রদর্শন করতে পারি।

তিনি মনে করতেন ভালো একটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে কিভাবে সুন্দরভাবে কথাবার্তা বলা যায় সেটি জানা। কিছু মানুষ সেটি পারে না কারণ তাদের সূক্ষ্ম রসবোধের ঘাটতি আছে: সেটি বিরক্তি উৎপাদন করে, তিনি লিখেছিলেন তিনি সামাজিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় সে কোনো অবদান রাখতে পারে না এবং সব কিছুতে সে নিজেকে অপমানিত বোধ করে’। কিন্তু অন্যরা আবার রসিকতাকে মাত্রাহীন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায়: যারা ভাঁড়ামী করে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা রসিকতা করা থেকে, তারা যেমন নিজেদেরও ছাড় দেয়না, তেমনি অন্য কাউকে না, যদি না অবশ্যই তিনি হাসির উদ্রেক করতে পারেন শ্রোতাদের মধ্যে এমন কিছু বলে, যা রুচিশীল কোনো মানুষ বলার জন্য স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। সুতরাং তার মধ্যে সদগুণ সম্পন্ন মানুষটি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে এই ক্ষেত্রে গোল্ডেন মিন এর অবস্থান করছে – রসবোধ সহ বিদগ্ধ কিন্তু বিচক্ষণ। অ্যারিস্টোল ব্যক্তিত্ব ও আচরণের একটি বিস্ময়কর জরিপ করেছিলেন, তিনি বহু সদগুণকে বিশ্লেষণ করেছিলেন, তিনটি ভাগে – ‘too little’, ‘too much’ আর ‘just right’; যেমন – ভয় বেশী বা ভীতুদের সেই খারাপ গুণের মধ্যে too much আছে লজ্জা, আর সদগুণ Courage (বা সাহস), যেখানে too little থাকে অতি দূঃসাহস ও অপরিনামদর্শিতা, আরেকটি উদহারণ যেমন খারাপগুণ রাগ,যেখানে too much আছে কথাকথায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রেগে যাওয়া, আর সদগুণ Good Temper বা ভালো মেজাজে too little থাকে অসাড়তা আর নির্লিপ্ততা।

তিনি বলেছিলেন আমরা আমাদের আচরণ এই ক্ষেত্রগুলোকে কখনোই পরিবর্তন করতে পারবো না খুব অনায়াসে। তবে পরিবর্তন সম্ভব, ধীরে। নৈতিক সদগুণ, অ্যারিস্টোটল বলেছিলেন, আসলেই অভ্যাসের পরিণতি। সময়, অনুশীলন আর উৎসাহের দরকার। সুতরাং তিনি ভাবতেন, যে মানুষদের সদগুণ নেই তাদেরকে হতভাগ্য হিসাবে বুঝতে হবে, খারাপ ভাবার চেয়ে। তাদের যা দরকার সেটি ভৎর্সনা কিংবা জেলখানা নয়, বরং আরো ভালো শিক্ষক ও নৈতিক পথনির্দেশনা।

২. শিল্পকলা কিসের জন্য:

সেই সময় শিল্পকলার যে ক্ষেত্রটি সুপারহিট ছিল এথেন্সবাসীদের মধ্যে সেটি হচ্ছে ট্রাজেডি, ভয়ঙ্কর সব নাটক তারা দেখতো মেলায় উন্মুক্ত মঞ্চে। ঘরে ঘরে পরিচিত নাম ছিল ইসকাইলাস, ইউরিপাইডেস আর সফোক্লিস। অ্যারিস্টোটল কিভাবে ভালো নাটক লেখা যায় এমন বিষয়ে একটি বই লিখেছিলেন The Poetics – বহু চমৎকার নির্দেশনা আছে সেখানে – যেমন: peripeteia ব্যবহার করা নিশ্চিৎ করতে হবে, ভাগ্যের পরিবর্তন, যখন নায়কের জন্য খুব ভালো একটি পরিস্থিতি রুপান্তরিত হবে খুবই ভয়াবহ একটি পরিস্তিতে, এছাড়াও দরকার anagnorisis – সেই নাটকীয় অনুধাবনের মুহূর্তটি যখন হঠাৎ করেই নায়ক বুঝতে পারবেন যে তার জীবনের সবকিছুই খুবই খারাপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং আসলেই – বাস্তবিকভাবেই একটি বিপর্যয়। কিন্তু ট্রাজেডি আসলেই কিসের জন্য? কেনই বা পুরো সমাজ একসাথে জড়ো হয় নাটকের প্রধান চরিত্রের সাথে ঘটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয়গুলো উপভোগ করার জন্য? যেমন ইডিপাস, সফোক্লিসের এই নাটকটি, যে দূর্ঘটনাবশত তার বাবাকে হত্যা করে, তার মাকে বিয়ে করে, এবং জানতে পারে এই সব কাজ সে করেছে, হতাশা আর অুনশোচনায় সে তার চোখ তুলে ফেলে।

এই প্রশ্নের অ্যারিস্টোটলের উত্তর ছিল catharsis, catharsis এক ধরনের পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া, আপনি খারাপ জিনিসগুলো বাদ দেবেন। এই ক্ষেত্রে এটি আমাদের আবেগের বিশুদ্ধিকরণ, বিশেষ করে ভয় আর করুণার অনুভূতি সংক্রান্ত আমাদের সংশয়গুলোর শুদ্ধিকরণ। আমাদের একটি প্রাকৃতিক সমস্যা আছে এখানে – আমরা কঠিন হৃদয়ের, আমরা যখন কাম্য তখন করুণা প্রদর্শন করিনা আর আমাদের প্রবণতা আছে ভয়কে বহুগুণে বাড়িয়ে প্রদর্শন করা অথবা আদৌ কোনো ভয় না পাওয়া। ট্রাজেডি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অনেক ভয়ঙ্কর জিনিসও লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে নিরপরাধ মানুষের জীবন, তার মধ্যে আমরাও হয়তো অন্তর্ভুক্ত। একটি সামান্য ক্রটি পুরো জীবনকে পরিবর্তিত করতে পারে। সুতরাং আমাদের খানিক বেশী সহমর্মিতা অথবা করুণা থাকা দরকার সেই সব মানুষদের প্রতি, যাদের কর্ম ভয়নকভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সম্মিলিতভাবে আমাদের পুনচিন্তা করাতে হবে এইসব গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলো নিয়মিতভাবে। শিল্পকলার কাজ, যেভাবে অ্যারিস্টোটল দেখেছিলেন, জীবনের এই গভীর সত্যগুলো যেন আমাদের মনকে স্পর্শ করে তার প্রচেষ্টা করা।

৩ বন্ধুদের কি দরকার?

Nicomachean Ethics এর অষ্টম ও নবম খণ্ডে, অ্যারিস্টোটল তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বন্ধুত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন: কিছু বন্ধুত্ব আছে যা ঘটে যখন প্রত্যেকেই আনন্দ খোজে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের নিজেদের জন্য আনন্দ অনুসন্ধান ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করা, যে সুযোগটি দেয় অন্যজন। কিছু বন্ধুত্ব আছে তারা আসলে কৌশলগত পরিচয়ের রুপ। তারা পরস্পরের সঙ্গ উপভোগ করে যতক্ষণ তারা সেখান থেকে সুবিধা আদায় করতে পারে। আরেকধরনের বন্ধুত্ব হচ্ছে সত্যিকারের – এমন কেউ যে ঠিক আপনার মত, কিন্তু এমনকেউ যে আপনি নন, কিন্তু তার জন্য আপনি ততটুকুই অনুভব করেন, যেমন আপনি নিজের জন্য করেন। সত্যিকারের বন্ধুর দুঃখ আপনারও দুঃখ, তাদের আনন্দ আপনাও। এটি আপনাকে আরো আক্রম্য অরক্ষিত করে, যদি সেই মানুষটার সাথে খারাপ কিছু ঘটে। কিন্তু এটি আপনাকে অনেক শক্তিও দেয়। আপনি আমরা ভাবনা ও চিন্তার ক্ষুদ্র কক্ষপথ থেকে মুক্ত হতে পারেন, একে অপরের জীবনের সম্প্রসারিত করেন, ‍একসাথে দুজনেই আপনারা অনেক বড়, বুদ্ধিমান আরো বেশী শক্তিশালী ও খোলা মনের মানুষের পরিণত হন। দুজনের সদগুণগুলো আপনার যেমন ভাগ করে নেন তেমন পরস্পরের দূর্বলতাগুলোকেও আপনার বাতিল করতে পারেন। এই বন্ধুত্ব আমাদের শেখায় আমাদের কি হওয়া উচিৎ। এটি আসলে আক্ষরিকভাবে, আমাদের জীবনের সেরা অংশ।

৪ কিভাবে আমাদের ধারণাগুলো ব্যস্ত এই পৃথিবীকে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?

বহু মানুষের মত, অ্যারিস্টোটল সেই সত্য দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, যে অনেক সময় সেরা যুক্তি বিতর্কে জেতে না বা জন সমর্থন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কেন এমন হয়, আর আমরা এ বিষয়ে আসলেই কি করতে পারি। পর্যবেক্ষণ করার বহু সুযোগ ছিল। এথেন্স বহু সিদ্ধান্ত নেয়া হতো উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে, প্রায়শই আগোরা বা বাজারে বা শহরের মূল চত্বরে। বক্তারা বিতর্ক করতেন মানুষের মতামত প্রভাবিত করার জন্য। অ্যারিস্টোটল লক্ষ্য করেছিলেন কিভাবে দর্শকরা প্রভাবিত হয় বহু নিয়ামক দ্বারা, কিন্তু তারা প্রস্তাবনার ‍যুক্তি আর বাস্তব তথ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট না। এটি আসলেই পাগল করে দেবার মত পরিস্থিতি, বহু গুরুত্বপুর্ণ মানুষ এটি সহ্য করতে পারতেন না। তারা সব বিতর্ক আর জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতেন। অ্যারিস্টোটল তবে বেশী উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন সেই বিষয়টি যাকে আমরা এখন বলি rhetoric। আপনার মতের পক্ষে কারো সমর্থন অর্জন করার ‍শিল্প। আমরা চাই ভালো চিন্তা করতে সক্ষম, আন্তরিক আর সুউদ্দেশ্য আছে এমন মানুষগুলো শিখুক কিভাবে তারা তাদের প্রস্তাবনা দিয়ে মানুষকে প্ররোচিত করতে পারেন, আর যারা এখনও একমত না কিভাবে তাদের কাছে তারা পৌছৈাতে পারেন। তিনি কিছু কালজয়ী প্রস্তাব করেছিলেন: আপনার প্রথমে মানুষের ভয়কে প্রশমিত করতে হবে, আপনাকে যে কোনো সমস্যার আবেগীয় দিকটিকে আগে দেখতে হবে, এখানে কি কারো গর্ব আর অহঙ্কারবোধ অপমানিত হবার সম্ভাবনা আছে? তারা কি বিব্রত অনুভব করছে? এবং সেভাবেই বিষয়টিকে মসৃণ করে উপস্থাপন করতে হবে। আপনাকে একই সাথে কিছু হাস্যরসের যোগ করতে হবে কারণ মনোযোগের ব্যপ্তিকাল খুব সংক্ষিপ্ত। আপনাকে হয়তো উদহারণ বা অন্য কিছু ব্যবহার করতে যেন আপনার প্রস্তাবনাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

( অ্যারিস্টোটল পর্ব সমাপ্ত)
(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি:
(১) Aristotle: Francesco Hayez (1811)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 54 = 61