শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাষ্ট্রীয়
মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকারি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানার অধীনে বাণিজ্যিক
প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হলে দেশের সকল স্তরের
নাগরিক এর সুফল ভোগ করতে পারে। বাংলাদেশের
পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান,
রাজস্ব, কৃষি ইত্যাদিতে এর অবদান উল্লেখযোগ্য।
এমতবস্থায় উন্নয়নের সুফল বয়ে যায় সসর্বস্তরের
মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত
মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের মাধ্যমে। অন্যদিকে
বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানায় অর্থনৈতিক বিকাশ হয়
দ্রুত কিন্তু এর ফলে সমাজে বিভিন্ন বৈরী শ্রেণির
উদ্ভব হয়। শুরু হয় শোষণ। এ ব্যবস্থার অধীনে বিশেষ
শ্রেণির স্বার্থরক্ষা হওয়াই মূল প্রাপ্তি।
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি
সমাজতন্ত্র। এই মূলনীতির আওতায় মালিকানা সম্পর্কে
বলা হয়েছে, “উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও
বন্টনপ্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ
এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানাব্যবস্থা নিন্মরূপ হইবে :
(ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অথাৎ অর্থনৈতিক জীবনের
প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত
সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের
মালিকানা।
(খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা
নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে
সমবায়সমূহের মালিকানা এবং
(গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা
নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।”
এখানে উল্লেখ্য, সংবিধান প্রণেতারা মানুষের উপর
মানুষের শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী সমাজ ও অর্থনৈতিক
ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মালিকানার উপর্যুক্ত
বৈশিষ্ট্যাবলী নির্ধারণ করেছিলেন।
স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই ব্যবসায় ও আর্থিক খাতের
প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণেরর মাধ্যমে শিল্প ও
সম্পদগুলোর ৮৬% করায়ত্ত করা হয়। খাতগুলোর মধ্যে
শিল্প, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি, পরিবহন ও যোগাযোগ,
বাণিজ্য, কৃষি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী কয়েক
বছরের মধ্যেই দেখা গেল রাষ্ট্রীয় খাতের
প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা, দুর্নীতি,
উচ্চাভিলাসী নীতিনির্ধারণ ইত্যাদি কারনে
উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ফেলছে তথা ক্ষতির সম্মুখীন
হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এসব খাতে এই সমস্যাগুলো রয়ে
গেছে। সাথে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট নীতিনির্ধারণ ও
নিয়োগের মত আরো কিছু সীমাবদ্ধতা যোগ হয়েছে। এসব
কারনেই ‘আদমজী জুট মিল’-এর মত পাটকল বন্ধ হয়ে
গেছে, ‘বেসিক ব্যাংক’-এর মত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহ
ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, ২০০৭ সালে ‘বাংলাদেশ বিমান’
নামক রাষ্ট্রীয় সংস্থা লোকসানের মুখে পড়ে।
২০১২-১৩ অর্থবছরের হিসাবমতে রাষ্ট্রীয়
মালিকানাধীন সংস্থাসমূহের নীট লোকসান হয় ১০০০০
কোটি টাকার মত।
এসকল কারনে দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায়
বেসরকারি মালিকানাভিত্তিক সংস্থাসমূহের বিকাশের
দ্বার খুলে দেয়া হয়। ৭০’ এর দশকেই এই বিকাশের
গোড়াপত্তন ঘটে। ১৯৯৯ সালে এসে শিল্পনীতিতে
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকার
অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে কম
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে ঘোষণা করে। ফলে বেসরকারি
খাতসমূহ উন্নয়নের অগ্রগামী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
অর্থনৈতিক বিকাশ আরও ত্বরান্বিত করতে বৈদেশিক
বিনিয়োগের দ্বারও এখন সর্বাধিক উন্মোচিত। উন্নয়নও
হচ্ছে, প্রতিবছর দেশের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, প্রবৃদ্ধি
বাড়ছে আরও কত কী। এই উন্নয়নের সাথে সাথে
অর্থনৈতিক শ্রেণিরও বিকাশ ঘটছে যা
ব্যক্তিমালিকানা বা বেসরকারি মালিকানার ভয়নক
কুফল। সম্পদের অঢেল রাশি মুষ্টিমেয় কিছু শ্রেণির নিকট
জমা হচ্ছে আর অপরদিকে অন্যরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
এই বৈষম্যপূর্ণ সমাজ প্রত্যক্ষ এ পরোক্ষভাবে সামাজিক
অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। এখন কি আর সংবিধানের নীতি
রক্ষা হচ্ছে? সংবিধানমতে শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী সমাজ
ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
চিহ্নিত আসল সমস্যাগুলো নিরসন না করে সরাসরি
বেসরকারি মালিকানার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারনটা
বোধগম্য নয়। বেসরকারি মালিকানার অধীনে কীভাবে
দ্রুততর অর্থনৈতিক বিকাশ সম্ভবপর হয়? এগুলো অবশ্যই
সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে সঠিক নীতি প্রণয়ন
ও বাস্তবায়ন করা হয়, ব্যবস্থাপনায় দক্ষ লোক নিয়োগ
দেয়া হয়, স্বজনপ্রীতি রোধ করা হয়, যথাযথ তদারকির
মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করা হয়। দেশের বেসরকারি
বাণিজ্যক ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের দিকে লক্ষ্য
করলে আমরা এর প্রকৃষ্ট উদাহরন পাই।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাভিত্তিক সংস্থাসমূহের সমস্যা ও
সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করেই তো বেসরকারি
মালিকানাভিত্তিক সংস্থাসমূহ সফলতা অর্জন করছে।
তাহলে রাষ্ট্র কেন অধিক ক্ষমতাধর হয়েও ঐ সমস্যা আর
সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে পারে না? উল্টো বেসরকারি
মালিকানার নীতি অনুসরণ করে বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক
ব্যবস্থা ও সমাজ গড়ে তোলা হচ্ছে। এমতবস্থায়
বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী সমাজ ও অর্থব্যবস্থার
স্বপ্ন দেখা নিরর্থক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2