রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

?oh=e5e55504bf1651e5449c4ed332ede621&oe=5845A2F8″ width=”400″ />
রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (প্রথম পর্ব)
কে ছিল প্রথম মানুষ ?

এই বইয়ে বেশীর ভাগ অধ্যায়ের শিরোনামে একটি প্রশ্ন আছে। আর আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া, অথবা, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য সবচেয়ে সেরা উত্তরটি দেবার চেষ্টা করা, যা হচ্ছে বিজ্ঞানের উত্তর। কিন্তু সাধারণত আমি শুরু করবো কিছু পৌরাণিক কাহিনী থেকে নেয়া উত্তর দিয়ে কারণ তারা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক এবং বর্ণিল, এবং সত্যিকারের বাস্তব মানুষরা সেগুলো বিশ্বাস করেছিলেন এক সময়, আর কিছু মানুষ এখনও তা করেন।

পৃথিবীর সব দেশের মানব সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ কাহিনী আছে, আমরা কোথা থেকে এসেছে সেটি ব্যাখ্যা দেবার জন্য। বহু গোত্র ভিত্তিক সৃষ্টি সংক্রান্ত পুরাণ মূলত একটি সুনির্দিষ্ট গোত্র সংশ্লিষ্ট – যেন অন্য কোনো গোত্র ধর্তব্যের মধ্যেই পড়েনা! একই ভাবে, বহু গোত্রের আইন আছে যে, তারা মানব হত্যা করবে না – কিন্তু দেখা যায় এই ‘মানব’ বলতে শুধুমাত্র তারা তাদের নিজেদের গোত্রের অন্যদেরকেই বোঝায়। আর সেকারণে অন্য গোত্রের সদস্যদের হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই।

একটি বৈশিষ্ট্যসূচক সৃষ্টি পুরাণের কথা প্রথমে আলোচনা করা যাক: এটি তাসমানিয়ার আদিবাসীদের একটি গোষ্ঠীর। মহাকাশে নক্ষত্রদের জগদে একটি ভয়াবহ যুদ্ধে মইনি বলে একজন দেবতাকে পরাজিত করে প্রতিদ্বন্দী এক দেবতা, যার নাম ড্রোমেরডিনার। মইনি নক্ষত্রের জগত থেকে ছিটকে তাসমানিয়ায় এসে পড়েন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য। তবে তিনি মারা যাবার আগে, তার চিরন্তিম শয্যার এই জায়গাটি আশীর্বাদপুষ্ট করতে তিনি একটি ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন; সুতরাং, তিনি মানুষদের সৃষ্টি করেন। যেহেতু তিনি মারা যাচ্ছেন বলে খানিকটা তাড়া ছিল, তিনি তার সৃষ্ট মানুষদের হাটু দিতে ভুলে গিয়েছিলেন ( কোনো সন্দেহ নেই নিজের সমস্যা তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করেছিল), তিনি অন্যমনস্ক হয়ে তাদের ক্যাঙারুর মত লম্বা একটি লেজও দিয়েছিলেন, তার মানে নতুন সৃষ্ট মানুষগুলো ঠিক মত বসতেও পারতো না। এরপর তিনি মারা যান। মানুষ ক্যাঙ্গারুর মত লম্বা লেজ আর হাটু না থাকার ব্যপারটি নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে, এবং তারা স্বর্গের উদ্দেশ্যে আর্তি জানায় তাদের সাহায্য করার জন্য।

অসীম শক্তিশালী ড্রমেরডিনার, যিনি তখনও সারা আকাশ জুড়ে গর্জন করে ঘুরে বেড়াচিছলেন তার বিজয় শোভাযাত্রায়, তাদের সেই আর্তি শুনতে পান, এবং তিনি তাসমানিয়ায় নেমে আসেন সমস্যাটা কি, সেটি দেখার জন্য। মানুষের অবস্থা দেখে তার বেশ করুনা হয়, এবং তিনি তাদের ভাজ করা সম্ভব এমন হাটু প্রদান করেন, আর সমস্যা সৃষ্টিকারী ক্যাঙারু লেজটা কেটে দেন, যেন তারা ঠিকমত বসতে পারে। এবং এরপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

প্রায়শই আমরা একই উপকথার ভিন্ন সংস্করণের দেখা পাই। এটি খুব বিস্ময়কর নয়, কারণ মানুষ প্রায়শই খুটিনাটি বিষয়গুলো বদলে ফেলতো যখন আগুনের সামনে বসে গল্পগুজব করতো। সুতরাং কাহিনীর স্থানীয় সংস্করণগুলো ক্রমেই পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সেই একই তাসমানিয়ার পুরাণের অন্য একটি সংস্করণে, মইনি প্রথম মানুষকে সৃষ্টি করেন আকাশে, যার নাম পারলেভার। পারলেভার বসতে পারতো না কারণ তার ক্যাঙারুর মত লেজ আর ভাজ করার মত কোনো হাটু ছিল না। আগের মত প্রতিদ্বন্দী দেবতা ড্রমেরডিনার সাহায্যের জন্য হাজির হন। তিনি পারলেভারকে সত্যিকারের হাটু দেন এবং লেজ কেটে বাদ দেন, চর্বি দিয়ে তার ক্ষতটা সুস্থ করেন। পারলেভার এরপর তাসমানিয়া এসেছে আকাশের পথে হেটে ( মিল্কি ওয়ে)।

মধ্যপ্রাচ্যে হিব্রু গোত্রের একটি মাত্র মাত্র দেবতা ছিলেন, যাকে প্রতিদ্বন্দী সব গোত্রের দেবতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতো। তার নানা ধরনের নাম আছে, যাদের কোনোটাই ব্যবহার করার জন্য তাদের অনুমতি নেই। তিনি প্রথম মানুষকে ধুলা থেকে তৈরী করেন এবং তার নাম দেন অ্যাডাম ( যার মানে শুধু মানুষ)। তিনি ইচ্ছা করেই অ্যাডাম যেন তার মত দেখতে সেভাবেই বানিয়েছিলেন। আসলেই ইতিহাসে বেশীর ভাগ দেবতাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে পুরুষরা (অথবা কখনো নারীরা), প্রায়শই দানবাকৃতির এবং অবশ্যই অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ।

ঈশ্বর অ্যাডামকে সৃষ্টি করে প্রথমে তাকে রাখে একটি সুন্দর বাগানে, যার নাম ইডেন, যেখানে বহু গাছ ছিল, যাদের ফল খাওয়ার জন্য অ্যাডামকে উৎসাহিত করা হয়েছিল – শুধুমাত্র একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এই নিষিদ্ধ গাছটি ছিল, ভালো আর মন্দের বিভেদ জানার জ্ঞানবৃক্ষ। ঈশ্বর অ্যাডামকে সেখানে একা রেখে গেলেন, মনে কোনো সন্দেহ ছাড়াই, অবশ্যই অ্যাডাম সেই গাছটির ফল খাবে না।

কিছুদিন পর ঈশ্বরের মনে হয়েছিল যে, অ্যাডাম একা একা, হয়তো নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে, তিনি বিষয়টি নিয়ে কিছু করার কথা ভাবলেন। এ অবধি, মইনি আর ড্রমেরদিনার এর কাহিনীর ক্ষেত্রে যা হয়েছিল – এই পুরাণেরও দুটি সংস্করণ আছে, দুটোই পাওয়া যায় বাইবেলের বুক অব জেনেসিসে। বেশী বর্ণিল সংস্করণটিতে, ঈশ্বর সব প্রাণীকে অ্যাডামের সহযোগী হিসাবে সৃষ্টি করেন, তারপর তার মনে হয়েছিল যেন এখনও কিছু বাকি আছে: হ্যা, একজন নারী! সুতরাং তিনি অ্যাডামকে পুরোপুরি অচেতন করে, তাকে কেটে উন্মুক্ত করলেন, বুকের একটি পাজর বের করে, তার ক্ষতস্থান সেলাই করে দেন। এরপর সেই পাজর থেকে তিনি একটি নারীকে সৃষ্টি করেন, যেমন করে কোনো ফুল গাছের কাটা অংশ বা কলম থেকে ফুল ফোটানো সম্ভব এমন গাছের জন্ম দেয় যায়। তার নাম তিনি দিলেন ইভ, এবং অ্যাডামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তার স্ত্রী হিসাবে।

?oh=39fa5c73032925708d4d31a8d730a762&oe=5848A5D6″ width=”400″ />

দূর্ভাগ্যজনভাবে, সেই বাগানে একটি দুষ্ট সাপ ছিল, সে ইভের কাছে যায় ও তাকে প্ররোচিত করে ভালো মন্দ জানার সেই জ্ঞানবৃক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ফল পেড়ে অ্যাডামকে দিতে। অ্যাডাম ও ইভ দুজনেই সেই ফল খান, দ্রুত তারা সেই জ্ঞানটি অর্জন করেন – তারা দুজনেই আসলে নগ্ন। বিষয়টি তাদের অপ্রস্তুত করে এবং তারা ডুমুর পাতা দিয়ে নিজেদের আচ্ছাদন বানায়। যখন বিষয়টি ঈশ্বরে নজরে আসে, তিনি অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হন, এই ফলটি খাওয়ার জন্য ও জ্ঞান অর্জন করার জন্য – তাদের নিষ্পাপতা হারানোর জন্য, যেমনটা আমার মনে হয়। তিনি তাদের বাগান থেকে বের করে দেন, এবং তাদের ও তাদের সব বংশধরদের অভিশপ্ত করেন একটি কঠোর পরিশ্রম আর যন্ত্রণার জীবনের শাস্তি দিয়ে। আজ অবধি, অ্যাডাম ও ইভের সেই ভয়ঙ্কর অবাধ্যতাকে বহু মানুষই গভীরভাবেই বিশ্বাস করেন, আদি পাপ বা ‘অরিজিনাল সিন’ নামে। কিছু মানুষ এমনকি বিশ্বাস করেন যে, আমরা সবাই সেই আদি পাপ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি অ্যাডামের কাছ থেকে ( যদিও তাদের অনেকেই স্বীকার করেন যে, অ্যাডামের আসলেই কোনো অস্তিত্ব ছিলনা) এবং তার অপরাধের ভাগীদার।

স্ক্যানডেনেভিয়ার নর্সদের, যারা ভাইকিং সমুদ্র অভিযাত্রী হিসাবে বিখ্যাত, বহু দেবতা ছিল, যেমন গ্রীক ও রোমানদের ছিল। তাদের প্রধান দেবতা হলেন ওডিন, কখনো যাকে বলা হয় ওটান অথবা ওডেন। যেখান থেকে আমরা আমাদের বুধবার এর ইংরেজী ওয়েডনেসডে পেয়েছি ( থার্সডে এসেছে আরেক নর্স দেবতা, থর, বজ্রপাতের দেবতা, যে বজ্রপাত তিনি সৃষ্টি করেন তার শক্তিশালী হাতুড়ী দিয়ে।) একদিন ওডিন সমুদ্রের বেলাভূমিতে তার ভাইদের নিয়ে হাটছিলেন, তারা সবাইও দেবতা, এবং তারা দুটি গাছের গুড়ি দেখতে পান।

এই গাছের গুড়ির একটিকে তারা রুপান্তর করলেন প্রথম মানুষ হিসাবে, যাকে তারা নাম দিলেন আস্ক, এবং অন্য গুড়িটাকে প্রথম নারীতে রুপান্তরিত করেন, যাকে তারা নাম দেন এমবালা। প্রথম পুরুষ ও প্রথম নারীর শরীর দুটি তৈরী করার পর, দেবতা ভাইরা তাদের জীবন দিলেন, এরপর যথাক্রমে তাদের দিলেন – সচেতনতা, চেহারা, এবং কথা বলার ক্ষমতা।

?oh=727a28b734d06f874a7c35e5a5f334a8&oe=58548B25″ width=”400″ />

কেন গাছের গুড়ি, আমি অবশ্য ভাবছি ? কেন বরফ টুকরো বা বালিয়াড়ি নয়? খুব বিস্ময়কর তাই না যদি ভাবেন, কে এই গল্পগুলো বানিয়েছিল? এবং কেন? সম্ভবত এই সব পুরাণ কাহিনীর প্রথম আবিষ্কারকরা জানতেনও এগুলো সব কাহিনী – যে মুহূর্তে তারা এসব কাহিনী উদ্ভাবন করতেন। অথবা আপনি কি মনে করেন বিভিন্ন মানুষ গল্পগুলোর বিভিন্ন অংশ বানিয়েছে, ভিন্ন সময়ে এবং ভিন্ন জায়গায়, এবং অন্য মানুষরা তাদের সব একসাথে জড়ো করেছে, হয়তো তাদের কিছুটা রদবদল করে, হয়তো না জেনেই যে কাহিনীর নানা অংশগুলো মূলত বানানো?

গল্প শুনতে বেশ মজা লাগে, আমরা সবাই সেগুলো বার বার বলতেও ভালোবাসি। কিন্তু যখনই আমরা বেশী বর্ণিল কোনো কাহিনী শুনি, সেটি প্রাচীণ কোনো পুরাণ হোন অথবা কোনো আধুনিক আর্বান লিজেণ্ড বা শহুরে রুপকথাই হোক না কেন, যা ইন্টারনেটে দ্রুত হাত বদল হচ্ছে, বিশ্বাস করার আগে এটি পুরোপুরি – অথবা এর কোনো অংশ সত্য কিনা, সেটা জানতে চাওয়া সময়ের অপচয় নয়।

সুতরাং আমরা আবার সেই প্রশ্নটাই আমাদের করি – প্রথম মানুষ তাহলে কে ছিল? এবার এর সত্যিকারের এবং বৈজ্ঞানিক উত্তরটা পড়ে দেখুন।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − = 94