রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

?oh=4636cf4a62d165544406f8707d1c0c70&oe=5838BDAD” width=”400″ />
রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)
কে ছিল প্রথম মানুষ ?
সময়ের সাথে অতীতে ..

আসুন আরেকটি চিন্তার পরীক্ষা করি। আপনার কিছু সঙ্গীদের নিয়ে একটি টাইম মেশিনে উঠুন। এবার মেশিনটি চালু করুন এবং প্রায় দশ হাজার বছর অতীতের দিকে যাওয়া যাক। দরজা খুলুন, এবং যে মানুষদের সাথে আপনাদের দেখা হবে তাদের ভালো করে লক্ষ্য করুন। যদি না ঘটনাক্রমে এখন যেটি ইরাক, আপনি সেখানে গিয়ে থামেন, যারা তখন কেবল কৃষিকাজ আবিষ্কার করার পক্রিয়ায় আছে, বেশীর ভাগ জায়গায় আমরা শিকারী-সংগ্রহকারীদের (হান্টার গ্যাদারারদের) দেখবো, যারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাযাবরের মত স্থান পরিবর্তন করতো বুনো প্রাণি শিকার আর বুনো ফল সংগ্রহ করতে করতে। তারা যা বলবে তা আপনি বুঝতে পারবেন না, এবং তাদের পরনের কাপড়ও হবে খুব ভিন্ন ( যদি কিছু থেকে থাকে)। যাইহোক, আপনি যদি তাদের আধুনিক কাপড় পরিয়ে দেন ও আধুনিকভাবে চুল কেটে দেন, বর্তমান মানুষ থেকে তাদের পৃথক করা সম্ভব হবে না ( অথবা আধুনিক মানুষরা যেমন আজ পরস্পর থেকে ভিন্ন তার চেয়ে বেশী ভিন্ন তারা হবে না), এবং তারা আপনার সেই টাইম মেশিনে যাত্রী যে কোনো আধুনিক মানুষের সাথে প্রজননও করতে পারবে। এবং তাদের মধ্যে থেকে একজন স্বেচ্ছাসেবককে বাছাই করুন ( হয়তো তিনি আপনার ৪০০ তম প্র পিতামহ, কারণ এটাই আনুমানিক সময় যখন তিনি হয়তো জীবিত ছিলেন), এবং আবার টাইম মেশিন নিয়ে আরো দশ হাজার বছর আগে চলে যান, মোট বিশ হাজার বছর আগে, যেখানে আপনার সুযোগ আছে আপনার ৮০০ তম প্র পিতামহ/মাতামহের সাথে দেখা হবার। এবার আপনি যাদের দেখবেন তারা সাবাই শিকারী সংগ্রাহক, কিন্তু আবারো তাদের শরীর হবে আধুনিক মানুষের মত, এবং আধুনিক মানুষের সাথে তারা পুরোপুরিভাবে প্রজননক্ষম, তারা প্রজননক্ষম উর্বর সন্তানও উৎপাদন করতে পারবে। এদের একজনকে আবারও টাইম মেশিনে নিয়ে নিন আপনার সাথে এবং এরপর আরো দশহাজার বছর অতীতের দিকে যাওয়া যাক। এভাবে চালিয়ে যান, দশ হাজার বছর ব্যবধান দিয়ে অতীতের দিকে, প্রতিটি বিরতিতে একজন নতুন করে একজন আরোহীকে তুলুন, তাকে আরো অতীতের দিকে নিয়ে যান।

মূল বিষয়টি হচ্ছে যে এক সময়, এধরনের অনেক দশ হাজার বছর অবধি বিরতির পর পর, হয়তো যখন আপনি মিলিয়ন বছর অতীতে যাবেন, আপনি লক্ষ্য করতে শুরু করবেন, টাইম মেশিন থেকে বের হবার পর যে মানুষগুলোর সাথে আপনার দেখা হচ্ছে তারা সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের চেয়ে ভিন্ন, এবং তারা আপনার টাইম মেশিনে যাত্রা শুরু করা কোনো আরোহীর সাথে প্রজনন করতে পারবে না। কিন্তু তারা প্রজনন করতে সক্ষম হবে সেই সব সাম্প্রতিক সময়ে আপনাদের সাথে যুক্ত হওয়া আরোহীদের সাথে, যারা নিজেরাও প্রায় তাদের মতই প্রাচীন। আমি সেই একই বিষয়টি আবার উল্লেখ করছি, যা আগেও করেছি – ধীর ধাপে ধাপে পরিবর্তন সহজে নির্নয় করা সম্ভব না, অদৃশ্য অনির্ণেয়, অনেকটা ঘড়ির ঘন্টার কাটার মত, কিন্তু একটি ভিন্ন চিন্তার পরীক্ষা ব্যবহার করে। এবং দুটি ভিন্ন উপায়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার যৌক্তিকতা আছে, কারণ এটি এমন বেশী গুরুত্বপূর্ণ অথচ – এবং বোধগম্য কারণে – বিষয়টি বেশ কিছু মানুষের জন্য অনুধাবন করা বেশ কঠিন।

আবার আমাদের অতীতমুখী যাত্রা শুরু করা যাক, আর সেই অতীতের যাত্রায় কিছু বিরতি স্থানের দিকে লক্ষ্য করা যাক সেই মাছের কাছে পৌছানোর আগ পর্যন্ত। ধরুন আমাদের টাইমমেশিন নিয়ে আমরা এই মাত্র একটি বিরতিস্থানে এসে পৌছালাম, যার নাম ছয় মিলিয়ন বছর আগে। আমরা সেখানে কি খুজে পাবো? যতক্ষণ আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে আফ্রিকায় থাকা, আমরা সেখানে আমাদের ২৫০,০০০ তম প্র পিতামহ/মহী, প্র মাতামহ/মহীদের দেখা পাবো ( কিছু প্রজন্ম কম বেশী হতে পারে)। তারা সবাই নরবানর হবে এবং তারা কিছুটা শিম্পাঞ্জিদের মত দেখতে হবে, কিন্তু তারা শিম্পাঞ্জি নয়। বরং, তারা হবে সেই পূর্বসূরি, যাদের আমরা ভাগ করে নেই শিম্পাঞ্জীদের সাথে। কিন্তু তারা প্রজনন করতে পারবে সেই আরোহীদের সাথে যাদের আমার টাইমমেশিনে নিয়েছিলাম পাচ মিলিয়ন নয়শ নব্বই হাজার বছর আগের বিরতিস্থান থেকে এবং হয়তো পাচ মিলিয়ন নয়শ হাজার বছর আগে বিরতি থেকে তোলা আরোহীদের সাথেও প্রজনন করতে পারে। কিন্তু সম্ভবত তাদের সাথে না যারা আমাদের সাথে যোগ দিয়ে চার মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থান থেকে।

আবার আমাদের সেই দশ হাজার বছরের লাফ দিয়ে অতীতমুখী যাত্রা শুরু করা যাক, সেই পচিশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতিতে। সেখানে আপনি আপনার (এবং আমার) দেড় মিলিয়ন তম প্র-পিতামহদের খুজে পাবেন – একটি বেশ নিকটবর্তী আনুমানিক পরিমান। তারা নরবানর বা এইপ হবে না কারণ তাদের লেজ থাকবে, আমরা তাদের বানর বলে ডাকতাম, যদিও তারা আধুনিক বানরদের সাথে আমাদের সাথে যতটা তার চেয়ে বেশী সম্পর্কযুক্ত হতো না। যদি আমাদের থেকে খুবই ভিন্ন, আধুনিক বানর কিংবা আমাদের সাথে প্রজনন অক্ষম, তারা খুব সহজেই প্রজনন করতে পারবে তাদের প্রায় কাছাকাছি সদৃশ আরোহীর সাথে যারা আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে চব্বিশ মিলিয়ন নয়শ নব্বই হাজার বছর আগে। ধীর পরিবর্তন পুরোটা সময় জুড়ে।

?oh=d6785768efe98f3cd4a58fa9b13ede9f&oe=5883EDE1″ width=”400″ />

আবার আমরা পেছনে যাই, আরো আগে, দশ হাজার বছর লাফ দিয়ে, প্রতিটি বিরতিতে লক্ষ্য করার মত কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। আসুন থামি, দেখি কে আমাদের শুভেচ্ছা জানাতে আসে তেষট্টি মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থলে। এখানে আমরা করমর্দন করতে পারবো ( বা সেটি কি থাবা বলা উচিৎ হবে) সত্তর মিলিয়ন প্র পিতামহের। তারা দেখতে খানিকটা লেমুর বা বুশ বেবীদের মত, এবং তারা আসলে সব আধুনিক লেমুর ও বুশবেবীদের পূর্বসূরি, এবং সব আধুনিক বানর, নরবানর এবং আমাদেরও। আধুনিক মানুষদের সাথে তারা যতটা সম্পর্কযুক্ত ততটাই তারা কাছের আধুনিক বানরদের, এবং তারচেয়ে বেশী নিকট নয় আধুনিক লেমুর বা বুশবেবীদের। তারা কোনো আধুনিক প্রাণির সাথে প্রজনন করতে পারবেনা, কিন্তু তারা প্রজনন করতে পারবে বাষট্টি মিলিয়ন নয়শ নয় নব্বই হাজার বছর আগের বিরতি থেকে তোলা আরোহীর সাথে। আসুন তাদের টাইম মেশিনে আমন্ত্রন জানাই এবং আবার দ্রুত অতীত মুখে যাত্রা করি।

একশ পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতিস্থলে আমরা আমাদের ৪৫ মিলিয়ন তম প্র পিতামহের সাথে দেখা হবে। তিনি মারসুপিয়াল (যাদের এখন মূলত অষ্ট্রেলিয়ায় ও আমেরিকায় কিছু পাওয়া যায়) ও মনোট্রিম ( ডাক বিলড প্লাটিপাস ও স্পাইন অ্যান্টইটার, যাদের দেখা যায় অষ্ট্রেলিয়া/ নিউ গিনিতে) ছাড়া সব স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মহা পূর্বসূরিও। তিনি সমানভাবে সকল আধুনিক স্তন্যপায়ীর আত্মীয়, যদিও তিনি তাদের মধ্যে কারো সাথে একটু বেশী সদৃশ্য অন্যদের চেয়ে।

তিন শত আর দশ মিলিয়র বছর আগের বিরতিটি আমাদের ১৭০ তম প্র পিতামহের প্রতিনিধিত্ব করছে। তিনিও সব আধুনিক স্তন্যপায়ী, সব আধুনিক সরীসৃপ – সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ, কুমির – ও সব ডায়নোসররা ( পাখিরাও, কারণ পাখিদের বিবর্তন হয়েছে বিশেষ ধরনের ডায়নোসরদের থেকে)। সে সমানভাবে ঐসব আধুনিক প্রাণিদের আত্মীয়, যদি তিনি দেখতে গিরগিটির এর মতই বেশী। এর মানে হচ্ছে গিরগিটিরা তার সেই সময় থেকে অনেক কম পরিবর্তিত হয়েছে, যেমনটা, স্তন্যপায়ীরা হয়েছে। এতক্ষণে টাইম ট্রাভেলে আমরা বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, আর বেশী দুরে নয় যে আমরা মাছের দেখা পাবো যার কথা আমি আগে উল্লেখ করেছি। তার আগে আরেকটা বিরতি নেয়া যাক: তিনশ চল্লিশ মিলিয়ন বছর আগের বিরতি স্থানে আমরা আমাদের ১৭৫ তম প্র পিতামহের দেখা পাবো। তিনি দেখতে কিছুটা নিউটের মত, আধুনিক সব উভচরী ( নিউট ও ব্যাঙ) ছাড়াও সে স্থলবাসী সব মেরুদণ্ডী প্রাণিরও উত্তরসূরি।

সুতরাং চারশত সতের মিলিয়ন বছর আগের বিরতিতে আপনার সাথে দেখা হবে আপনার ১৮৫ মিলিয়ন তম প্র পিতামহের, যে মাছের সাথে ইতিমধ্যে আমাদের পরিচয় হয়েছে। সেখান থেকে আমরা সময়ের আরো পেছনের দিতে যেতে পারি, আরো অনেক দূরবর্তী প্র পিতামহের সাথে দেখা করতে পারি, যাদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত নানা ধরনের চোয়াল সহ মাছ, এরপর চোয়াল ছাড়া মাছ, তারপর … বেশ, তারপর আমাদের জ্ঞান একধরনের অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ম্লান হয়ে যায়, কারণ এইসব খুব প্রাচীন সময় হচ্ছে সেই সময় যখন আমাদের হাতে কোনো জীবাশ্ম থাকে না।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4