ড্রোন হামলা আর “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” তত্ত্ব এবং কয়েকটা মামুলী প্রশ্ন !

এক-
আইমান জাওয়াহিরি হচ্ছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী দল আল-কায়েদার বর্তমান প্রধান। প্রায় সাড়ে দশ বছর আগে, ২০০৬ সালের জানুয়ারী মাসের ১৩ তারিখে জাওয়াহিরিকে হত্যা করার জন্যে পাকিস্তানের “ডামাডোলা” গ্রাম চষে ফেলা হয়েছিলো। আমেরিকার অত্যাধুনিক ড্রোন, সেই ছোট্ট গ্রামটির আকাশ ছিন্ন – ভিন্ন করেছিলো। জাওয়াহিরি কে হত্যা করতে পারেনি। প্রায় ১০ মাস পরে সেই যুদ্ধবাজ চিল আবারও এসেছিলো, এবার “বাজাউরা” বলে আরেকটি গ্রামে, খবর পাওয়া গিয়েছিলো যেখানে জাওয়াহিরি আত্মগোপন করে আছে। সেই একই ভাবে বাজাউরা গ্রামের আকাশে সারাদিন ঘুরে ফিরলো সেই – স্বয়ংক্রিয় ঘাতক, কিন্তু জাওয়াহিরি কে পাওয়া গেলোনা এবারো। এরপরেও জাওয়াহিরির সন্ধানে আক্রমন হয়েছে কিন্তু সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী জাওয়াহিরি আজও বেঁচে আছে। মাঝ খান থেকে, মোট ১০৫ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয় এই দুটি গ্রামের। এদের মাঝে ৭৬ জন শিশু আর ২৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক। পশ্চিমা বয়ানে – এই ১০৫ জন সাধারণ মানুষ হচ্ছেন “কো-ল্যাটালার ড্যামেজ”! অর্থাৎ এদেরকে হত্যার কোনও উদ্দেশ্য ছিলোনা আমেরিকান ড্রোনের, এরা দুর্ভাগ্যজনক বলি হলেন পশ্চিমের কথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” নামক চলমান প্রকল্পের। মাত্র একজন কে হত্যা করতে গিয়ে ৭৬ টি শিশু ও ২৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে হত্যা করাটা হচ্ছে – “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” !

আইমান জাওয়াহিরিকে আজকাল অনেকেই চেনেন। আমেরিকার সাধারণ জনগন কিম্বা আমরাও চিনি। বিন-লাদেনের পরে আল-কায়দার হাল ধরা এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী লোকটি শান্তিপ্রিয় যেকোনো মানুষের জন্যে শান্তিপ্রিয় যেকোনো সমাজের জন্যে একজন মূর্তিমান আতংক। সেই তুলনায়, ক্বারি হুসাইন একেবারেই অজানা এক সন্ত্রাসী। অন্তত সাধারণ আমেরিকান রা তাকে চেনেন না, এমন কি জানেনওনা এই সন্ত্রাসী ক্বারি হুসাইন আমেরিকানদের প্রতি কি করেছে। তাকে হত্যা করার জন্যে, আমেরিকার ড্রোন পাকিস্তানের আকাশে পাঁচবার ঘুরে গেছে। ২০০৮ সালের ২৯ জানুয়ারী, ২০০৯ সালের ২৩ শে জুন, ২০১০ সালের ১৫ই জানুয়ারী, ২০১০ সালের ২রা অক্টোবর আর সবশেষে ২০১০ সালের ০৭ই অক্টোবর। কারী হুসাইন কে হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিলো মার্কিন ড্রোন। কিন্তু এই পাঁচবারের চেস্টায় আরো মোট ১২৮ জন নিরীহ সাধারণ জনগন নিহত হন। এদের মাঝে ১৩ জন ছিলো শিশু। একজন ক্বারি হুসাইন কে হত্যা করার জন্যে ১২৮ জন সাধারণ মানুষ নিহত হলেন। আধুনিক বয়ানে এর নাম – “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” ! এই তথ্যগুলো ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা দি গার্ডিয়ান থেকে নেয়া, আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন

আধুনিক – উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালী পশ্চিমা বয়ান “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” বিষয়টি ভালো রপ্ত করেছেন। এমনই একজন বাঙ্গালীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” বিষয়টা আসলে কি? তিনি আমাকে উইকিপেডিয়া থেকে কপি-পেস্ট করে দিয়েছিলেন এর সংজ্ঞা। উইকিপেডিয়া থেকে কপি-পেস্ট করাটা খারাপ কিছু নয়, কপি-পেস্ট করার ঝুকি টা হচ্ছে, কপি-পেস্ট করাটা একটা সস্তা শারীরিক শ্রম ও সামান্য টেকনিকের বিষয়, যেমন কন্ট্রোল সি+কন্ট্রোল ভি করে দিলেন, ব্যস কপি ও পেস্ট হয়ে গেলো। কিন্তু মূল বিষয়টিকে বোঝার জন্যে কেবল কপি-পেস্ট করলেই চলেনা, বিষয়টি পড়তে হয়, এবং তা নিয়ে ভাবতে হয়। অর্থাৎ ইংরাজিতে যাকে বলে ”Reading and Reflecting” । অর্থাৎ পড়া এবং অনুধাবন করা। “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” এর সংজ্ঞাটি উইকিপেডিয়া থেকে পড়া আর তাঁর মর্মার্থ অনুধাবন করার মাঝে তাই আকাশ-পাতাল তফাত। পড়ার জন্যে ইংরাজী বা ভিন্ন কোনও ভাষা জানাটাই যথেষ্ট কিন্তু অনুধাবন করার জন্যে ভাষার বাইরেও আরো কিছু থাকতে হয়, সেটা হচ্ছে বিষয়টির ব্যক্তিগত অনুধাবন। হলিউড অভিনেতা লিয়াম নিসন এর “টেকেন” লিংক এখানে , ছবিটিতে, পিতা হিসাবে লিয়াম নিসন যখন আলজেরিয়ান চোরাচালানীদের হাত থেকে তার কন্যাকে উদ্ধার করতে যায়, তখন আলজেরিয়ান মাদক ও ব্রোথেল ব্যবসায়ীদের নেতা, পিতা নিসন কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে যে, পুরো বিষয়টি ব্যবসায়িক, এতে ব্যক্তিগত আবেগের কোনও স্থান নেই, আর কে না জানে ব্যবসা করা খারাপ কিছু নয়। এই “ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত নয়” বিষয়টি পশ্চিমের ব্যবসায়ীদেরই আবিস্কার, তারা কথায় কথা বলে, ”Nothing personal, all are business” . কিন্তু পিতা লিয়াম নিসন এর কাছে তার কন্যাকে ব্রোথেল ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করাটা ভীষন ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ। যখন তার কন্যাকে কেউ পতিতালয়ে বিক্রি করে দেবার চেষ্টা করে, তখন সেটা পৃথিবীর কোন পিতার কাছেই ব্যক্তিগত না হয়ে পারেনা। কিন্তু বিক্রেতার কাছে এটা কেবলই ব্যবসা আর পিতা লিয়াম নিসনের কাছে – জীবন-পন ব্যক্তিগত সমস্যা। তাই একই ঘটনার কোন বয়ানটি আমি গ্রহন করবো, তা একান্তই নির্ভর করে আমি কিভাবে বিষয়টিকে অনুধাবন করছি।

তাই – পশ্চিমের এই “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” তত্ত্ব টি আপনি কিভাবে অনুধাবন করছেন সেটা নিজেকে প্রশ্ন করুণ।

দুই –
ব্যক্তিগত ভাবে চিকিতসক হওয়ার কারণে – “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” বিষয়টিকে আমি আমার কাজ থেকে জানি। খুব সাধারণ একটা উদাহরন হচ্ছে – যেকোনো একটি অপারেশন করতে হলে, সার্জনেরা মানুষের ত্বক কেটেই টার্গেট অঙ্গটিতে অপারেশন করেন। টার্গেট অঙ্গটিতে সার্জনের ছুরি – কাঁচি স্পর্শ করার জন্যে খানিকটা রক্তপাত অবধারিত, কিন্তু কতটুকু রক্তপাত হতে পারে, সেই হিসাবটা সার্জনকে করে নিতে হয় তার সিদ্ধান্ত নেবার সময়, অর্থাৎ রোগীর গায়ে ছুরি চালানোর আগেই এই হিসাব টা করে নেয়া জরুরী। এই রক্তপাত কমানোর জন্যেই চিকিৎসাবিজ্ঞান দিন দিন “মিনিম্যালি ইনভাসিভ” বা ন্যূনতম কাটাছেড়ার মাধ্যমে চিকিতসা করা – হয়ে উঠেছে। যদি অপারেশনের রক্তপাতের ঝুঁকি রোগীর জীবনকেই সংশয়াচ্ছন্ন করে তোলে, তাহলে সার্জন অপারেশনের জন্যে আরো অপেক্ষা করেন, আরো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেন অথবা বাতিল করেন অপারেশনের পরিকল্পনা। অথবা যখন, অপারেশন করে রোগীর রোগ খুব বেশী উন্নতি হবার সম্ভাবনা থাকেনা, তার বর্তমান অবস্থার চাইতে, সেই সকল ক্ষেত্রেও চিকিতসা কিম্বা অপারেশন কিছুই নাও করতে পারেন ডাক্তার। সেজন্যেই – মেডিক্যাল প্র্যাকটিসে একটা কথা প্রচলিত আছে- ভালো সার্জন জানেন কিভাবে অপারেশন করতে হয়, সেরা সার্জন জানেন কখন অপারেশন করতে হয় আর শ্রেষ্ঠ সার্জন জানেন কখন অপারেশন করতে হয়না (Good surgeons know how to operate, better ones when to operate, and the best when not to operate.) আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন । “ড্যামেজ” বা ক্ষতি যখন টার্গেট এর চাইতেও বহুগুন বেশী হয়ে যায়, তখন সেটা আর “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” থাকেনা, ধ্বংসযজ্ঞতে পরিনত হয়। কখনও কখনও সেটা জেনোসাইডেও পরিনত হয়। তাই “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” বিষয়টি উইকিপেডিয়ার পাতায় পড়া আর বিষয়টিকে অনুধাবন করা সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের শোলাকিয়ায়, লাখের উপরে মানুষ নামাজ পড়তে আসে প্রতিবছর। ঈদের জামাতে দুই জঙ্গীকে ধরার জন্যে, একজন সাধারণ গৃহবধূ প্রান হারান। এটা দুর্ভাগ্যজনক। ভেবে দেখুন তো একবার, সেই দুই জঙ্গীকে ধরার জন্যে বা হত্যা করার জন্যে যদি শোলাকিয়ার মতো একটি বিরাট জমায়েতে ৫০০ বা পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হতেন, তাহলে কেমন হতো? খুব সহজে কি তাকে “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” বলা যেতো? সন্দেহাতীত ভাবে, বাংলাদেশ পুলিশ সেই অভিযান টি পরিচালনা করেছেন, অত্যন্ত দক্ষতার সাথে, তাই দুইজন জঙ্গীকে ধরার জন্যে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে একজন গৃহবধূ নিহত হয়েছে, এটা “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”। দুর্ভাগ্যজনক, জঙ্গী দুজন নিহত হয়েছেন, সাথে একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আইমান জাওয়াহিরি কে হত্যা করতে গিয়ে ১০৫ জন নিরপরাধ মানুষ কে হত্যা কি “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”?

এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটি ভেবে দেখুন তো – আমরা যারা উইকিপেডিয়া থেকে “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” এর সংজ্ঞা পড়ছি, তারা কি শোলাকিয়ায় নিহত সেই ভদ্রমহিলার পরিজনদের কে ব্যাখ্যা করতে পারবো “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” বিষয় টা? বোঝাতে পারবো তাদেরকে, যে তাদের মা – বোন – বা স্ত্রী কেবল একজন “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” এর শিকার? না, তাদের কাছে এটা একটা হত্যা এবং চিরস্থায়ী ক্ষতি। শোলাকিয়ার এই মধ্যবিত্ত মায়ের কাঁধে আপনি আপনার নিজের মায়ের মাথাটি বসিয়ে দিন। “ডামাডোলা” গ্রামের নিহত ৭৬ টি শিশুর কাঁধে আপনার শিশু কন্যা বা শিশু পুত্রের মাথাটি বসিয়ে দিন এবং এখন বোঝার চেস্টা করুণ “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” কাকে বলে। একই পরিবারের ৩ টি শিশু যখন ড্রোন হামলায় নিহত হয়, আপনার নিজেকে সেই তিন শিশুর পিতার স্থানে বসিয়ে দেখুন এবং তারপরে বোঝার চেস্টা করুণ “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” কাকে বলে। এটাই হচ্ছে “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” কে অনুধাবন করা। তাই এই অনুধাবন করার কাজটি উইকিপেডিয়া থেকে কপি পেস্ট করার চাইতে বহুগুন কঠিন কাজ।


(আমেরিকার ড্রোন হামলায় বেঁচে যাওয়া শিশুকন্যা শাকিরা কে বলা হচ্ছে “সৌভাগ্যবান”, কারণ সে বেঁচে গেছে। ড্রোনের আঘাতে সারা শরীর মারাত্মক ভাবে ঝলসে যাওয়া শাকিরার চিকিতসা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এই নাহলে আর পশ্চিমা মানবতা, বলুন? শাকিরার চিকিতসক, পচিশ বছরের অভিজ্ঞ প্লাস্টিক সার্জন বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি শাকিরার সুস্থ হয়ে ওঠাটা একটা দীর্ঘতম পথ হবে তার জন্যে। আর আমরা আধুনিক মানুষেরা বলবো – “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” ! )

তিন –
পাকিস্তানে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত, মাত্র ৪১ জন টার্গেট সন্ত্রাসীকে হত্যা করার জন্যে মোট ১১৪৭ জন সাধারণ সিভিলিয়ান কে হত্যা করা হয়েছে। এটাকে পশ্চিমা বয়ানে বলা হচ্ছে “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”। এই টারগেট ৪১ জনের মধে ৩৭ জন মারা পড়েছে, চারজন এখনও বেঁচে আছে, সেই হিসাবে প্রতি একজন সন্ত্রাসীকে হত্যা করার জন্যে ৩১ জন সাধারণ নাগরিককে প্রান দিতে হয়েছে, আমরা এটাকে বলছি “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”। এই ৩১ জন সাধারণ নাগরিকের মাথায় আপনার পরিবারের সকলের মাথা বসিয়ে দেখুন তো ভাবনা টা কেমন হয়?

এবার বিষয়টিকে বোঝার জন্যে আরেকটি লেনস চোখে দিন। ইউরোপের বড় বড় শহরে অনেক ইসলামীক সন্ত্রাসী বসবাস করেন, প্রকাশ্যে কিম্বা গোপনে। হয়তো এদের অনেকেই নিরস্ত্র কিন্তু মাস্টারমাইন্ড। সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ড সরকার তাদের বহুদিনের চেস্টায় এইরকমের একজন আত্মস্বীকৃত ইসলামী জঙ্গীকে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছে। ভেবে দেখুন তো, এই ধরনের একজন সন্ত্রাসীকে ধরার জন্যে ইউরোপের কিম্বা আমেরিকার একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহল্লায় বা নেইবারহুডে ভিন্ন আরেকটি দেশের ড্রোনের আক্রমন হচ্ছে। বিষয়টি কি ভাবতে পারেন? এটা একটা অকল্পনীয় বিষয়। পশ্চিম কোনদিনও একজন সন্ত্রাসিকে হত্যা করার জন্যে তার নিজের সমাজের একজন নাগরিকের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলবেনা। সে কারনেই ইংল্যান্ডের আনজেম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভাবে আইসিস এর প্রচারনা চালানোর অভিযোগ, ইংল্যান্ডের নাগরিকদের জঙ্গী প্রশিক্ষন দেয়া সহ আরব ভুখন্ডে অসংখ্য আইসিস কর্মী রিক্রুট করার প্রমান সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার তাকে হত্যা করেনি, আমেরিকাও তাকে ড্রোন দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেনি, বরং বহু বছরের আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশের গণতান্ত্রিক আইনী পদ্ধতিতে শাস্তি দিয়েছে (আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন)। তাহলে এই পশ্চিমা শক্তি গুলো, আফগানিস্থানে এবং পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের কে ধরার ক্ষেত্রে সেই দেশের স্থানীয় সরকার ও আইনের আশ্রয় নিচ্ছেনা কেনও? পাকিস্তান ও আফগানিস্থান দুটি দেশেই তো মূলত আমেরিকার অনুগত অথবা আরো সরাসরি বললে বলা যায় – আমেরিকার নিজের পছন্দের পুতুল সরকারই দেশ চালাচ্ছে। তাহলে কেনও মার্কিন বা পশ্চিমের দেশ গুলো এই সকল দেশের সরকারী সাহায্য না নিয়ে, নিজেরাই একটি সার্বভৌম দেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে সেই দেশ গুলোর নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করছে? এটা কি অন্যায়? এটা কি বেআইনি? যে সকল দেশ সারা দুনিয়াতে গনতন্ত্রের কথা বলে বেড়ায়, তারা যখন ভিন্ন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে বার বার শত শত সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করে, সেটা কি মানবিক দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য? পশ্চিমের অনুগত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা এই বিষয়টিতে অন্যায় বা বেআইনি কিছু না দেখলেও, পাকিস্তানের উচ্চ আদালত সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছে – তিন সদস্যের একটি পাকিস্তানী আদালতের বেঞ্চ রায় দিয়েছে, পাকিস্তানের জনগনের উপরে আমেরিকার সি আই এ পরিচালিত ড্রোন হামলা, সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটা পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অশ্রদ্ধা ও হুমকি স্বরূপ (আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন)। আদালত পাকিস্তান সরকার কে নির্দেশ দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে একটি প্রস্তাবনা জাতিসংঘের সভায় তোলার জন্যে। আদালত এমনও রায় দিয়েছে, যদি এই প্রস্তাবনায় আমেরিকা “না” ভোট দেয়, তাহলে প্রয়জনে আমেরিকার সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ত্যাগ করার বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। আমরা জানি, পাকিস্তানের সরকার মূলত আমেরিকারই সেবক এবং তারা আদালতের এই নির্দেশনা পালন করবেনা।

আমরা যদি গনতন্ত্র ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি, যদি মনে করে থাকি, একটি স্বাধীন দেশ যত ছোটই হোক, তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অধিকার কারো নেই, তাহলে আমাদের সবার জন্যেই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক – বেশ কিছু স্বাধীন দেশ যেমন পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমেনে পশ্চিমা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ড্রোন হামলা কি নৈতিক? আইন সিদ্ধ?

চার-
এবার শেষ প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলার আগে, একটু যুদ্ধ নৈতিকতা নিয়ে কথা বলা দরকার। যুদ্ধ মানব সভ্যতার জন্যে একটি ভয়াবহ ঘটনা। তবুও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই ঘটনাটিতে জড়িয়েছে। বলাই বাহুল্য, গত একশো বছরে, যে ভয়াবহ যুদ্ধ গুলো হয়েছে, সেখানে মূল অংশগ্রহণকারীদের সকলেই হচ্ছে সেই দেশ গুলো, যারা আজকের পৃথিবীতে গনতন্ত্র, মানবতা, উচ্চ নৈতিক মুল্যবোধ ইত্যাদি নানান ধরনের ফোলানো – ফাপানো ধারণাগুলোর প্রচারক। ধরা যাক আমেরিকা হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে গণতন্ত্র ও মানবতাবাদ প্রচারের প্রধান আত্মস্বীকৃত এজেন্সি। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ তো বটেই, বাঙ্গালী উঠতি বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের ও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন – ভিয়েতনাম বা পাকিস্তানে একদা সারাদিনরাত বোমাবাজি করলেও, আমেরিকাই হচ্ছে পৃথিবীতে সকল চিন্তা – ধারণা – সংস্কৃতি – স্বপ্নের উন্নত চর্চার স্থান। যদিও এই দেশটি তার জন্মের পর থেকে ২৩৯ বছরের প্রায় ২২২ বছরই কোনও না কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে ছিলো (মতান্তরে, ২৩৫ বছরের মধ্যে ২১৪ বছর)। অর্থাৎ এই দেশটির ইতিহাসের প্রায় ৯৩% ভাগ সময় এরা যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো, তথাপি এরাই হচ্ছে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান এজেন্সিআগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন । আগেই বলে নিয়েছি – যুদ্ধ ভয়াবহ, তবুও যেহেতু সভ্যতা আধুনিক হয়েছে, তাই যুদ্ধেরও এক ধরনের নৈতিক বিধি বিধান তৈরী হয়েছে। সকল যুদ্ধই তাই আজকাল শুরু হয় – “কোনও সিভিলিয়ান আক্রান্ত হবেনা” এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এমন কি সিভিলিয়ান এলাকা গুলোকে চিহ্নিত করা হয় এবং ঘোষণা দিয়েই সেই সকল এলাকাকে যুদ্ধের বাইরে রাখা হয়। অন্তত যুদ্ধ নৈতিকতা তাইই বলে। যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যুদ্ধরত দেশগুলোর মাঝেই। নিশ্চিত করা হয়, যেনো, একদেশের সাথে যুদ্ধ তার প্রতিবেশী দেশ কে আক্রান্ত না করে। বলাই বাহুল্য, যুদ্ধের মতো একটি অনৈতিক কাজের কথিত “নৈতিকতা” তৈরী হয়, বড় বড় শক্তিমান দেশগুলোর হাত দিয়ে। তাই কথিত “যুদ্ধ নৈতিকতা” পালন হচ্ছে কিনা, তার দেখভালও করেন এই সকল বড় বড় শক্তিরা। তাই এই সকল “যুদ্ধ নৈতিকতার” অপব্যবহার নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও বড় শক্তিমান দেশ কে কথা বলতে দেখা যায়নি।

এবারে শেষ প্রসঙ্গটি, বলাই বাহুল্য, এই প্রসঙ্গটি দারুন স্পর্শকাতর। আমি জানি এখানে আমাদের অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলবো। ড্রোন হামলা কি কাপুরোষচিত? একজন মানুষের উপরে পেছন থেকে চাপাতি হামলার সাথে অসংখ্য মানুষের উপরে অতর্কিতে – অজ্ঞাত স্থান থেকে ড্রোন হামলার এর নৈতিক পার্থক্য টা কোথায়? অন্তত প্রয়োগের দিক থেকে কি কোনও পার্থক্য আছে? দুটি হামলাই ভিকটিমের পেছন থেকে চালানো হয়, ভিকটিমের অজান্তে তাকে আক্রমন করা হয়।

আমি জানি, আমাদের বাঙ্গালী উঠতি বুদ্ধিবৃত্তিক অংশের কপাল কুচকে উঠবে এই প্রশ্নে। অতি বুদ্ধিমান কেউ কেউ বলবেন – ড্রোন হামলা হচ্ছে “কৌশলগত সুবিধা” যুদ্ধরত প্রতিপক্ষকে অতর্কিতে হামলা করার, কেউ কেউ মনে করিয়ে দেবেন, প্রথাগত যুদ্ধেও এই ধরনের আরো অনেক পদ্ধতি চালু আছে, যেমন গেরিলা হামলা। আচ্ছা ধরে নিলাম – যুদ্ধরত দুটি শক্তির মাঝে ড্রোন হামলাকে প্রথাগত গেরিলা হামলার মতোই । কিন্তু যুদ্ধরত নয় এমন স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জনগনের উপরে ড্রোন হামলা কি গেরিলা হামলার সমার্থক?

যুদ্ধ আক্রান্ত দেশের মানুষেরা জানতে পারেন, তাদের দেশ বা তাদের এলাকাটি আক্রান্ত কিনা। সেই অনুযায়ী ব্যক্তি মানুষ সিদ্ধান্ত নেন, তিনি বা তার পরিবার ও সমাজ নিরাপদ কোনও স্থানে সরে যাবেন কিনা। যেহেতু যুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই সীমিত থাকার কথা, তাই যুদ্ধ আক্রান্ত দেশগুলোর প্রতিবেশীরা আতংকিত হলেও, এক ধরনের নিরাপদ বলয়ে থাকেন। এই দীর্ঘ ভুমিকাটি দেবার কারণ হচ্ছে, এই স্পর্শকাতর প্রশ্ন গুলো তোলা –

পাকিস্তানের জনগনের উপরে, আমেরিকার ড্রোন হামলা টি কি নৈতিক? যেখানে একদল মানুষ জানেন, তাদের দেশের সাথে আমেরিকার কোনও যুদ্ধ বিরাজ করছেনা, তখন সেই সকল জনগনের উপরে, রাতের আধারে, কিম্বা দিনের আলোয়, অজ্ঞাত স্থান থেকে – দূরত্ব থেকে ড্রোন হামলা কি বীরোচিত? নাকি কাপুরুষত্ব? প্রশ্নটি তুলছি এজন্যে যে, যুদ্ধ আক্রান্ত ভুমির মানুষ জানেন যে তারা একটি যুদ্ধ আক্রান্ত ভুমিতে আছে, যেকোনো সময় তারা আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু যে দেশটি যুদ্ধ আক্রান্ত নয়, সেই দেশের সাধারণ মানুষের উপরে এই ধরনের ড্রোন হামলা কতটুকু নৈতিক?

ড্রোন হামলা কে প্রশ্ন করার জন্যে পাকিস্তানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই লেখায়। আমি জানি, পপুলার বাঙ্গালী বুদ্ধিবৃত্তিতে পাকিস্তানের নাম উচ্চারন করা যেকোনো মানুষকেই, তার চিন্তার জন্যে, লেখালেখির জন্যে স্টিগমাটাইজ বা কালিমালিপ্ত করা যেতে পারে খুব সহজেই। সেই ঝুঁকির কথা আমি জানি। আমি এও জানি, আজকের পশ্চিমা বয়ানের জয়জয়কারের যুগে, পশ্চিমের বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও কতটা ঝুঁকির। এই ঝুঁকিটা যতটা পশ্চিমা মানুষের কাছ থেকে, তার চাইতে অনেক বেশী আমাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের কাছ থেকেই। আজকালকার বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে, পশ্চিমা বয়ানের প্রতি প্রশ্ন তোলার অবধারিত পরিনাম হচ্ছে – পশ্চিম ভক্ত বাঙ্গালী বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের কাছ থেকে কিছু “ট্যাগ” বা নাম জুটে যাওয়া। “কমিউনিস্ট”, “কমি”, “বাম”, “ভাম”, “বামাতি” এই সকল আখ্যা জুটে যাওয়া।

কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো তুলতেই হবে, জীবন তো খুব ছোট তাই না? ছোট্ট জীবনে – নিজ নৈতিক অবস্থান দিয়ে চালিত হবার চাইতে স্বস্তিদায়ক আর কিছু আছে কি?

জীবনের জন্যে, পৃথিবীর জন্যে শুভ দিক হচ্ছে – পশ্চিমা বয়ান কে চ্যালেঞ্জ করছে যে সকল মানুষ তাদের বড় অংশটা পশ্চিমা জনগণেরই অংশ। পাকিস্তানের ভুক্তোভোগী জনগনের সাথে সোচ্চার প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন যে সকল আন্তর্জাতিক মানুষেরা, বিচার দাবী করছেন আমেরিকার ও পশ্চিমা শক্তির অন্যায় ড্রোন হামলার, তাদের একটা বিরাট অংশ খোদ আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষ। এখানে দেখে নিতে পারেন – এই পশ্চিমের মানুষেরাই ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার হয়ে দাড়িয়েছে – একটি দারুন ডকুমেন্টারী মুভি, ইউ টিউব থেকে দেখে নিতে পারেন লিংক এখানে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ড্রোন হামলা আর “কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ” তত্ত্ব এবং কয়েকটা মামুলী প্রশ্ন !

  1. কোল্যাটারাল ড্যামেজ বুঝতে হলে
    কোল্যাটারাল ড্যামেজ বুঝতে হলে কোরান পড়েন। সেখানে এর বৈধতা দেয়া হয়েছে।
    এতকিছু রেফারেন্স দেন , কোরানের রেফারেন্স দেন না কেন ?
    যারা কোরানে বিশ্বাসী তারা কেন এখন কান্নাকাটি করে ?
    আল্লাহ স্বয়ং কোল্যাটারাল ড্যামেজ চর্চা করেন।

    সুরা আশ শোয়ারা

    “অতঃপর অপর সকলকে ধ্বংস করলাম।” (২৬:১৭২)

    “তাদের উপর শাস্তিমূলক (পাথরের) বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলাম, যাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তাদের জন্য এই (গজবস্বরূপ) বৃষ্টি ছিল কত নিকৃষ্ট।” (২৬:১৭৩)

    “এতে অবশ্যই (শিক্ষা ও) নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।” (২৬:১৭৪)

    “নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১৭৫)

    1. আপনি কি কুরআন ভক্ত নাকি? আমি
      আপনি কি কুরআন ভক্ত নাকি? আমি কুরআন ভক্ত নই, তাই কোল্যাটারাল ড্যামেজ বোঝার জন্যে আমার কাণ্ডজ্ঞানের উপরে ভরসা করি, কুরআনের দ্বারস্থ হতে হয়না আমার। আপনি বরং কুরআন মুখস্থ করুন এবং ইস্লামিস্ট দের মতো করে কুরআনের আলোকে দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করুন। ভালো থাকবেন। মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 + = 82