রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (শেষ পর্ব)

?oh=e520f2fa5b2d0811b2a12cf77bed5c22&oe=58402ADC” width=”400″ />
রিচার্ড ডকিন্সের বাস্তবতার জাদু – দ্বিতীয় অধ্যায় (শেষ পর্ব)
কে ছিল প্রথম মানুষ ?
ডিএনএ জানাচ্ছে আমরা সবাই আত্মীয় ..

যদিও আমাদের কাছে সেই সব জীবাশ্মগুলো নাও থাকতে পারে – যেগুলো কিনা জানাতে পারে আমাদের আরো প্রাচীন পূর্বসূরিরা কেমন দেখতে ছিল, কিন্তু আমাদের মনে কোনো সন্দেহ নেই যে সব জীবিত জীবই পরস্পরের এবং আমাদের আত্মীয়। এবং আমরা আরো জানি কোন আধুনিক প্রাণিগুলো পরস্পরের একটু বেশী নিকটাত্মীয় (যেমন মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি অথবা ইদুর) আর কারাই বা পরস্পরের বেশ দূরের আত্মীয় ( যেমন মানুষ আর কোকিল, অথবা ইদুর আর কুমির) কিন্তু কিভাবে আমরা সেটি জানতে পারলাম? পদ্ধতিগতভাবে তাদের তুলনা করে – সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলো এসেছে তাদের ডিএনএ তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে।

ডিএনএ হচ্ছে সেই জিনগত তথ্যভাণ্ডার যা প্রতিটি জীবিত জীব তাদের প্রতিটি কোষে বহন করে। এই ডিএনএ তথ্যগুলো সজ্জিত থাকে অত্যন্ত জটিলভাবে কুণ্ডলী পাকানো উপাত্ত বা ডাটার ফিতায় বা টেপে, যাদের বলা হয় ক্রোমোজোম। এই ক্রোমোজোমগুলো আসলে অনেকটা সেই ধরনের ডাটা টেপের মত দেখতে যাদের পুরোনো আমলের কম্পিউটারে ব্যবহার করা হতো, কারণ যে তথ্য এটি বহন করছে সেটি ডিজিটাল, এবং সেটি ক্রমানুসারে এর দৈর্ঘ বরাবর সজ্জিত। সেগুলো দীর্ঘ সাংকেতিক বা কোড ‘অক্ষরের’ সুতার মত, যা আপনি পড়তে ও গণনা করতে পারবেন। প্রতিটি অক্ষর সেখানে আছে অথবা সেখানে নেই, এর কোনো মধ্যবর্তী অবস্থান নেই, আর সেটাই এটিকে ডিজিটাল বৈশিষ্ট্য দেয় এবং সে কারণেই আমরা বলি ডিএনএ ‘অক্ষর’ দিয়ে লেখা।

প্রতিটি জিন, প্রতিটি প্রাণি, উদ্ভিদ আর ব্যাকটেরিয়ায়,যেখানেই তাদের আমরা দেখেছি, সেগুলো হচ্ছে সাংকেতিক বার্তা কিভাবে সেই জীবটিকে তৈরী করা যায়, যা লেখা হয়েছে ‘অক্ষর’ দিয়ে। এই বর্ণমানায় চারটি মাত্র বর্ণ আছে বাছাই করার জন্য (ইংরেজী বর্ণমালায় যেমন আছে ২৬টি), আমরা ডিএনএ বর্ণগুলো লিখি A, T, C এবং G , এই চারটি বর্ণ ব্যবহার করে ( এরা হচ্ছে চার ধরনের নিউক্লিওটাইড)। একই জিনের দেখা মেলে বহু ভিন্ন ভিন্ন জীবের শরীরে, খুব সামান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছাড়া। যেমন একটি জিন, যার নাম FoxP2, সব স্তন্যপায়ীদের শরীরে সেটি আছে তো বটেই, এছাড়া আরো অন্য অনেক জীবের শরীরেও এটি দেখা যায়। এই জিনটি ২০০০ এর বেশী অক্ষর দিয়ে সাজানো একটি সুতা। আপনি বলতে পারে FoxP2 জিনটি সব স্তন্যপায়ী প্রাণির শরীরে একই রকম কারণ সংকেতটির বেশীর ভাগ বর্ণ একই। শিম্পাঞ্জিদের সব বর্ণগুলো পুরোপুরি এক নয় আমাদের সাথে, এবং ইদুরের সাথে যতটা ভিন্নতা আছে, তার থেকে অবশ্যই কম।

শিম্পাঞ্জিদের এই জিনটির আমাদের জিনটি তুলনা করলে দেখা যাবে, FoxP2 জিনের ২০৭৬ টি অক্ষরের মধ্যে মাত্র নয়টি অক্ষর আলাদা, আর ইদুরের মাত্র ১৩৯ টি বর্ণ ভিন্ন। অন্য জিনদের ক্ষেত্রে এই একই ধরনের সজ্জা আমরা লক্ষ্য করবো। এটাই ব্যাখ্যা করে কেন শিম্পাঞ্জিরা আমাদের এত নিকটাত্মীয়, আর ইদুর অপেক্ষা কৃত দূরের। শিম্পাঞ্জিরা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়, আমাদের কাজিন, আর ইদুররা আরো কিছুটা দূরের। দূরের আত্মীয় মানে আমাদের দুটি প্রজাতির সবচেয়ে সাম্প্রতিক সাধারণ পূর্বসূরি বহুদিন আগে বেঁচে ছিল। বানররা ইদুরদের চেয়ে আমাদের বেশী নিকটবর্তী, কিন্তু শিম্পাঞ্জিদের চেয়ে, আমাদের চেয়ে দূরের আত্মীয়। বেবুন আর রিসাস ম্যাকাক উভয়ই বানর, পরস্পরের নিকটাত্মীয়, প্রায় হুবুহু তাদের FoxP2 জিনটি। তারা শিম্পাঞ্জি থেকে যতটা দূরের ঠিক ততটাই আমাদের দূরের আত্মীয়। FoxP2 জিনে ডিএনএ অক্ষরগুলোর মোট ভিন্নতা যা শিম্পাঞ্জি আর বেবুনের মধ্যে পার্থক্য করে তা প্রায় হুবুহু একই রকম (২৪) আমাদের সাথে যে সংখ্যক ডিএনএ বর্ণ বেবুনদের সাথে আমাদের বিভেদ করে এই জিনটিতে (২৩)। খুব সহজেই সব কিছু সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে যখন আমরা ডিএনএ তে উত্তর খুঁজি।

আর এই ভাবনাটা শেষ করার আগে আরো একটি বিষয়, ব্যাঙরা সব স্তন্যপায়ীদের চেয়ে অনেক দূরবর্তী জিনগতভাবে। প্রত্যেক স্তন্যপায়ীদের এই জিনটি ব্যঙ থেকে একই সংখ্যক ডিএনএ অক্ষরে ভিন্ন ( প্রায় ১৪০), এবং খুব সরল কারণে তারা সবাই ঠিক সমপরিমান দূরের আত্মীয়। সব স্তন্যপায়ীরা ব্যঙের সাথে যে সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছিল (৩৪০ মিলিয়ন) তার চেয়ে পরস্পরের সাথে অপেক্ষাকৃত কম সাম্প্রতিকতম সময়ে এক সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছিল (প্রায় ১৮০ মিলিয়ন বছর আগে)। কিন্তু অবশ্যই সব মানুষই অন্য সব মানুষদের মত একই না, এবং সব বেবুনও অন্য সব বেবুনদের মত একই না, সব ইদুররাই অন্য সব ইদুরের মত না। আমরা আমার জিনের সাথে আপনার জিনের তুলনা করে দেখতে পারি, প্রতিটি অক্ষরের সাথে প্রতিটি অক্ষরের। এবং ফলাফল? আমাদের দুজনের আরো বেশী অক্ষর একই হবে, যদি শিম্পাঞ্জির সাথে তুলনা করা হয় তার চেয়ে বেশী। কিন্তু তারপরও আমাদের দুজনের মধ্যে অক্ষরের কিছু ভিন্নতা আমরা পাবো। খুব বেশী না।

?oh=f143646079cde788318a3c8a2bb25acf&oe=587CBF25″ width=”400″ />

FoxP2 জিনটাকে আলোচনার জন্য আলাদা করে বেছে নেবার পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু যদি আপনি যদি আমাদের সব জিনে সব ডিএনএ অক্ষরগুলোকে গণনা করেন, আমাদের যে কেউই শিম্পাঞ্জিদের সাথে যতটা বর্ণ ভাগ করি, তার চেয়ে বেশী হবে। এবং আপনি আমার সাথে যতটা অক্ষর ভাগাভাগি করেন তার চেয়ে বেশী অক্ষর আপনার কাজিনের সাথে ভাগাভাগি করেন। আপনি এমনকি আরো বেশী অক্ষর ভাগ করে নেন আপনার মা ও আপনার বাবার সাথে এবং ভাই ও বোনদের সাথে ( যদি আপনার তা থাকে)। বাস্তবিকভাবে, আপনি সমাধান করতে পারবেন যে কোনো দুটি মানুষ কতটা নিকট আত্মীয় পরস্পরের তারা যতটা সংখ্যক ডিএনএ অক্ষর ভাগাভাগি করে তা গণনা করার মাধ্যমে। বিষয়টি খুব কৌতুহলোদ্দীপক এবং ভবিষ্যতে আমরা এই বিষয়ে সম্ভবত আরো অনেক বেশী কিছু শুনবো। যেমন, পুলিশ হয়তো কাউকে খুজে বের করতে পারবে যদি তাদের কাছে তার ভাইয়ের ডিএনএ ফিংগারপ্রিন্ট থাকে।

সব স্তন্যপায়ীদের মধ্যে কিছু জিন আছে তারা শনাক্তযোগ্যভাবেই একই ( খুব সামান্য কিছু পার্থক্য ছাড়া)। এই সব জিনে কতটা অক্ষর ভিন্ন সেটি গণনা করা বেশ উপযোগী একটি উপায় বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রজাতিরা কতটা নিকটাত্মীয় সেটি নির্ণয় করা। অন্য জিনগুলো বেশ উপযোগী দূরবর্তী সম্পর্কগুলো নিরুপনে, যেমন মেরুদণ্ডী ও কেঁচোদের মধ্যে। অন্য জিনগুলো আবার দেখার উপযোগী একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নিরুপনে, যেমন ধরুন আপনি আমার কতটা নিকটাত্মীয় সেটি নির্ণয়ে। যদি আপনি আগ্রহী হন, এবং যদি আপনি ইংল্যাণ্ডের হন, আমাদের সবচেয়ে নিকটতম সাধারণ পূর্বসূরি সম্ভবত বেঁচে ছিল মাত্র কয়েক শতাব্দী আগেই। যদি আপনি তাসমানিয়ার স্থানীয় হন, অথবা আমেরিকার আদিবাসী হন, তাহলে আমাদের কয়েক লক্ষ বছর আগে যেতে হবে কোনো সাধারণ পূর্বসূরি খুঁজে বের করার জন্য। যদি আপনি কালাহারি মরুভূমির !কুঙ সান হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের আরো অতীতে যেতে হবে।

সব সন্দেহের উর্ধে বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, এই গ্রহে প্রতিটি প্রাণি ও উদ্ভিদ প্রজাতির সাথে আমরা একটি সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছি। এর কারণ কিছু জিন শনাক্তযোগ্যভাবে একই – সব জীবে, প্রাণি, উদ্ভিদ আর ব্যাকটেরিয়ায়। আর সর্বোপরি, জেনেটিক কোডটি – যে অভিধান ব্যবহার করে সব জিন অনূদিত হয় – সমস্ত জীবে, এ যাবত যে কয়টি জীবে দেখা হয়েছে, প্রতিটি জীবেই এটি একই ভাবে কাজ করে। প্রতিটি জীবই, আমরা সবাই পরস্পরের আত্মীয়। আপনার পারিবারিক বৃক্ষ সুস্পষ্ট নিকটাত্মীয় যেমন শিম্পাঞ্জি বা বানরই থাকবে, সেখানে থাকবে ইদুররা, বাফালো, ইগুয়ানা, ওয়ালবি, শামুক, ড্যাণ্ডেলিয়ন, সোনালী ঈগল, ছত্রাক, তিমি, ওমব্যাট ও ব্যাকটেরিয়ারাও। প্রত্যেকেই আমাদের আত্মীয়, যে কোনো প্রজাতির তা হোক না কেন। যে কোনো পূরাণ বা কিংবদন্তীর চেয়ে এটি কি আরো বিস্ময়কর একটি ভাবনা নয়? আর সবচেয়ে চমৎকার বিষয়টি হচ্ছে আমরা নিশ্চিৎভাবে জানি যে এটি আক্ষরিকভাবেই সত্য।

(দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত)
(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − = 82