মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি -যাদের রক্তে আমাদের গৌরব

শহীদ জগৎজ্যোতি
সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস। জগৎজ্যোতি ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জীতেন্দ্র চন্দ্র দাস। মাতা হরিমতি দাস। জগৎজ্যোতির যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তাকে ভর্তি করা হয় গ্রামের তৎকালীন এম ই স্কুলে। বিনম্র আচরণ ও ভদ্রতার কারনে জ্যোতি সবার প্রিয় ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করলে জগৎজ্যোতিকে স্থানীয় গ্রামে অবস্থিত আজমিরীগঞ্জ এমালগেমে টেড বীরচরণ হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। জগৎজ্যোতি শরিফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলে।
১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির কর্মী হিসেবে জগৎজ্যোতি স্বভাবতই সুনামগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত স্বাধীকার আন্দোলনের সকল কর্মসূচিতে অগ্রভাগে থাকেন এবং সশস্ত্র যুদ্ধে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সংকল্প করেন। সুনামগঞ্জ শহর পাক বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ার পর স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা বালাট চলেন যান। সেখান থেকে প্রথম ১১৪ জনের দলটিকে ভারতের শিলং এ যে গোপন ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন জগৎজ্যোতি। হবিগঞ্জ জেলা ছিল টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে। প্রশিক্ষণ শেষে জগৎজ্যোতির এই দলটিকে নৌপথে হানাদারদের বাধা প্রদানের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে জগৎজ্যোতি হায়নাদের ঠেকাতে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি ও রাজাকারদের কাছে দাস পার্টি ছিল এক মুক্তিমান আতঙ্কের নাম। আর এই দলটির দায়িত্বে ছিল জগৎজ্যোতি দাস।
হাই কমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বানিয়াচং অপারেশনের উদ্দেশ্যে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জগৎজ্যোতি শাল্লা থানার গোপরাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন। সেখানে দাস পার্টির সাথে আরো আটজন মুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হন। টেকেরঘাট সেক্টর থেকে একটি গানবোট আসছে বলে জ্যোতিকে জানানো হয়। গান বোটটি ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা দু’ভাগে ভাগ হয়ে নদীর দু’পাশে অবস্থান নেয়। কার্গোটি আসামাত্র গুলি চালাতে থাকে দাস পার্টির সদস্যরা। বিপাকে পড়ে আত্মসমর্পণ করে বোটের ভিতরে থাকা পাকসেনা ও তাদের দোসররা। সেখানে কার্গোটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়, হত্যা করা হয় চারজন রাজাকারকে। সফল নেতৃত্ব দেন জগৎজ্যোতি দাস।
বানিয়াচং এ সফল অভিযানের পর জ্যোতির নেতৃত্বে দাস পার্টি কুড়িগ্রাম থেকে শাল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। শাল্লা থানা সদরের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে জগৎজ্যোতি ১৭ আগস্ট সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে দাস পার্টি জানতে পারে বানিয়াচং থানার মাকালকান্দি গ্রামে পাক হানাদারেরা আক্রমণ করে অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে। নারীদের উপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন। এদিন রাতেই জ্যোতি সোর্স মারফত জানতে পারেন পরদিন হানাদারেরা পাথরপুর গ্রামে অপারেশন চালাবে। এই খরব শুনে তিনটি নৌকায় করে দাস পার্টির ১২ জন যোদ্ধা রওনা হয় পাহাড়পুরের উদ্দেশ্যে।
শত্র“পক্ষের গতিবিধি লক্ষ করতে তিনি নিজেই একজন ফেরিওয়ালার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রায় দুই ঘন্টা অবস্থানের পর শত্র“পক্ষের আগমন প্রত্যক্ষ করে দাস পার্টি। ৫০ জন পাকসেনা ও দেশীয় রাজাকার মিলে তারা নৌকাযোগে আসে। পাহাড়পুর পৌঁছার পর পাক হানাদাররা রাজাকারদের নির্দেশ দেয় গ্রামের মানুষদের একত্রিত করার জন্য। এক পর্যায়ে জ্যোতির নেতৃত্বে নৌকায় অবস্থানকারী রাজাকারদের তারা মেরে ফেলল এবং হানাদারদের উপর তীব্র আক্রমণ শুরু করল। প্রায় দুই ঘন্টা যুদ্ধ চলার পর হানাদারেরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সেখান থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে দাস পার্টি রওনা হয় দিরাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
তিনি বহিঃশত্র“দের ঘায়েল করতে এমন সব পন্থা অবলম্বন করতেন যা ছিল বিস্ময়কর। এমনই একটি অভিযান পরিচালনা করেন জ্যোতি শেরপুরে। শেরপুর আজমিরীগঞ্জ রুট ব্যবহার করে হানাদারেরা তাদের সব সরঞ্জাম নির্বিঘেœ পৌঁছে দিত বিভিন্ন এলাকায়। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর আসে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে বেশ কয়েকটি চালান নদীপথে নিয়ে আসার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পাক বাহিনীরা। তাৎক্ষণিকভাবে জ্যোতির নেতৃত্বাধীন দাস পার্টিকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে কোন মূল্যে গান বোটগুলো ধ্বংস করার জন্য। জগৎজ্যোতির নির্দেশ অনুযায়ী নদীর পশ্চিম তীরে পানির নিচে একটা খুঁটি পোতা হয় অপর একটি খুঁটি পোতা হয় নদীর পাড়ে। খুঁটি দুটি একটা শক্ত রশি দিয়ে বাঁধা হয়। এই রশিতে পাঁচটি অ্যান্টি মাইন ট্যাঙ্ক ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
রাত ১১ টায় একটা নৌবহর দেখে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। নৌবহরটি মাইন লাইনে আসা মাত্র জ্যোতির নির্দেশে টার্গেট বরাবর রকেট লাঞ্চার থেকে একটি গোলা নিক্ষেপ করা হয়। অন্যদিকে মাইন সিরিজের ফিউজে সেফটি ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। ধ্বংস হয় গোলাবারুদবাহী হানাদারদের গানবোট।
বদরপুর ব্রীজ ধ্বংসের ব্যাপারে জ্যোতি তার নিজের রণকৌশলে কমসংখ্যক সরঞ্জামাদি দিয়ে বদরপুর ব্রীজ ধ্বংস করে দেন যাতে করে হানাদাররা ঐ পথ দিয়ে না আসতে পারে।
জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে জামালপুর থানা আক্রমণ দাস পার্টির অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব। জামালপুর শত্র“মুক্ত করার জন্য জ্যোতি জামালপুর থানা আক্রমণ করে সেখানে অবস্থানরত রাজাকারদের হত্যা করতে সফল নেতৃত্ব দেয় জগৎজ্যোতি। এরপর জগৎজ্যোতি অনেকগুলো সফল অভিযান পরিচালনা করেন যেমন শ্রীপুর অভিযান, খালিয়াজুড়ী থানা আক্রমণ, রাণীগঞ্জ ও কাদিরগঞ্জ অভিযান। এরপর একে একে দিরাই-শাল্লা অভিযান, শাহজিরবাজার আশুগঞ্জ বিদ্যুত লাইন বিচ্ছিন্নকরণ করা হয় জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে।
মুঞ্জিয়ারগাঁওয়ে যাওয়ার সময় হানাদারেরা তাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে। জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে দাস পার্টিও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেনি। যখন তিনদিক থেকে আক্রমণ শুরু হয় তখন জ্যোতি ও তার বাহিনী বিলের মধ্যে অবস্থান করেন কিন্তু, সেখান থেকে তারা একটুকুও সরে যেতে পারে না। পাকবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে একে একে দাস পার্টির অনেকে মারা যায়। জগৎজ্যোতি প্রাণপণ যুদ্ধ করতে থাকে। তার নির্ভুল নিশানায় ১৪ জন পাকসেরা মারা যায়। দুপুর গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হয় তখন জগৎজ্যোতির সাথে মাত্র ১ জন সহযোদ্ধা থাকে। শেষ সহযোদ্ধা ইলিয়াস জগৎজ্যোতিকে পিছু হটতে বললে জ্যোতি শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হঠাৎ একটা গুলি এসে জ্যোতির বুকে বিদ্ধ হয়। জ্যোতি শেষবারের মত চিৎকার করে ওঠেন- আমি যাইগ্যা! ইলিয়াস পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে তার প্রিয় কমান্ডার ও প্রাণপ্রিয় যোদ্ধা জ্যোতির তেজময় দেহ পানিতে ডুবে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস তার কমান্ডারকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে কোমর পানিতে কাঁদার মধ্যে নিথর দেহ ডুবিয়ে দেন সুযোগ পেলে পুনরায় এসে লাশ তুলে নেওয়ার প্রত্যাশায়। এভাবে অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস দেশ ও মাতৃকার জন্য যুদ্ধে শহীদ হন।
শহীদ রওনাকুল ইসলাম বাবর
খুলনার দৌলতপুরে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে রওনাকুল ইসলাম বাবরের জন্ম। পিতা মরহুম মোঃ হানিফ দৌলতপুর মহসিন স্কুলের কৃতি শিক্ষক ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন। পরে এস. এস. সি পাশ করে ব্রজলাল কলেজে ভর্তি হলে নিজেকে ছাত্র রাজনীতিতে নিবেদন করেন। ১৯৬৮ সালে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একজন প্রথম সারির ছাত্র নেতা হিসেবে শুধু ব্রজলাল কলেজে নয় সারা খুলনা জেলার ছাত্রসমাজের কাছে পরিচিত হন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার পর অন্যদের সাথে তিনিও দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরুতে তৎকালীন ছাত্রনেতা মনিরুজ্জামানের সাথে সংগঠনের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কর্মীদের ভারতে ট্রেনিং এর জন্য পাঠিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। দীর্ঘ কয়েকমাস এভাবে বাড়ি ছেড়ে কাজ করার পর ২৯ জুলাই তিন তার অসুস্থ পিতার সাথে দেখা করতে দৌলতপুরের বাড়িতে আসেন। স্থানীয় রাজাকার বাহিনী খবর পেয়ে হানাদারদের দিয়ে আটক করিয়ে স্থানীয় এক পান চাষীর বিল্ডিংয়ে আটকে রাখে। তার সঙ্গে আটক করে তার ছোট ভাই জাকির হোসেন ও ছাত্রনেতা তপন দাসকে।
সারাদিন নির্যাতনের পর সেদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় মহেশ্বরপাশা বিলে (বর্তমান কৃষি বিভাগের নার্সারি) তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে একবার বলা হয়, তুমি একবার পাকিস্তান জিন্দাবাদ বল, তোমাকে ছেড়ে দেব। বাবর পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেন নি। তারপর প্রথম তার দুই হাত কেটে ফেলা হয় এবং এরপর দু’পা। পরে বেয়নেট দিয়ে চোখ উপড়ে ফেলা হয়। অবশেষে তাকে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হলে ঐ স্থানে তার কঙ্কাল পাওয়া যায় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।
শহীদ সুভাষ
গরিব পিতামাতার সন্তান সুভাষ তার গায়ের শ্যামলা বরণের জন্য ঘনিষ্ঠ সকলের কাছে পরিচিত ছিল কালু নামে। অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সুভাষ ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে সচেতন ছিলেন। ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশ যে অগ্নিময় অবস্থা ধারণ করেছিল তার উত্তাপ থেকে সুভাষ বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটি ও কমিউনিস্ট পার্টি কক্সবাজার শাখার সদস্য কক্সবাজার ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের বিশিষ্ট নেতা হিসেবে সুভাষ ছিলেন সকলের অতি প্রিয়পাত্র।
সুভাষের বাড়ি ছিল কক্সবাজারের টেকপাড়া গ্রামে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে কক্সবাজার শহরের প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হাতে প্রথম শিকার হন সুভাষ ওরফে কালু। পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে নেতৃবৃন্দ গা ঢাকা দিলে কালু তা করেনি। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মা-বাবাকে শহর থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শহরে এসে শত্র“পক্ষের হাতে আটক হন সুভাষ।
এক সময়ের স্কুল সহপাঠী মাহমুদ যে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছে সে কালুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায়। কালুকে বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই এপ্রিল ২৭ বছর বয়সে শহীদ হয়েছিরেন সুভাষ।
শহীদ মোঃ বদিউল আলম
বশিরউদ্দিন আহমেদের পুত্র মোঃ বদিউল আলম ১৯৪৯ সালের ১০ জানুয়ারি গাইবান্ধায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ২৪শে আগস্ট প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ৪র্থ বর্ষ পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ‘বদি ভাই’ নামে সমধিক পরিচিত সকলের প্রিয় বদিউল আলম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আহসানউল্লাহ হল শাখার সবাপতি ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তাঁকে আল বদররা আলীয়া মাদ্রাসায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি।
শহীদ নিতাই দেবনাথ
শহীদ নিতাই দেবনাথ ছিলেন বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। কলেজ ছাত্রাবস্থায় তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন এবং মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির কর্মী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান। তাঁকে আসামের তেজপুর সালুনবাড়ী ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে প্রশিক্ষণকালীন দুর্ভাগ্যজনক এক ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ কৃত্যে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিগ্রেডিয়ার আর. কে. অগ্নিহোত্রা। সামরিক মর্যাদায় তাঁকে দাহ করা হয়।
শহীদ নিতাই দেবনাথ এর মৃত্যুর পর তাঁর মাতা একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যান এবং এর অবস্থায় মারা যান।

শহীদ ফজলুর রহমান
স্কুলে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। গুরুদয়াল কলেজে পড়ার সময় সেখানে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী সংগঠন। ’৬৯ ও ’৭০-এর উত্তাল দিনগুলোতে তিনি পালন করেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ১৯৭০ সালের বি. এ পাশ করার পর একাত্তরের জানুয়ারিতে যোগ দেন একটি হাই স্কুলে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সব ফেলে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। কিশোরগঞ্জের কুখ্যাত রাজাকার মুসহলে উদ্দিন আটক অবস্থায় কিশোরগঞ্জের সিদ্ধেশ্বরী ঘাঁটে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। শহীদ ফজলুর রহমান ছাত্র ইউনিয়ন মহকুমা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তার মায়ের নাম আমেনা খাতুন ও বাবার নাম মৌলভী আবদুল আজিজ। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আতকগাড়া, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
শহীদ অজিত সরকার
জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ১৫ই ফেব্র“য়ারী, বত্রিশ কিশোরগঞ্জে। ছাত্র ইউনিয়ন কিশোরগঞ্জ শহর কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৬ আগস্ট গফরগাঁও পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং শহীদ হন।
শহীদ নাসিরুজ্জামান ননী
খুলনা সিটি কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন নাসিরুজ্জামান ননী। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে পাকিস্তানী বাহিনী অতর্কিত তার বাসায় হামলা চালিয়ে আটক করে নাসিরকে। কয়েকদিন নির্যাতনের পর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলি করেই ক্ষান্ত হয় নি বর্বর পাক হায়েনারা, শহীদ নাসিরুজ্জামানের লাশ ঝুলিয়ে রাখে জনসম্মুখে।
শহীদ ওলিউর রহমান
খুলনা সিটি কলেজে øাতক শ্রেণির নৈশ বিভাগের ছাত্র ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এ মেবাধী সংগঠক। শ্রমিকদের মুক্তির জন্য সবসময়ই তিনি ভাবতেন। ভাবতেন একটি শোষণহীন সমাজের কথা। থাকতেন খুলনা সংলগ্ন খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের মিল ব্যারাকে। ১৯৭১-এর দুঃসহ দিনগুলির প্রথম দিকেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এ দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় ওলিউর রহমানকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।
শহীদ রতন কুমার বর্মণ
চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন রতন কুমার বর্মন। ১৯৭১-এ যুদ্ধ শুরু হলে রাঙ্গুনীয়ায় চলে যান। ৮ এপ্রিল বাবার জন্য ঔষধ কিনতে বের হয়ে পথে কাপ্তাইয়ের পথে নিখোঁজ হন। এরপর তিনি আর ফেরেননি। শহীদ রতন কুমার বর্মন ছাত্র আন্দোলনের একজন প্রথম সারির নেতাই ছিলেন না তিনি চট্টগ্রাম বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পীও ছিলেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 5