পৃথিবীর পথে প্রান্তরে।

আমার প্রথম বিদেশ যাত্রার লক্ষ ছিল দঃ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং হয়ে কোরিয়া গিয়ে ছিলাম। সে সময় যে কি পরিমাণ বোকা ছিলাম তা আর বলে বুঝাতে পারবনা। যদিও আমি এখনো খুবই বোকা। কখনো যে চালাক চতুর ছিলাম এমন দুর্নাম আমার জীবনে কোন দিনই ছিলনা। ছোট বেলায় পারিপার্শ্বিক সবার কাছ থেকে বোকা, ভোঁদাই এসব শুনতে শুনতে আমি যে পাক্কা ভোঁদাই তাতে আমার পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস ছিল।

যাইহোক মুল কথায় আসি। যাচ্ছিলাম থাইল্যান্ড, জীবনে কোনদিন এতো দুরের গন্তব্যে যাব বলে চিন্তাই করিনি। তার আগে যদিও দু’একবার বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছি তা ছিল সবই দেশের সীমানার মধ্যে। বিমানের দুঘণ্টার দূরত্ব তবুও যেন বিরাট ব্যাপার স্যাপার! বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশাল লম্বা ডানা ওয়ালা বিমান, ধবধবে ফর্সা বিমান বালা (এখন যদিও সব সাইজ এবং সব রঙেরই পাওয়া যায়) বিমানের ভিতরে কফির কি একটা ভাজা ভাজা গন্ধ, সব মিলিয়ে আমার চোখে শুধু বিস্ময় আর বিস্ময়!!

বোকার ভাগ্য কখনো সুপ্রসন্ন হয়না, আমারো ঘটল তাই। আমার সাথীরা সব বাইরে গেছে, ইমিগ্রেশনে আমাকে দিল আটকে। কি একটা ফরম পুরন করতে হয় আমার তো জানায় ছিলনা, সুতরাং নতুন করে ফরম পুরণ করে বের হতে হতে ততক্ষণে ওরা সব বাইরে। আমি কাঁচের দেয়ালের ওপারে দেখতে পাচ্ছি ওরা সব দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমি যাব কোন দিক দিয়ে পথ তো খুঁজে পাচ্ছিনা। কোন দিকে কোন দরজাও নেই, লোকজনও নেই, কি এক বিড়ম্বনা!
একটু পরে দেখি একলোক হন হন করে হেঁটে আসছে। লোকটা যে দিক দিয়ে আসছিল সোজা হেঁটেই চল্ল, কাঁচের দেয়ালের কাছাকাছি যেতেই দুপাশে দুটা কাঁচ সরে গেল, অবাক ব্যাপার স্যাপার!! আমিও কাঁচের দেয়ালের কাছাকাছি হতেই তেমনি দুটো কাঁচের পাল্লা সরে গিয়ে দরজা হয়ে গেল। এতো দেখি আলী বাবা চল্লিশ চোর গল্পের সেই চিচিং ফাঁক অবস্থা!!

বাইরে গিয়ে দেখি আজব সব কাণ্ডকারখানা, এত্তোবড় ধাড়ী ধাড়ী মেয়ে, পুরুষ সাদা ধবধবে রান বের করে হাফ প্যান্ট পরে রয়েছে! পুরুষের তুলনায় মেয়েদের কাপড়ের পরিমাণ যেন আরো কম, অধিকাংশ মেয়েরা সেন্ডো গেঞ্জি জাতীয় কি সব পরে রয়েছে। মেয়েরাও গাড়ি, মটর সাইকেল সবই চালাচ্ছে, বিশেষ করে এতো বেশি মোটরসাইকেল চলছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল যেন শহর জুড়ে মোটরসাইকেলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

সংগের লোক জনের সাথে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, এতোদিন পরেও হোটেলের নামটা মনে আছে শের-এ পাঞ্জাব, সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবিদের হোটেল ছিল সেটা। যা হোক, হোটেল এলাকায় আসতেই কি একটা উৎকট গন্ধ নাকে এলো, কি বিশ্রী সে গন্ধ!! হোটেলের ভিতর পা দিতেই আবারো চমকে উঠলাম! ইয়া বড় বিশাল বিশাল দেহ, নাক বোঁচা আর পাতিলের তলার মত কুচকুচে কাল মানুষ! মানুষ এতো কাল হয় জীবনে কোন দিন দেখিনি!

পরদিন বাইরে ঘুরতে গিয়ে উৎকট গন্ধের কারণটা জানা গেল, শামুক, ঝিনুক আরো কি সব গ্রিলে পুড়ে পুড়ে খাচ্ছে আর তা থেকেই এই গন্ধটা বেরুচ্ছে।
বিমানে ঝাল লবণ ছাড়া কি সব ছাইপাঁশ খেতে দিয়েছিল একবার মুখে দিয়ে আর দ্বিতীয় বার মুখে তুলতে পারিনি। এখানকার খাবার আর খাব কি? দেখেই তো নাড়ী ভুঁড়ি বের হয়ে যাবার উপক্রম! স্পেশাল অর্ডার দিয়ে আলু ভর্তা আর ভাত এলো, তাও কি খাওয়া যায়! কেমন তেলতেলে, যেন পানির বদল তৈল দিয়ে রান্না করেছে।

কখনো সিঁড়িতে, কখনো বারান্দায় মাঝেমধ্যেই কাল মানুষদের সাথে দেখা হয়ে যাচ্ছে, দেখা হলেই মোটা হেড়েগলায় গুড মর্নিং, গুড আফটারনুন বলছে, আমি যে তাল পাতার সেপাই ভয়ে ভয়ে কোন রকম উত্তর দিয়ে কেটে পড়ছি। কি জানি যে দৈত্য দানবের মত চেহারা হঠাৎ আক্রমণ করেই বসে কিনা!

তিনদিন পর আবার উড়াল দিলাম হংকংএর উদ্দেশ্যে। ক্ষুধা তৃষ্ণায় বিমান বন্দরেই প্রাণ যায় যায় অবস্থা, বিমানে উঠে এবার আর ঝাল লবণের খোঁজ পড়লনা, যা এলো সব সাবাড় করে ফেললাম।
মাসুদ রানার রহস্য উপন্যাসের মত পাহাড়ের আর সমুদ্র বেষ্টিত কোন দুর্গম গিরি গুহাই যেন বিমানটা অবতরণ করল। তারপর ট্যাক্সি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছিলাম।
অবাক সুন্দর শহর! নানান আকারের, নানান ডিজাইনের, নানান রঙ বৈচিত্র‍্যের বিশাল বড় বড় বিল্ডিং আর বিল্ডিং!! কোথাও এতোটুকু ময়লা আবর্জনা নেই। সব কিছুই ঝকঝকে তকতকে সাজানো গোছানো শহর। তার মাঝ দিয়ে স্ফটিক স্বচ্ছ জলের নদী, সেখানে অজস্র নৌকা, জাহাজ, লঞ্চ, স্পিডবোট। সন্ধ্যা হতেই নানা রঙের আলো জ্বলে আরো এক স্বর্গীয় রুপ ধারন করল। এতো সুন্দর শহর কোন ভাবেই ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছিল না।
মনে করেছিলাম কোরিয়া বোধহয় তেমনি হবে, আসলে পাহাড় পর্বতময় কোরিয়া সে এক অন্য রকম প্রকৃতিক সৌন্দর্য। মার্চ মাসেও এখানে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মোটা কোট টাই পরেও শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছি।

এক বছর দেড় মাসের মত কেটেছে আমার এই দেশটাতে। জীবনের প্রথম ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা সন্ধান পেয়েছি এখানেই। তুষার পাতের অবাক সৌন্দর্যের প্রথম সকাল দেখা, পাহাড়ের বিশালতার কাছে আনমনে তাকিয়ে থাকা, সমুদ্রের থৈথৈ জলরাশির বিস্ময়কর সৌন্দর্যের কাছে নির্বাক চেয়ে থাকা। জীবনের প্রবল অনুভূতির অনেক গুলো স্মৃতি আমার এখানেই।

কত বোকা ছিলাম সে সব কিছু কথা মনে হলে এখনো একা একাই লজ্জা পাই। খুব মনে আছে একদিন ভুতের গল্প করায় আমার সহকর্মীরা হো হো করে হেসেছিল। শুধু হেসেই খান্ত হয়নি, ওরা সব সহকর্মীদের বলে বেড়িয়েছে। যেই শুনেছে আমাদের দেশে জীন পরি আছে, সেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়েছে। ওরা হয়তো ভেবেছিল আমি আস্ত একটা বেয়াক্কল।

আমি আসলে ঠিকই ছিলাম, কমবুঝ মুর্খরা জানেনা যে আমাদের দেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, মন্ত্রী মিনিস্টার, সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সবায় কম বেশি এই, জ্বীন পরীতে বিশ্বাস করে। শুধু তাই নয় এসব বিশ্বাস আমাদের এখানে ঈমানের অংগ। বিশ্বাস করিনা, জনসম্মুখে এ কথা বলে কেউই ক্ষমতায় থাকতে পারবেনা, তা সে যত বড় লাট সাহেবই হোক।

এদেশ সে দেশ করে জীবনের কত গুলো বৎসর চলে গেল! এখন আর ভিন্ন রকম খাবার দেখলে গা গুলায় না, মনে করি মানুষ জাতীর ক্ষুধার অন্ন সে সব! খুব মজা করেই খেতে পারি অনেক কিছু। ভিন্ন পোশাক, সাজগোছ গায়ের রঙ, শরিরের গড়ন এসব দেখলে আর ভয় করেনা। আন্তরিক ভাবে মিশে জানতে পেরেছি উপরের যেমনই হোক ভিতরে অন্তত বাঙালীর চেয়ে সরল ওরা।
পৃথিবীর সব কিছুই পরিবর্তনশীল, আমার চোখের দেখা সেসব স্থান গুলোও আর নিশ্চয় আগের মত নেই। পাশাপাশি থাকা মানুষ গুলোর কেউ একজন চলে গেলে জড়ে ধরে কেঁদেছি। তারা আজ এতোদিনে কে কোথায় তার কিছুই জানবার উপায় নেই। আজ কারো হয়তো মনেও পড়েনা, শুধু আমি চিরকেলে বোকা বলেই এমন পুরাতন কথা লিখতে বসেছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 2 =