“”এ পিঠ ও পিঠ”” (পর্বঃ১)

একটা মেয়ে ষ্টেশনে বসে নাকের পানি, চোখের পানি এক করে ফেলছে। দেখতে কুৎসিত লাগার মত ব্যাপার। কিন্তু এই কুৎসিত দৃশ্যটি মানুষ প্রবল আগ্রহ নিয়ে দেখছে। প্রত্যেক সমাজের মানুষ আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। আমাদের সমাজের মানুষজন জন্মায় প্রবল আগ্রহ নিয়ে। সব কিছুতেই আমাদের প্রবল আগ্রহ থাকে। মেয়েটা বিকেল থকেই ষ্টেশনের পাশের টুলে বসে আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। তার সাথে যোগ হয়েছে মেয়টার চোখের পানি, নাকের পানি। এতক্ষণ কেউ তেমন পাত্তা না দিলেও কয়েকজন মানুষ এখন জটলা পাকাতে শুরু করেছে।
আবিদ পাশের দোকানটায় বসে ছিল। অনেকক্ষণ থেকেই মেয়েটাকে লক্ষ্য করছে। ইদানীং চায়ের সাথে সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে। চা খেলে সিগারেট বাধ্যতা মূলকে পরিণত হয়েছে। চা খাওয়া কমাতে হবে এজাতীয় কথা চিন্তা করতে করতে মেয়েটার সামনে চলে এল।
‘কি সমস্যা?’
মেয়েটা সম্ভবত এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলনা। অপ্রস্তুত হয়ে চোখ দুটো কপালে তুলে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে বলল, ‘কিছুনা’।
‘কিছুনা তো এখানে বসে এভাবে ভ্যা ভ্যা করছেন কেন?’
মেয়েটা জবাব দিল না। আগের মত তাকিয়ে থাকল।
কৌতূহল আর ভয় মিশ্রিত চোখ দুটোকে মন্দ লাগছেনা। আবিদ অপেক্ষা না করে বলল, ‘উঠুন, সামনে হাঁটি। এভাবে আর কিছুক্ষণ বসে থাকলে আপনাকে নিয়ে মিছিল শুরু হয়ে যাবে।’
মেয়েটা সেভাবে বসে থাকল। আবিদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটু দূরে চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসল। চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাতেই দেখল পাশে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে।
আবিদ টুলের একপাশে সরে গিয়ে বলল, ‘বসুন। চা খাবেন?’
মেয়েটা আবার হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে বলল, ‘না।’
‘কোথাও যাবেন?’
‘না।’
‘কোথাও থেকে আসছেন?’
‘না।’
‘কারো জন্য অপেক্ষা করছেন? বয়ফ্রেন্ড? পালিয়ে বিয়ে করবেন? আসেনি?’ এক সাথে প্রশ্ন গুলো করে আবিদ হা হা করে গলা ছেড়ে হাসতে থাকল।
মেয়েটা জবাব দিলনা। একবার শুধু চোখ তুলে তাকাল।
আবিদ ষ্টেশনের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটছে। মেয়েটা পাশেপাশে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। একটু দূরে রফিক ঘুরঘুর করতে দেখে আবিদ ডেকে আনল। আবিদের সাথে রফিকের চুক্তি আছে। পানি, সিগারেট যখন যা লাগবে বলা মাত্র হাতে চলে আসবে বিনিময়ে তাকে প্রতিদিন দশ টাকা করে দেওয়া হবে। রফিক প্রবল উৎসাহে তার দায়িত্ব পালন করে যায়।
রফিক একটা স্কুলে পড়ে। সপ্তাহে একদিন ভার্সিটি থেকে কতগুলি ছেলে এসে পড়িয়ে যায়। তারাই ফ্রি তে বই দেয়। রফিক সেদিন হাত থেকে বই কোথাও রাখেনি। যাই করছে বই হাতে। আবিদ বলল, ‘কিরে বই কই পাইলি?’
রফিক হেসে বলল, ‘স্কুলে দিছে’।
রফিকের হাসি দেখে পরদিন আবিদ মোটা দেখে আরেকটা বই এনে দেয়। রফিক পড়তে পারেনা। তবু সে কান পর্যন্ত হাসতে চেষ্টা করল। এরপর থেকে রফিক কখনো টাকা খোঁজে না। কিন্তু পাশে ঘুরঘুর করে। আবিদ ডেকে এনে দশ টাকা দিয়ে দেয়।
আবিদ বলল, ‘এখন কোথায় যাবেন? বাসায়?’
মেয়েটা কোমল কণ্ঠে বলল, ‘না, আব্বু আমাকে মেরে ফেলবে।’
আবিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘কোন আত্মীয়ের বাসায় চলে যায়, পরে কিছু একটা হবে।’
মেয়েটা জবাব দিলনা। ছলছল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আবিদ চোখ সরিয় ফেলল। কিন্তু তার খুব ইচ্ছে করছিল মেয়েটার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে। সূর্য ডুবে গেছে অনেক আগে। রাস্তার পাশে নিয়ন বাতি গুলো জ্বলজ্বল করছে। তারা দুজন রিকশা পাশাপাশি বসে আছে। হরতালের কারনে তেমন গাড়ি চলছে না। আজ বিচিত্র কারণে রাস্তা বেশিই ফাঁকা। আবিদ ধরে নিয়েছিল মেয়েটা তার সাথে যেতে রাজি হবে না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে তার বড় ফুফুর বাসায় যাচ্ছে। মেয়েটা রিকশার একপাশে জড়সড় হয়ে বসে আছে। আর কিছুক্ষণ পরপর চোখ মুছে নিচ্ছে।
আবিদ আকাশ পাতাল ভাবতে শুরু করল। সে অনেক দিন দিবা স্বপ্ন দেখেছে এক রমণীকে নিয়ে নিয়ন বাতির আলোতে রিকশা করে ঘুরছে। নিয়ন বাতির আলোতে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। মেয়টা গভীর মমতায় চোখে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো দেখছে। সে অবাক চোখে মেয়েটার বৃষ্টির ফোঁটা দেখা দেখছে। কিন্তু এভাবে সত্যি হয়ে যাবে তা সে সপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। সে মেয়েটাও কি এরকম ছলছল মায়াবী চোখে তাকাতো? আবিদ মনে মনে বলল, সে যদি মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, ‘এই মেয়ে, তোমাকে আমি হাজার বার কাঁদাবো তোমার চোখের পানি মুছে দেওয়ার জন্য। মেয়েটা কি খুব রাগ করবে?’
আবিদ মুখে বলল, ‘আপনাদের সম্পর্ক কত দিনের?’
মেয়েটা জবাব দিল না।
আবিদের অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছে। অস্বস্তি দূর করার জন্য সে রিকশাওয়ালার সাথে কথা বলা শুরু করল। ‘চাচা ঘরে কে কে আছে?’
রিকশাওয়ালা উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘তিন ছেলে।’
‘কি করে?’
‘সবাই পড়ে। বড়টা ক্লাস টেনে।’
আবিদ গম্ভীর গলায় বলল, ‘ভাল ভাল’।
লোকটার ঘাড়ের অংশ দেখে কেমন পরিচিত লাগছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলো না কার মত। অনেকক্ষণ পর মনে হল তার বাবা ঘাড়ের অংশ লোকটার মত ছিল। রফিককে একদিন ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর তার মা অবাক হয়ে বলল, ‘তুই ছোট বেলায় হুবহ এরকম ছিলি। নাকটা দেখ।’
আবিদের ধারণা মানুষ বয়স বাড়ার সাথে সাথে সামনে পড়া মানুষদের সাথে কাছের দূরে চলে যাওয়া মানুষ গুলোর সাথে মিল খুঁজতে থাকে। অনেক গুলো মানুষকে দেখে খুব পরিচিত মনে হয়। কোথায় যেন দেখেছি মনে হয়। কিন্তু ঠিক মনে করা যায় না। মেয়েটাকেও খুব পরিচিত লাগছে। সেও কি কারো মত?
রিকশা বড় রাস্তার পাশ ধরে ধীরে ধীরে চলছে। এখন এক ধরনের রিকশা বের হয়েছে। রকেটের মত দ্রুত চলে যায়। আবিদ ইচ্ছে করেই বেশি সময় পাশে থাকার জন্য তাতে উঠেনি। আজ তার ভীষণ মন ভাল। এই রাস্থায় সে অনেক বার আসা যাওয়া করেছে। কিন্তু কখনও বড় আম গাছটা চোখে পড়েনি। আজ পড়েছে। শুধু তাই না, আম গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো এত অপরূপ লাগে সে তা আজই প্রথম বের করেছে। মন ভাল থাকলে সব ভাল লাগার জিনিস চোখের সামনে এসে হাজির হয়? নাকি ভাল লাগার জিনিস সব জায়গায় থাকে, মন ভাল থাকলে চোখ তা খুঁজে নেয়?
তিন রাস্তার মোড়ের কাছে আসতেই মেয়েটা বলে উঠল, ‘একটু রাখেন।’
রিকশা দাঁড়ানোর সাথে সাথে মেয়েটা নেমে গেল। প্রায় দৌড়ানোর মত করে মোড়ের দিকে চলে যাচ্ছে। সেখানে একটা সিএনজি দাঁড়ানো ছিল। আবিদ কিছু বুঝে উঠার আগেই তিন চারটা ছেলে তার মোবাইল, মানিব্যাগ নিয়ে সিএনজিটার দিকে দৌড় দিল। ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেল যে সে প্রায় হতভম্ব হয়ে কিছুই বলতে পারল না। শুধু দেখল মেয়েটা সিএনজিতে উঠার আগে একবার তার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। সে চোখে কিছু বলার আর্তি ছিল।
আবিদ নিয়ন বাতির আলোতে আনমনে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে থাকল। বারবার মেয়েটার ছলছল চোখের মায়াবী মুখটা ভেসে উঠছে। আজ তার ভীষণ রকম মন খারাপ। আজ সে ষ্টেশনের পকেটমার জীবনে প্রথমবার ধরা পড়েছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 89 = 97