বাংলা সাহিত্যে যে ১০০ টি বই আপনাকে পড়তেই হবে (ছয়)

৫১। ‘উত্তর পুরুষ’ লেখক- রিজিয়া রহমান। রিজিয়া রহমানের কোন বই পড়ি নাই আগে। আর মহিলা রাইটার বলে খুব একটা উৎসাহও ছিল না পড়ার। অসাধারণ বই এই “উত্তর পুরুষ”! আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির এ্যাসেট। উপন্যাসের শুরুতেই বঙ্গোপসাগরকে যে উপমায় বাঁধেন লেখিকা তা পড়ে তার আঙুল ছুঁয়ে আসতে ইচ্ছে করে। সারাটা উপন্যাসে উপমার সার্থক ব্যবহার পাঠককে যেমন সম্মোহিত করে তেমনি উপন্যাসটিকে করে তুলে অনেক বেশি বাঙ্ময়।

৫২। ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’ লেখক- সুস্মিতা বন্দোপাধ্যায়। এ উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে রাব্বানির যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্মের নামে কায়েম হওয়া সন্ত্রাসের রাজত্ব, মেয়েদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে অন্ধাকারে পাঠিয়ে দেয়া, কোরআন শরীফের মনগড়া অপবেখ্যা, সংকীর্ণতা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে। বাস্তবতা হলো লেখিকা তাঁর ”কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ” উপন্যাসে নিজের জীবনের কাহিনী তুলে ধরেছেন। কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ” এর কাহিনীর সংক্ষিপ্ত রুপ হচ্ছে, কলকাতার ব্রাক্ষ্মন পরিবারের একটি মেয়ে বিয়ে করে আফগাস্তানের কাবুলের গজনি এলাকার এক মুসলিম যুবককে। স্বামীর সাথেই পাড়ি জমান শ্বশুর বাড়ি আফগানিস্তান। সেখানে যাওয়ার পর ওই বাঙালি বউয়ের উপলব্দিতে হলো এরা শুধু ধর্মান্ধ নয়, এদের মানসিকতাও রুচিহীন। পরদেশী একজন বাঙালি নারীকে ছেলের বউ হিসাবে তারা কিভাবে গ্রহন করলো, তাদের দর্শন, তাদের দেশে নারীর মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক, দাম্পত্য জীবনসহ খুটিনাটি নানা বিষয় গল্পে গল্পে তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসে।

৫৩। ‘পথের পাঁচালি’ লেখক- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাসের গল্প এ রকম- “গ্রাম্য গরীব একটি পরিবারের সুখ দুঃখের মাঝে দুটি চঞ্চল শিশুর বেড়ে ওঠা । নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান অপু ও দূর্গা । বাবা হরিহর রায়, মা সর্বজয়া, আর অপু-দূর্গার বৃদ্ধা ফুফু ইন্দিরা ঠাকুরকে নিয়ে পরিবারটির সদস্য সংখ্যা পাঁচ । হরিহরের পেশা পুরোহীতগিরী করা । সামান্য আয় । কোন রকমে সংসার চলে । টানাটানির সংসারে বিধবা বোন ইন্দিরা ঠাকুর বাড়তি বোঝা । হরিহর কিছু না বললেও স্ত্রী সর্বজয়ার সাথে প্রায়ই ছোটখাট ঝগড়া হয়ে যায় । অপু বড় বোন দূর্গার সাথে বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । মিষ্টিওয়ালা, বায়োস্কোপ, আর ট্রেনের পিছনে ছুটতে ছুটতেই দিন কেটে যায় । সংসার, দারিদ্রতা কোন কিছুরই চিন্তা নেই ওদের । এদিকে অপু, দূর্গা খেলতে গিয়ে হঠাৎ একদিন বনের মধ্যে বৃদ্ধা ইন্দিরা ঠাকুরকে মৃত আবিস্কার করে। মর্মান্তিক দৃশ্য । বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে আক্রান্ত হয় দূর্গা । চিকিৎসার অভাবে বাড়তে থাকে জ্বর। গভীর রাত । বাইরে প্রচন্ড ঝড়-বাতাস । ঘরদোর উড়িয়ে নেয়ার পালা । সেই রাতেই দূর্গা মারা যায় । হরিহর ফিরে আসে তারও কিছুদিন পর । সবার জন্য অনেক কিছু কিনে এনেছে । শাড়ি হাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সর্বজয়া ।বুঝতে বাকি থাকে না হরিহরের । পাথরের মত নিশ্চল হয়ে যায় । ছবির সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য অবলোকন করে দর্শক । এত কষ্ট! এত সংগ্রাম! তবু পিছু ছাড়ে না দারিদ্র । সব ছেড়েছুড়ে হরিহর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গরুর গাড়িতে চড়ে অজানার উদ্দেশ্যে ……..।

৫৪। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ লেখক- নীলিমা ইব্রাহীম। খুব সহজ ভাষায় সাতটি মেয়ের বীরত্বের কাহিনী এতে লেখা আছে। একশো ষাট পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। জীবন যুদ্ধে যারা শত কষ্টের মাঝেও হেরে যায় নি শুধু তাদের গল্প দিয়েই বইটি সাজিয়েছেন লেখিকা। আমরা যারা সহজে হতাশ হই, হাল ছেড়ে দেই, নৈরাশ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যেয়ে মুক্তি খুঁজি তারা যেনো যুদ্ধ করার, লড়ার মনোবল রাখি।

৫৫। ‘পুত্র পিতাকে’ লেখক- চানক্য সেন। ‘পুত্র পিতাকে’ উপন্যাসে পুত্র পিতাকে লিখে, ‘তোমরা আমাদের সরিয়ে দাও, দূরে রেখে দাও, তোমাদের বড়দের দুনিয়ার বাইরে, কেননা সে নিষিদ্ধ দুনিয়া মিথ্যা, অর্থ-মিথ্যা, চাতুরি-চালাকি, পারস্পরিক প্রবঞ্চনা প্রতারণার ধনদৌলত ভরা তোমাদের দুনিয়া আমদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে তোমরা কী চেষ্টাই না করো। অথচ, বাবা, তোমরা জান না যে আমরা তোমাদের অনেক কিছুই জেনে ফেলি, দেখে ফেলি, শুনে ফেলি। আমাদের হিসাব গোড়া থেকেই গোলমাল হয়ে যায়’ (পৃষ্ঠা-১২, সপ্তম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন প্রকাশনী, কলকাতা)

৫৬। ‘দোজখনামা’ লেখক-রবিশংকর বল। রবিশংকর এর জন্ম ১৯৬২। বিজ্ঞানের স্নাতক। একটা বাংলা দৈনিকের সাংবাদিক। বাংলা ভাষার প্রথম সারির কথা সাহিত্যিক। ২০১১ সালে “দোজখনামা” উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।

৫৭। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ লেখক- আহমদ ছফা। যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থটি আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে সব্যসাচী লেখক অহমদ ছফার একটি গভীর ও সরস রচনা। দীর্ঘদিনের সান্নিধ্যের কারণে ব্যক্তিগত দূর্বলতা থেকে অধ্যাপক রাজ্জাক হয়তো লেখকের বিশেষ কিছু অনুভূতি দখল করেছেন তবে তাঁর প্রতি দেশ ও বিদেশের অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তির শ্রদ্ধার বর্হিপ্রকাশই প্রমান করে, তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন কি;বদন্তী। অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটিতে সেই সময়ের সমাজ, সমকালীন বিশ্ব ও রাজনীতির যে বিষয়গুলো উম্মোচিত হয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ একটি সামাজিক দলিল। ইতিহাসের সহজ প্রকাশ।

৫৮। ‘চতুষ্পাঠী’ লেখক-স্বপ্নময় চক্রবর্তী। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পূজা সংখ্যায় (১৯৯২) । প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশিষ্ট লেখকররূপে চিন্হিত হয়েছিলেন।

৫৯। ‘নামগন্ধ’ লেখক- মলয় রায়চৌধুরী। ঠাস বুনন, অভিনব বর্ণনা এবং নানা জনের অজানা হরেক তথ্যা ভরা নামগন্ধ নামের নাতবৃহৎ উপন্যাসটি স্রেফ ভিন্ন নয়, বিশিষ্ট মেজাজের, যা সদ্য-অতীত জটিল সময়ের এক বিচিত্র অভিলেখ। ‘নামগন্ধ’ সাহিত্যের বাজারি বিপণনে বিমোহিত বহু পাঠাকের কাছেও সুপাঠ্য এক অনন্য উপহার।

৬০। ‘বিষাদবৃক্ষ’ লেখক- মিহির সেনগুপ্ত। উপন্যাসটিতে হিন্দু মুসলিম সমস্যাটাই শুধু আসেনি, এসেছে দেশ ভাগ, তার ইতিহাস, তৎকালীন রাজনৈতিক সামাজিক মনস্তত্ব, জীবনসংগ্রাম, পাশাপাশি স্বপ্ন দ্রষ্টা কিছূ মানুষের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা, মোট কথা, একটি ভুখন্ডের ইতিহাস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − = 65