“বাগদাদ জ্বলছে” – নামহীন নারীর ব্লগ থেকে ! – কিস্তি ৭

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ

 

টক শোঃ ভিন্নমত !

 

দৃশ্যঃ বাসার ড্রয়িং রুম
ভাবঃ বিষণ্ণ

আমরা দুই পরিবারের লোকজন বসে ছিলাম। আমাদের আর আমার চাচার পরিবার। বড়রা বসেছিলেন সোফায় আর আমরা ছোটরা মেঝেতে। মেঝেতে ঠান্ডা টাইলসের উপরে বসে আমরা টিভি দেখছি। বড় ছোট আমরা সবাই বিষন্ন কারণ কিছুক্ষণ আগে টিভিতে দেখানো হলো যে আন্তর্জাতিক রেডক্রস, ইরাক এর প্রধান নাদা দোমানি জানিয়েছেন, রেডক্রসের জনবল ইরাক থেকে জর্ডানে সরিয়ে নেয়া হবে কারণ তারা মনে করছেন জর্ডানে রেডক্রসের সাহায্য আরো বেশী করে দরকার। জর্ডানেও সম্ভাব্য আক্রমনের লক্ষন তৈরী হয়েছে। যে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তারা রেডক্রসের কিছু জনবল এখানে ইরাক থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে জর্ডানে নিয়োজিত করবে।

আমি খুব করে প্রার্থনা করছি, যে বা যারাই রেডক্রস কে এই তথ্য দিয়েছে, তারা যেনো ভীষণ ভাবে মিথ্যা বা ভুল প্রমানিত হয়। আমি সত্যিই ভেবে পাইনা, ইরাকে কে রেডক্রস এর উপরে হামলা করবে? যেখানে ইরাকীদের নিজেদেরই সবচাইতে বেশী দরকার রেডক্রসের সাহায্য। ইরাকে রেডক্রস শুধু মানুষের সেবাই করছেনা ঔশুধ আর খাবার দিয়ে, বরং তারা দখলদার শাসক আমেরিকা, তাদের স্থানীয় সরকার এর সাথে ইরাকী বন্দিদের হয়ে মধ্যস্থতার কাজটিও করছে। রেডক্রস আসার আগে, ইরাকী বন্দীদের সম্পর্কে কিছুই জানার উপায় ছিলোনা তাদের পরিবার পরিজনদের পক্ষে। রেডক্রস আসার আগে বা তাদের এই বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত হবার আগে, ছেলে পুরুষ বন্দীরা শ্রেফ ধরা পড়তো – বন্দী হতো এবং গায়েব হয়ে যেতো। আর তাদের কোনও খবর পাওয়া যেতোনা। তাদের আসার আগে, পরিবারের কেউ বন্দী হলে বা নিখোঁজ হলে, পরিবারের সদস্যরা আমেরিকানদের হোটেল এর সামনে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতো, যদি একটু কোনও খজপাওয়া যায়, একটু যদি কেউ দয়া করে কোনও সংবাদ দিতে পারে, কারো সন্তান, ভাই, স্বামী, বাবা বা চাচার সম্পর্কে। এই রকম পরিস্থিতিতে রেডক্রস এখন একটা বড় সহায়। রেডক্রস চলে গেলে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে কি করবে মানুষ? কি করবো আমরা?

এই সব বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছিলো। আমরা বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আগামী দিনগুলোতে কি হবে, কিভাবে আমরা ম্যানেজ করবো এই ধরনের পরিস্থিতি গুলো। হঠাত বাইরে থেকে কোনও ডাক শোনার পর টিভির সাউন্ড বন্ধ করে দিলাম, কেউ একজন আমার ছোট ভাইয়ের নাম ধরে ডাকছে। আমার ছোট ভাই “এক্স” এক লাফ দিয়ে উঠে ওর বন্দুকটি লোড করে নিলো, তারপর, পিঠের নীচে গুজে নিয়ে খুব সাবধানে দরজার একটা পাল্লা খুলে দেখলো। না অন্য কেউ নয়, আমাদেরই একজন প্রতিবেশী। আমি শুধু তার মাথা দেখতে পেলাম, জিজ্ঞাসা করলো, আমরা আল-জাজিরা টেলিভিশন দেখছি কিনা? খুব তড়িঘড়ি করে বলে গেলো – যদি আমরা আল-জাজিরা না দেখে থাকি, তাহলে যেনো দেখি এখন, এই বলে খুব দ্রুত চলে গেলো। এটাই? এইটুকু বলার জন্যে কাউকে রাত দুইটার সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে হয়?

আল-জাজিরার অনুষ্ঠানটির নাম ছিলো – “আল ইতিজাহ আল মুতাকিস” কিম্বা বাংলায় বলা যেতে পারে “ভিন্নমত” বা বিপরিত মত ইত্যাদি। যারা আরব নন, তাদের জন্যে এই অনুষ্ঠানটি, মূলত আরব অঞ্চলের সামাজিক – রাজনৈতিক বিষয়ের উপরে দুইজন আলোচক বিতর্ক করে থাকেন। এই দুইজন আলোচক সাধারণত তাদের মতের ভিন্নতার কথা তুলে ধরেন তাই অনুষ্ঠানের নাম হচ্ছে “ভিন্নমত”। দর্শকেরা সরাসরি ফোনের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। এমন কি দর্শকেরা ভোটও দিতে পারেন, কোন বক্তা ভালো বলছেন, যৌক্তিক বলছেন সে বিষয়ে।

ইরাকে আমাদের জন্যে “সারপ্রাইজ” হওয়াটা নতুন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু এই অনুষ্ঠানের “সারপ্রাইজ” টা ছিলো – ইন্তিফাদ কাম্বার, একজন আলোচক। ইনি ইরাক ন্যাশনাল কংগ্রেস এর দ্বিতীয় প্রধান, আহমেদ সালাবী’র ডেপুটি। টিভি ছাড়ার আগ পর্যন্ত আমাদের ড্রইং রুমটা বিষন্ন ছিলো, কিন্তু টিভিতে কাম্বার এর শক্ত – লোহার মতো মুখ টা দেখে সবাই এক যোগে হেসে উঠলো, তালি দিয়ে উঠলো। এই লোক যেকোনো ইরাকীর জন্যে একটা মূর্তিমান বিনোদন।

সত্যি একজন আরব ছাড়া আর কেউই এই লোকটাকে বুঝতে পারবেনা। সে এই টিভি অনুষ্ঠানে এসেছে, তার দলের একজন প্রতিনিধি হিসাবে। তার দল ইরাকের অস্থায়ী সরকারের একজন শরিক। কিন্তু তার বক্তব্যে রাজনৈতিক শিষ্টতার অভাব এতো প্রকট ছিলো যে সে শুধু নিজেরই মান – ইজ্জত ডোবায়নি, তার দলেরও মান ইজ্জত ডুবিয়ে দিয়ে এসেছে। সে তার দলের ও তার নেতার মান ইজ্জত এতোটাই ডুবিয়ে দিয়েছে যে তার দলীয় প্রধান আহমেদ সালাবী হয়তো তাকে খুন ও করে ফেলতে পারে। কাম্বার বলসে ছিলেন প্রায় পাথরের মূর্তির মতো। কেক এর রঙের মতো বেগুনী একটা স্যুট পরেছেন সাথে সাদা শার্ট, একটা হলুদ আর কালো স্ট্রাইপ দেয়া টাই, গলায় একটা চকচকে স্কার্ফ আর সাথে ক্রিম বা জেল মাখানো চকচকে চুল। তিনি কি কোনও ছবির শুটিং করতে এসেছেন নাকি কোনও রাজনৈতিক আলোচনার অনুষ্ঠানে এসেছেন এটা তার পোশাক দেখে বোঝার কোনও উপায় নেই। প্রায় একঘন্টা ধরে বেচারাকে গালিগালজ করলেন অনুষ্ঠানে যে সকল দর্শক ফোন করেছেন তারা সবাই মিলে। ইরাকী এবং অ-ইরাকী সকলে মিলে তাকে ব্যাপক ধোলাই দিলো টিভি স্ক্রিনেই। কিছুই বলতে বাকী রাখেনি দর্শকেরা। চোর, ডাকাত, বেইমান, খুনী, আমেরিকান ক্রিমিনাল … গালির বাহার দেখে মনে হচ্ছিলো দর্শকেরা তার হরেক রঙের পোশাকের সাথে ম্যাচ করেই গালিগালাজ করছিলো। দর্শকদের আক্রমনের জবাবে – সেই আমেরিকার শিখিয়ে দেয়া বুলিগুলোই আওড়াচ্ছিলো। সে ব্যাখ্যা করছিলো – কেনও আমেরিকার আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা একটা ন্যায্য পদক্ষেপ ছিলো, কেনও আমেরিকার এই যুদ্ধটা একটা ন্যায্য যুদ্ধ এমন কি সে ব্যাখ্যা করছিলো, আমেরিকার এইভাবে ইরাক দখল করে নেয়াটাও ন্যায্য, তা সে যত হাজার বা লাখ মানুষই মারা যাকনা কেনও। সে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলো – ইরাক যত বড় ধ্বংস স্তুপেই পরিনত হোকনা কেনও, সাদ্দাম হোসেন বিদায় নিয়েছে, ইরাকে এখন এই অস্থায়ী সরকার এসেছে, এটাই বড় পাওয়া। সে ভেবেছিলো সে খুব স্মার্ট বক্তব্য রেখেছে, কিন্তু দর্শকের গালি খেয়ে বেচারার থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানের আরেকজন অতিথি ছিলেন – আল-কুদস আল আরাবী পত্রিকার সম্পাদক। ভদ্রলোক অবশ্য বেশ চুপচাপ ছিলেন। বরং তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছিলেন, এই লোক কি করে ইরাকের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তিনি হয়তো ভাবছিলেন, এই লোকটিই যদি আহমেদ সালাবির দলের দ্বিতীয় প্রধান মানুষ হন, তাহলে ইরাকীদের কপালে ভবিষ্যতে কি কঠিন দিন আসছে।

কাম্বার এর না আছে কোনও রাজনৈতিক মান, না আছে ন্যূনতম সাংস্কৃতিক মান। কোনও যুক্তি খুঁজে না পেলেই সে অশ্লীল সংলাপ শুরু করে দেয়। এমন কি টেলিভিশনে অন্য আলোচকদের উপরে শারীরিক হামলা করারও রেকর্ড আছে এই লোকের। হ্যাঁ সত্যিই বলছি – একবার আবুধাবি টিভিতে একটি রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠানে, ওয়ামিদ নাদমি বলে একজন প্রবীন আলোচকের উপরে শারীরিক ভাবে হামলা করেছিলো এই কাম্বার। বেচারা ওয়ামিদ নাদমি, একজন অশীতিপর প্রবীন বুদ্ধিজীবি, তিনি সাদ্দমের বাথ পার্টিও করতেন না আবার আমেরিকার প্রতি অনুগতও ছিলেন না। মাঝে মাঝে তিনি বরং সাদ্দামের সমালোচনা করতেন। তিনি শুধুমাত্র ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্যে আমেরিকার এই দখলদারিত্ব ও জোর করে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। কাম্বার প্রায় এক ঘন্টার লম্ফঝম্ফ করার পরে, ওয়ামিদ নাদমি প্রায় অধৈর্য হয়ে মন্তব্য করেন, আহমেদ সালাবী একজন আপাদমস্তক অসৎ মানুষ এবং যে দলের প্রধান নেতা তার মতন অসৎ, সেই দল ইরাকে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হবে এটা প্রায় নিশ্চিত। এই মন্তব্যের সাথে সাথেই সালাবীর এই শিষ্য কাম্বার হুঙ্কার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আশি বছরের এই প্রবীন বুদ্ধিজীবির উপরে। এজন্যেই, সালাবী আর তার শিষ্য কাম্বার কে সারা ইরাকের সাধারণ মানুষ দুটি ক্লাউন ছাড়া আর কিছুই মনে করেনা। তাই এরা টিভিতে আসা মানেই হচ্ছে বিনা পয়সায় দারুন বিনোদন। আর এরাই হচ্ছে ইরাকে বুশ প্রশাসনের মন্ত্রী।

তাহলে বিকল্প কি? ইরাকে কি এই ধরনের অসংস্কৃত – মাস্তান শ্রেনীর মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই? অবশ্যই আছে, ইরাকে হাজার হাজার বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ আছেন, ডাক্তার, অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ভাষাতাত্তিক, আইনজীবী, প্রোকৌশলী সহ আরো নানান দক্ষতার মানুষ যারা নতুন ইরাক গড়ার কাজে অবদান রাখতে পারেন। এরা বহু বছর ধরে ইরাকে নানান পদে নানান ভাবে অবদান রেখে চলেছেন। বুশের মননীত পুতুলদের মতো কেউ ইরানে, কেউ তুরস্ক বা জর্ডানে কিম্বা ইংল্যান্ডে প্রবাসী ছিলেন না। কিন্তু এদের কাউকে নেয়া হয়নি দেশ চালানোর জন্যে কারণ এরা শর্তহীন ভাবে আমেরিকা ও সি আই এ’র কথা শুনবে এমন কোনও গ্যারান্টি নেই। ইরাক দখলের পরপরই প্রেসিডেন্ট বুশ ঘোষণা দিলেন – “তোমরা হয় আমাদের সাথে, নয়তো আমাদের শত্রুর সাথে”। অথচ কি আশ্চর্য বিষয়, পৃথিবীটা এই রকমের “হয় সাদা – নয়তো কালো” এই রকমটা নয়। এই ইরাকেই হাজার হাজার মানুষ আছেন যারা সাদ্দাম হোসাইন কে পছন্দ করেন না, আবার একই সাথে তারা আমেরিকাকেও পছন্দ করেন না, তারা সাদ্দামেরো পতন চান আবার এই যুদ্ধ – দখলদারিত্বকেও বিরোধিতা করেন। এই ধরনের মানুষদেরকে কোনও সুযোগ দেয়া হলোনা, বরং যারা ইরানের – আমেরিকার বা ইংল্যান্ডের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত ছিলো তাদের পুরো ক্যারিয়ার, তাদেরকেই নিয়ে আসা হলো ইরাকের শাসক হিসাবে। আমাদের এখানে একটা প্রবাদ আছে, এটা সম্ভবত একটা আরবী প্রবাদ – “গাধার পালের মাঝে উটকে খুব দ্রুতগামী প্রানী বলেই মনে হয়” ! উট সাধারণত খুব বেশী দ্রুত দৌড়াতে পারেনা, তবে গাধার দলের মাঝে উটের গতি বেশ ভালোই ঠেকে। আহমেদ সালাবী আর কাম্বার হচ্ছেন বর্তমান ইরাকী শাসকদের মাঝে ‘উট’, তাহলে এখন ভেবে দেখুন বাকীদের কি অবস্থা?

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − 80 =