যে-সব কারণে চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যুকে কোনোভাবেই আত্মহত্যা বলা যায় না। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

প্রতিবছর দেশব্যাপী ৬ই সেপ্টেম্বর বাংলা-চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ-অভিনেতা সালমান শাহ’র মৃত্যুবার্ষিক পালিত হয়ে থাকে। আর প্রতিবছরই তাঁর পরিবার ও ভক্তকুল তাঁর হত্যার বিচার দাবি করে আসছে। কিন্তু আজ কত বছর হয়ে গেল কেউই এব্যাপারে কোনোপ্রকার কর্ণপাত করছে না। আর এই মামলার সকল নথিপত্র সম্ভবত এখন হিমাগার থেকে বঙ্গোপসাগরে চলে গেছে। এই মামলার ব্যাপারে আজ কেউই আন্তরিক নয়। ২০বছর যাবৎ এদেশের সর্বস্তরের মানুষ এই পরিকল্পিত-হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আসছে।

মাত্র ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আমাদের সালমান শাহ বাঙালি-দর্শকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসনলাভে সক্ষম হয়েছেন। তিনি তাঁর অভিনয়-গুণে দর্শকদের মোহিত করেছেন। আজও দর্শক তাঁর অভাব অনুভব করে থাকে। অনেকের মতে, তিনি বাংলা-চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা নায়ক। তিনিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যিকারের সুপার স্টার।
সালমান শাহ শিক্ষিত-পরিবারের মার্জিত-রুচিবোধসম্পন্ন তরুণ ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি-কর্মকর্তা। আর তাঁর মা-ও উচ্চশিক্ষিত রমণী। এমন একটি পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিত্বে মোহিত হয়ে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের দর্শক পর্যন্ত তাঁকে পছন্দ করেছেন। এখনও তাদের সংলাপে সেই পছন্দের সুরই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।

সালমান শাহকে হত্যার পর হত্যাকারীরা অত্যন্ত কুকৌশলে এটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে অপপ্রচার করতে শুরু করে। আর এর সঙ্গে একসময় একটি স্বার্থান্বেষীমহল সুর মিলিয়ে এ-কে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে সাধারণ-জনমনে বিভ্রান্তিসৃষ্টি করতে থাকে। এরা সেই খুনীদেরই একাংশ।

সালমান শাহ’র ‘আত্মহত্যা’ করা তো দূরে থাক—তিনি কখনও-কোনোদিন আত্মহত্যা করার কথা চিন্তাও করেননি। তবুও তাঁকে হত্যা করে খুনীচক্র এটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে পার পেয়ে গেছে। এই দেশে সেইসব খুনীদের কে আর বিচার করবে?

সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। যে-সব কারণে সালমান শাহ’র মৃত্যুকে কোনোভাবেই আত্মহত্যা বলা যায় না—তার কয়েকটি মাত্র এখানে তুলে ধরা হলো:

১. সালমান শাহ ছিলেন তাঁর কালে সর্বাধিক জনপ্রিয়-নায়ক। দর্শক তাঁর ছবিগুলো প্রাণভরে উপভোগ করেছে। তিনি সবসময় দর্শকনন্দিত-নায়ক ছিলেন। তাহলে, তিনি কেন আত্মহত্যা করতে যাবেন?
২. সালমান শাহ’র সঙ্গে কারও পরকীয়া-সম্পর্ক ছিল না। তিনি একজনের সঙ্গে প্রেম করে তাকে বিয়ে করেছিলেন। আর এজন্য তিনি কখনও অনুশোচনায় ভোগেননি। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সুখী হতে চেয়েছিলেন। তিনি কেন আত্মহত্যা করবেন?
৩. সালমান শাহ নিজে ছিলেন একজন সফল ও জনপ্রিয় অভিনেতা। এজন্য তিনি ছিলেন সবার প্রিয়পাত্র। আর এতে তিনি সবসময় সুখী ছিলেন। তাঁর এই জনপ্রিয়তা অনেকের জন্যই ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তারা কারা? এই সমাজ এই রাষ্ট্র কি তাদের শনাক্ত করেছে? করেনি। সালমান শাহ একজন সুখীমানুষ ছিলেন। আর তিনি কেন ‘আত্মহত্যা’ করতে যাবেন?
৪. বাংলা-সিনেমার পরিচালকরা সালমান শাহকে সমীহ করতো। আর তাঁকে সিনেমা-জগতের সত্যিকারের ‘হিরো’ ভাবতো। আর সবাই তাঁকে তাদের সিনেমার নায়ক বানাতে চাইতো। কারও কোনো ছায়াছবির নায়ক হওয়ার জন্য সালমান শাহকে কখনও-কোনোদিন ধর্না দিতে হয়নি। বরং তাঁর মৃত্যুতে পরিচালকরা কেঁদেছেন। এমন একজন সফল-অভিনেতা আত্মহত্যা করতে যাবেন কোন দুঃখে? আর কারা এসব বলে?
৫. সালমান শাহ বেঁচে থাকলে তিনি আরও বিশ-ত্রিশ বছর-যাবৎ দাপটের সঙ্গে বাংলা-চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারতেন। তাঁর ভবিষ্যৎ সবসময় অত্যুজ্জ্বল ছিল। তাই, এমন একজন সফল-মানুষ কি কখনও-কোনোদিন আত্মহত্যা করতে পারে?
৬. সালমান শাহ’র মৃত্যুর আগের দিন কিংবা আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে কেউ কখনও ডিস্টার্ব দেখেনি। আর এমন একজন মানুষ হঠাৎ আত্মহত্যা করতে পারে?
৭. সালমান শাহ ছিলেন তাঁর কালের তরুণদের আইকন বা মডেল। তিনি কেন আত্মহত্যা করতে যাবেন?
৮. সালমান শাহ তাঁর কালে নায়ক হিসাবে ছিলেন শীর্ষস্থানে। আর আজও তিনি সেই আসনে সমাসীন। তাই, তিনি কেন আত্মহত্যা করতে যাবেন?
৯. সালমান শাহ’র কোনো নেশা ছিল না। তিনি অত্যন্ত সুস্থ-সবল-মানসিকতার অধিকারী ছিলেন। তিনি ‘আত্মহত্যা’ করবেন কীসের জন্য?
১০. সালমান শাহ নিহত হওয়ার পর চারদিক থেকে আওয়াজ উঠেছিলো এই ঘটনায় জড়িত পাকিস্তানীনাগরিক, মাফিয়া-ডন ও শয়তানের জারজপুত্র আজিজ মোহাম্মদ ভাই। কিন্তু সেই সময় তাকে গ্রেফতার করে কোনোপ্রকার রিমান্ডে নেওয়া হয় নাই। তাকে শুধু নামকাওয়াস্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে থাকতে পারে। আর এগুলো ছিল সেই সময় ‘আইওয়াশ’ মাত্র। আর এদের পাপকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সেই সময় সালমানের করুণ-মৃত্যু ও হত্যাকাণ্ডকে এদেরই প্ররোচনায় ‘আত্মহত্যা’ বলে চালানো হয়েছিলো। সালমান কীসের জন্য আর কোন দুঃখে আত্মহত্যা করবে?
১১. সালমানের শ্বশুর শয়তানপুত্র শফিকুল হক হীরাকে তৎকালে গ্রেফতার করে তাকেও একদিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয় নাই। এসব কীসের আলামত? সালমান কেন এভাবে আত্মহত্যা করবে?
১২. সালমানের দুশ্চরিত্রা স্ত্রী-সামিরা অনেক ঘটনার সাক্ষী। তাকেও তৎকালে কিংবা এখনও একদিনের জন্যও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাকে যা-কিছু বা যৎসামান্য যা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো তা লোকদেখানো মাত্র। সেও জনসমক্ষে পরিকল্পিতভাবে বলেছে: সালমান আত্মহত্যা করেছে! কিন্তু সালমান কেন আত্মহত্যা করবে?
১৩. সালমান-হত্যায় ঢাকাই-চলচ্চিত্রের ভিলেন ‘ডন’-এর নাম উঠে এসেছিলো—তাও এখন ধামাচাপা পড়ে গেছে। কিন্তু কেন? কিন্তু কেন সালমান আত্মহত্যা করবে?

বাংলা-চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য-হত্যাকাণ্ড হলো—সালমান শাহ হত্যাকাণ্ড। এটি খুবই পাকা হাতের অপকর্ম। এটি ভয়ানক পরিকল্পিত। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া অত্যাবশ্যক।

সালমান-হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি বলেই পরবর্তীতে সেই একই খুনীচক্র অত্যন্ত কুকৌশলে আরেক জনপ্রিয়-নায়ক মান্নাকে খুন করতে দ্বিধাবোধ করেনি। আজ সময় এসেছে এইসব পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম করার।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৮/০৯/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 − 19 =