উনিশ না বিশের বাঁশি (পর্বঃ০১)

উতসর্গঃ অনন্ত বিজয় দাশ

কোরানের অলৌকিকতা বা তা যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত হয়েছে তা প্রমানের জন্য ইসলামী স্কলার ও মুসলমানরা নানাবিদ মোজেজা বা মিরাকলের কথা বেশ গর্বভরে প্রচার করতে চায়। তারা দাবী করে এসকল মিরাকল বা অলৌকিক বিষয়গুলোই প্রমান করে যে কোরান মানুষের দ্বারা রচনা করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে একটা হাস্যকর দাবী হলো যে কোরানের মত আরেকটা গ্রন্থ রচনা। সত্যিকার অর্থেই তা কী করে সম্ভব? আমি এখন যে প্রবন্ধটা লিখার প্রয়াশ পাচ্ছি, তা লিখার পর যদি দাবী করি যে এরকম আরেকটা প্রবন্ধ লিখে দেখান তো দেখি। যতবারই এই প্রবন্ধের মত করে লিখা হোক না কেন, তা হুবহু এক রকম হবে না। আবার হুবহু মিলে গেলে তা একটি প্রতিলিপি ছাড়া আর কিছুই হবে না। বিষয়টা এভাবে বললে মনে হয় আরও সহজ হবে। যদি আমি অতি প্রতিভাধর কোন কবিকে বলি যে আপনি নিজেকে যেহেতু প্রতিভাবান বলে দাবী করেন, পারলে একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখে দেখান তো? নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখা তার দ্বারা সম্ভব হবে না। তারমানে কি এই দাঁড়ায় যে, রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলো অলৌকিক কোন ঈশ্বরের দ্বারা প্রদত্ত হয়েছে? এই প্রবন্ধটির মত আরেকটি প্রবন্ধ লিখা যেমন সম্ভব নয়, আরেকটা রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখা যেমন সম্ভব নয়, সম্ভব নয় কোরানের মত আরেকটা কোরান লিখা। তাই বলে, আমার এই প্রবন্ধ, রবীন্দ্র সঙ্গীতকে ঐশ্বরিক বলে দাবী করা যায় না। এমনি করে কোরানের মত আরেকটা গ্রন্থ লিখা যাবে না বলেই একেও ঐশ্বরিক বলে দাবী করা যায় না। এ ধরনের দাবী নিতান্তই হাস্যকর।

তবে, কোরানের মত লিখা নয়, কোরানের আরেকটি মিরাকল বা মোজেজা আছে বলে দাবী করা হয়, আজ সেটা নিয়ে লিখব। সেই মিরাকলটি হলো মিরাকল-১৯ বা উনিশের যাদু। দাবী করা হয় বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহিম বাক্যটিতে উনিশটি বর্ন রয়েছে এবং কোরানের অনেক বিষয়াদি এই উনিশ সংখ্যাটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। দাবীগুলোর দিকে এক নজর চোখ বোলানো যাক।
১. কোরানের সর্বমোট সুরার সংখ্যা ১১৪ যা ১৯ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য।
২. কোরানের সর্বমোট আয়াত সংখ্যা ৬৩৪৬ যা ১৯ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য।
৩. কোরানে বিসমিল্লাহ শব্দটি ১১৪ বার এসেছে যা ১৯ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য।
৪. কোরানের সর্বমোট বর্ন সংখ্যা ৩২৯১৫৬ যা ১৯ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য।
৫. কোরানে আল্লাহ শব্দটি এসেছে ২৬৯৮ বার যা ১৯ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য।
৬. সর্ব প্রথম নাজিলকৃত সূরা আলাকের অবস্থান শেষ দিক থেকে গননা করলে ১৯।
৭. সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরা নাসর এর আয়াত সংখ্যা ১৯।

এমন সব উনিশের বাঁশি সরি মিরাকল দেখেও যদি আপনার মনে কোরানের ঐশ্বরিকতা বা অলৌকিকতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়, তাহলে এই প্রবন্ধটুকু আপনার জন্য লিখা হয়েছে।

হ্যাঁ, এটা অবশ্যই অনস্বীকার্য যে কোন গ্রন্থ রচনায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা আসলেই একটি দুরহ কাজ। সাধারণ সাহিত্যিকদের দ্বারা আসলেই খুব কষ্ট সাধ্য একটা ব্যপার। তাই বলে এমন উনিশের যাদুতে মোহিত হয়ে কোরানকে আল্লাহর দেয়া মোজেজা বলে দাবী করাটা কতটুকু যৌক্তিক? আল্লাহ নিজে কী উনিশটি রুপে বিকশিত? না কি আল্লাহর উনিশটি প্রকরণ বিদ্যমান? উনিশের সাথে আল্লাহর কী সম্পর্ক? তাহলে এই উনিশের রহস্য কেন? ইসলামী স্কলারগণ দাবী করেন, এই উনিশের কথা কোরানেই বলা হয়েছে। কোরানের ৭৪ নং সূরার ৩০ নং আয়াতের ( আ’লাইহা তিসআ’তা আ’শারা) অর্থ হলো, “ ইহার উপর উনিশ।” মিরাকল উনিশের আবিষ্কারকগণ দাবী করেন এখানে কোরানের কথাই বলা হয়েছে এবং এই আয়াত দ্বারা নিঃসন্দেহে কোরানের উনিশ সম্পর্কিত মোজেজার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। “ইহার উপর উনিশ” আয়াতের মর্মার্থ নিয়ে পরে আলোচনায় আসছি, এর আগে দেখে নিই উনিশের মিরাকল সম্পর্কিত যে দাবীগুলো করা হয়, তা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত।

প্রথম দাবীটি হলো সূরার সংখ্যা নিয়ে। কোরানে সূরার সংখ্যা ১১৪ যা উনিশ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। যদি এমন হয় যে কোরানে সূরা ১১৪টির চেয়ে কম বেশি আছে, তাহলে এই দাবীটি কি যথার্থতা পূর্ণ করে? কোরানে সূরার সংখ্যা কি কম বেশি হবার সম্ভাবনা আছে? হ্যাঁ, অনেক তাফসীরকারকগণ কোরানের সূরার সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত পোষন করেছেন এবং তাদের দ্বিমত পোষনের পেছনে যথেষ্ঠ কারণও রয়েছে। অনেক স্কলার সূরা নাস, ফালাক এবং ফাতিহাকে কোরানের অংশ হিসেবে মানতে নারাজ। সূরা নাস ও ফালাকের শানে নুযূল অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, একবার মোহাম্মদের উপর জাদুর আছর পড়েছিল এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে এ সূরা দুটি নাজিল হয়। এই শানে নুযূল নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। কারণ, মোহাম্মদের মত ব্যক্তিকে যদি জাদু দিয়ে বশ করে ফেলাই যায়, তাহলে তার বন্ধু আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন এসে যায়। মাওলানা আকরাম খাঁ এ সম্পর্কে বলেন, “ এই সূরা দুটিকে অবলম্বন করে বিভিন্ন প্রকারের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে গেছে। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাছউদ এ সূরা দুটিকে কোরানের অংশ বলে স্বীকার করেননি। নিজের মুসাবিদায় সূরা দুটি লিপিবদ্ধ করেননি এবং সমস্ত সাহাবীর মতে ও স্পষ্ট হাদিসগুলোর বিরুদ্ধে আজীবন দৃঢভাবে নিজের মত কায়েম রেখেছেন (ইসলামী দর্শন ও দার্শনিক, পৃষ্ঠা ১৯৪)। কেউ যদি এইমতের অনুসরণ করে কোরানের সূরা সংখ্যা ১১২তে নিয়ে আসে, তাহলে সূরার সংখ্যার মিরাকল ধোপে টেকে কি!

আবার সূরা ফাতেহা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। এ সূরা পাঠ করলে তা মনে হয় না স্রষ্টার কোন নির্দেশ বা তার মুখে বর্নিত কোন ঘটনা। এটি স্রেফ একটি প্রার্থনা। এমনও নয় যে এই সূরার প্রারম্ভে নাস কিংবা ফালাকের মত ক্বুল বা বলুন শব্দটি আছে। তা থাকলে অন্তত ধরে নেয়া যেত যে এটি আল্লাহ কর্তৃক শিখিয়ে দেয়া একটা দোয়া কিংবা সূরা। এভাবে সূরার সংখ্যা আরেকটি কম ধরা যেতে পারে। মিরাকল উনিশ থাকবে তখন?

শুধু সূরা নাস, ফালাক কিংবা ফাতিহা নয়, বিতর্ক রয়েছে সূরা তওবা, ফীল ও কোরাইশ নিয়েও রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। হ্যাঁ, এই বিতর্কগুলো নাস্তিকদের নয়, এগুলো ইসলামিক স্কলারগণেরই। তারা একমত হতে পারেননি। তওবা সম্পর্কে একমত না হবার মূল কারণ হলো এর শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। কোরানের অপরাপর সূরার শুরুতে অবশ্যই বিসমিল্লাহর ব্যবহার রয়েছে এবং দাবী করা হয় যখন কোরান যখন নাজিল হতো তখনই নতুন সূরার বেলায় বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু হতো। অর্থাৎ বিসমিল্লাহর ব্যবহার মানেই পূর্বতন নাজিলকৃত অংশটুকু একটি সূরা হিসেবে পরিগনিত হবে এবং নতুন সূরা আরম্ভ হলো। কিন্তু তওবা নাজিলের সময় বিসমিল্লাহর ব্যবহার করা হয়নি। এতে অনেক তাফসীরকারক তওবাকে স্বতন্ত্র সূরা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী তার রচিত “বয়ানুল কোরান”-এ বলেছেন, “ এই সুরাটি ইহার পূর্ববর্তী সূরা সুরায়ে আনফালের অংশ হবার এবং স্বতন্ত্র সূরা না হবার সম্ভাবনা রয়েছে, এই অনিশ্চয়তার কারনে এর প্রথমে বিসমিল্লাহ লিখা নাই”। গেল তো সূরা আরেকটি কমে। মেলান এবার উনিশের মিরাকল!

ওসমান দ্বারা কোরান সংকলনের আগে সূরা ফীল ও সূরা কোরাইশকে একই সূরা হিসেবে ধরা হত এবং কোন কোন মাসহাবে এক সূরা হিসেবেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। যদি ঐ মাসহাবের মত সঠিক ধরা হয়, তাহলে সূরার সংখ্যা উনিশে বিভাজ্য ১১৪ ঠিক থাকে না।

এবার আসা যাক, আয়াত সংখ্যার দাবীতে। মজার বিষয় হলো, মিরাকল উনিশের আবিষ্কারক খলিফা রাশেদ (পরে খলিফা রাশেদ সম্পর্কে আলোচনা করছি) অনুদিত কোরান ছাড়া আর কোন কোরানে আয়াত সংখ্যা উনিশ দ্বারা বিভাজ্য ৬৩৪৬ পাওয়া যায় না। আরও মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশে মিরাকল উনিশের চ্যালেঞ্জ প্রচারকারী হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদের অনুদিত কোরানেও কিন্তু আয়াত সংখ্যা উনিশ দ্বারা বিভাজ্য নয়। তার অনূদিত কোরানে আয়াত সংখ্যা ৬২৩৭। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের অনূদিত কোরানের সরল বঙ্গানুবাদেও একই সংখ্যক আয়াত বিদ্যমান। ইউসুফ আলীর অনূদিত কোরানের আয়াত সংখ্যা ৬২৩৯, উনিশ দ্বারা অবিভাজ্য।

হাফেজ মুনির উদ্দীন কোরানের আয়াতে যে হিসাব দিয়েছেন, “ হজরত আয়েশা (রাঃ) এর মতে ৬৬৬৬, হজরত ওসমান (রাঃ) এর মতে ৬২৫০, হজরত আলী (রাঃ) এর মতে ৬২৩৬, হজরত ইবনে মাসউদ (রঃ) এর মতে ৬২১৮, মক্কার গণনা মতে ৬২১২, বসরার গণনা মতে ৬২২৬, ইরাকের গণনা মতে ৬২১৪। ঐতিহাসিকদের মতে হজরত আয়েশার (রাঃ) গণনাই বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে” (কোরআন শরীফঃ সহজ বাঙলা অনুবাদ, পৃঃ ১১)।

আবার আয়াত সংখ্যা নিয়ে ইসলামী মতভেদে ছয়টি প্রকরণ পাওয়া যায়;
১. পূর্ণ ছয় হাজার; না বেশি না কম
২. ৬ হাজার ২শত ৪টি
৩. ৬ হাজার ২শত ১৪টি
৪. ৬ হাজার ২শত ১৯টি
৫. ৬ হাজার ২শত ২৫টি
৬. ৬ হাজার ২শত ৩৬টি
আয়াত সংখ্যা নিয়ে আরও কিছু মত পাওয়া যায়;
৭. মুসনাদ দায়লামীর এক বর্ণনায় আছে কোরানের আয়াত সংখ্যা ৬হাজার ২শত ১৬টি
৮. ইবনুদ দুরিস এর এক বর্ণনায় জানা যায় কোরানের আয়াত সংখ্যা ৬হাজার ৬শত
৯. আমাদের দেশে ও অন্যান্য মুসলিম বিশ্বে বহুল প্রচলিত কোরানের আয়াত সংখ্যা ৬৬৬৬টি।

দেখা যাচ্ছে, কোরানের মোট আয়াত সম্পর্কিত উনিশের মিরাকলের দাবীটি সম্পুর্ন ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। একমাত্র খলিফা রাশেদের অনূদিত কোরান ছাড়া আর কোন মতেই মোট আয়াত সংখ্যা উনিশ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য নয়।

কথা হবে আগামী পর্বে

(সম্পূর্ণ লিখাটিই অনন্ত বিজয় দাশ ও সৈকত চৌধুরী এর পার্থিব বই থেকে অনুপ্রানিত)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “উনিশ না বিশের বাঁশি (পর্বঃ০১)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

94 − 85 =