বাংলা সাহিত্যে যে ১০০ টি বই আপনাকে পড়তেই হবে (আট)

৭১। ‘কলকাতার কাছেই’, ‘পৌষ ফাগুনের পালা’ এবং ‘উপকন্ঠ’ লেখক- গজেন্দ্র কুমার মিত্র। এই তিনটি খন্ড আমার অনেক বেশি প্রিয়। আসলে এটি ত্রিপিটক উপন্যাস, খাস ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ট্রিলজি’। একটা কিনলে বা পড়লে পরবর্তী বাকী দু’টির জন্য হাঁসফাস করবেন! একেকটি বই যেন একেকটি নেশা। পৌষ ফাগুনের পালা শেষেরটি পড়ার পরেও দুঃখ হয় তারপর কি …।
কথাসাহিত্যিক গজেন্দ্র কুমার মিত্রের সর্বোত্তম সাহিত্যসৃষ্টি। উনবিংশ শতাবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরু -এই রকম সময়ের পটভূমিতে এই ট্রিলজি কাহিনীর সূত্রপাত। কুলীন ব্রাহ্মণের বিধবা পত্নী রাসমণি ও তার তিনি কন্যার জীবন নিয়ে এই উপন্যাস-ত্রয়ীর কাহিনী শুরু। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যমা শ্যামাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে, তবু রাসমণির তিন কন্যার ক্রমবর্ধমান পরিবারের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার নরনারী বিভিন্ন ঘটনাসূত্রে কাহিনীতে অসাধারণ বৈচিত্রের সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কাহিনীর অখন্ডতা লাভ করেছে। সংস্কারে সংস্কৃতিতে উন্নত অথবা নিদারুণ দারিদ্র ক্লিষ্ট মধ্যবিত্ত সমাজের এই সব মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ-সংকীর্ণতা, আশা-নিরাশা, ছোট বড়, সুখ দুঃখ. বিপদ আপদ সবকিছুর মধ্যদিয়েও তাদের অপরাজেয় জীবনাকোঙ্ক্ষার এবং জীবনযুদ্ধের এক নিটোল অনবদ্য কাহিনী শুনিয়েছেন লেখক যা আমরা আগে শুনিনি, আজকাল শোনা যায় না, অদূর ভবিষ্যতে শুনব কিনা সন্দেহ।
অনেকেই হয়তো গজেন্দ্র মিত্রকে সেভাবে জানেন না। পড়ুন এবং তারপর জানবেন।

৭২। ‘আমার প্রিয় ভৌতিক গল্প’- হুমায়ূন আহমেদ সম্পাদিত। মোট চব্বিশটি গল্প আছে। দারুন সব গল্প, ভূতের গল্প। জনপ্রিয় সব লেখকদের- চমৎকার সব গল্প। পড়ুন। আমার বিশ্বাস আপনাদের অনেক ভাল লাগবে।

৭৩। ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’ লেখক- জগদীশ গুপ্ত। উপন্যাসের নটবর দলছুট চরিত্র। সে ‘লঘু-গুরুর’ বিশ্বম্ভর কিংবা পরিতোষের মতো ‘স্বভাবসিদ্ধ ইতর’ বা ‘কোমরবাঁধা শয়তান’ নয়; শয়তানিতে তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত, কিন্তু উপন্যাসের আখ্যানে এটি অতীত, তার মানুষ আর প্রেমিক হয়ে ওঠার সাধনাটুকুই তার সপ্রাণ বর্তমান। এই বর্তমানটুকু মনে রাখলে তার বাইরের এবং ভেতরের মানুষটিকে চেনা যায় সহজেই। তার পরিণতির বেদনাটুকুও বোঝা যায়।
জগদীশ গুপ্তের উপন্যাসে সব সময়ই দ্রুত ঘটে যায় সব ঘটনা।

৭৪। ‘সেয়ানা’ লেখক- সত্যেন সেন। সত্যেন সেন জেল প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি লিখেছেন নিরন্তর। এক সময় জেলখানায় পত্রিকা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে বাইরের খবর তিনি জানতেই পারতেন না। তখন সময় কাটবে কি করে ? এটা ব্রিটিশ যুগের কথা। ও সময় অবশ্য পত্রিকা বন্ধ করে বাইবেল দেয়া শুরু হলো। তাতেই সন্তুষ্ট হলেন সত্যেন সেন। তিনি বইবেলের কাহিনী নিয়ে লিখলেন দু”খানা উপন্যাস- অভিশপ্ত নগরী ও পাপের সন্তান।
সেয়ানা নামের উপন্যাসটির নায়ক জেল খানারই হয়তো কেউ। তিনি লিখতেন একদম ভেতর থেকে। তাই তার লেখা মানুষকে স্পর্শ না করে পারে না। সত্যেন দা” জেলে বসেও উবু হয়ে নিরন্তর লিখে চলতেন। জেলখানায় তো চেয়ার টেবিল ছিলো না, তাতে সত্যেনদার কিছু যেত আসতো না। সিমেন্টের ফ্লোরে দিনের পর দিন উবু হয়ে বসে লিখতে লিখতে তার কনুইয়ের চমড়া ইস্পাতের মতো হয়ে গিয়েছিলো।

৭৫। কাশবনের কন্যা’ লেখক- শামসুদ্দীন আবুল কালাম। শামসুদ্দীন আবুল কালামের দু’টি উপন্যাস সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের মন্তব্য। তিনি লিখেছেন, “… শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ এবং ‘কাঞ্চনমালা’য় সমসাময়িক রাজনীতির কোনো ছাপ নেই… সময়ের কোনো বোধ নেই… ‘কাশবনের কন্যা’ ও ‘কাঞ্চনমালা’য় নরনারীর প্রেমই তো আসল বিষয়। তবু বলতে হয়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম একটি স্থূল ও পুরুষ্টু কাহিনী ছাড়া আর কিছুই আমাদের দেন না। বরিশাল অঞ্চলের গ্রামজীবনকে কেন্দ্র করে ‘কাশবনের কন্যা’ উপন্যাসটি যেভাবে এগিয়ে চলে তা পাঁচশো বছর আগেকার গ্রাম হতে পারতো এবং যে-কোনো গ্রাম্য পুঁথির বিবরণ হলে তাতে কোনো বাধা ছিলো না। আধুনিক বাংলা উপন্যাসের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে উপন্যাস দুটি যে কাহিনী আমাদের উপহার দেয়, তার মধ্যে চিরায়ত বাংলাদেশের কোনো সত্যও ধরা পড়ে না। শ্লথ গদ্যে লেখা এই কাহিনী দুটিতে এক ধরনের আন্তরিকতা ছাড়া আর কিছু তেমন ধরা পড়ে না।…”

৭৬। ‘জলরাক্ষস’ লেখক- আবুবকর সিদ্দিক। লেখক আবু বকর সিদ্দিকীর ”জলরাক্ষস” বইটি প্রকাশিত হবার পর এরশাদের সামরিক-শাহী লেখকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। লেখককে সংক্ষিপ্ত বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার প্রায় বিশ বছর পর এই লেখকেরই কন্যা বিদিশা সেই বিশ্ববেহায়ার অঙ্কশায়িনী হয়েছে। চেতনা বোধহয় প্রজন্মান্তরে বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হয় না। নয়ত পিতাকে নির্যাতন আর অপমানকারীকে আলিঙ্গন করতে কন্যার বাধে না কেন?
আবুবকর সিদ্দিক কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে কট্টর বস্তুবাদী, সমাজনিষ্ঠ শিল্পী। আর বামপন্থী রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে জীবনকে সমীক্ষা করার একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়। জীবনের একটা প্রধান সময় তাঁর অতিবাহিত হয়েছে বাম চিন্তাদর্শের ঘনিষ্ঠ সানি্নধ্যে। সেখান থেকে যে গভীর অভিজ্ঞতা ও প্রেরণার শাঁস তুলে এনেছেন তা যেমন বাস্তববাদী, তেমনি অকৃত্রিম।

৭৭। ‘বিলোরিস’ লেখক- অঞ্জলি লাহিড়ী। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন কমিউনিষ্ট বিপ্লবী। তেভাগা আন্দোলনের সক্রীয় কর্মী। বাংলা দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও অসম মেঘালয়ে সক্রীয় স্বেচ্ছাসেবী, জীবনের পঞ্চাশ বছর পার করে লিখতে শুরু করেন অঞ্জলি লাহিড়ি। ক্রমেই অসমের বাংলা সাহিত্যের অভিবাবক স্বরূপা হয়ে উঠেন। নিজে অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য ছিলেন যখন বিয়ে করেছিলেন তখনকার আর সি পি আই দলের আরেক কর্মী প্রয়াত নিরেন লাহিড়িকে।

৭৮। ‘বাওয়ালী উপাখ্যান’ লেখক- হুমায়ূন রহমান। নাম কি তোমার?
করিম বাওয়ালী।- ভয়ার্তকন্ঠ বাওয়ালীর
কুঠির খাতায় নাম লিখিয়েছিলে?-সক্রোধ দৃষ্টি রেনী সাহেবের।
না হুজুর!
আর কোন প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করলো না রেনী সাহেব, শপাং শপাং চাবুকের আঘাতে ককিয়ে উঠলেন করিম বাওয়ালি, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
বাবার এই অবস্থা দেখে গোলপাতার আড়ালে আর লুকিয়ে থাকতে পারলোনা কিশোরী কমল। সুন্দরবনের বাঘের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে বর্শাটা সে সাথে রাখতো সবসময়ে, সেটাই সর্বশক্তি দিয়ে আকড়ে ধরে লাফিয়ে এসে পরলো রেনীর সামনে। এই আতর্কিত হামলার জন্য রেনী প্রস্তুত ছিল না, কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই কমল বর্শাটা ছুড়ে দিল রেনীর বুকের দিকে লক্ষ করে। তবে রেনী ভাগ্যভাল যে সেটা বুকে না লেগে বাহুতে লাগলো, যন্ত্রনায় চিৎকার করে উঠলো সে।
অতো কিছু খেয়াল করার সময় নেই কমলের; সে তার বাবা দুজনে মিলে রেনীর চাবুকটা দিয়েই পেচিয়ে তাকে বেধে রেখে তার ঘোড়ায় করে গহীন অরন্যের দিকে হারিয়ে গেলেন।
তারপর? … বইটা পড়ুন। পুরান বইয়ের দোকানে গিয়ে দেখুন বইটা খুঁজে পান কিনা।

৭৯। ‘মোহিনীর থান’ লেখক- নাসিমা আনিস। কবি ও সাহিত্যিকদের কলমে আরেক উপেক্ষিত হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়। তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি; ব্যতিক্রম নাসিমা আনিসের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’।

৮০। ‘কুহেলিকা’ ও ‘মুত্যুক্ষুধা’ লেখক- কাজী নজরুল ইসলাম। “কুহেলিকা” নজরুলের শ্রেষ্ট একটি সৃষ্টি। এই উপন্যাস পাঠকদের মন ছুঁয়ে যাবে। কুহেলিকা’র মূল চরিত্র “জাহাঙ্গির” পার্শ্ব চরিত্র আরো আছে। তবে আমাকে ভবিয়েছে জাহাঙ্গিরের জন্ম সংক্রান্ত বিদ্রোহের বর্ণনা। বন্ধু হারুণের সাথে হারুণের বাড়ীর দিকে যাত্রা। হারুণের পাগলী মায়ের অদ্ভুত আচরণ। তাঁর অন্ধ পিতা, খোন্দকার সাহেব সহ তাঁর দুই বোনের চরিত্র, সাথে উপন্যাসের সংলাপ গুলো গভীর মনস্তাত্বি ভাব বহন করে।
মৃত্যুক্ষুধা প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালের রচনা। এ উপন্যাসের ভাষা একান্তই নজরুলীয় বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ। তিনি চরিত্রের স্বাভাবিকতার স্বার্থে যার যার মুখে যে সংলাপ প্রযোজ্য তাই রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। উপন্যাসের প্রথমাংশ কৃষ্ণনগরে এবং শেষাংশ কলকাতায় রচিত। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট এবং দুঃসাধ্য কৃচ্ছ্রসাধন ছিল নজরুলের নিত্য জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই দারিদ্রের চিত্র, সাম্য ও বিপ্লবীচেতনা এ উপন্যাসের রূপকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − 21 =