দর্শনের সহজ পাঠ – ৪: পিরো – আমরা কিছুই জানিনা ( প্রথম পর্ব)


দর্শনের সহজ পাঠ – ৪:
পিরো – আমরা কিছুই জানিনা ( প্রথম পর্ব)
(প্রাচীন সংশয়বাদ)

কেউই কোনো কিছু জানেন না – এবং এমনকি এই কথাটিও নিশ্চিৎ করে বলা সম্ভব না। যা সত্য বলে বিশ্বাস করেন, তার উপর আপনার ভরসা করা উচিৎ না – আপনি হয়ত ভূল প্রমানিত হতে পারেন। সব কিছুকেই প্রশ্ন করা যেতে পারে, সবকিছুকেই সন্দেহ করা যেতে পারে । সবচেয়ে সেরা উপায়টি হচ্ছে তাহলে, নিজের মনটাকে সবসময় খোলা রাখা। কোনো কিছুর ব্যপারে অপরিবর্তনযোগ্য কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না, তাহলে আপনি হতাশও হবেন না। এটাই ছিল স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদের মুল শিক্ষা। সংশয়বাদ দর্শনটি কয়েক শতাব্দী ধরেই বেশ জনপ্রিয় ছিল প্রাচীন গ্রীসে, পরে রোমে। প্লেটো এবং অ্যারিস্টোটলের ব্যতিক্রম, বেশীর ভাগ চুড়ান্ত মাত্রার সংশয়বাদীরা কোন বিষয়ে, সেটি যাই হোক না কেন, কোন ধরনের স্থির বা নিশ্চিৎ বা অপরিবর্তনযোগ্য কোন মতামত ধারণ করা মত যে কোন অবস্থান এড়িয়ে যাওয়াই সমীচীন মনে করতেন। প্রাচীন গ্রীক এক দার্শনিক পিরো (Pyrrho) (সম্ভবত ৩৬৫ থেকে ২৭০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সম্ভবত সকল সময়ের সেরা সংশয়বাদী। খুব নিশ্চিৎভাবে তার জীবনটাও বেশ অদ্ভুত ছিল।

প্রাচীন স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদ আধুনিক সংশয়বাদকে প্রভাবিত করেছিল, এখনও যা এই ক্ষেত্রে কাজ করা দার্শনিকদের বিস্মিত করে। কিন্তু আধুনিক সংশয়বাদের সাথে এর মিল নেই, আধুনিক সংশয়বাদের জনক দেকার্ত, যিনি প্রস্তাব করেছিলেন, বৈপ্লবিক সংশয় হচ্ছে সেই উপসংহারের পৌছানোর পথ যা নিয়ে সন্দেহ করা যায় না। তবে এই পর্বের প্রাচীন সংশয়বাদীদের কর্মপন্হা ছিল ভিন্ন। স্কেপটিসিজম শব্দটির উৎস Skeptikos, যার মানে এমন কেউ যে অনুসন্ধাণ করেন, প্রশ্ন করেন। প্রাচীন সংশয়বাদীরা তাদের বিশ্বাসকে কোনো ধরনের বৈপ্লবিক আর সন্দেহ সৃষ্টিকারী দৃশ্যের সাথে যাচাই করে দেখতেন না, তিনি এমন কেউ যারা দর্শনের একটি অনুসন্ধাণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করতেন, তারা যেটি করতেন তাহলো অন্য বিশ্বাসীদের সফলতাকে প্রশ্ন করতেন, বিশেষ করে স্টয়িকদের।
আপনি হয়তো বিশ্বাস করতে পারেন যে, অনেক কিছুই আপনি জানেন – যেমন আপনি জানেন এই মুহুর্তে এই লেখাটি পড়ছেন। কিন্তু সংশয়বাদীরা আপনার এই নিশ্চিৎ জানা বিষয়টিকে বা জ্ঞানটিকে চ্যালেঞ্জ করে। একটু চিন্তা করে দেখুন, কেন আপনি বিশ্বাস করছেন যে, আপনি আসলে এই শব্দগুলো পড়ছেন এবং শুধুমাত্র কল্পনা করছেন না যে, আপনি এটা পড়ছেন। আপনি কি নিশ্চিৎ হতে পারেন যে আপনি সঠিক? আাপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আপনি পড়ছেন-আপনার কাছে এটা ঠিক সেভাবেই অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু হতে পারে কি পুরো ব্যাপারটি একটি ঘোর বা হ্যালুসিনেশন বা যা ঘটছে না অথচ আপনি তাই দেখছেন বা কোনো স্বপ্ন দেখছেন ( এবং এটা একটি ধারণা যা রেনে দেকার্ত ব্যাখ্যা করেছিলেন আরো আঠারো শত বছর পরে, ১১ তম পর্বে আমরা তার কথা জানবো)। সক্রেটিস দাবী করেছিলেন তিনি যা জানেন তা সামান্য, আর সেটি তিনি জানেন, সেই হিসাবে তিনিও একজন সংশয়বাদী। কিন্ত পিরো এই ধারণাটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আরো অনেকটা অগ্রসর পর্যায়ে। হয়তো একটু বেশীই সামনে।

পিরোর জন্ম এলিসে, গ্রীক মূল ভূখণ্ডের উত্তর পশ্চিম কোনায় যার অবস্থান। ডায়োজেনিস লেইয়ার্শিয়াস এর Lives of the Philosophers ও পিরোর একজন ছাত্র টিমন এর লেখা গুরুত্বপূর্ণ উৎস তার সম্বন্ধে জানার জন্য । পিরোকে যদিও কৃতিত্ব দেয়া হয় নতুন কিছু শুরু করার জন্য, তার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য শূন্য থেকে আসেনি। পিরোকে নিয়ে যারা লিখেছিলেন তাদের একটি প্রস্তাবনা ছিল, খ্রীস্টপূর্ব ৩২০ এর দশকে পিরো আলেক্সাণ্ডার দ্য গ্রেটের সামরিক অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন, যা তাকে নিয়ে এসেছিল ভারতে। এখানে তিনি ভারতীয় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যারা তার সংশয়বাদী ধারণাগুলোর উৎস। এই ধারণটি ফেলে দেয়া যাবে না কারণ ভারতীয় ধ্রুপদী দর্শনে সংশয়বাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে। পিরো নিজেও ডেমোক্রিটাসের চিন্তাকে স্বীকার করেছেন, অ্যাটমিক তত্ত্ব প্রস্তাব করে তিনি সেখান থেকে সংশয়বাদী উপসংহারে পৌছাতে চেয়েছিলেন। তবে ভারতের প্রভাব যাই থাকুক না কেন তিনি অবিচলিত প্রজ্ঞাবান দার্শনিকের বৈশিষ্ট্যই প্রদর্শন করেছেন তার জীবনে।

যদি তার জীবন সম্বন্ধে বর্ণিত সব তথ্য আমরা বিশ্বাস করি ( এবং হয়তো সেই বিষয়েও আমাদের সংশয়বাদী হওয়া দরকার), পিরো, যে কোন কিছু আমরা যা দেখি,জানি বা বুঝি তা কোন প্রশ্ন ছাড়াই মেনে না নেওয়াটাকেই জীবনের ধর্ম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। সক্রেটিসের মতই কোন কিছুই তিনি লিখে যাননি। সুতরাং তার সম্বন্ধে আমরা যা জানি সেটি এসেছে অন্য মানুষদের কাছ থেকে তারা যার কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন, মূলত তার মৃত্যুর বেশ কয়েক শতাব্দী পর। তাদের একজন, ডায়োজেনিস লেইয়ার্শিয়াস , আমাদের বলেন, পিরো সেই সময় তারকা খ্যাতি পেয়েছিলেন এবং এলিস – যে শহরে তিনি বসবাস করতেন – তার প্রধান পুরোহিত হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তার সন্মানে সেখানে দার্শনিকদের কোনো কর দিতে হতো না। কথাটি সত্যি কিনা তা যাচাই করে দেখার কোন উপায় নেই, যদিও দার্শনিকদের কর না দেবার নিয়মটি মন্দ না।

আমরা যতদূর বলতে পারি, যদিও পিরো, তার সংশয়বাদ নিয়ে খুব স্বাভাবিক কোন জীবন কাটাতে পারেননি। পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার মেয়াদ খুবই সংক্ষিপ্ত হতো, যদিনা রক্ষা করার জন্য তার বেশ কিছু প্রভাবশালী বন্ধু না থাকতো। দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকবার জন্য একজন চুড়ান্ত সংশয়বাদী মানুষের প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত কম সংশয়বাদী মানুষদের সহায়তা অথবা সৌভাগ্য।

জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংক্ষেপে এরকম : আমরা পুরোপুরিভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে বিশ্বাস করতে পারবোনা। কখনো কখনো তারা আমাদের বিভ্রান্ত করে। যেমন, অন্ধকারে আপনি কি দেখতে পারছেন, সে বিষয়ে খুব সহজেই আপনি ভুল করতে পারেন। এমন কিছু যা দেখতে শিয়াল এর মত মনে হলেও, হতে পারে সেটি শুধুমাত্র একটি বিড়াল। অথবা আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, আপনি শুনেছেন যে, কেউ আপনার নাম ধরে ডেকেছিলো, যখন সেটি শুধুমাত্র গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই না। যেহেতু আমাদের ইন্দ্রিয় প্রায়শই আমাদের বিভ্রান্ত করে, পিরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি তাদের ‘কখনোই’ বিশ্বাস করবেন না। তিনি কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে একেবারে প্রত্যাখান করেননি যে, তারা তাকে হয়তো সঠিক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি খোলা মন রাখার ব্যাপারেই মতামত দেন।

সুতরাং, যখন বেশীর ভাগ মানুষই কোন খাড়া পাহাড়ের প্রান্তে গভীর খাদের দৃশ্যকে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমান হিসাবে ধরে নেন যে সামনের দিকে হাটা খুবই বোকামী হবে, পিরো তা মনে করতেন না। তার ইন্দ্রিয় হয়তো তাকে প্রতারণা করছে, সুতরাং তিনি তাদের বিশ্বাস করতেন না। এমনকি খাদে প্রান্ত যখন তার পায়ের আঙ্গুল স্পর্শ করে বা সামনের দিকে ঝুকে পড়ার অনুভূতিও তাকে বিশ্বাস করাতে পারেনি তিনি গভীর খাদের নীচে পাথরের উপর পড়ে যাবার উপক্রম হয়েছেন। এমনকি এটিও স্পষ্ট না তার কাছে যে, উপর থেকে নীচে পাথরের উপর পড়াটা তার স্বাস্থের জন্য খুবই খারাপ হবে। কিভাবে তিনি চুড়ান্তভাবে নিশ্চিৎ হবেন এই সব সম্ভাব্য পরিণতিগুলোর ব্যাপারে। তার বন্ধুরা, যারা স্পষ্টত সবাই তার মত সংশয়াবাদী ছিলেন না, এই ধরনের নানা দুর্ঘটনা ঘটানো থেকে তাকে বিরত রাখতেন। যদি তারা সেটি না করতেন, প্রায় প্রতিটি মিনিটে তিনি নানা ঝামেলায় পড়ে যেতেন।

হিংস্র একদল কুকুর দেখে কেনই বা ভয় পেতে যাবেন যদি আপনি নিশ্চিৎ না হতে পারেন তারা আপনাকে আক্রমন করতে চাইছে কিনা ? শুধুমাত্র তারা চিৎকার করছে বা দাঁত বের করে আপনার দিকে দৌড়ে আসছে বলে এমন মনে করা উচিৎ হবে না যে নিশ্চিৎভাবে তারা আপনাকে কামড়ে দেবে। এমনকি যদি তারা সেটাও করে, আবশ্যিকভাবেই যে আপনি ব্যাথাই পাবেন তা কিন্তু নিশ্চিৎভাবে বলতে পারবেন না। রাস্তা পার হবার সময় দুই দিক থেকে ধেয়ে আসা যানবাহনগুলোর দিকে আপনি কেন খেয়াল করবেন? ঐসব যানবাহন হয়তো আপনাকে নাও আঘাত করতে পারে। কে আসলেই তা জানেন? আর কিইবা এমন পার্থক্য হবে আপনি মৃত কিংবা জীবিত থাকার মধ্যে? কোন না কোনভাবে পিরো তার এই পুরোপুরি নির্বিকার থাকার দর্শন নিয়ে জীবন কাটাতে পেরেছিলেন এবং প্রচলিত আর স্বাভাবিক সব মানবিক আবেগ আর আচরণের নিয়মগুলোকে জয় করেছিলেন।

যাইহোক এগুলো পিরোর জীবন ঘিরে সম্ভবত রটানো কিংবদন্তি। তাকে নিয়ে এই গল্পের কিছু বানানো হয়েছে সম্ভবত তার দর্শনকে নিয়ে উপহাস করার জন্য। কিন্তু একেবারে সবই যে বানানো তার সম্ভাবনা কম। যেমন, একটি বিখ্যাত ঘটনা বলছে, একবার সমুদ্রযাত্রায় প্রবল ঝড়ে মুখে পুরোপুরিভাবে শান্ত ছিলেন তিনি, প্রবল বাতাস ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করেছিল জাহাজের পাল, বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। তার চারপাশে সবাই ছিল আতঙ্কিত, কিন্তু এসব কোনকিছুই পিরোকে একটুও বিচলিত করেনি। যেহেতু আমরা আপাতদৃষ্টিতে যা দেখি, তারা প্রায়শই খুব ছলনাময়, তিনি কিছুতেই চুড়ান্তভাবে নিশ্চিৎ হতে পারেননি এই ঝড়ে তার ক্ষতি হবে কিনা। তিনি শান্ত থাকতে পেরেছিলেন যখন এমনকি সবচেয়ে অভিজ্ঞ নাবিকও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে এমনকি এইসব পরিস্থিতিতেও নির্বিকার এবং অবিচলিত থাকা যায়। এই গল্পটির সত্যতা আছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “দর্শনের সহজ পাঠ – ৪: পিরো – আমরা কিছুই জানিনা ( প্রথম পর্ব)

  1. পিরো সম্পর্কে এই লেখাটি পড়ে
    পিরো সম্পর্কে এই লেখাটি পড়ে পুরোপুরি ধারনা পেলাম না। আরো একটু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে। পিরো দার্শনিক মতগুলোর আরো বিশ্লেষন থাকলে ভাল হত। তারপরও যতটুকু লিখেছেন জ্ঞানের ক্ষুদা কিছুটা হলেও মিটেছে। ধন্যবাদ আপনাকে।

    1. আপনাকেও ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
      আপনাকেও ধন্যবাদ পড়ার জন্য। দুই হাজারের কাছাকাছি শব্দে আসলে কোনো দার্শনিককেই তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। আর খুব সুচারু বিশ্লেষণের মত দার্শনিক শিক্ষাও আমার নেই ( শুধুমাত্র কৌতুহল, আর আমার প্রিয় দার্শনিক স্কুলটি ছাড়া তেমন গভীরে আমি প্রবেশ করার সময় পাইনি)। এগুলো নানা লেখা আর পডকাষ্ট থেকে সংগ্রহ করে অনুবাদ ও সম্পাদনা করা। সক্রেটিস থেকে শুরু করে আজ অবধি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকদের সম্বন্ধে শুধুমাত্র একটি সাধারণ ধারণা দেয়া যারা আমাদের চিন্তার বিবর্তনে মৌলিক অবদান রেখেছেন, দর্শন সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছু জানতে হলে অন্য কিছু পড়তে হবে। জানিনা আমি কতটুক করতে পারবো, তবে প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাইলস্টোনগুলো ছুঁতে চাইছি, যদি সম্ভব হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 5