‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে, আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কোন এক ঈদের মৌসুমে কোন একটি মেয়ে নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে গাবতলির হাট থেকে গরু কিনে বাড়ি ফিরছিল। পিতাবিহীন পৃথিবীতে মেয়েটি অভিভাবকের গুরু দায়িত্ব পালন করতে কার্পণ্যবোধ করে নি। মেয়েটি বেশ খুশি ছিল। সে সময়ে ৪০,০০০ টাকা দিয়ে গরু কেনা বিশাল ব্যাপার।

যে সমাজে মেয়েটি বড় হয়েছিল, সে সমাজ সব সময়ই নারীর উপার্জনের পেছনে কোন না কোন কুৎসিত রহস্য খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। মানুষের সুখ কেনো জানি মানুষের সহে না। গরু কিনে বাড়ির নিচে আসা মাত্র পাড়া-প্রতিবেশীর সকলেই গরুর মূল্যের চেয়ে মেয়েটির শরীরের মূল্য নিয়ে হিসাবনিকাশ শুরু করেছিলো। চোখের সামনে প্রশংসা করা এবং পিঠ পিছে কুৎসা রটানো বাঙালির চরিত্র। বাঙালির চরিত্র সম্বন্ধে মেয়েটি অবগত ছিল।

আশেপাশের মানুষ কী বলতে পারে তা সকলেরই জানা। যে মেয়েমানুষ একা হাটে গিয়ে গরু কিনতে পারে সেতো কতো কিছুই না করতে পারে, যে মেয়েমানুষ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী করে- সে কেমন হবে বোঝাই যায়, সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরে, মাঝে মাঝে গাড়িতে কে জানি নামিয়ে দেয়, পরিবারের ভরণপোষণ করে কীভাবে ৪০,০০০ টাকা দিয়ে গরু কিনতে পারে, কমবয়সী মেয়ে তাগড়া শরীর, ভরপুর যৌবন ব্যবহার করে কতো কী স্বার্থ উদ্ধার করা যায় ইত্যাদি।

আশেপাশের কুৎসিত মানুষগুলির নোংরামি মেয়েটির কানেও আসতো। মেয়েটির মনোবল শক্ত ছিল। তোয়াক্কা করতো না।

কোরবানির দিনে সন্ধ্যেবেলায়, পাশের বাড়ির এক লোক মেয়েটিকে মামুনি ডেকে স্নেহ করার অজুহাতে শরীর ছুঁয়ে বিকৃতযৌন চাহিদা পূরণ করছিলো। মেয়েটি সেই স্পর্শের সংজ্ঞা বুঝতে পেরেছিল। পৃথিবীতে একমাত্র মেয়েরাই প্রতিটি স্পর্শের ভাষা বুঝতে পারে। মেয়েটি সরে দাঁড়িয়েছিল। লোকটি মেয়েটিকে বলেছিল, তোমার গরুর মূল্যে কি তোমাকে পাওয়া যাবে? মেয়েটি ধমকে গিয়েছিল।

এটি শুধু একটি বিশেষ মেয়ের জীবনের ঘটনা। কিন্তু, অসংখ্য মেয়ের জীবনের প্রতিচ্ছবি। দেশে অসংখ্য মেয়ের সাথে অহরহ এমন ঘটনা ঘটে থাকে। কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, আবার কেউ শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

কিন্তু এই ঘটনাটির মেয়েটি আজ আর নেই। মারা গেছে। হয়তো আত্মহত্যা কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যু। জানা নেই। কোরবানির আগেই মেয়েটি মারা গেলো। হয়তো সহ্য করতে না পেরে, হয়তো নিঃশ্বাস নিতে না পেরে! দুর্গন্ধময় কুৎসিত পুরুষশাসিত সমাজ মেয়েটি বাঁচতে দিল না।

‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে, আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + = 8