মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প লেখা বন্ধ করুনঃ বন্ধ করুন ইতিহাস বিকৃতি


স্যার ওয়াল্টার স্কটের পৃথিবী বিখ্যাত একটি উপন্যাসের নাম “আইভানহো”, তৃতীয় ক্রুসেডের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ব্যাপক ভাবে পাঠকের মাঝে জনপ্রিয়তা পেলেও বোদ্ধা সাহিত্য সমালোচকদের শাণিত সমালোচনার মুখে পড়ে। কারণ এই উপন্যাসটিতে ঐতিহাসিক তথ্যের চরম বিকৃতি ঘটানো হয়।

একইরকমভাবে নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের “জ্যোতস্না ও জননীর গল্প” উপন্যাসটিও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পেলেও তথ্যবিকৃতির অভিযোগ ওঠে সেটির ব্যাপারেও। কেননা মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটিতেও বেশ কিছু বিতর্কিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

এই দুটি উপন্যাসের প্রসঙ্গ আনার কারণ হচ্ছে , ইদানীং অনলাইনে কিছু তরুণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার্। কিন্তু সেইসাথে একটি ব্যাপার চরম হতাশার সাথে পরিলক্ষিত হয় , তারা তাদের লেখালেখির ক্ষেত্রে এমন কিছু রেফারেন্স দিচ্ছেন , যেখানে সেগুলো ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ ভিত্তিক মাস্টারপিস হওয়ার পরিবর্তে স্রেফ রঙচঙে থ্রিলারে পরিণত হচ্ছে আর সেইসাথে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিকৃত ঐতিহাসিক তথ্য। যার কারণে পুরো যুদ্ধে এক রাউন্ড গুলি না ছোড়া জিয়াউর রহমানের মতো ব্যক্তি ও ড্রামের উপরে দাড়িয়ে রাইফেলের গুলিতে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কল্পকাহিনীও মানুষ বিশ্বাস করছে অবলীলায়।আর মূলতঃ ফেসবুক কেন্দ্রিক লেখালেখির কারণে এই কল্পকাহিনীগুলো অবলীলাক্রমে পৌঁছে যাচ্ছে অধিক সংখ্যায় মানুষের কাছে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অতিরিক্ত কল্পনার আশ্রয় নেয়ার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি অন্তত আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে করিনা। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাটম্যান , সুপারম্যান , হারকিউলিসদের মতো সুপারহিরোর মতো উপস্থাপন করারও কোন প্রয়োজন নেই। এরা ছিলেন তাদের সময়ে সত্যি সত্যিই এক একজন সুপার হিরো।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ক্র্যাক প্লাটুনের রুমি ,বদি ,আজাদদের চিনিয়েছে , ভাটির বীর জগৎজ্যোতি দাসকে চিনিয়েছে , চট্টগ্রামের কিংবদন্তী ক্যাপ্টেন করিমকে চিনিয়েছে ,চিনিয়েছে মতিউর এর মতো দুঃসাহসী বিমান সেনা , সিপাহী মোস্তফা কামাল , ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখদের অকুতোভয় বীরশ্রেষ্ঠদের্। চিনিয়েছে পিলখানা আর রাজারবাগের প্রথম প্রতিরোধের দুঃসাহসী পুলিশ আর ইপিআর সদস্যদের্।
৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতি ইঞ্চি ভূমির জন্য জীবন দেয়া ৩০ লক্ষ শহীদের দেড় কোটি লিটার রক্তের প্রতি বিন্দুতে লুকিয়ে আছে কোন না সাহস , বীরত্ব আর আত্মত্যাগের ইতিহাস।৪৫ বছর পার হলেও যেখানে কাজের অধিক্ষেত্র তাই শেষ হয়ে যায়নি। সেখানে কল্পনার ডালপালা বিস্তার করে প্রকৃত কাহিনী বিস্মৃত করার কোন যৌক্তিকতা আমার অন্তত চোখে পড়েনা। সত্যিকারের ইতিহাস নিয়েও যে কালজয়ী লেখা রচনা করা সম্ভব , তা মেজর কামরুল ইসলাম ভুইয়া তাঁর “জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা” বইয়ে হাতেকলমে করে দেখিয়েছেন। যেমন দেখিয়েছেন Sezan Mahmud ভাই তাঁর “অপারেশন জ্যাকপট” বইয়ে।সম্প্রতি প্রকাশিত Hasan Murshed ভাইয়ের “দাস পার্টির খোঁজে ” বইটিও সেই একই ধারার পরিচয় বহন করে।

আপনাদের প্রয়াসকে আমি স্বাগত জানাই। শুধু অনুরোধ রইলো , এমন কোন রেফারেন্স পারতপক্ষে ব্যবহার করবেন না , যাতে সত্যের বদলে কল্পকাহিনীই জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কারণ ইতিহাসের কাছে এতটুকু দায়বদ্ধতা আমাদের সকলেরই থাকা উচিৎ ,ভুলে যাবেন না যে মুক্তিযুদ্ধ কোন গল্প নয় , এটি হলো রক্তভেজা আত্মত্যাগের অশ্রুসজল ইতিহাস।

জনপ্রিয়তার সাথে সাথে দায়িত্ব ও যে বৃদ্ধি পায় বন্ধুগণ……………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − = 71