শান্তির স্বরূপ সন্ধানে।

আমার জন্মের পর কয়েক দশক এবং প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে বিশ্ববাসী একটা বাক্য শুনে আসছে “ইসলাম শান্তির ধর্ম”। আমি যেমন কয়েক দশকের মধ্যে শান্তির ঐ ধর্মের মধ্যে শান্তির নমুনা দেখতে, পাইনি তেমনি পৃথিবীবাসীও ঐ ধর্ম বা তার অনুসারীদের কার্যকলাপের মধ্যে শান্তির লেশ মাত্র দেখতে পায়নি। অন্তত ঐতিহাসিক কোন তথ্য প্রমাণ নাই।

আসলে শান্তির নাম নিয়ে ধর্মটার প্রতিষ্ঠাই পেয়েছিল প্রচন্ড নিষ্ঠুরতার মধ্যদিয়ে, যার ধারা বিশ্বময় আজও প্রবাহিত। অন্যান্ন ধর্ম গুলোর তাণ্ডবলীলা আজ যেখানে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে , এই উদ্ধত ধর্ম সেখানে আজও খড়গ হাতে চণ্ডাল নিত্য করে চলেছে।

রুক্ষ, ধুসর, ক্ষুধা তৃষ্ণার মরুবাসীরা সম্ভবত একজন ত্রানকর্তার আশায় আশায় দিন গুনতেন, সেই সুযোগে ভন্ড প্রতারকেরও অভাব হতনা। আজকের দুনিয়ায় আমরা যে নবী রুপ দেখতে পাই তা সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত একজন। মুহাম্মদের আমলে নবী শুধু তিনি একায় ছিলেন না, আরও অনেক নবুয়াতের দাবীদারকে হটিয়ে তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন, এবং সত্য সত্যই তিনি কিছুটা আজন্ম ক্ষুধা, দরিদ্র আরব বাসীর জন্য ত্রাণ কর্তা হিসেবে আভির্ভূত হয়েছিলেন। আমরা যে জীর্ণ বস্ত্র, ক্ষুধা, দরিদ্র নিপীড়িত সাহাবীদের দেখতে পাই তা ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের অবস্থা, মুসলমানদের প্রতিষ্ঠা পাবার পরকার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেখানে বিত্ত বৈভব, শূরা নারীর অভাব ছিলনা। আজকে যে ধর্ম ব্যবসায়ী নেকো কান্না কেঁদে কেটে উম্মতিদের দুঃখ কষ্ট বর্ণণা করেন তা আংশিক সত্য মাত্র, শুধু অনুসারীদের ভাবাবেগ জাগাতে যেটুকু দরকার পড়ে ততটুকুই। তারা কখনই বলবে না যুদ্ধবন্দিনী নারীদের নির্যাতন, মর্মান্তিক দুঃখ দুর্দশার কথা, অথবা অপেক্ষাকৃত দুর্বল গোত্রের কথা যারা মুসলমানদের হাতে নির্মম ভাবে পুরুষেরা নিহত অথবা নারী শিশু সহ দাসদাসীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। আমি অন্তত একবারও জীবনে শুনিনি।

আসলে মারাত্বক এক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলাম নামক এই শান্তির ধর্ম। মুহাম্মদ ঘোষণা দিয়েছিলেন দুনিয়ার মালিক আল্লাহ ও তার রাসুল,তাই তিনি বিশ্বময় তার শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন , তার অসম্ভব রণকৌশল এবং পর পর বিজয় গুলোই সম্ভবত তাকে এধরণের দুঃস্বপ্ন দেখতে সহায়তা করেছিল। ইসলামের ছায়া তলে এসো, নয়তো জিজিয়া কর প্রদান কর, অথবা তরবারির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত থাক। এই তিনটা শর্তের মধ্যে তিনি আরব অঞ্চলের গোত্র ভিত্তিক এক একটা এলাকা দখল করে চলেছিলেন। ইসলামের ছায়া তলে এসেও খুব একটা মুক্তি ছিলনা, জিহাদ নামক যুদ্ধ তাদের উপর ফরজ ছিল।

মুহাম্মদ ঘোষণা দিয়েছিলেন শীঘ্রই ইরান এবং রোমান সম্রাজ্য ইসলামের পদানত হবে । ইসলামের তৃতীয় খলিফা উমরের শাসন আমলে কয়েক হাজার সৈন্য খুইয়ে , অনেক তৈল বাতি পুড়িয়ে ইরান শেষ পর্যন্ত মুসলমানেরা দখল করতে পেরেছিলেন, কিন্তু রোমান সম্রাজ্য সহস্রাধিক বছর রাজত্ব করে শেষ পর্যন্ত কালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেল কিন্তু মুসলমানের পদানত করার সুখ স্বপ্ন আর পূরন হলনা।

কোন ধর্মই প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক বা কোন রকম অলৌকিকতা নেই, প্রতারণা এবং প্রচণ্ড সন্ত্রাসের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর ধর্ম গুলোর প্রতিষ্ঠা । মুসলমানদের অসংখ্য যুদ্ধে জয়লাভ কেউ কেউ অলৌকিকতার নিদর্শন খুঁজে পান, আসলে তাদের প্রথম দিকের কৌশল এবং জয়লাভ পরবর্তী যুদ্ধ গুলোর রণকৌশল, জনবল, অস্ত্রবল, এবং মনোবল যোগাতে সহায়তা করে ছিল। কোন রকম ঐশ্বরীকতা বা অলৌকিকতা থাকলে মুহাম্মদকে আর মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হতনা। প্রথম যুদ্ধ গুলোতে মুহাম্মদের পরাজয় হলে অন্যান্ন নবুয়্যাতের দাবীদারদের মত তিনিও কালের গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেন। কোন যুদ্ধ বাজের যুদ্ধে জয়লাভই কোন ধর্মের সত্যতা এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব সুনিশ্চিত করেনা। অনেক শক্তিধর দ্বিগবিজয়ী-ই পৃথিবীর সভ্যতার ওলট পালট করে ছিলেন।

পরম করুণাময় কোন পরমেশ্বর বা আল্লাহ, ভগবান, গড যে নামেই ডাকিনা কেন তিনি যদি সুশৃংঙ্খল কোন জীবন ব্যবস্থা মানুষের জন্য পাঠাতে চাইতেন তাহলে তিনি মানুষের মন পরিবর্তন করে দিয়ে অনায়াসেই সেটিকে জগতের প্রধানতম ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিতে পারতেন। এতো যুদ্ধ বিগ্রহ,হত্যা রক্তপাত,নারী, শিশু সহ অসংখ্য মানুষের নির্মম, দূর্বিসহ দাসত্বের জীবনের মধ্যদিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হত না। সত্যি যদি কেউ এমন করে থাকেন তিনি আর যেই হন দয়াময়, করুণাময় বিশেষণ গুলোর যোগ্য নন।

প্রত্যেক ধর্ম গুলো পুরাতন এবং সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত, কোথাও কোন অলৌকিকতার লেশমাত্র নেই। অনন্ত মহাবিশ্বের প্রতিপালক কোন স্বত্বা মানুষের জন্য বাণী, কিতাব, বা গ্রন্থ পাঠানোর ইচ্ছা করলে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের দূর্বোদ্ধ কোন ভাষা ব্যবহার করতেন না বা অহেতুক রহস্যময় জটিলতার প্রশ্রয় নিতেন না অথবা অনাগত মানবের জন্য কোন গ্রন্থে একক সাধারণ কোন মানুষের অভিশাপ বা কোন নারীর পবিত্রতা ঘোষনার মত তুচ্ছ এবং সমসাময়িক হাস্যকর ঘটনা স্থান পেতনা। কোরানের প্রতিটা বাণী, আয়াত এসেছিল কোন বিশেষ বিধানপ্রতিষ্ঠা অথবা সে সময়ের কোন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে যা অনন্ত মানবের জীবন বিধান হওয়ার কোনই যৌক্তিকতা নেই।

প্রত্যেক মানুষই মূলত মানবিক। অতিলোভ, আত্মরক্ষার চেষ্টা এবং কখনো কখনো অতি উন্মত্ততা মানুষকে খুনি করে তোলে, এবং পরিশেষে সবায় আত্মগ্লানিতে ভোগেন। মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। যে কারণে তারা কঠোর প্রার্থনা প্রণালী, কৃচ্ছ সাধনার মধ্য দিয়ে বিবেকের তাড়না এবং গ্লানী মুক্ত হতে চেয়েছিলেন, কেননা কোন অপরাধবোধ ছাড়া প্রতিপালকের (যদি থাকেন) কাছে এমন করুণ আকুতি সাধারণ মানুষের থাকে না।

কোটি কোটি বৎসর পূর্বে কোন এক শুভক্ষণে পৃথিবী নামক এক তুচ্ছ গ্রহে প্রাণ বিকাশের অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিল, তারপর অনেক পথ পরিক্রমায় আমরা আজ একবিংশ শতাব্দীর সভ্য মানুষ। এখানে জ্ঞানী, মহাজ্ঞানীগণ অনবরত সংস্কার, সংযোজন, বিয়োজনের মধ্যদিয়ে মানুষের সৃষ্ট সভ্যতা, জ্ঞান বিজ্ঞান সামনের দিকে নিয়ে চলেছে। অতীতের পুঁথি কংকালে আমাদের মন মগজ, মনন, মেধা আটকে পড়ে থাকা কোন কাজের কথা নয়।

মানুষই এখানে উন্নত থেকে উন্নততর মত, পথ ও জীবন প্রণালীর স্রষ্টা, কোন অলৌকিক সত্ত্বা নয়। আজকের পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে, এখানে এখনও হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, শিখ, জৈন্য এইসব পুরাতন পচা ধর্মীও পরিচয় খোঁজা হাস্যকর। এ পৃথিবী আজ আর কোন অলৌকিক স্বত্বার দাস নয়, এ পৃথিবী সম্পূর্ণ মানুষের।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “শান্তির স্বরূপ সন্ধানে।

  1. মানুষই এখানে উন্নত থেকে

    মানুষই এখানে উন্নত থেকে উন্নততর মত, পথ ও জীবন প্রণালীর স্রষ্টা, কোন অলৌকিক সত্ত্বা নয়।

    কিন্তু মৃত্যু আর বার্ধক্য নামক বিদ্ঘুটে যন্ত্রণা সব হিসাব পালটে দেয়। অনেক আরজ আলী মাতুব্বরকেই হাসপাতালের বিছানায় তসবী জপতে দেখা যায়। তখন কিন্তু আর নিজেকে বাদরের বংশধর বলে মনে হয় না। উন্মাতাল যৌবনে ঈশ্বরের প্রতি অগাধ ঘৃণা, জীবন সায়ান্নে অগাধ আস্থায় রুপান্তরিত হয়।
    আসলে মানুষের উচিত হবে দ্রুত জীবন আর মৃত্যুর উপর নিয়ন্ত্রন স্থাপন করা। সুইচ টিপলেই জন্ম আর সুইচ টিপলেই মৃত্যু। অনন্ত যৌবন। ব্যাস শেষ। ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নাই। কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়া আর মৌজ-ফুর্তি।

    1. আশে পাশের মানুষদের দেখাদেখি
      আশে পাশের মানুষদের দেখাদেখি নাস্তিক হওয়া মানুষ গুলো নিজেদের উপলব্ধীর অগভীরতার জন্যই নাস্তিক থেকে আস্তিক হয়ে পড়ে। আগে আমাদের দেশে নাস্তিক খুব বেশি হারে দেখা যেতনা। যারা ছিল তারাও য়ৌবনের উত্তাপেই বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইতো বলেই নিজেকে নাস্তিক ঘোষনা করে বসতো, কিন্তু বয়স ঢালে গড়াতে শুরু করলে বিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করতে সময় লাগতোনা। কিন্তু উপলব্ধীর গীভরতা নিয়ে যারা বিশ্বাসের খোয়াড় থেকে বেরিয়ে আসছেন তাদের সেই বিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করা কঠিন। আপনি হয়তো অনেক নাস্তিককে আস্তিক হয়ে যেতে দেখেছেন। কিন্তু এটাও বলবো হয়তো সবটা দেখেনেনি, সব নাস্তিকের মৃত্যুকালে আপনি তাদের পাশে ছিলেননা। মৃত্যু, বার্ধক্য সকলকে বিশ্বাসে খোয়াড়ে ফিরিয়ে আনে, এটা হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 62 = 65