বাংলা সাহিত্যে যে ১০০ টি বই আপনাকে পড়তেই হবে (দশ) শেষ পর্ব

৯১। ‘আয়না’ লেখক- আবুল মনসুর আহমেদ। তৎকালীন সমাজের কিংবা জাতীয জীবনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব অসঙ্গিত লেখককে পীড়া দিয়েছে তাই তিনি তির্যক বাণীভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি আয়না নামক গল্পগ্রন্থে। আবুল মনসুর আহমেদের প্রথম ব্যঙ্গ গল্প সংকলন আয়না। গল্পগুলোর রচনাকাল ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৯ সাল অর্থাৎ বিশ শতকের বিশের দশক। গল্পগুলো প্রথম সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আয়নার উৎসর্গপত্রে আবুল কালাম শামসুদ্দীন-এর প্রতিটি উদ্ধৃতিটি ছিল এরকম: “বন্ধুরা বলেছেন, এই বইয়ে আমি সবাইকে খুব হাসিয়েছি। কিন্তু এ্ই হাসির পেছনে যে কতটা কান্না লুকানো আছে, তা তুমি যেমন জান, তেমন আর কেউ জানে না।”

৯২। ‘মুক্তচিন্তা’ লেখক- রতনতনু ঘোষ একজন প্রাবন্ধিক ও গবেষক। মুক্তমনারা বইটি খুবই পছন্দ করবেন আশা করি।

৯৩। ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ লেখক– দেবেশ রায়। তিস্তাপারের বৃত্তান্ত সমাজবাস্তবতা নির্ভর এক প্রকল্পায়ণ কথাসাহিত্য, যা পরিত্রাণহীন সত্যের দর্শন থেকে নেতিদেশ ও দৈশিকতার দর্শণয়িত পথ অভিসারী। এপিকধর্মী এই উপন্যাসের ক্রমপুষ্টিকরণ যে নির্দিষ্ট টাইম এবং স্পেস থেকে উৎসারিত, তা এক আকাশের হাঁ-মুখ থেকে নেমে আসা নদীবিস্তৃতিকে পুরায়ত জনপদের ঐকান্তিক ইতিহাস বলে দায়ী করে।

৯৪। ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’ লেখক– অবধূত। অবধূত ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক ও তন্ত্রসাধক। তাঁর প্রকৃতনাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। পুত্র অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে উজ্জ্বয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস (অবধূত) গ্রহণ করেন। অবধূত ছদ্মনামে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

৯৫। ‘বারো ঘর এক উঠোন’ লেখক– জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয় বারো রকমের গল্পকে তিনি যেন বর্ণিত আখ্যানের মধ্যে অদৃশ্য সুতো দিয়ে জুড়ে দিয়েছেন। মনে হয় উপন্যাসের বর্ণিত আখ্যানের সর্বত্রই, তলে অবতলে গভীরে, ক্রমশই গল্পের সম্মোহনী ছায়া-প্রচ্ছয়া ঘনীভূত হচ্ছে। উপন্যাসের মধ্যে বারবার গল্পশিল্পের অতিরিক্ত এই সংক্রমণ, তার প্রভাব, তার আধিক্য, উপন্যাস রচনার কারুকৃতিকে অনেকাংশেই কিন্তু নষ্ট করে দিয়েছে।

৯৬। ‘সাদা খাম’ লেখক– মতি নন্দী। এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে প্রতারণা ও স্বীকারোক্তির এক আশ্চর্য সংঘাত, আর্তনাদের ভেতর রূপান্তরিত মানুষের সংবেদ; যা সংশয় ও ফলশ্রুতির ভেতরে চিরকালীন জিজ্ঞাসা ফেলে রেখে, পাঠককে অনুসন্ধানী করে তোলে।

৯৭। ‘নুন চা’ লেখক– বিমল লামা। বইয়ের ফ্লাপ থেকেঃ ভৌগোলিক তরঙ্গ জমে ছিল পাহাড় হয়ে। তারই খাঁজে খাঁজে নিস্তরঙ্গ জীবনের নুনকথা। টয় ট্রেনর মতো ধারাবাঁধা নিসর্গের ভেতর দিয়ে ওঠা নামা। অপরূপ কিন্তু জীর্ণ। নিরাপদ কিন্তু অস্বাধীন। একথা বুঝতে সময় লাগেনা উরগোনের যখন লাল পতাকার পাশ দিয়ে উঠে এলো সবুজ নিশান। লাল সবুজের দ্বৈরথে তৈরি হল হলুদ শিখা। পুড়তে লাগল ঘরবাড়ি। ক্ষেত গোয়াল। স্মৃতি আর স্বপ্ন। নিসর্গের দাউ দাউ চিতা।
তবু লুকিয়ে ভালো বাসতে ছাড়ে না জুনি। জীবন বাজি রেখে ভালো বাসতে চায় উরগেনকে। জ্বলন্ত চিতার ফাঁকেই খুঁজে নিতে চায় কোনো স্নিগ্ধ কোণ। নিভৃতে শুধু ভালোবাসবে বলে। কিন্তু যেই নিভৃতের খোঁজ মেলার আগেই বুনো মোষের মতো তেড়ে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে জুনিকে। তার যোনির ভেতর ঢেলে দেয় তপ্ত গরল।
কিন্তু জুনি যেন নিজেকে অভিযোজিত করতে চায় ভালোবাসার সংশ্লেষকের মতো। ভালোবাসতে চায় বহিরাগ গরলকেও। আর সেখানেই শুরু হয় তার সমান্তরাল এক লড়াই। সবার হয়ে কিন্তু একা একা।
রাজনীতির নিশানে যখন আকাশ ঢাকে, জুনি পড়ে থাকে মাটি কামড়ে, পৃথিবীর দিকে পিঠ করে, এগোতে চায় আর এক পৃথিবীর দিকে। পৃথিবীটাকে অবাক করে, হতবাক করে।

৯৮। ‘গড় শ্রীখন্ড’, ও ‘রাজনগর’ লেখক– অমিয়ভূষণ মজুমদার। অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রথম প্রকাশিত রচনা হল একটি নাটক। প্রথম উপন্যাস গড় শ্রীখণ্ড – ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা পত্রিকায় ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা থেকে। গড় শ্রীখণ্ড আবহমান বাংলার উপন্যাস। ভারত স্বাধীনতার আগে-পরের সময়কালে পদ্মাপাড়ে স্থাপিত এ উপন্যাসের কাহিনী।
রাজনগর-এর কাহিনী শেষ ১৮৮৩-তে। নয়নতারাতে নয়নতারাও রাজচন্দ্রের মুহূর্তিক শারিরীক সম্পর্কের ফসল যুবক কুমারনারায়ণকে দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করা হয়েছে। মানবমন ও সমাজের বিচিত্র অনালোকিত জগতই তাঁর আরোধ্য। বিশ্বসাহিত্যে সিরিয়াস ধারার একজন বুভুক্ষু পাঠক অমিয়ভূষণ মজুদার তাঁর মনন ও শৈলী দিয়ে সে সকল জগতকেই চিত্রায়িত করেছেন। গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা উপন্যাসে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি আমাদেরকে নিরন্তর প্রাগ্রসর করেছে।

৯৯। ‘ক্রান্তিকাল’ ও ‘কেয়াপাতার নৌকা’ লেখক– প্রফুল্ল রায়। ‘”ক্রান্তিকাল” বইটি পড়লে বোঝা যাবে ভারতীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বাধীনতার আকুতি। এই উপন্যাসটি অবলম্বনে ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক শেখর দাস “ক্রান্তিকাল” নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। যেখানে রূপা গাঙ্গুলী, সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়সহ অনেক বাঘা বাঘা অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন।
কেয়াপাতার নৌকো’র পরবর্তী খণ্ড ‘শতধারায় বয়ে যায়’ এবং তারও পরবর্তী খণ্ড ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’। তিনটি উপন্যাসই আকারে মহাকাব্যিক। অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন এইঔপন্যাসিক সারা জীবন জুড়ে পুরস্কারও পেয়েছেন প্রচুর।
এই লেখকের আরেকটি বইয়ের কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তারই রচিত আরো একটি বই ঈশ্বরপুত্র। এই বইটির ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে মাইকেল সমরেশ দত্ত নামের এক বিপত্নীক মানুষকে ঘিরে। মাইকেল সমরেশ দত্ত আদর্শহীন মানুষদের মধ্যে বিরলতম চরিত্র। বহুজন হিতায় নিজেকে সপে দিয়েছে সে। বহু দুঃস্থ, সম্বলহীনের পরম আশ্রয় সে। নারী পাচার চক্রের কবল থেকে একটি সরল গ্রাম্য যুবতীকে বাচাতে গিয়ে কোন মূল্য দিতে হয় তাকে তাই নিয়ে এই আশ্চর্য আখ্যান ঈশ্বরপুত্র।

১০০। ‘মহাস্থবির জাতক’ লেখক– প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর জন্ম ১৮৯০ সালে। ‘মহাস্থবির জাতক’-এর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় ‘মহাস্থবির’ (প্রেমাঙ্কুর আতর্থী) লিখেছিলেন: “মানুষের জীবনের কাহিনীই সব-চাইতে বিচিত্র উপন্যাস – উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রের জন্য আশা করি কারও কাছে কোনও জবাবাদিহিতে পড়তে হবে না”। চার-খণ্ডের সম্পূর্ণ বইটি লিখে ও বলে শেষ করতে ওঁর লেগেছিল কুড়ি বছর। চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয় প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মৃত্যুর পরে। এই খণ্ডটি লেখার সময়ে তিনি প্রায় দশ বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। কবি উমা দেবীকে মুখে মুখে বলতেন, আর তিনি সেগুলো লিপিবদ্ধ করতেন। চতুর্থ পর্ব-এর নিবেদনে উমা দেবী লিখেছিলেন: “মহাস্থবির জাতকের প্রথম পর্ব যখন লেখা হচ্ছিল, তখন একদিন কথা প্রসঙ্গে (প্রেমাঙ্কুর আতর্থী) বলেছিলেন, যে, পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের কথাই তিনি লিপিবদ্ধ করবেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি সে ইচ্ছে ত্যাগ করেন।”

‘বাংলা সাহিত্যের যে ১০০টি বই আপনাকে পড়তেই হবে’ শেষ হয়ে গেল। মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল। এখন বেশ কিছু ভাল বই এই তালকায় দিতে পারিনি।

চারিদিকে এত্ত এত্ত বইয়ের ছড়াছড়ি যেন বইয়ের মেলা । এত বই কি এক জীবনে পড়া করা সম্ভব ? সম্ভব নয় । এক্ষেত্রে একটি কাজ করা যেতে পারে , প্রখ্যাত লেখকদের সেরা উপন্যাসগুলো পড়া যেতে পারে । আমি এভাবেই পড়ার চেষ্টা করি । আমি এরকম একটি লিস্ট তৈরী করেছি , আমার মতে এগুলি বাংলাসাহিত্যের অবশ্যপাঠ্য উপন্যাসগুলির মধ্যে পড়বে । অনেক উপন্যাস বাদ পড়তে পারে , আবার অনেক লেখক বাদ পড়তেও পারেন , সেক্ষেত্রে সেটি আমার অজ্ঞতা ধরে নেবেন । একজন লেখকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস কোনটি এটা নিয়ে মতানৈক্য থাকতে পারে ।

আশা করি, সত্যিকার পড়ুয়ারা এই বই গুলো পড়েছেন, সব গুলো না পড়া হলেও কিছু কিছু যে পড়েছেন তা আমি জানি। আর যারা পড়েননি তারা আজ থেকেই বই গুলো সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করে দেন। ১০০ টা বই শেষ করতে দুই-তিন বছরের মত সময় লাগবে। সবাই ভাল থাকুন।

এরপর আসবে, ‘ইংরেজি সাহিত্যের যে ১০০টি বই আপনাকে পড়তেই হবে’ শুরু করবো। সাথেই থাকুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

51 + = 57