কুরবানী নিয়া ব্যক্তিগত অভিমত

শ্রেণীভেদ প্রকটভাবে বুঝাইয়া দেয়ার খুব ভালো পন্থা এই কুরবানী। দরিদ্র ধনীর দরজায় মাংস মাংস কইরা চিল্লাবে। দেশে অন্তত একটা দিন যারা ভিক্ষুক না, তাদেরও বিশাল একটা অংশ একধরণের ভিক্ষাবৃত্তিতেই নামে, মাংস ভিক্ষা চলে। যদি কেউ ত্যাগ করতেই চায়, এইভাবে টূকরা টুকরা জৈব খন্ড ত্যাগ না কইরা পাত্তি বিলাক গোপনে। কিংবা জনসেবার নানা উপায় তো আছে, সাহায্যের নানা উপায় আছে, ওইসব করুক। এই বাজারে একটা গরুর দাম দিয়া অন্তত পাচটা ছেলে মেয়ের শিক্ষার খরচ উঠে যায়। ৫০ লাখ গরুর টাকায় অন্তত ২-৩ কোটি ছেলে মেয়ের আধুনিক শিক্ষার খরচ উঠে আসতো। দেশে বা জাতির উপর প্রভাব হইতো ব্যাপক। কিন্তু আমরা ওইসব শিশুদের, ছেলে মেয়েদের তাদের পুরা পরিবার সহ ভিক্ষুকই বানাইতেছি।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কুরবানীর ঈদ কনসেপ্টটাই পছন্দ না। ত্যাগের কথা বলা হয় কুরবানীর মাধ্যমে। আসলে আমরা কি ত্যাগ করি? আমরা আসলে (বেশিরভাগ কুরবানীদাতা) কিছুই ত্যাগ করি না। লাখ লাখ কোটি কোটি পশুই প্রাণত্যাগ করে মাত্র। সেইটাও সমস্যা না। যারা এই মুহুর্তে কাচকী মাছের তরকারী দিয়া ভাত খাইতেছেন, তাদের জিভের জলের যোগান দিতেছে হাজার হাজার নিরীহ কাচকী প্রাণ। তাদেরও তো গেবন ওরফে জীবন ছিলো, সুক্ষ জালে ধরা পইরা কি ধড়ফড়াইয়া না মরছিলো ওরা, আহারে! আমরা লিলিপুট সাইজের হইলে আর শ্রবণশক্তি যদি সারমেয় স্ট্যান্ডার্ডের হইতো, তাইলে হয়তো তাদের লাফালাফি আর মৃত্যুর আগমুহুর্তের হাসফাস টের পাইতাম।

সেই কথাও বাদ দ্যান। এই যে অনেকে পানি ফুটাইয়া খায়, পানির জীবানুগুলা মইরা যায় কিংবা আপনি আমি এন্টিবায়োটিক খাই, দেহের ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া মইরা যায়। ওরাও তো প্রাণ। কারো প্রাণ লইয়া টান দেয়ার আমরা কে? কিন্তু আমরাই আসলে সেই চ্যাটের বাল, যারা যা খুশী করতে পারি। কারণ, আমাদের জানামতে আমাদের থেকে উন্নত এই দুনিয়া তো দুরের কথা, এই মহাবিশ্বেও কেউ নাই। তেমন কারো খবর আমরা এখনো জানি না।

মানুষের সাথে অন্য যেকোনো টাইপের প্রাণের পার্থক্য কি? সেইটা হইলো মানুষের বোধ উন্নত, বুদ্ধি উন্নত। একটা গরুর পাশে আরেকটা গরু জবাই করলেও যে নির্বিকার থাকতে পারে, কিংবা ভাতের মাড়ের সাথে তার চোখের সামনেই বিষ মিশাইলেও তার সেইটা বোঝার ক্ষমতা নাই। সেইটা আমাদের জন্য ভালো হইছে। মানুষ বাদে অন্য যেকোনো প্রাণ কি করতে পারে আমাদের কমবেশি আন্দাজ আছে। তাই অন্য সকল প্রাণের গতিবিধিতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম হইতেছে। ওরা প্রকৃতির নিয়মেই চলে। এদিক সেদিক নাই। কিন্তু মানুষ যেইদিকেই যায়, যেইখানেই তাকায় ওইদিকেই এদিক সেদিক করে। কিন্তু আমরা মানুষ হইছি বইলা আমরা কি যা খুশী তাই করবো? তাইলে এই উন্নত বোধ ধুইয়া আমরা কোন পবিত্র পানি পান করিয়া নির্বান লাভ করিবো?

আমি ছোটবেলায় কুরবানীর দিন মাংস খাইতে পারতাম না, আমার বুক ফাইটা যাইত কস্টে। অবলা প্রাণীর জন্য দুইদিনের মায়া। শুনতে হাস্যকর মনে হইলেও আমার কাছে এই মায়ার অনুভূতি বুঝতে পারাই মানব জীবনের স্বার্থকতা, এই কারণেই আমি মানুষ।

প্রতিবছর দেশে নাকি ৫০ লাখের বেশি হাম্বা এবং আরো অনেক ছাগু কুরবানী দেয়া হয়। এত হাম্বা আর ছাগু জবাই হওয়ার পরেও দেশে দালালের সংখ্যা কমে না, এইটাই আফসোস। যাক গিয়া, অন্য ট্র্যাকে না যাই। এতগুলা ছাগু আর হাম্বার দাম এভারেজে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হবে। যেই মাত্রায় প্রচার করা হয় যে এই কুরবানী দিয়া ত্যাগের মাধ্যমে দেশের ভাগ্য পরিবর্তন কইরা দেয়া হবে, তাহা ফাপা বুলি মাত্র। দেশের বাজেট দিয়া সবাইরে এই রকম কুরবানীর আয়োজন অন্তত ৫০-৬০ বার করা যাবে বিনামুল্যে। এইটা দেশের বাজেটেরই মাত্র ১.৫ – ২% হয়, জিডিপির হিসেবেই আসে না। একদম আদর্শ নিয়ম মাইনা দেয়া হইলেও দেশে এর তেমন প্রভাব নাই, বরং যেইভাবে কুরবানী দেয়া হয়, যা আমরা রীতি কিংবা কালচার বানাইয়া ফেলছি তার কিছু বাজে প্রভাব আছে।

কি কি বাজে কিংবা আমার চোখে খারাপ প্রভাব তাও বলিঃ

১। ধনীক শ্রেণী আর দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দেয়। চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখায় যে এদের সামর্থ্য কম, এদের বেশি এবং এরা মিসকিন কিংবা এদের একেবারেই নাই।

২। যেই বাচ্চাটা ছোট থেকেই জানলো ওরা গরীব, তাই ওদের মাংসের খোজে বাইর হইতে হবে, এই আচরণ এবং অবস্থা মাইনা নেয়ার ট্রেনিং আর এই আচার প্রাতিষ্ঠনিকীকরণ জোরছে চলে কুরবানীর ঈদের সময়ে। এই মানসিকতার মধ্যে দিয়ে শিশুদের যাইতে দেয়াও অন্যায়।

৩। বছরব্যাপী আমিষের চাহিদার যে সুষম বন্টন আরও কম মুল্যে সম্ভব ছিলো, তা এই উৎসবের কারণে হইতে পারতেছে কই। গরীব কিছু পাইতেছে ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগই আসলে ফ্রিজে চইলা যায়, আর যাদের আছে তারা তো ভরপেট খাইতেই থাকে। এইখানেও হানা দেয় পুজিবাদ। ভিক্ষা কইরা লাখ লাখ মানুষ মাংস জমায়, সেই মাংস বাজারদরের চেয়ে অনেক সস্তায় কিনে হোটে ব্যবসায়ী এবং মওজুদদাররা, যাদের বিশাল সাইজের হিমাগার আছে। গরীব মানুষের তো ফ্রিজ নাই, কারো যদি কোনোমতে ফ্রিজ থাকেও তাতে কেজি কেজি মাংস রাখা বিলাসিতা। আলটিমেট ফায়দাভোগী ক্যামনে জানি পুঁজিপতিরাই হয়।

৪। কুরবানী এইদেশে অন্তত শো অফের ব্যাপার। মাংসের হিসাব, দামের হিসাব, ভাগার হিসাব, হারছি নাকি জিতছি সেই হিসাব, এত এত হিসাব করার পর কিসের মহৎ ধর্মীয় উতসব হয়? উতসবের নামে চলে ছোটলোকীর চর্চা।

৫। শ্রেণীভেদ প্রকটভাবে বুঝাইয়া দেয়ার খুব ভালো পন্থা এই কুরবানী। দরিদ্র ধনীর দরজায় মাংস মাংস কইরা চিল্লাবে। দেশে অন্তত একটা দিন যারা ভিক্ষুক না, তাদেরও বিশাল একটা অংশ একধরণের ভিক্ষাবৃত্তিতেই নামে, মাংস ভিক্ষা চলে। যদি কেউ ত্যাগ করতেই চায়, এইভাবে টূকরা টুকরা জৈব খন্ড ত্যাগ না কইরা পাত্তি বিলাক গোপনে। কিংবা জনসেবার নানা উপায় তো আছে, সাহায্যের নানা উপায় আছে, ওইসব করুক। এই বাজারে একটা গরুর দাম দিয়া অন্তত পাচটা ছেলে মেয়ের শিক্ষার খরচ উঠে যায়। ৫০ লাখ গরুর টাকায় অন্তত ২-৩ কোটি ছেলে মেয়ের আধুনিক শিক্ষার খরচ উঠে আসতো। দেশে বা জাতির উপর প্রভাব হইতো ব্যাপক। কিন্তু আমরা ওইসব শিশুদের, ছেলে মেয়েদের তাদের পুরা পরিবার সহ ভিক্ষুকই বানাইতেছি।

যাইহোক, আমি এত ভাইবা লেখিনা। ইচ্ছা হইলো দিনভিত্তিক এই লেখা লিখবার, পেজ ওপেন করলাম আর লিখা শুরু করলাম মাথায় যা আছে তা সম্বল কইরা। আমি প্রাণী অধিকার কর্মী নাকি হাবিজাবি কিসব আছে, ওইসব কিছু না। এইসব গরু ছাগল একদিন না একদিন মরতোই আর ওইটা নিশ্চিতভাবেই জবাই হওয়ার পরেই। আমি তাদের প্রতি সমব্যথীও না। আমাগো দিন তো শেষ প্রায়, আমি ভবিষ্যত প্রজন্মের মানসিকতা নিয়া শংকিত কিছুটা। আমি জীবনে কুরবানী বা জবাই দেখিনাই। এমন না যে ভয় পাই। আমি নিজেও হয়তো প্রয়োজনে মানুষ জবাই করতে পারবো যদি মনে হয় ওইটাই সঠিক হবে। কিন্তু আমি এইসব দেখিনা। আমার মনে হয় একটা প্রাণীর যন্ত্রনা, আর্তনাদের মধ্যে উপভোগের কিছু নাই। এই প্রক্রিয়া যত দ্রুত শেষ করা যায় ততই ভালো। কিন্তু কোটি কোটি বাচ্চাও এইসব জবাইয়ের দৃশ্য আগ্রহ নিয়া দেখে, হাসিমুখে আনন্দ নিয়াই দেখে। আমি তাদের মানসিকতা কিভাবে গইড়া উঠবে সেইটা নিয়া শংকিত। নৃশংস কাজ যদি উপভোগের, বিনোদনের ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়, তাইলে সেইটা আশংকারই কথা। জবাই এক্সপার্ট জঙ্গী তাইলে এইদেশ সহজে প্রডিউস করবে নাকি অন্যদেশ করবে? একটা মানবিক পৃথিবীতে প্রকাশ্যে আনন্দ নিয়া বা হাসিহাসি মুখে নৃসংশ দৃশ্য উপভোগ করতে থাকা আমার কাছে কেমন জানি লাগে। ওরা নাহয় হাম্বা ছাগু তাই বোধ নাই কোনো, কিন্তু আমরা মানব জন্ম লইয়াও মানুষ হইলাম কই?

শেষে আরেকটা সরল স্বীকারোক্তি, কুরবানী আমার নামেও হইতেছে, কিন্তু ওইটা আমার কাছে সামাজিক রীতি পালনের মতই। শিশুকাল থাইকাই দুই তিনদিনের দেখা গরুর কষ্টে মাংস খাইতে পারতাম না কয়দিন। আমি ওইটাও পালন করবো। কুরবানী দিব, কিন্তু ঈদের দিন অন্তত মাংস খাব না, যদিও আমি পুরাপুরি মাংসাশী মানব। আমার অংশ তারাই খাক, যারা সারাবছর তৃপ্তি নিয়া মাংস খায়না। কুরবানীর এইদিকটা একেবারে মন্দ না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “কুরবানী নিয়া ব্যক্তিগত অভিমত

  1. আমি ছোটবেলায় কুরবানীর দিন

    আমি ছোটবেলায় কুরবানীর দিন মাংস খাইতে পারতাম না, আমার বুক ফাইটা যাইত কস্টে। অবলা প্রাণীর জন্য দুইদিনের মায়া। শুনতে হাস্যকর মনে হইলেও আমার কাছে এই মায়ার অনুভূতি বুঝতে পারাই মানব জীবনের স্বার্থকতা, এই কারণেই আমি মানুষ।

    আহারে মানবতা।

    আপনি নীচের ছবিগুলা আর ভিডিওটা খুব মন দিয়ে দেখুন। পৃথিবীতে এভাবে প্রতিদিনই লাখ লাখ গরু-ছাগল জবাই করা হচ্ছে স্লাটার হাউসগুলোতে। এর এসব জবাই করা পশুদের মাংশ দিয়েই কে এফ সি, ম্যকডোনাল্ড গিয়ে আপনি এবং আপনার মত মানবতাবাদীরা ফাস্ট ফুড গিলছে বিপুল পয়সা খরচ করে। তখন কিন্তু মানবতা আর দরদ উথলে উঠছে না।

    https://www.youtube.com/watch?v=Xac4L4Zn570

    1. জী ভাই, মানবতারে আমিও আহারে
      জী ভাই, মানবতারে আমিও আহারে বললাম আপনার সাথে সুর মিলাইয়া। আমিও যে কেএফসি, ম্যাগডোনাল্ডস ভক্ত। কিন্তু আমার এই অংশটা কিসের ভুমিকা হিসেবে আনছিলাম আপনি হয়তো পড়েন নাই কিংবা আপনার এইসব অদরকারী, ভন্ডামীমার্কা পোস্ট পুরাটা পড়বার ধৈর্য্য হয়নাই। এই অংশটা পড়লে মনে হয় বুঝতে পারবেন কেন লিখছিলাম। বিষয়টা পশু হত্যা করা যাবে নাকি যাবে না এইসব না, বিষয়টা মানুষ হিসেবে আমাদের কোনটা উপভোগ করা উচিত, কি অনুভব করা উচিত কিংবা আচরণ কতটূকু সংযত হওয়া উচিত, সেইসবঃ

      আমি জীবনে কুরবানী বা জবাই দেখিনাই। এমন না যে ভয় পাই। আমি নিজেও হয়তো প্রয়োজনে মানুষ জবাই করতে পারবো যদি মনে হয় ওইটাই সঠিক হবে। কিন্তু আমি এইসব দেখিনা। আমার মনে হয় একটা প্রাণীর যন্ত্রনা, আর্তনাদের মধ্যে উপভোগের কিছু নাই। এই প্রক্রিয়া যত দ্রুত শেষ করা যায় ততই ভালো। কিন্তু কোটি কোটি বাচ্চাও এইসব জবাইয়ের দৃশ্য আগ্রহ নিয়া দেখে, হাসিমুখে আনন্দ নিয়াই দেখে। আমি তাদের মানসিকতা কিভাবে গইড়া উঠবে সেইটা নিয়া শংকিত। নৃশংস কাজ যদি উপভোগের, বিনোদনের ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়, তাইলে সেইটা আশংকারই কথা। জবাই এক্সপার্ট জঙ্গী তাইলে এইদেশ সহজে প্রডিউস করবে নাকি অন্যদেশ করবে? একটা মানবিক পৃথিবীতে প্রকাশ্যে আনন্দ নিয়া বা হাসিহাসি মুখে নৃসংশ দৃশ্য উপভোগ করতে থাকা আমার কাছে কেমন জানি লাগে। ওরা নাহয় হাম্বা ছাগু তাই বোধ নাই কোনো, কিন্তু আমরা মানব জন্ম লইয়াও মানুষ হইলাম কই?

      1. নৃশংস কাজ যদি উপভোগের,

        নৃশংস কাজ যদি উপভোগের, বিনোদনের ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়, তাইলে সেইটা আশংকারই কথা। জবাই এক্সপার্ট জঙ্গী তাইলে এইদেশ সহজে প্রডিউস করবে নাকি অন্যদেশ করবে?

        আমি আসলে বুঝতে পারি নাই। সমস্যাটা আপনার মাইন্ড সেটে। একজন মুসলিমের মনে গরু-ছাগল কোরবাণী দেবার সময় নৃশংশতা কাজ করে না। বরং নবী ইব্রাহীমের অনুসরনে একটা ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে কোরবাণী দেয়া হয়। আর কোরবাণী দেখে কোন শিশু কোন কালে এক্সপার্ট জংগী হিসেবে বড় হয়েছে এমনটাও কোন কালে শোনা যায় নাই।
        আপনি হয়ত জানেন না আমেরিকার মত উন্নত আর সভ্য দেশে (যারা কোন কালেই কোরবাণী দেয় না) প্রতি বছর বিপুল পরিমান মানুষ মারা যায় পাশের প্রতিবেশীর বন্দুকের গুলিতে।

        তবু আপনার ব্যাক্তিগত ভিন্ন অভিমত থাকতেও পারে। সেটা তো স্বাভাবিক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 1