অনলাইন গরুর হাট ডট কম

এবার ঈদে আর বাড়ি যাওয়া হচ্ছেনা। এটা ঠিক কামরুলের নিজের সিদ্ধান্ত না, অবস্থার চাপে সিদ্ধান্তটা জন্ম নিয়ে ফেলেছে। ঠিক জন্মদাতা না হলেও সিদ্ধান্তটাকে তার বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। কেননা একটা পাথর তার বুক থেকে নেমে গেছে। ঈদের সময় বাস বা ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে চ্যাপ্টা হয়ে আধমরা শরীরে ঈদের দিন বিকেলে বা তারও পরের দিন বাড়ি পৌঁছানোর মজা আর কেউ পেলেও কামরুল পায়না। এবার কোনভাবেই টিকেট ম্যানেজ করতে না পেরে বেগতিক অবস্থায় এইটায় মেনে নিতে হলো। এবার আর ঈদে বাড়ি যাওয়া হলোনা। কিন্তু যে পাথরটা কামরুলের বুক থেকে নেমে গিয়েছিল তাই দেখা গেল নাজমার মনের ওপর চেপে বসে বসলো। সিদ্ধান্তটা ফাইনাল হয়ে যাবার পর থেকে ওর দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। আড়ালে আবডালে হয়তো আঁচলে চোখের কোনটাও মুছে নিয়েছে দু’একবার, কিন্তু নয়ন সরসী বলে কথা। কামরুল পজিটিভ ধরনের কথা বার্তা বলে ভারটা হালকা করার চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দেয়। আসলে এসব ঠিক কথা বলে সুরাহা করা কঠিন।

এখন ঈদটা যাতে যুত মত ভালোই ভালোই উতরে যায় তবেই রক্ষা। কথায় নয় কামরুল কাজে বিশ্বাসী। সুতরাং সে ভেবে নেয় ঈদটা যাতে দেশেরবাড়ির শোক ভুলিয়ে দিতে পারে সেই চ্যালেঞ্জটাই সে নেবে। শেষে নাজমাও বলবে আরে বেশতো একটা ঈদ পার করলাম, অতখানি কষ্ট করে দেশের বাড়ি গিয়ে কি লাভ। সমস্যা হলো কিভাবে একটা ঈদকে আনন্দময় করে তোলা যায় এটা সম্পর্কে তেমন কোন আইডিয়া এখনও কামরুলের মাথায় খেলছেনা। খেলছেনা কারণ সে এটা নিয়ে এখনও সত্যিকারের ভাবনাটা ভাবেনি। যখন ভাবা শুরু করবে তখন নিশ্চিতই দারুন দারুন সব প্ল্যান এসে যাবে। এগুলো সবই অবশ্য কামরুলের পজিটিভ ভাবনা। কারণ নিজেকে যতই বুঝ দিক, এ নিয়ে সে বিস্তর ভাবাভাবি এর মধ্যেই করেছে কিন্তু ভাবনাটা ঈদের সময়ে রাস্তার জ্যামে পড়া গাড়ির মত আটকে পড়েছে। না সামনে এগোচ্ছে, না পেছাতে পারছে।

রোজার ঈদ হলে সমস্যা ছিলনা। ঢাকা শহরে ঈদকে আনন্দময় করবার একশো একটা ব্যবস্থা থাকেই। কিছু বাড়তি পয়সা অবশ্য খরচ হয়ে যাবে কিন্তু সেদিকটা নিয়ে না ভাবলেও চলে। কিন্তু কোরবানীর ঈদটা সম্পূর্ণই অন্য ব্যাপার। আত্মীয়-স্বজন মিলে মাংসের স্তুপের সামনে সবাই মিলে যে জটলা আর হাঙ্গামাটা হয় সেরকম পরিস্থিতি নন্দনপার্ক বা ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের সাধ্য কি তৈরী করে।

একটু একটু করে কামরুলের খুশি খুশি ভাবটা উবে যেতে শুরু করে। প্রথমত এই প্রথমবার সে উপলব্ধী করে দেশের বাড়ির ঈদের হৈ-হল্লাটা টেস্ট-টিউব বেবির মত কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি করাটা কতখানি অসম্ভব একটা কাজ। দ্বিতীয়ত যে ভাবনাটা আসে তা তাকে একেবারেই ধ্বসিয়ে দেয়। বাড়িতে কোরবানীটা দেওয়া হয় সবাই একসাথে। তাদের পরিবারটা বেশ বড়ই। ঈদের সময় ডজন খানেক পরিবার একত্রিত হয় আর কম পক্ষে চারটা গরুতো কোরবানী হবেই। সঙ্গে দু’চারটা ছাগলও অনেক সময় থাকে। আর এ সম্পর্কিত রূঢ় সত্যটা হলো তাকে কোনবারই গরুর হাটে যেতে হয়নি। অল্প বয়সে দু’চারবার গরুর হাটে গরুর শিঙের গুতো খেয়ে আর ও পথ সে মাড়ায়নি। এতে করে অসুবিধা বিশেষ কিছু হয়নি কেননা বাড়িতে কোরবানীর সময় গরুর হাটে যাবার উৎসাহী লোকের কখনও আকাল পড়েনি। হৈ হৈ করে তারা হাটে গেছে আবার হৈ হৈ করেই গরু গুলো টানতে টানতে বাড়ি এনেছে। কোরবানীর হাটে কি দেখে সঠিক কোরবানীর গরুটা কিনতে হয় এ সম্বন্ধেও কামরুলের বিশেষ ধারনা নেই।

ঢাকায় একটা আস্ত গরু কোরবানী দেওয়ার কোন মানেই হয়না। অতখানি মাংস নাজমা একা ম্যানেজ করতে পারবেনা, তার উপর আত্মীয় স্বজনও বিশেষ কেউ নেই এখানে। অতখানি মাংস বিলি বন্টনের ব্যাপারটাই ঝামেলা হয়ে দাঁড়াবে। অফিসের কলিগ আর পরিচিত মানুষ জন আর কয়টা। সুতরাং সম্ভব হলে একটা ছোট খাটো ছাগল অথবা গরুর ভাগ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকায় এর আগে কোরবানী ঈদ করা হয়নি সুতরাং গরুর ভাগের ব্যাপারে কারো সাথেই সেরকম কথা আগে থেকে বলে রাখা হয়নি। তাছাড়া এখানে কোন হাটে গিয়ে ছাগল কিনবে সেই দুশ্চিন্তাটাতো রয়েইছে। বিশেষ করে এখানকার হাট গুলোতে পশু-বিক্রেতার চেয়ে দালালদের অত্যাচার বেশি। তার মনে হয় তাকে নির্ঘাত ঠকিয়ে দেবে। ছাগলটা কিনে আনার সময় দেখা যাবে সেটা অনেকদিন ধরেই অসুখে ভুগছিল। হয়তো পথেই জিভ বের করে সেটা মারা পড়বে। গলায় বাঁধা দড়িটা ধরে ছাগলের লাসটা রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে আসার সময় নিশ্চয়ই তাকে ঘিরে একটা ভিড় তৈরী হবে। সেখান থেকে কি রকম মন্তব্য আসতে পারে এসব ভাবতেই তার বুক শুকিয়ে যায়। দেশের বাড়িতে তাকে কখনওই এসব দায়িত্ব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। আর এখন এসব চিন্তায় তার মাথাতো বটেই সারা শরীর ভেঙ্গে ঘাম দেখা দিল।

অফিসের কলিগেরা এর মধ্যেই অনেকে দেশের বাড়ি চলে গেছে। যারা রয়েছে তারাও কামরুলের জন্য গরুর ভাগের কোন ব্যবস্থা করতে পারলোনা। এসব ব্যাপার একটু আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হয়। এই অন্তিম মুহূর্তে কোন ভাগাভাগির গ্রুপে একটা কি দু’টো ভাগ ম্যানেজ করা ভীষণ কঠিন। চোখে আন্ধার দেখলেও কামরুল পজিটিভ ভাবতে চায়। জোর করে মনে মনে বলে ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবেই।

কিন্তু যতক্ষণ ব্যবস্থাটা না হচ্ছে তখন নাজমা আর বাচ্চা দু’টোকে নিয়ে ঈদ শপিং করে ব্যস্ত রাখা যায়। আইডিয়াটা কোরবানী সমস্যার কোন সমাধান না হলেও তার মনে ধরে। অসহায়ের মত বসে থাকার চেয়ে অন্তত একটা কাজতো পাওয়া গেল। এমনিতে মার্কেট আর শপিং মল গুলোয় ঘুরে ঘুরে কেনাকাটায় কামরুলের ভীষণ আপত্তি। ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে অনলাইনে অর্ডার দেবে আর জিনিসটা বাড়িতে কেউ পৌঁছে দিয়ে যাবে এটাই কামরুলের পছন্দ। কিন্তু সে পছন্দের গলা টিপে ধরার সময় এখন, কেননা নাজমা সারাটা দিন ধরে এ মার্কেট, সে মার্কেটে ঘুরে ঘুরেই শপিং করতে পছন্দ করে। অনলাইনে কেনাকাটা নাজমার চুড়ান্ত অপছন্দের। “শুধু ছবি দেখে দেখে কেউ জিনিস কেনে! কি দিতে কি দেবে তার ঠিক আছে। এই যে এত দেখে শুনে কিনে আনি তবু দেখা যায় একটা না একটা খুঁত থেকেই যায়। ওরা একটু সুযোগ পেলেই ঠকায়, এখন কিছুতেই বিশ্বাস নেই।” অকাট্য যুক্তি। অন্তত বাড়িতে নাজমার মুখের ওপর তার যুক্তি খণ্ডাতে পারে এতখানি যুক্তিবিদ কামরুল নয়। তাছাড়া অবস্থা এখন যেমন বেগতিক তখন ডিজিটাল কেনাকাটার চেয়ে বরং পুরনো ভার্সনটাই চলুক। একটু প্রাণ খুলে শপিং মল টলে ঘুরলে হয়তো নাজমা আর বাচ্চা দু’টোর মনও খানিকটা ভালো হয়ে যাবে।

কামরুল অবশেষে সমাধান পেয়েই গেল। ডিজিটাল বাংলাদেশে অনলাইনেই যে একেবারে নাকের ডগার সামনে সমাধানটা ঝুলে ছিল তা সেও ঠাহর করে উঠতে পারেনি। কোরবানী হচ্ছে এটাই বড় কথা। এর জন্য তাকে গরুর হাটের কাদায় হুটোপুটি খেতে হবেনা। বিদেশে এমন ব্যবস্থা আছে সে শুনেছে। এখন দেশেও যে শুরু হয়েছে সেটা জানা ছিলনা। সে শুনেছে ইয়োরোপ-আমেরিকায় হালাল বুচারিতে অর্ডার দিয়ে রাখলেই হলো। ঠিক ঈদের দিন তারা হালাল ভাবে কোরবানী জবাই করে গোস্ত কেটেকুটে প্যাকেট করে বাড়ি দিয়ে যায়। হাটে হাটে ঘুরে গরুর মুখ খুলে দাঁত দেখে বয়স জানার ব্যাপার নেই, শিঙের গুঁতো খাওয়ার ব্যাপার নেই, কসাই যোগাড় করার ব্যাপার নেই, সব চেয়ে মোদ্দা কথা গরুর ভাগের জন্য ঝোলাঝুলির ঝামেলাই নেই। দেশেও যে এমন কারবার শুরু হয়েছে কে জানতো। স্মার্ট ফোনে নেট সার্ফিং করতে গিয়েই এই সাইটটা সে পেয়ে গিয়েছে। একশো ভাগ দেশী সাইট। সাইটটার চেহারা সুরতের বিশেষ ছিরি-ছাঁদ নেই। বোঝাই যায় সাইট তৈরীতে খুব বেশি যত্ন নেওয়া হয়নি, তবে চেহারায় কি আসে যায়, কাজটাই আসল। এক্কেবারে অনলাইন গরুর হাট যাকে বলে। সার দিয়ে একেকটা গরুর ক্লোজড আপ ছবি। বেশির ভাগের নিচেই লেখা “সোল্ড”। কোন কোনটার নিচে আবার লেখা সাত ভাগের চার ভাগ বিক্রি হয়ে গেছে তিন ভাগ আছে। এই ভাগের মধ্যেই কেউ এক বা দুই ভাগ অনায়াসেই কিনতে পারে। কিছু ছাগলের ছবিও আছে। একটা ছাগল আবার ঠোঁট উল্টে দাঁত বের করে আছে। অনলাইনেই রেজিস্ট্রেশন, পেমেন্ট সেরে কামরুল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

অনলাইনে কেনাকাটার ব্যাপারে উৎসাহী হলেও কামরুল যে খুব বেশি অনলাইনে কেনাকাটা করেছে এমন নয়। নেহাত শখের বশে বার দু’য়েক হাতঘড়ি, কখনও সখনও একটা কি দু’টো টি-শার্ট এই পর্যন্তই। সংসারের কেনাকাটা সাধারনত নাজমারই এখতিয়ারে। আর এসব ব্যাপারে সে সশরীরে বাজার ভ্রমনে তুমুল বিশ্বাসী। কামরুল মুগ্ধতা নিয়ে অনলাইনের গরুর হাটটির সাইটটা আতিপাঁতি করে দেখে। শুধু কোরবানীর গরু কেনা নয় সব দায়িত্বই ওরা নিয়ে নিচ্ছে। সাইটটাতে বলছে “অনলাইনে কোরবানীর পশুর জন্য পেমেন্ট করে সব ভুলে যান, আপনার কোরবানী সংক্রান্ত সমস্ত দায়িত্ব আমাদের।” আহ! ঠিক এমন একটা সমাধানইতো সে খুঁজছিল। এতদিনের পজিটিভ ভাবনার ফল সে হাতে হাতে পেতে শুরু করেছে। সেতো বারবারই বলে এসেছে যে কোন ব্যাপারে পজিটিভ ভাবতে হয়। পজিটিভ, নেগেটিভ নয়, হান্ড্রেড পার্সেন্ট পজিটিভ।

নাজমা একবার বলেছিল “এবার না হয় কোরবানী আমরা নাইবা দিলাম।” কামরুল কণ্ঠে একরাশ বিস্ময় ফুটিয়ে বলে “কেন ? আলবৎ আমরা কোরবানী দেব। আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি। ঈদের দিন দেখবে সব রেডি হয়ে চলে এসেছে। গরুর দু’টো ভাগ নিয়েছি।” ওর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বরে নাজমাও আর বেশি উচ্চবাচ্য করে না। কামরুল কিন্তু খুব সাবধানে অনলাইনে অর্ডার দেবার কথাটা চেপে যায়। কি দরকার বাবা এই সময় এসব কথা ফাঁস করে। হাতের কাছেই একটা মোক্ষম সমাধান পাওয়া গেছে, এইই ঢের। বাচ্চা দু’টো একবার গরু দেখবো বলে জেদ ধরবার উপক্রম করেছিল অবশ্য। সময় মত সেটা সামাল দেওয়া গেছে। একবার মনেও হয়েছিল অনলাইনে সাইটটা খুলে গরুর ছবিটা ওদের দেখিয়ে দেয়। পরে ভাবলো অযথা ঝুঁকিটা নেওয়া ঠিক হবেনা। নাজমা জানলে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দেবে। ঈদের দিন যখন কোন ঝামেলা ছাড়াই বাসায় গরুর মাংস এসে হাজির হবে, সে মাংস মসৃণ ঝকঝকে মেঝেতে স্তুপ করে রাখা হবে তখনই কামরুল নাজমার সামনে বিষয়টা বলবে তার আগে নয়। আর সে মুহূর্তটাই হবে কামরুলের বিজয়ের মুহূর্ত।

ঈদের দিন কামরুল সকাল থেকেই অস্থির হয়ে আছে। বাচ্চা দু’টোকে নিয়ে কাছের একটা ঈদগাহে নামাজ পড়ে এসেছে। মাংস রান্নার মশলা গুলো কাজের মেয়েটার সাহায্যে গতকালই নাজমা প্রস্তুত করে রেখেছে। এখন টুকিটাকি কাজ গুলো সেরে রাখছে। মাংস এসে পড়লে নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকবেনা। কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে পায়চারী করে কাটালো কামরুল। কেউ প্যাকেট ফ্যাকেট নিয়ে এলে এখান থেকেই আগে চোখে পড়বে। এখনও বেলা বিশেষ হয়নি সুতরাং উতলা হবার কোন মানেই হয়না। কিন্তু এসব ভেবে উত্তেজনাটা প্রশমিত করা যায়না। কিছুক্ষণ বাচ্চাদের সঙ্গে টিভি দেখে কাটালো। বাড়ি থেকে ফোন এলে সবারই পর্যায়ক্রমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় চললো। বাড়ি আসতে না পারায় বাড়ির সবারই মন খারাপ সে সংবাদও পাওয়া গেল। বাচ্চা দু’টো দাদু-দিদার সাথে কথা বলার সময় এ নিয়ে অনুযোগ-অভিযোগের কোন ত্রুটি রাখলোনা। বলাই বাহুল্য এইসব অভিযোগের আসামী একমাত্র কামরুলই।

একটু বেলা হলে কামরুল নিচে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটাহাটি করতে থাকে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকাই ভালো। মাংস নিয়ে লোক এলে তাদের ঠিকানা চিনতে অসুবিধে হতে পারে। একটু যে দেরী হবে এটা স্বাভাবিক। তাদের বাড়িতেও চারটা গরু কেটেকুটে তৈরী হতে দুপুর পেরিয়ে যায়। আর এই অনলাইন কোরবানীর প্রতিষ্ঠানটিকে নিশ্চয়ই অনেক কোরবানীর সামাল দিতে হচ্ছে। দুপুরের খাবারটা তড়িঘড়ি করেই খায় কামরুল। টেনশনটা নাজমাকে দেখতে দিতে চায়না। খেয়েই আবার সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। আসে পাশে যারা কোরবানী করেছে তাদের কয়েকজনের মাংস এর মধ্যেই কাটাকোটা শেষ। অনেকের এখনও শেষ হয়নি তাদের কসাই এসেছে দেরী করে। এসব দেখতে দেখতেই কামরুল একটা চায়ের স্টলে চায়ের অর্ডার দেয়। ঘড়ির কাঁটা বিকেল চারটা পার হলে তার দুশ্চিন্তা শুরু হয়। একটা ফোন করে দেখা যায়। সাইটটাতে ফোন নাম্বার নিশ্চয়ই দেওয়া আছে। অজানা আশঙ্কায় তার বুক ধুকপুক করতে থাকে। স্মার্ট ফোন বের করে সাইটটা খোলে। হ্যাঁ এইতো দু’টো ফোন নাম্বার দেখা যাচ্ছে। প্রথম ফোনটা করতেই যখন ওপার থেকে ঘোষণা আসে “এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া যাচ্ছেনা” তখন সে প্রমাদ গুনলো। পরের নাম্বারটায় অবশ্য রিং বাজতে শুরু করে। ফোন ধরলো একটা কচি কণ্ঠের ছেলে। কামরুলের অনুসন্ধানী প্রশ্নে সে কণ্ঠস্বর বিন্দু মাত্র বিচলিত হলোনা। “প্রিয় মুমিন, আপনি আপনার মেইল চেক করেননি। আপনার উচিত ছিল মেইলটা চেক করা। আমরা সব কিছু আপনাকে বেশ কয়েক ঘন্টা আগেই মেইল করেছি। আমাদের সেবা গ্রহন করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।” ফোনটা কেটে যেতেই কামরুল ভাবতে থাকে। মেইল কেন? হয়তো কোন কনফার্মেশন কোড বা ডেলিভারি বিভাগের ফোন নাম্বার দেওয়া আছে মেইলটাতে। মেইল খুললে সে আগেই নাম্বার পেয়ে যেত আর ডেলিভারি বিভাগে ফোন করে বাড়ির ঠিকানাটা আরেকবার বলে দিতে পারতো। ধুর, সে অযথাই দেরী করে ফেললো। ওপরে নাজমা হয়তো মাংসের জন্য বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে।

আর দেরী না করে স্মার্ট ফোনেই সে মেইলটা খোলে। কোরবানীর সেই সাইটটা থেকেই একটা মেইল এসেছে। কিন্তু মেইলটা খুলে সে বোকার মত তাকিয়ে থাকে। একটা নাম্বার ছাড়া মেইলটাতে আর কিছু নেই। ছয়-সাত ডিজিটের একটা নাম্বার। কোন এ্যাটাচমেন্ট ফাইল আছে কিনা সেটাও কামরুল একবার দেখে নেয়। না নেই। এই নাম্বারটার মানে কি? এটা যে কারো ফোন নাম্বার নয় এটাতো নিশ্চিত। তাহলে কি কনফার্মেশন কোড। যদি তাই হয় তাহলে কোথায় এই কোডটা পাঠাতে হবে। কোন ফোন নাম্বার বা মেইল এ্যাড্রেসে এটা পাঠাতে হবে সে নির্দেশও নেই। কিছুইতো বোঝা যায়না। অনলাইন পদ্ধতি গুলো আরো সহজ হওয়া উচিত। এত জটিল প্রক্রিয়া হলে ব্যবসা এগোবে কি করে।

কামরুল ঐ আগের ফোন নাম্বারটাতেই আবার ফোন দেয়। কচি কণ্ঠস্বরটা উৎফুল্ল ভঙ্গীতে বলে মেইলটা নিশ্চয়ই দেখেছেন। “হ্যাঁ একটা নম্বর পাচ্ছি ওখানে।” ছেলেটা বলে, “প্রিয় মুমিন ওটা শুধু নম্বর নয় ওটা একটা সংখ্যা।” কামরুল একটু অধৈর্য্যই হয়ে ওঠে “কিন্তু সংখ্যাটা নিয়ে কি করবো।” কচি কণ্ঠটা বলে “ প্রিয় মুমিন আপনাকে বিষয়টা বুঝিয়ে দিই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন কোরবানীর পশুর জবেহ হওয়া মাত্র তা আল্লাহ পাক কবুল করে নেন। এমনকি রক্তটা মাটিতে পড়ার আগেই। কিয়ামতের দিন কুরবানীদাতা কুরবানীর পশুর শিং, খুর আর পশম নিয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে। এইসব মাংস-গোস্তের কোন উপকারিতা নেই। এগুলো আপনার সঙ্গে যাবেনা। আমরা আপনার হয়ে কোরবানী দিয়েছি এবং সেই মাংস গরীব-দুঃখীকে বিলি বন্টনও করেছি। আর প্রিয় মুমিনের নিশ্চয়ই জানা আছে কোরবানীর পশুর শরীরে যত পশম বা লোম আছে তার সমান নেকী বা সওয়াব পাবেন কোরবানীদাতা। আমরা ঠিক এই ব্যাপারেই বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা আপনার কোরবানীর পশুর চামড়ার একবর্গ ইঞ্চি পরিমান জায়গার লোম গুনে সেই অনুপাত দিয়ে কোরবানীর পশুটার সারা শরীরে কতটা লোম আছে তা বের করে সাত ভাগে ভাগ করেছি। আপনি যেহেতু দু’ভাগ অংশ কিনেছেন তাই সেই সর্বমোট পশম সংখ্যা থেকে দু’ভাগের পশম সংখ্যা যুক্ত করে আমরা আপনার মেইলে সেণ্ড করে দিয়েছি। এই সংখ্যাটাই হলো আপনার নেকীর সংখ্যা, আপনার কোরবানীর সওয়াব। এটা লিখে রাখবেন এবং প্রতি বছর এই সংখ্যা গুলোকে আগের বছরের সাথে যোগ দিয়ে একটা খাতায় লিখে রাখবেন। প্রিয় মুমিন এই সওয়াবটাই আসল ব্যাপার। মাংস পচে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে একমাত্র নেকীই আপনার সঙ্গে যাবে। ঈদ মুবারক।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 + = 77