কুরবানীর ঈদ এবং আমাদের বিবেক

আমি হিন্দু। জন্মসূত্রে। আমার পরিবার আমাকে শিখিয়েছে গরু না খাবার জন্য। সেজন্য আমি খাই না। ধর্মীয় কারনে খাই না বা ধর্মানুভূতি থেকে খাই না এমন নয় বিষয়টা। বিষয়টা বংশ পরম্পরা থেকে। বংশ পরম্পরার জন্য আমি অনেক কিছুই করি যেটা অনেকে করেনা আবার অনেক কিছুই করিনা যেটা অনেকে করে। ঠিক সেভাবেই আমার বংশ পরম্পরা আমাকে অন্যের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করতেও শেখায় নি। শিখিয়েছে সবাইকে মানুষ ভাবতে। স্কুলে যেমন একই ক্লাসে ক শাখা, খ শাখা, গ শাখা ইত্যাদি থাকে তেমন ভাবেই কোন এক সময় হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, শিখ প্রভৃতি আলাদা শ্রেনী বা শাখায় ভাব হয়েছে। এই প্রতিটা ধর্মের ভেতরও আবার কিছু ভাগ রয়েছে। এই ভাগ মানুষ নিজেরা নিজেরাই করেছে।


জীবনে বহু মানুষের সাথে মিশেছি। বহু মানুষকে দেখেছি। নিজের পরিবার থেকেই শুরু করি। আমার বাবা একজন শাড়ী ব্যবসায়ী। নিজে বিভিন্ন স্থান থেকে শাড়ি কিনে আনেন, আবার অনেকে বাসায় বা দোকানে এসেও শাড়ি দিয়ে যায়। অনেক আগে আমাদের বাসায় ভারত থেকে কাপড় নিয়ে আসত কিছু মুসলিম মহিলা। তারা কখনো আমাদের বাসায় এক ফোটা পানিও খেত না। একবার রমজানের সময় এসেছিলেন। রোজাও ছিলেন। ইফতারের সময় তাকে আমরা ইফতার খাওয়াতে চাইলে তিনি বললেন বাইরে থেকে কিছু এনে দিলে খাবেন কিন্তু হিন্দু বাসায় তাদের খাবার খাওয়া হয় না। এতে কিন্তু আমার বাবা,মা কিছু মনে করতেন না, কারন এটা তাদের পরম্পরা। এটা তাদের ব্যপার। তারা কোথায় খাবে কোথায় খাবেনা। সেকারনে তাকে বাইরে থেকে এনেই ইফতার দেওয়া হয়েছিল কাগজের ঠোঙায় করে।অতিথি যেভাবে খুশি হয় আসলে তাকে সেভাবেই আপ্যায়ন করার চেষ্টা করা উচিত।

আবার আমাদের পাশের এক পড়শি ব্রাক্ষ্মন বাসায় দেখেছি মুসলিম দের বাসায় ঢুকতে দিলেও কখনো ঘরে ঢুকতে দিত না। তাদের বাসার উঠনেই বসতে দেওয়া হত। আবার তারা চলে গেলে ওই জায়গা খুব যত্ন সহকারে ধুইয়ে দিত জল দিয়ে। তাদের খাবার খেতে দেয়া হত আলাদা বাসনে। সেই বাসনে ওই বাসার কেউ ব্যবহার করত পর্যন্ত না।

আর নিজের কথা বলতে গেলে, আমি কেমন আমার বন্ধু বান্ধব জানে। বিভিন্ন ধর্মের বন্ধু বান্ধব দের সাথে দিন রাত কাটাই, এক সাথে চলি, একসাথে খাই। অনেক সময় এক বিছানায় রাত কাটাই, প্রয়োজনে এক থালায় খাই, এক গ্লাসে পানি পান করি। কোন সমস্যা তো নেই আমার। আমি কিন্তু এসব করে মরে যাই নি। দিব্যি বেঁচে আছি, ভাল আছি। ওদের পাশে বসেই আমি খাসী খাই ওরা গরু খায়। আমাদের পূজায় ও ওরা আনন্দ করে ওদের ঈদেও আমি আনন্দ করি, যে যার মত কিন্তু সবাই একসাথে। ভাল থাকি, খুশি থাকি। এর চেয়ে ভাল কিছু তো আর কিছু হতে পারে না। তাইনা?

গতকাল ছিল কুরবানীর ঈদ
অনেক হিন্দুর চোখেই আজ বিষাক্ত একটি দিন। ঘৃনার একটি দিন। তাই না কি? কিন্তু আমার চোখে কিন্তু নয়। এটা তাদের পরম্পরা। তাদের ধর্মীয় উৎসব। এটাকে কটাক্ষ করা তাদের অপমান করার সামিল। তাদের উৎসব তারা কিভাবে পালন করবে তাদের ব্যাপার। অনেককে দেখি লিখতে, “পশু হত্যা করে কিভাবে ধর্ম পালন করা হয়।” বা “নিরীহ পশুর রক্তে ঈদ আনন্দ পালন কেমন ধর্ম।”


আমার প্রশ্ন আপনি কি কোন পশু হত্যা করেননি? আপনি কি মুরগী খান না?মাছ খান না? আপনি কি গাছ কেটে খাবার খান বা? ফার্নিচার বানান না? তখন কোথায় থাকে আপনার কাছে এই জীবের প্রতি ভালবাসা? উত্তর দিতে পারবেন? পারবেন না।

কারন এর উত্তর দিতে গেলে আপনাকে শুধু পানি আর হাওয়া খেয়ে থাকতে হবে। আর অচিরেই মৃত্যুবরন করতে হবে। কারন এই দুইটা বাদে বাকি সব ভোজ্যই তো জীব। যদি ভেজিটেরিয়ান ও হয়ে থাকেন তবে মনে রাখবেন গাছ এর ও প্রাণ আছে।

আমি হিন্দু। আমার পরিবার আমাকে গরু খেতে নিষেধ করেছে। শুকর খেতে কিন্তু নিষেধ করেনি, নিষেদ করেনি কচ্ছপ খেতে বা আপনাদের ধর্মে যেসব হারাম সেসব আহার করতে আমায় নিষেধ করেনি। সেকারনে আমার সেসব আহারে কোন আপত্তি থাকে না কিন্তু।

আপনি একজন মুসলমান। আমি হিন্দু হলেও কিন্তু জানি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে। আমি পড়েছি। জেনেছি। অনেকটাই। আমি জানি আপনাদের ধর্মে অনেক কিছু খাওয়াই হারাম। অনেক কিছু আছে মাক্রু। যেমন শুকর খাওয়া হারাম, মদ্যপান করা হারাম। তবে আপনি একজন মুসলমান। আপনি তো জানেন হিন্দুরা গরু খায় না। তাদের গরু খেতে বলা আপনার কাছে মজা কিন্তু তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত পাওয়া। মন্দিরের সামনে গরু জবাই করলে তাদের কিন্তু ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগবেই। যদি আপনাদের মসজিদের সামনে শূকর বলি দেওয়া হয়, বা মসজিদের বসে মদ্যপান করা হয় আপনার সজ্ঞানে আপনার কি খারাপ লাগবে না? লাগবে তো?

সে গরু খায় না ছেড়ে দিন না তাকে তার মত থাকতে দিন, জায়গার তো অভাব নেই তাইনা। এত বড় একটা দেশ। সেই তুলনায় গরুর সংখ্যা খুবই কম। আর মন্দিরের সংখ্যাও হাজার গুনে কম। তবে মন্দিরের আশে পাশে কেন কুরবানি দিতে হবে গরু? ঢাকেশ্বরী বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির। তাইনা? আমরা সবাই জানি তো। একবার ঢাকেশ্বরী গিয়ে (যারা আশে পাশে থাকেন না) দেখেন কি অবস্থা সেখানে গরু জবাই হয়, গরুর চামড়ার বাজার বসানো হয়, ঢাকেশ্বরী মোড় এই গরুর বজ্য পদার্থ ফেলা হয়। প্রমান সরূপ আমি কোন ছবি দিতে চাই না। অবিশাস হলে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।


আবার আরেকটা কথা হল অনেক হিন্দুই গরু খায়, অনেক মুসলিম মদ খায়। এজন্য কিন্তু আপনি সব্বাইকে দায়ী করতে যেমন পারেন না তেমন আপনার অধিকার ও নাই যারা এসব খায় বা ধর্মের অনেক কিছুই মানে না তাদের দিকে প্রশ্ন উঠানোর। কারন সবাই স্বাধীন, সার্বভৌম। নিজের প্রতিটা কাজ এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার সবার আছে। কিন্তু কাউকে ছোট করার বা অপমান করার বা কারো অনুভূতিতে আঘাত করার অধিকার কারোর নেই।

আপনি হিন্দু হোন বা মুসলিম, খ্রিষ্টান হোন বা বৌদ্ধ, শিখ হোন বা নাস্তিক। আপনার কিন্তু অধিকার নেই অন্য কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত করা। আপনি নাস্তিক বলে আল্লাহ রাসুল কে গালাগালি দিবেন কেন। আপনি ধর্মে বিশাস করেন না ভাল কথা অন্যের ধর্মকে নিয়ে গালাগালি কেন করেন? আপনি হিন্দু, আপনি কেন গরু কাটায় মুসলিম দের ছিহ ছিহ করেন? আপনি মুসলিম কেন হিন্দুদের মূর্তি পূজা নিয়ে কথা বলেন কেন মন্দিরের সামনে গরু কুরবানী দেন? আপনি ধার্মিক কেন আপনি নাস্তিকদের গালাগালি দেন, সে ধর্ম মানবে কি মানবে না তার ব্যাপার। আপনি তো বলার অধিকার রাখেন না।

আসলেই কোন প্রয়োজন আছে কি? প্রতিটা মানুষই তো স্বাধীন। প্রত্যেকের ই পারসোনাল ব্যাপার সে কি করবে কি করবে না কি খাবে কি খাবেনা কি পড়বে কি পড়বে না ধর্ম পালন করবে নাকি আদৌ করবে না। সেসব সবই একজন মানুষের নিজের ব্যাপার। একান্তই নিজস্ব ব্যাপার।

থাকতে দিন না যাকে যার মত। নিজে ভাল থাকুন অন্যকে ভাল থাকতে দিন। আজ ঈদ। কুরবানি ঈদ। আসুন নিজের মনের পশুকে কুরবানি দেই, মনুষ্যত্ব কে জাগ্রত করি। সবাই ভাল থাকি। খুশি থাকি।

লেখক: কুমার অনিক কুন্ডু

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “কুরবানীর ঈদ এবং আমাদের বিবেক

  1. লিখাটি ছোটভাই কুমার অনিক
    লিখাটি ছোটভাই কুমার অনিক কুন্ডুর। আশা করছি ক্রেডিট লাইনে মুল লেখকের নাম দিবেন। ইস্টিশ্ন ব্লগ এর বিশ্বস্ততা নষ্ট করবেন না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 − 65 =