উনিশ না বিশের বাঁশি (পর্বঃ০২)

কোরানের ১৯ ভিত্তিক রহস্যের ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আগের পর্বে দুটি বিষয়ের আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম। আগ্রহীগণ ঢু মারতে পারেন এখানে।

কোরানের রহস্যময়তার প্রমান হিসেবে এরপরের যে উল্লেখযোগ্য দাবীটি করা হয় তা হলো, বিসমিল্লাহ সংখ্যা। দাবী করা হয়, বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম-এ উনিশটি বর্নের সাথে মিল রেখে কোরানে এটি ব্যবহার করা হয়েছে ১১৪বার যা এর বর্ন সংখ্যা উনিশ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। বিভাজ্য হলেই যে এই গ্রন্থ একটি রহস্যময় গ্রন্থ হয়ে যাবে সে দাবী কতটুকু যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্নে না গিয়ে আসুন আমরা দেখি আসলেই এ দাবী কতটুকু সত্য। কোরানে সূরার সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকার কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই সূরাগুলোর আগে ব্যবহৃত বিসমিল্লাহর সংখ্যা নিয়ে দ্বন্ধ উপস্থিত হয়। সূরা তওবার আগে বিসমিল্লাহ ব্যবহৃত না হলেও, সূরা নামলের ত্রিশ নং আয়াতে বিসমিল্লাহ ব্যবহার এর সংখ্যাকে সূরা সংখ্যার সমান করে দিয়েছে। কিন্তু আগে তো সূরা সংখ্যার সমাধান হওয়া চাই!

এবার শুনুন সবচেয়ে বড় রহস্যের কথা। কতবড় জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ হলে একটা বিশাল গ্রন্থের বর্নগুলোও গুনে গুনে ব্যবহার করা সম্ভব! হ্যাঁ, কোরানে সেই রহস্যও আছে। কোরানে ব্যবহৃত মোট বর্নের সংখ্যা ৩২৯১৫৬। দেখেছেন, এই সংখ্যা কিন্তু বিসমিল্লাহে ব্যবহৃত উনিশ বর্ন দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। সুবাহানাল্লাহ বলে দলবেঁধে ঈমান আনার আগে আসুন জেনে নিই কোরানে সত্যি সত্যি কতটি বর্ন রয়েছে। এর আগে আরেকটা বিষয় মাথায় ঢুকাবেন না দয়া করে। বিষয়টা হলো, কোরান নাজিল হয়েছিল মৌখিকভাবে, লিখিতরুপে নয়। আরবী ভাষায় মৌখিক রূপের সাথে লিখিত রূপে রয়েছে বিস্তর ফারাক। মৌখিকভাবে উচ্চারণ পরেও লিখার সময় এর শব্দের ফাঁকে ফাঁকে নানান উহ্য বর্ন ব্যবহার করা হয়। তাহলে, আপনি মৌখিক রূপ থেকে বর্ন গননা করবেন, নাকি লিখিত রূপ থেকে। আমি আপনার পক্ষে অবশ্য একটা একটা বর্ন ধরে গণনা করাও একটা কষ্টসাধ্য ব্যপার। তাই, নিজে গণনার দায়িত্ব না নিয়ে চলুন দেখি ইসলামিক স্কলারগণ কি মত প্রদান করেছেন।

“ সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কোরানের অক্ষর গণনা করেছেন বলে মনে করা হয়। তার গণনা মতে কোরানের অক্ষর সংখ্যা হলো, ৩২২৬৭১। তাবেয়ীদের মধ্যে মোজাহেদ এর গণনা অনুযায়ী অক্ষর সংখ্যা ৩২১১২১। তবে, সাধারণভাবে ৩২০২৬৭ কে সঠিক বলে গণ্য করা হয়েছে”। ( কোরান শরীফঃ সরল বাঙলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ১১)
হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রচিত বায়ানুল কোরান-এর সংক্ষিপ্ত অনুবাদ-এ সর্বমোট বর্ণসংখ্যা ৩২১২৫০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে” (ছহীহ রহমানী বঙ্গানুবাদ কোরআন শরীফ, পৃষ্ঠা ২১)।

উপরের তিনটি সূত্রের কোথাও উনিশ দ্বারা বিভাজ্য ৩২৯১৫৬ সংখ্যাটির কথা বলা নেই। তাহলে কোন দাবী সঠিক? বিচারের ভার আপনার হাতেই তোলা থাক।

সূরা, আয়াত, বর্ন নিয়ে রহস্য ঘুচলেও আরও রহস্য বাকী রয়েছে। যে আল্লাহ উনিশময় কোরআন দিয়েছেন, সেই আল্লাহর নামও কোরানে ঠিকই উনিশের বাঁশীর যাদুতে আবিষ্ট। বিশ্বাস না হলে শুনুন, কোরানে আল্লাহ শব্দটি ২৬৯৮ বার এসেছে, যা উনিশ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য। শুধু কি তাই! আল্লাহ শব্দটি আছে এমন আয়াতগুলোর আয়াত সংখ্যা যোগ করলে যোগফল হয় ১১৮১২৩, এটিও উনিশ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। এই রহস্যের সমাধান কিভাবে হবে?

রহস্যটি হলো, এই রহস্যের যিনি দাবী করেছেন তিনি নিজেই কোরানকে সংকলিত করেছেন সূরা তওবার শেষ দুটি আয়াতকে বাদ দিয়ে। সূরা তওবার শেষ আয়াতে আল্লাহ শব্দটি একবার আছে। আল্লাহ শব্দের রহস্য টিকিয়ে রাখতে গেলে এই আয়াত বাদ দেয়া ছাড়া উপায়ও নাই।

এরপর আরও যে দুটি দাবী করা হয় সেগুলি হলো, সর্বপ্রথম নাজিলকৃত সূরা আলাকের উলটা ক্রম ও সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরা নসর-এর আয়াত সংখ্যার রহস্য। সূরা আলাকের উল্টাক্রম হল উনিশ এবং সূরা নসর এর প্রথম আয়াতে শব্দ সংখ্যা উনিশ। আসলেই এর পেছনে বিশাল চিন্তাশীল, মহাজ্ঞানী প্রতিভাধর কেউ না থাকলে এভাবে খাপে খাপে মিলিয়ে কিছু কি লিখা সম্ভব?

অবশ্য নাস্তিকেরা প্রশ্ন করে, সর্বপথম নাজিলকৃত সূরার ক্রমকে কেন উলটা করে গুনতে হবে? আর সূরা সংখ্যা নিয়ে যে দ্বন্ধের কথা আগেই বলেছি তা না হয় আর নতুন করে না বললাম।

আর সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরার প্রথম আয়াতে শব্দ সংখ্যা ঠিকই উনিশ, তবে উহা আসলেই সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরা কী না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তা ভাই, সর্বশেষ নাজিলকৃত সূরার সর্বশেষ আয়াত না গুনে প্রথম আয়াতের শব্দ গুনবেন কেন? উনিশের রহস্যের সাথে মিলে যায় বলেই!!

বাকীটুকু আবার আগামী পর্বে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 32